বাংলাদেশ ছোট আয়তনের দেশ। এ দেশে কোটি কোটি মানুষের বসবাস। কৃষিজমি পর্যাপ্ত নয়। অথচ বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে চতুর্থ, মিঠা পানির মাছ ও সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আলু উৎপাদনে সপ্তম। ১৬ কোটি মানুষের দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এখন পুষ্টিমান অর্জনে এগিয়ে যাচ্ছে।
অধিকাংশ সামাজিক প্রসূচক যেমন— স্যানিটেশন, শিশু-মাতৃমৃত্যুর হার, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষায়ও প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে আমরা এগিয়ে। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ৬-এর বেশি। প্রবৃদ্ধি বাড়লেই সুষম উন্নয়ন হয় না। এর চেয়েও বেশি প্রবৃদ্ধি ভারতে হয়েছে। কিন্তু তা ভারতের গ্রামীণ মানুষের উপকারে আসেনি। কিন্তু বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিতে গ্রাম-শহর, উভয়েরই অবদান আছে। অমর্ত্য সেনের ‘ভারত: উন্নয়ন ও বঞ্চনা’ বইতে তিনি বাংলাদেশের অর্জনকে অনন্য হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আসুন, এবার একটু কল্পনা করি। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে উন্নয়নের অন্য সব অবকাঠামো ঠিক রেখে শুধু গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামোটা মনে মনে সরিয়ে নিন। দেখবেন প্রায় সব অর্জন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।
এ অর্জনের পেছনের কিছু গল্প আছে। এ অর্জনের শুরুটা হয়েছে আশির দশক থেকে। তবে এর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে সত্তরের দশকে। ধারাবাহিকতা বোঝার জন্য আমরা ১৯৪৭-এ শুরু করি। অমর্ত্য সেনের গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত পাক-ভারত-বাংলাদেশের জনগণের দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হয়নি। ১৯০০-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত উপমহাদেশের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল দশমিক ৯ শতাংশ। মাঝে মধ্যে তা নেগেটিভও হতো। তখন গ্রেট ব্রিটেনের জিডিপি ভারতের কয়েক গুণ ছিল। ১৯৩১ সালে উপমহাদেশের গড় প্রত্যাশিত আয়ু ছিল মাত্র ২৭ বছর। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর পাকিস্তান ও ভারতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। ১৯৪৭-১৯৭১ সালে পাকিস্তানের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ভারতের প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে পূর্ব পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি পশ্চিম পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধির সমান ছিল না। পাকিস্তানের এ বৈষম্য ও উন্নয়ন নীতির জন্যই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত নির্মিত হয়েছে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান তা যথার্থভাবেই মূল্যায়ন করেছেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান এক অর্থনৈতিক নীতির দেশ না, এটা মূলত দুই অর্থনীতির দেশ। ড. আতিউর রহমান ও লেলিন আজাদ সম্পাদিত ভাষা আন্দোলনের অর্থনৈতিক পটভূমি শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিষয় যেভাবে কাজ করেছে, একইভাবে কাজ করেছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিষয়টি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে শনাক্ত করতে সক্ষম হন। এ অর্থনৈতিক বৈষম্যের সারসংক্ষেপ ফুটে ওঠে বাঙালির মুক্তি সনদ ছয় দফায়। ১৯৬৬ সালে ঘোষিত ছয় দফার প্রস্তাব ৩, ৪ ও ৫-এ মূলত অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়েছে। উন্নয়নের জন্য জনআকাঙ্ক্ষা এবং তার সঙ্গে রাজনৈতিক সদিচ্ছার সংযুক্তি— এ দুই মিলিয়ে স্বাধীনতাপূর্ব উন্নয়নের একটি জাতীয় দর্শন দাঁড়িয়ে যায়, যাকে ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ দর্শন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বা স্বাধীন মানচিত্রের। