‘তলাবিহীন’ ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে সম্মানজনক স্থানে নেয়ার পেছনে ক্ষুদ্রঋণের সফলতার অবদান আজ সবাই স্বীকার করে নিয়েছেন।১ সম্ভবত আমাদের জাতীয় লেবাসে জঙ্গিবাদের ছাপ পড়ার আগে ক্ষুদ্রঋণ, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিত্ব বিশ্বমানসে বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবে ছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ক্ষুদ্রঋণের অগ্রগতির রমরমা ভাব দেখে অনেকের মাঝেই আশা জেগেছিল, হয়তো বা ক্ষুদ্রঋণ দিয়েই দারিদ্র্য বিমোচন করা যাবে। কিন্তু দশক শেষ হতে না হতেই এ অঙ্গনের অগ্রজরা মেনে নেন, কেবল ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়, এটি বহুবিধ হাতিয়ারের একটি মাত্র। দারিদ্র্য বিমোচনের মূর্তপ্রকাশ হিসেবে আলোচনায় graduation প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হয়— অর্থাৎ একজন গরিব উপরের আর্থসামাজিক স্তরে উন্নীত হচ্ছে কিনা, তার আলোকেই সফলতা-ব্যর্থতা বিচার করা। আলোচনায় প্রায়ই আমরা এ পুরো প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানের ক্রমবিকাশের কথা ভুলে যাই। অথচ দারিদ্র্য দূরীকরণের উদ্দেশ্যে হোক অথবা (যদি কেউ মনে করেন) সুদ ব্যবসার উদ্দেশ্যে হোক, এসব সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। তাই গরিবের দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের উত্তরণ ও বিকাশ এবং এ দুই প্রক্রিয়ার পারস্পরিক সম্পর্ক অনুধাবন প্রয়োজন। এছাড়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রবন্ধে ক্ষুদ্রঋণের আলোচনা করা হয়েছে।
উদ্যোক্তা তৈরির ইতিহাস এ দেশে নতুন নয়— সেই পাকিস্তান আমলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কলকারখানা গড়ে ব্যক্তিমালিকানায় সেসব হস্তান্তর করে ব্যক্তি-উদ্যোক্তা গড়ার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিল। আগের এ ধারার নবতর রূপ দেখা যায় বাংলাদেশে। সরকারি ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের দায়বদ্ধতা অস্বীকার করে বাংলাদেশে কীভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন নব্য পুঁজির সৃষ্টি হয়েছিল, তা হয়তো অনেকের মনে আছে। সঙ্গত কারণেই এ পুঁজিকে কেন্দ্র করে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, তার পরিচয় পরিবারকেন্দ্রিক রয়ে যায়। অর্থাৎ আদমজী-বাওয়ানীর পরিবর্তে এ দেশে অমুক গ্রুপ, তমুক গ্রুপ গড়ে ওঠে এবং সেসব ‘গ্রুপ’ জাতীয় রাজনীতির রেষারেষির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উত্থান-পতনের মাঝ দিয়ে আমাদের সমাজে এখনো সজীব রয়েছে।২
বিগত শতাব্দীর আশির দশকে পুঁজির বিকাশে দুটি ব্যতিক্রমধর্মী ধারার সূত্রপাত ঘটে। বিদেশে, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে, কাজ করে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর হাতে গড়ে ওঠা মোটা অংকের সঞ্চয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ, বিশ্ববাজারে কোটাভিত্তিক সুযোগ, ইত্যাদি বাংলাদেশের রেডিমেড গার্মেন্টসের (তৈরি পোশাক কারখানা) প্রসারের দ্বার উন্মুক্ত করে, যার শুরুটা ওই আশির দশকেই। সনাতনী ধারার মতো এক্ষেত্রেও সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক হতে দেখা যায়। তবে মালিকানার ক্ষেত্রে পার্টনারশিপের মাত্রা অধিক পরিলক্ষিত হয় এবং এসব কারখানা ব্যবস্থাপনায় করপোরেট মনোভাব ও কৃষ্টি আবশ্যিক হয়ে পড়ে। বিশ্ববাজারের অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসূত্রতার কারণে, বিশেষত, অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনে সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সরাসরি তত্ত্বাবধায়নের ফলে বংশানুক্রমিকভাবে কারখানা চালানোর রীতিটা এ খাতে কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।৩