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তা অর্জিত হলে সোনার বাংলা বির্নিমাণে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার বৃহৎ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। প্রথম পঞ্চম বার্ষিক পরিকল্পনা তার অন্যতম ভিত। এ পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল যুদ্ধোত্তর দেশের অবকাঠামো পুনর্গঠন ও নির্মাণ, ক্ষেত-খামার ও শিল্প-কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি, পল্লী জনপদসহ সারা দেশে ক্ষুধামুক্তি, দারিদ্র্য নির্মূল ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।
পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হলো, রাজনৈতিক সদিচ্ছাও প্রচণ্ড। কিন্তু গ্রামবাংলার অবকাঠামো নির্মাণের টাকা কোথায়? গ্রামবাংলার দারিদ্র্য হ্রাস, ক্ষুধামুক্তি, কর্মসংস্থান তৈরির তখন সহজ-সরল স্ট্র্যাটেজি ছিল— লিন পিরিয়ডে যখন কৃষি শ্রমিকের হাতে কোনো কাজ থাকে না, অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটে, তখন ভূমিহীন এবং দরিদ্র কৃষকের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি। কুমিল্লা বার্ডের প্রতিষ্ঠাতা ড. আখতার হামিদ খান-পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে একটা তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিলেন। লিন পিরিয়ডে এর আগে সরাসরি খাদ্য সাহায্য দেয়া হতো। আখতার হামিদ খান সরাসরি খাদ্য সাহায্যের পরিবর্তে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির মাধ্যমে লিন পিরিয়ডে গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণের পরামর্শ দেন। পঞ্চাশের দশকের শেষ দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন সাহায্য পিএল ৪৮০-এর গম/গম বিক্রিলব্ধ অর্থ আসা শুরু করে। মহকুমা প্রশাসক, সার্কেল অফিসারের তত্ত্বাবধানে সেই গম বিক্রিলব্ধ অর্থের টাকায় থানা পর্যায়ে মাটির সড়ক, ছোট ব্রিজ/কালভার্ট এবং সেচ নালা ইত্যাদি নির্মাণ করা হতো। এ কার্যক্রমকে কিছুটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য ১৯৬৩-৬৪ সালে পল্লী পূর্ত কর্মসূচির শুরু হয়, যা পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) হিসেবে বিবর্তিত হয়। মূলত বৈদেশিক সাহায্যের গম কিংবা খাদ্য সাহায্যই ছিল এ কর্মসূচির অর্থায়নের মূল উৎস।
বাহাত্তর সালেও বঙ্গবন্ধু সরকারকে এ খাদ্য সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। তখন যুক্তরাষ্ট্র বনাম সোভিয়েত ইউনিয়ন স্নায়ুযুদ্ধের সময়কাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পিএল ৪৮০ খাদ্য সাহায্যের মাধ্যমে ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করত। এ ভূরাজনীতির একপর্যায়ে ১৯৭৩ সালের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে পিএল ৪৮০ খাদ্য সাহায্য বন্ধ করে দেয়। তত্কালীন পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল ইসলাম অনেক ছোটাছুটি করলেন, কিন্তু খাদ্য সাহায্য আর এল না। এতে চুয়াত্তরে দুর্ভিক্ষ হলো। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলেন। ছিয়াত্তরে আবার পিএল ৪৮০ খাদ্য সাহায্য চালু হলো। পিএল ৪৮০-এর খাদ্য বিক্রয়লব্ধ অর্থে লিন পিরিয়ডে ভূমিহীন এবং দরিদ্র কৃষকের শ্রমের বিনিময়ে কিছু পল্লী সড়ক, অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হলো।
প্রকৌশলী খন্দকার মোশাররফ হোসেন তখন পল্লী পূর্ত কর্মসূচির প্রধান ছিলেন। সচিবালয়ের ভেতরে দুটি টিনশেড ভবনে পূর্ত কর্মসূচির সদর দপ্তর ছিল। কারিগরি জনবল বলতে সদর দপ্তরের কয়েকজন প্রকৌশলী আর দেশব্যাপী উপজেলাগুলোয় ওভারশিয়ার/সাব-ওভারশিয়ার। খন্দকার মোশাররফ হোসেন পল্লী পূর্ত কর্মসূচিকে পরিকল্পিতভাবে একটি প্রাতিষ্ঠানিক এবং প্রকৌশল সংস্থা হিসেবে অবয়ব দেয়ার সূত্রপাত করেন। তার চেষ্টায় সারা দেশে পল্লী পূর্ত কর্মসূচির আওতায় জেলা পর্যায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী এবং মহকুমা পর্যায়ে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ দেয়া হয়। এভাবে তিনি সারা দেশে পরিকল্পিত গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণের প্রাথমিক ভিত তৈরি করে দেন। তার গড়ে দেয়া এ ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের এলজিইডি। তার আরো একটি বড় অবদান ছিল, তা হলো শ্রমঘন পদ্ধতিতে অবকাঠামো নির্মাণ করে অধিকতর কর্মসৃজন করা। এ বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের জন্যই ১৯৭৮ সালে তাকে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) চাকরি দিয়ে আফ্রিকা অঞ্চলের দায়িত্ব প্রদান করে। যে সংস্থা তিনি ছেড়ে যান, এর প্রায় তিন যুগ পরে তিনি সে সংস্থার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ’৭৮ সাল থেকে পল্লী পূর্ত কর্মসূচির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এর আগে ১৯৭৭ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর করতে যান। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনায় উচ্চশিক্ষা তার অন্তর্দৃষ্টি খুলে দেয়। পল্লী কর্মসূচির দায়িত্ব পেয়ে ধীরে ধীরে তার জ্ঞান প্রয়োগ করতে থাকেন। ১৯৮০ সালে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পল্লী উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এসএইচকে ইউসুফজাই যোগ দেন। ড. ইউসুফজাই ও কামরুল ইসলাম সিদ্দিক দুজনই বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। দেশের উন্নয়নের জন্য দুজনের অপরিসীম আবেগ ছিল। তাদের ত্যাগ ও বোঝাপড়ার রসায়নই পরবর্তীতে বাংলাদেশে পল্লী অবকাঠামোর ভিত তৈরিতে ভালো ভূমিকা রাখে। পল্লী উন্নয়ন ও ভাবনায় এই দুই কীর্তিমান প্রকৌশলী উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেন। স্বাধীনতার পর থেকে পল্লী উন্নয়ন বলতে মূলত কৃষি উন্নয়নই বোঝাত। কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে ছিল সবুজ বিপ্লব, ভূমি সংস্কার, সমবায় নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা, কর্মসূচি। এর সঙ্গে কিছু ছোটখাটো সেচ কর্মসূচি। কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ও ড. ইউসুফজাই প্রচলিত স্থাবর পল্লী উন্নয়ন ও কৃষি উন্নয়ন ভাবনায় সফলভাবে ‘গতিশীলতা’ যোগ করেন। তারা পল্লী উন্নয়নের মূল প্রভাবক হিসেবে পল্লী সড়ক অবকাঠামো গুরুত্বের সঙ্গে দেশীয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন।