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সবচেয়ে উদ্ভাবনী প্রয়াস সম্ভবত এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে, যাকে এ নিবন্ধে দ্বিতীয় ব্যতিক্রমধর্মী পুঁজি বিকাশের ধারা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চলমান প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার আগে একে ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত করার ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন। অর্থনীতি ও রাজনীতির আলোচনায় চিরাচরিত প্রথা হলো, রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকাধীন পুঁজির মাঝে পার্থক্য টানা। তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতের প্রসারের যৌক্তিকতা দেখানোর সময় (বিশেষত অর্থনীতিবিদদের লেখায়) এ খাতের নানা রূপ ও বৈশিষ্ট্যের আলোচনা সাধারণত করা হয় না। এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে বাংলাদেশের পুঁজির বিকাশ নিঃসন্দেহে সরকারি খাতের বাইরে। এবং একই সঙ্গে এ ধারাকে প্রচলিত ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতের অংশ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
পৃথিবীর অন্যান্য স্থানেও অর্থনীতির বিকাশের শুরুর দিকে কৃষির উদ্বৃত্ত ও কৃষিপণ্যের বাণিজ্য ঘিরে লগ্নি পুঁজির বিকাশ ঘটেছিল, যা সরকার ও ব্যক্তি— উভয় পর্যায়ে সম্পদ তৈরিতে সাহায্য করে। দীর্ঘ পথ পেরোনোর পর এ পুঁজির ব্যবস্থাপনায় করপোরেট কৃষ্টি প্রতিষ্ঠিত হয় (যাকে অনেকে ব্যক্তি ও পরিবার-কেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে গণ্য করেন)। এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর শুরুটা গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সেখানেও ব্যক্তির উদ্যোগ অনস্বীকার্য। তবে বৈদেশিক অনুদান, প্রকল্প-ভিত্তিক আয় এবং ঋণ কর্মকাণ্ড থেকে প্রাপ্ত অর্থের যেটুকু সঞ্চিত হয়েছে, তার ধারক মূলত প্রতিষ্ঠান। এটা সত্য যে, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকারী এক বা একাধিক ব্যক্তি সেই আয়ের একটি অংশ নিজেদের ভোগে অথবা ব্যক্তিপর্যায়ে সম্পদ আহরণে ব্যবহার করেন। কিন্তু এসবের পরও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সঞ্চয় হয়, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুঁজিতে রূপ নেয়— আমাদের আলোচনার মূল বিষয় সেই প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির বিকাশ।
এ ধারাকে ব্যতিক্রমধর্মী বলার দ্বিতীয় কারণ হলো, পুঁজি তত্ত্বাবধানের প্রয়োজনে উদ্ভূত না হয়ে ব্যক্তি ও পরিবারের ঊর্ধ্বের এ প্রতিষ্ঠানগুলো (পরিকল্পিত না হলেও) পুঁজি সৃষ্টির প্রাথমিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে এদের অনেকের যাত্রা হওয়ায় এবং ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গড়ে তোলা হাজারো ব্যক্তি ও গ্রামীণ পরিবারের নেটওয়ার্ক বাড়তি সম্পদ হিসেবে গণ্য হওয়ায় এ পুঁজির যাত্রাপথ নিঃসন্দেহে ভিন্নতর হবে। এবং এটাকে সামাজিক উদ্দেশ্যে কার্যকরীভাবে ব্যবহার করতে চাইলে এবং সে লক্ষ্যে নীতি প্রণয়ন করতে চাইলে এর গতি-প্রকৃতি বোঝা জরুরি।
২। এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক পুঁজির বিকাশের কিছু দৃষ্টান্ত
ব্যক্তিপর্যায়ে আমাদের আয় কীভাবে সঞ্চয়ে রূপ নেয়, তা সবারই জানা। সেই সঞ্চয় কখনো নিজ হাতে নগদ তহবিল, ব্যাংকে গচ্ছিত নগদ বা দীর্ঘমেয়াদি জমা, অথবা (তুলনামূলকভাবে সহজে) বিক্রয়যোগ্য সম্পদ (যেমন— শেয়ার, স্বর্ণ ও জমি) হিসেবে আকারে বাড়তে থাকে। এসব সম্পদ পুঁজি হিসেবে গণ্য হবে তখনই, যখন কোনো খাতে এর ব্যবহারের ফলে বিনিয়োগযোগ্য দ্রব্য বা সেবা প্রস্তুত হবে। অর্থাৎ, কোনো কোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকের ব্যবহূত সোয়া কোটি টাকার গাড়ি এ নিবন্ধে পুঁজি হিসেবে গণ্য করা হয়নি। অথচ সঞ্চয় দিয়ে কেনা একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, সবজির দোকান অথবা মুরগির হ্যাচারিকে পুঁজির মূর্তরূপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