দেশ গড়তে উপযুক্ত সংগঠন প্রয়োজন। তাই কামরুল ইসলাম সিদ্দিক পল্লী পূর্ত কর্মসূচিকে আধুনিক প্রকৌশল সংস্থার অবয়বে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেন। ১৯৮২ সালে চার শতাধিক উপজেলা সৃষ্টি হয়। কামরুল ইসলাম প্রতি উপজেলায় স্নাতক প্রকৌশলীর পদসহ উপজেলা পর্যায়ে দপ্তর তৈরির উদ্যোগ নেন। ১৯৮৩ সালে দুই শতাধিক স্নাতক প্রকৌশলী পল্লী পূর্ত কর্মসূচিতে যোগদান করে। গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে আরো কিছু প্রকৌশলী নিয়ে পল্লী পূর্ত কর্মসূচি দেশের সব উপজেলায় কাজ শুরু করে। ১৯৮৪ সালে পল্লী পূর্ত কর্মসূচি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল ব্যুরোতে (এলজিইবি) পরিণত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালে তা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) রূপ নেয়।
১৯৬৩-৬৪ সালে পল্লী পূর্ত কর্মসূচির শুরু থেকেই মূল লক্ষ্য ছিল কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য হ্রাস। তখন কৃষি খাতই ছিল পল্লী জনগণের কর্মস্থানের মূল উৎস। দেশের ৮০ ভাগ মানুষের কর্মসংস্থান জোগাত কৃষি। কিন্তু ধান রোপণ এবং ফসল তোলা এই দুই সময় ছাড়া কৃষিতেও ব্যাপক কর্মসংস্থান ছিল না। যাদের কৃষিজমি ছিল, তাদের নিজেদের শ্রম আর মালিকানার ভাগ এ দিয়ে হয়তো কিছুটা পোষাত। কিন্তু লিন পিরিয়ডে ‘দিনে আনি দিনে খাই’ কৃষি শ্রমিকদের অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটত। পল্লী পূর্ত কর্মসূচি চালু থাকলেও চাহিদা অনুপাতে এর ব্যাপ্তি ছিল খুব কম। এ বরাদ্দ কখনই চাহিদার ৩-৪ শতাংশও পূরণ করতে পারেনি। সত্তরের দশকে পল্লী পূর্ত কর্মসূচির পাশাপাশি ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ফুড ফর ওয়ার্কস প্রোগ্রাম চালু হয়। কিন্তু ১৯৭৮-৮৩ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে পল্লী পূর্ত কর্মসূচি এবং কাজের বিনিময়ে খাদ্যের (কাবিখা) আওতায় ৭ কোটি থেকে ১০ কোটি জনদিবস কর্মসৃজন করা গেছে। কিন্তু এ সময়ে লিন পিরিয়ড বিবেচনায় ২২০ কোটি জনদিবস কর্মসংস্থানের চাহিদা ছিল।
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং গ্রামের আর্থসামাজিক উন্নতির জন্য সত্তর সালের শেষের দিকে সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে দেশে কয়েকটি এরিয়া ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট শুরু হয়। ১৯৭৬-৮৩ সালব্যাপী চালু থাকা এ ধরনের প্রকল্প হলো— পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প-১ (ময়মনসিংহ ও বগুড়া জেলার সাতটি উপজেলা), সিরাজগঞ্জ ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (সিরাজগঞ্জের চার উপজেলা), নোয়াখালী ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (নোয়াখালী জেলার তিন উপজেলা)। এ তিন প্রকল্পের মোট বাজেট ছিল ১৩৩ কোটি টাকা। ১৪টি উপজেলায় এ তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় (গড় বরাদ্দ ৯ দশমিক ৫ কোটি টাকা)। বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও ডানিডা এ তিন প্রকল্পের উন্নয়ন সহযোগী ছিল। সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন ধারণার এ প্রকল্পগুলোয় পল্লী সড়ক, সেচ, ড্রেনেজ ইত্যাদি পূর্ত কাজের পাশাপাশি কৃষি, মত্স্য, স্বাস্থ্য, সমবায় ইত্যাদি কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড এ প্রকল্পের লিড এজেন্সি ছিল। এর সঙ্গে পল্লী পূর্ত কর্মসূচিসহ সরকারের অন্যান্য সংস্থা কাজ করত। আর্থিক মূল্যমানে এসব প্রকল্পের ৮০-৯০ ভাগ কাজ ছিল পল্লী পূর্ত কর্মসূচির পূর্ত কাজ।
৮৩ সালে এ প্রকল্পগুলোর মূল্যায়নে দেখা গেল, দেশের চার শতাধিক উপজেলার মধ্যে মাত্র ১৪টিতে কাজ হয়েছে। এভাবে এরিয়া ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান অনুযায়ী অগ্রসর হলে দেশের ৪০০টি উপজেলায় অবকাঠামো উন্নত করতে শত বছরের অধিক সময় লাগবে। বাড়বে উপজেলা উপজেলায় বৈষম্যও। অন্যদিকে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সংস্থা থাকায় এ প্রকল্পগুলো সুষ্ঠুভাবে সমন্বয় করা যায়নি। ফলে এ ধরনের এরিয়া ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বাদ দিয়ে পল্লী পূর্ত কর্মসূচিকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকল্প তৈরি শুরু হলো। বিআরডিবির স্থলে লিড এজেন্সি হলো পল্লী পূর্ত কর্মসূচি/ এলজিইবি। ৮৩ সালের শেষে দুটি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হলো। একটি ইন্টেনসিভ রুরাল ওয়ার্কস প্রোগ্রাম (আইডব্লিউআরপি) এবং অন্যটি সাউথ ওয়েস্ট রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এসডব্লিউআরডিপি)। সাউথ ওয়েস্ট প্রকল্পে তত্কালীন ফরিদপুর ও যশোর জেলার ৪৪টি উপজেলা অন্তর্ভুক্ত হলো। ইন্টেনসিভ রুরাল ওয়ার্কস প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে আট জেলার ৪০টি উপজেলা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ দুই প্রকল্পে যদিও ৮৮টি উপজেলার সংস্থান ছিল, কিন্তু উপজেলাপ্রতি বাজেট ছিল যথেষ্ট কম (গড় ৮০ লাখ টাকা/উপজেলা)।
প্রকল্পগুলোর আর্থসামাজিক প্রভাবও বিশ্লেষণ করা হলো। ষাটের দশক থেকে চলমান পূর্ত কর্মসূচি, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, এরিয়া ডেভেলমেন্ট প্রজেক্টস— এসবের প্রভাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, কিছু ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বেড়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় বেড়েছে। তবে এই আয়ের সিংহভাগ ভূমি মালিক ও অবস্থাপন্নদের হাতে গেছে। সিংহভাগ ভূমিহীন এবং দরিদ্র কৃষি শ্রমিকের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে সামগ্রিক দারিদ্র্য হ্রাসেও বেশি প্রভাব পড়েনি। তাই এ প্রেক্ষাপটে পল্লী উন্নয়নের জন্য এমন একটা স্ট্র্যাটেজি প্রয়োজন ছিল, যা কৃষির পাশাপাশি অকৃষি কর্মসংস্থান বাড়াবে, যাতে ভূমিহীনরা সহজ কর্মসংস্থান পাবে, কৃষি উৎপাদন বাড়াবে, গ্রামে অর্থের প্রবাহ বাড়বে, শ্রমের মোবিলিটি সহজ করবে, যাতে শ্রমিকরা জেলা সদর কিংবা রাজধানী শহরে গিয়ে কাজ পান।
এ ভাবনা থেকেই ১৯৮৪ সালে পরিকল্পনা কমিশনের পল্লী উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠান সেক্টরের উদ্যোগে বাংলাদেশ স্ট্র্যাটেজি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টস তৈরি করা হয়। স্থবির গ্রামীণ বাংলাদেশ গতিশীলতায় রূপান্তরের পেছনে এ প্রকল্পের বিরাট ভূমিকা আছে। কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ও ড. ইউসুফজাই’সহ এলজিইবি এবং পরিকল্পনা কমিশনে সে সময়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের ভাবনার ফসল হলো এ স্ট্র্যাটেজি। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সে সময়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী ছিলেন। তারও এতে অংশগ্রহণ এবং সমর্থন ছিল।