পুঁজির উৎস সঞ্চয় এবং সেই সঞ্চয়ের উৎস হলো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে অর্জিত অর্থ এবং সেই অর্থ নানা উপায়ে অর্জিত হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ অর্থ উপার্জনের পন্থা স্বচ্ছ নয়। অনিয়ম ও অনৈতিক পন্থায় অর্থ উপার্জনের দৃষ্টান্তই বেশি। এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে কম-বেশি হলেও এ অপবাদ সত্য। সেই বিতর্কের বিবিধ বিষয় এ নিবন্ধে আলোচনা করা হয়নি, যদিও পরিশেষে এ বিষয়ে কিছু প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হয়েছে। তবে আলোচনার এ পর্বে এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ খাতে পুঁজি বিকাশের কিছু মূর্ত দৃষ্টান্ত দেখা যাক।
বহু বছর ধরেই ব্র্যাকের আড়ং ঢাকা শহরের একটি অতি পরিচিত নাম। গ্রামের মহিলাদের তৈরি নকশিকাঁথা ও অন্যান্য কুটির শিল্প বাজারজাত করার কল্পে এ ধরনের দোকান খোলার উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে বাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য এবং বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে পণ্য উদ্ভাবন প্রয়োজন এবং নিজস্ব গণ্ডির বাইরে থেকেও পণ্য সংগ্রহ আবশ্যিক হয়। আড়ংয়ের ক্ষেত্রেও এ পথ পরিক্রমণ দেখা গেছে।
দল-সদস্য ও ঋণগ্রহীতাদের মুরগি পালন থেকে আয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গণকল্যাণ ট্রাস্টের মতো কিছু সংস্থা মুরগির বাচ্চা প্রজননে (হ্যাচারিতে) বিনিয়োগে উদ্যোগী হয়। এতে বাচ্চা মুরগির সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। আধুনিক প্রজনন পদ্ধতির মাধ্যমে উন্নত (অধিক ফলনশীল) জাতের পণ্য ও সম্পদ (গাভীসহ) সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্র্র্যাকের উদ্যোগও একই কাতারের প্রচেষ্টা। একইভাবে দল সদস্য ও ঋণগ্রহীতাদের আয় নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে অনেক সংস্থাই পণ্য বাজারজাত করার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা পরিচালিত পণ্যসামগ্রীর দোকান এখন অনেক। এছাড়া কেউ কেউ বড় হোটেল বা দোকানের সঙ্গে পণ্য সরবরাহের চুক্তি করেছে এবং এসবের দ্বারা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এসব সংস্থা এক মধ্যস্বত্ব ব্যবসায়ীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
উপরোক্ত উদাহরণগুলোর ক্ষেত্রে এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার বাণিজ্যিক ভূমিকা সরাসরি তার দল-সদস্য বা ঋণগ্রহীতার আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংঘটিত। কিন্তু লক্ষণীয় যে, ঋণ লেনদেনের প্রক্রিয়ায় আজ বিভিন্ন সংস্থা গ্রামাঞ্চলে যে বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, তা ব্যবহার করে বাইরে থেকে সংগৃহীত পণ্য সরবরাহ করা যায়। এ ধরনের উদ্যোগের উদাহরণ অনেক। যেমন— গ্রামীণের ফোন ও সৌরশক্তি, ব্র্যাকের বিতরণ করা হাইব্রিড বীজ অথবা ব্র্যাক ব্যাংক-ব্র্যাক, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের সম্মিলিত উদ্যোগে সরবরাহকৃত ব্যাংকিং সেবা, যার মাধ্যমে আইনি পদ্ধতিতে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ (রেমিট্যান্স) গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।
জনগোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠায় এক বিশাল বিক্রেতা গোষ্ঠীর বাণিজ্যিক প্রতিনিধি হওয়া যেমন সম্ভব হয়েছে, তেমনি তাদের কাছে সহজে পণ্য সরবরাহের চুক্তিতে বাইরের প্রস্তুতকারকের এজেন্সি হিসেবে কাজ করার সুযোগ আজ অনেক এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের হয়েছে। এ দুটি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে অধিকতর আয় এসেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা নবতর পুঁজি/বিনিয়োগের রূপ নিয়েছে। সদস্য বা ঋণগ্রহীতাদের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নয়, এমন অনেক খাতেই এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার বিনিয়োগ দেখা যায়। এগুলো মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো— ব্র্যাক ব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিকার ইন্টারনেট (যা ব্র্যাকও শিগগিরই শুরু করবে), গার্মেন্ট কারখানা ক্রয়/বিনিয়োগ, স্থানীয় পর্যায়ে সাইবার ক্যাফে পরিচালনা, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে স্বাস্থ্য ক্লিনিক বা হাসপাতাল পরিচালনা, শিশুদের স্কুল পরিচালনা ইত্যাদি। এসব বিনিয়োগে অনেক ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী সামাজিক লক্ষ্য থাকতে পারে, তবে উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রে তা আরো বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকে।
মূল কথায় আসি। ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনার প্রক্রিয়ায় এ দেশের বহু প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনায় পারদর্শী এক দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে এক বিশাল জনগোষ্ঠীর নেটওয়ার্কের ধারক হওয়ায় এসব সংস্থা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার বাড়তি সুবিধা পায়। বিদেশী সংস্থার অনুদান, প্রকল্পভিত্তিক আয়, ঋণ থেকে প্রাপ্ত সুদের আয় এবং হাজারো ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের পুঞ্জীভূত অর্থ তহবিল ব্যবস্থাপনার সুযোগ অনেক প্রতিষ্ঠানকে পুঁজি বিনিয়োগে উদ্যোগী করে তোলে। এর উেসর ভালো-মন্দের বিচার আজকের আলোচ্য নয়, এর সংকট ও সম্ভাবনা নিয়েই নিবন্ধের বাকি অংশের আলোচনা।
৩। সংকট ও সম্ভাবনায় প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজি বিকাশের ধারা
এক কালে বন্ধকযোগ্য সম্পদের অভাবে গ্রামের গরিব জনসাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ পাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারত না। চড়া সুদে মহাজনি ঋণ ছিল তাদের মূল অবলম্বন। সেই প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্রঋণের আওতায় জামানতবিহীন ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ সাদরে আমন্ত্রণ পেয়েছিল। সঙ্গত কারণেই দারিদ্র্য বিমোচনে অগ্রজ হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলো দ্রুত পরিচিতি লাভ করে। আজকের প্রেক্ষাপট ভিন্ন, এ ধরনের (নিশ্চায়ক বিহীন) ঋণ সমাজে অলিখিত অধিকার হিসেবে স্বীকৃত এবং একাধিক প্রতিষ্ঠান আজ একই সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতাকে পেতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাই মোটেই অবাক হওয়ার নয় যে, গ্রামের মানুষের কাছে এসব প্রতিষ্ঠান ক্রমান্বয়ে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠান যদি তাদের কর্মপরিধি শুধু ঋণ লেনদেনের মাঝেই সীমিত রাখে এবং একই সঙ্গে আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সচেষ্ট হয়, তাদের সঙ্গে জনসাধারণের সম্পর্ক মহাজন ঋণীতে (ব্যাংক-ঋণী) সংকুচিত হতে বাধ্য। এবং সে কারণেই প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির প্রকৃতি ও প্রভাব বলয়ে পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার জন্য যেমন এ পরিবর্তন প্রয়োজন, তেমনি জনসাধারণের কাছে অধিকতর সেবা পৌঁছে দেয়ার জন্যও এ পরিবর্তন আবশ্যিক।