এ স্ট্র্যাটেজি তৈরির আগে কিছু কাজ করতে হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের উদ্যোগে পল্লী পূর্ত কর্মসূচির কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় সারা দেশের হাটগুলো জরিপ করে ১ হাজার ৪০০টি বড় বাজার বা গ্রোথ সেন্টার চিহ্নিত করা হয় ১৯৮১-৮৩ সালে। এসব গ্রোথ সেন্টারের গেজেট প্রকাশিত হয় ১৯৮৩ সালে। পরে গ্রোথ সেন্টার অন্যান্য বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রাম এসব চিহ্নিত করে উপজেলার গ্রামীণ সড়কগুলোকে চার ভাগে— ফিডার সড়ক, আর-১, আর-২, আর-৩-এ ভাগ করা হয়। আইএলও, সার্ভে অব বাংলাদেশের সহযোগিতায় উপজেলা বেজ ম্যাপ, উপজেলা রোড ম্যাপ তৈরি করা হয়। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা প্ল্যান বুক, উপজেলা রোড লিস্ট এ ধরনের পরিকল্পনার উপকরণ গড়ে তোলা হয়। নব্বইয়ের দশকে এর ভিত্তিতে প্রতি উপজেলার জিআইএস ম্যাপ এবং সফটওয়ারভিত্তিক ডাটাবেজ তৈরি করা হয়।
ফলে সে সময়ে দেশব্যাপী পরিকল্পিত উন্নয়নের একটা ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে ওঠে। স্ট্র্যাটেজি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টস-৮৪ ছিল এ ফ্রেমওয়ার্কের ভিত্তিতে পরিকল্পিত পল্লী জনপদ গড়ে তোলার নির্দেশনা। এতে নির্দেশনা ছিল সমন্বিতভাবে পল্লী অবকাঠামো এবং সেচ কর্মসূচি গড়ে তোলা, যেন ব্যাপক কৃষি এবং অকৃষি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এ নির্দেশনার পাশাপাশি চিহ্নিত উপজেলাভিত্তিক ফিডার সড়ক, গ্রোথ সেন্টার, ব্রিজ/কালভার্ট নির্মাণের টার্গেটও নির্ধারণ করা হয়।
দেশব্যাপী সব উপজেলার ম্যাপ, সড়ক-হাটবাজারসহ অন্যান্য অবকাঠামো পরিকল্পনা দেখে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো বাংলাদেশের পল্লী অবকাঠামোয় বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে ওঠে। ক্রমেই পল্লী অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশে প্রকল্প সংখ্যা বাড়তে থাকে। একেকটি প্রকল্প সমাপ্তির পর মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে আসে একেকটি জনপদের উত্তরণের গল্প। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় প্রবেশগম্যতা বৃদ্ধি, আয় বৃদ্ধি এবং আরো অনেক সূচকের অগ্রগতি, যার কিছু পরিমাপযোগ্য, কিছু পরিমাপযোগ্য নয়।
১৯৮৮ সালে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি গ্রোথ সেন্টার কানেক্টিং রোড (জিসিসিআর) প্রকল্প নিয়ে আসে। এ কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল গ্রোথ সেন্টার সংযোগ ফিডারগুলো মাটির কাজ দ্বারা উন্নয়ন। এর আগ পর্যন্ত জেলা পরিষদের মালিকানাধীন কিছুসংখ্যক সড়ক ব্যতীত গ্রামীণ সড়কগুলো প্রশস্ত/সড়ক বাঁধ ছিল না। কিছু ক্ষেত্রে স্বল্প প্রস্থের সড়ক ছিল, কিছু ক্ষেত্রে শুধু মাটির আইল। এসব সড়কে কোনো ধরনের জমি অধিগ্রহণ ছাড়া জনগণকে সামাজিকভাবে উদ্বুদ্ধ করে দেশব্যাপী সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা ছিল সত্যিকারের চ্যালেঞ্জিং কাজ। জিসিসিআর প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২৪ ফুট প্রস্থের (সড়কের উপরিভাগে) মাটির সড়ক নির্মাণ করা হতো। ১৯৮৮-২০০৩ সাল পর্যন্ত চলমান এ প্রকল্পে প্রায় ৩০ হাজার কিলোমিটার মাটির সড়ক এবং ১২ হাজার মিটার সেতু নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৫ সালে কেয়ারের সহযোগিতায় ইন্টিগ্রেটেড ফুড ফর ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এর মাধ্যমে ১৯৯৫-২০০০ সময়কালে ১৮ ফুট প্রস্থের প্রায় ৬০ হাজার কিলোমিটার মাটির সড়ক নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এলজিইডির আওতাধীন সড়কের দৈর্ঘ্য (পাকা ও কাঁচা মাটির সড়ক মিলে) প্রায় ৩ লাখ ৫২ হাজার কিলোমিটার। এ বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে কোনো ধরনের জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই— জনগণের দানে। বিশ্বব্যাপী জনঅংশগ্রহণে এত বড় সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার নজির বোধ হয় আর নেই।