আগে এ পরিবর্তনের তিনটি উপধারার দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর মালিকানায় মূলত তিন ধরনের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের প্রতি ইঙ্গিত টানা হয়েছে। তবে সে বিভাজন শুধু বিনিয়োগের সঙ্গে নেটওয়ার্কভুক্ত জনগোষ্ঠীর সরাসরি সম্পর্ক আছে কিনা, তার ভিত্তিতে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের ভিন্নতার কারণে পুঁজির চরিত্রে বৈসাদৃশ্য থাকতে পারে, যার গতিপ্রকৃতি ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নির্ধারণ করবে। সেই আঙ্গিকেই বাকি আলোচনা করা হলো।
আলোচনার খাতিরে দল সদস্যদের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের উদাহরণ দেয়া যাক। বিভিন্ন গবেষণাকর্মে সাধারণত তিন ধরনের কর্মকাণ্ডের উল্লেখ করা হয়। প্রথমত. সদস্যদের পণ্য বাজারজাত করার জন্য একটি সংস্থা কর্তৃক খোলা শহরের দোকান। দ্বিতীয়ত. মুরগির বাচ্চা সরবরাহের উদ্দেশ্যে হ্যাচারিতে বিনিয়োগ ও সদস্যদের লালনে বেড়ে ওঠা মুরগি বাজারজাত করতে সংস্থার উদ্যোগ। অনেক সময়ে নির্দিষ্ট দামে পণ্য কিনে নেয়ার নিশ্চয়তা একই ভূমিকা পালন করে। তৃতীয়ত. বিদেশী কোনো পণ্য প্রস্তুতকারীর (যেমন— নিরাপদ খাদ্য অথবা সৌরশক্তির সেল অথবা বীজ) কমিশন এজেন্ট হিসেবে সদস্য ও অন্যান্য জনসাধারণের মাঝে বাজারজাত করার দায়িত্ব নেয়া। একটু চোখ মেললেই দেখা যাবে, বাংলাদেশের অনেক এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা উপরের তিন ধারার এক বা একাধিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছে। প্রথমটির ক্ষেত্রে দোকানকেন্দ্রিক পুঁজির বিকাশ কেবল সদস্যদের তৈরি পণ্য বাজারজাত করে না-ও হতে পারে। আড়ংয়ের ক্ষেত্রে যেমন ঘটেছে, সেটাই স্বাভাবিক। যারা বিপণনকে শুধু নিজেদের সদস্যদের তৈরি পণ্যে আটকে রাখতে গেছেন, তাদের অনেকেই বাজারের সাধারণ নিয়ম অস্বীকার করায় বিপর্যয়ে পড়েছেন। বাজারের চাহিদা ও একাধিক উৎস থেকে জোগানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে যারা পুঁজি প্রসারে লিপ্ত হয়েছেন, তাদের সফলতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি। আর তাই নিজের সদস্যদের সাহায্য করার আর্থিক ক্ষমতাও এসব সংস্থার বেশি।
আমরা জানি যে, বায়িং হাউজ, যারা এ দেশের পোশাক শিল্পে তৈরি দ্রব্যাদি উন্নত দেশে বাজারজাত করছে, তারা অবশ্যই লাভের জন্য এ কাজ করছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় আমাদের শ্রম ও শিল্প বাইরের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে, সেই সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে। একইভাবে দেশীয় পণ্যের ওপর ভিত্তি করে যদি বিপণন সংস্থা গড়ে ওঠে ও সম্প্রসারিত হয়, তা নিঃসন্দেহে স্থানীয় উৎপাদকের সহায়ক হবে। এসব ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বিচার্য দিকটি হলো এসব কর্মকাণ্ড স্থানীয় পণ্যের মান এবং সেই পণ্য প্রস্তুতে ব্যবহূত শ্রমের উৎপাদিকা বৃদ্ধিতে সচেষ্ট কিনা। রক্তচোষা বা শোষণের ধুয়ো তুলে যারা পুঁজির বিকাশ রোধ করতে চান, তারা অজান্তে জাতি ও অর্থনীতিকে দেউলিয়াপনার দিকে নিতে সহায়তা করছেন। এ ধরনের পুঁজির বিকাশ কীভাবে গরিব ও জনগণমুখী হতে পারে, সে ব্যাপারেই বরং সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
উপরোল্লিখিত দ্বিতীয় ধরনের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে নির্দিষ্ট সংস্থার দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। অতীতের Putting out ব্যবস্থার সঙ্গে এর সাদৃশ্য রয়েছে। গরিব পরিবারকে উপকরণ সরবরাহ করে যদি কোনো সংস্থা পর্যাপ্ত দামে উৎপাদিত পণ্যের বাজার নিশ্চিত করতে পারে এবং সেই প্রক্রিয়ায় যদি শ্রমের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করা যায়, একজন সম্পদহীনের জন্য এমন ঝুঁকিহীন ব্যবস্থার চেয়ে আর কি উত্তম পন্থা থাকতে পারে? বাস্তব আয়োজন অবশ্য এত নির্ভেজাল নয়। সে কারণেই এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের ঢালাও বিরোধিতা না করে তাদের উদ্যোগকে দায়বদ্ধ ও গরিবমুখী করার ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