সুপ্রশস্ত মাটির বাঁধের সড়ক, স্ট্র্যাটেজির দিকনির্দেশনা, তথ্যনির্ভর গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা এবং কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের নেতৃত্বে দক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা— এ চার উপাদানের সমন্বয় বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোকে বাংলাদেশে পল্লী অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগে উৎসাহিত করে। ১৯৯০ সাল থেকে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
পরবর্তীতে বাংলাদেশের পল্লী কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০ দশকের পর থেকে দেশে অকৃষি কর্মসংস্থান ক্রমেই বেড়েছে। বর্তমানে পল্লী অঞ্চলে অকৃষি কর্মসংস্থান মোট কর্মসংস্থানের প্রায় অর্ধেক। ভূমিহীন কৃষক এবং দরিদ্র কৃষকদের অনাহার-অর্ধাহারে থাকা প্রায় নেই বললেই চলে। পল্লী সড়ক কীভাবে এত অকৃষি কর্মসংস্থান তৈরি করে? একটি সহজ উদাহরণ দেয়া যায়। পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়কে প্রতিদিন ন্যূনতম ২০০ গাড়ি-রিকশা-ভ্যান চলে। ফলে ৪০০ জনের কর্মসংস্থান হয়। তারপর যানবাহনের ওয়ার্কশপ ও যন্ত্রাংশের দোকান। আরো কিছু কর্মসংস্থান। ওয়ার্কশপের পাশে হয়তো একটা টি স্টল। টি স্টলে হয়তো পিঠা সরবরাহ করেন এক বিধবা। যানবাহন থেকে শুরু করে বিভিন্ন উদ্যোগে বিনিয়োগ। এভাবে বিশাল এক প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অদৃশ্য অর্থনীতির জালে গ্রামীণ অর্থনীতি গতিশীল হতে থাকে। পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির এ রকম আরো অনেক উদাহরণ আছে।
পল্লী অবকাঠামোর প্রভাব বহুবিধ। পল্লী সড়ক হলো পল্লী জনগোষ্ঠীর ভিত্তি অবকাঠামো, যাকে কেন্দ্র করে পল্লী অর্থনীতির সঞ্চালন এবং পল্লী জনজীবনের অনেক সুযোগ-সুবিধা ধারাবাহিকভাবে বিকশিত হয়। একজন উপকারভোগীর ভাষায় পল্লী সড়ক হলো মা মুরগির মতো। মা মুরগিকে খাঁচায় নিলে সব মুরগিছানাকে যেমন সহজে খাঁচায় নেয়া যায়, তেমনি টেকসই পল্লী সড়ক থাকলে অন্য সব আর্থসামাজিক সুবিধা যেমন— শিক্ষা-স্বাস্থ্যে প্রবেশগম্যতা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যমুক্তি, নারী উন্নয়ন ও ব্যবসা উদ্যোগ ইত্যাদি সহজ হয়ে যায়।
বর্তমানে বাংলাদেশ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়নে উন্নয়নশীল বিশ্বের রোল মডেল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আগ্রহে পল্লী অবকাঠামোয় বিনিয়োগ অনেক বেড়েছে। টেকসই উন্নয়ন অভিলক্ষ্য— এসডিজি টার্গেট ৯.১-এর একটি সূচক হলো ‘সব মৌসুমে চলাচলের উপযোগী সড়কের দুই কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী গ্রামীণ জনসংখ্যার অনুপাত’। দেশের কিছু হাওড়, দ্বীপাঞ্চল এবং দুর্গম পাহাড়ি জনপদ ছাড়া প্রায় সব উপজেলায় এ সূচকের মান শতভাগ। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশব্যাপী এ সূচকের গড় মান ৮৮ শতাংশ, যা উন্নয়নশীল অধিকাংশ দেশের চেয়ে বেশি। আশা করা যায়, এ সূচকে বাংলাদেশ সহজেই এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করবে।
লেখক: নির্বাহী প্রকৌশলী (পরিকল্পনা), এলজিইডি।