নেটওয়ার্কভুক্ত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট তৃতীয় বাণিজ্যিক উদ্যোগকে অনেকেই হয়তো ‘বেনিয়া-মুত্সুদ্দি’ বলে চিহ্নিত করবেন, কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব উদ্যোগে সংস্থাগুলো স্থানীয় বাজারে বিদেশী পণ্য বিক্রির কমিশন এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। তবে ভালো-মন্দ সম্পর্কে মন্তব্য করার আগে কিছু বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যেমন (ক) প্রচলিত বিপণন ব্যবস্থার তুলনায় এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার উদ্যোগে দ্রব্য বা সেবা কি স্বল্পমূল্যে এবং সময়োপযোগীভাবে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে কিনা এবং (খ) যেসব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সংস্থাগুলো কি নির্দিষ্ট দ্রব্য বা সেবার উৎপাদন/সরবরাহ স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে তুলতে সচেষ্ট? উল্লেখ্য যে, প্রথম ক্ষেত্রে ভোক্তা হিসেবে জনসাধারণ উপকৃত হবেন এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ফলে কর্মজীবী জনসাধারণ উপকৃত হবেন। সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য হিসেবে দ্বিতীয়টি অর্জন করা আবশ্যিক।
এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ খাতে প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির বিকাশ এমন একপর্যায়ে গেছে যে, অনেক বিনিয়োগ আশু বা ভবিষ্যৎ মুনাফার জন্য করা হয় এবং সেসবের সঙ্গে সদস্য স্বার্থের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা নেই।৪ এসব বিনিয়োগে অনাকাঙ্ক্ষিত ভর্তুকি না থাকলে সামষ্টিক অর্থনীতির বিচারে তাদের ভালো-মন্দ সম্পর্কে ঢালাও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব খাতে প্রাথমিক বিনিয়োগ (যেমন তথ্যপ্রযুক্তি বা শিক্ষায়) অধিকতর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মোচন করে, অনেক ক্ষেত্রে তা আনে বাড়তি মুনাফা (যেমন— বাণিজ্যিক ব্যাংক)। শেষোক্ত ক্ষেত্রেও সংস্থাগুলোর অন্যান্য সামাজিক ও গরিবমুখী অর্থনৈতিক/ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় এ বাড়তি মুনাফা ব্যবহার সম্ভব। এ ধরনের সমাজমুখী বিনিয়োগ ও সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ পুঁজির বিকাশের জন্য এ খাতের সুশাসন প্রয়োজন।
৪। পরিশেষে
যে গরিবদের কেন্দ্র করে এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে যেসব প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতির সঙ্গে ব্যক্তির কল্যাণের মাঝে অনেক সময় সংঘাত দেখা দিয়েছে। যেমন— জলমহালের ইজারা প্রতিষ্ঠানের দখলে এলে অথবা শাকসবজি ও মুরগির স্থানীয় ব্যবসায় প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিস্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। সর্বোপরি ক্ষুদ্রঋণের প্রসারের সঙ্গে এবং আর্থিক স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে এর অধিক বাণিজ্যিকীকরণের ফলে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এর সদস্যদের সম্পর্কে চিড় ধরে। আজ স্বীকার করার সময়ে এসেছে যে এ বিবর্তন অবশ্যম্ভাবী ছিল। এ সংকটের দৃষ্টান্ত দিয়ে যেমন অতীতের সফলতাকে তুচ্ছ করে দেখা সম্ভব নয়, তেমনি অতীতের সফলতার আত্মতুষ্টিতে ভুগে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের বিরোধিতা করা ঠিক হবে না। এ নিবন্ধে দারিদ্র্য উত্তরণের মাপকাঠিতে ক্ষুদ্রঋণের সফলতার বিচার করা হয়নি। বরং এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার বিবর্তনের ধারা বর্ণনা করতে গিয়ে তার আবশ্যিকতা ও প্রয়োজনীয় দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। পাঠকসমাজ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার কর্মপরিধি ও ‘প্রাইভেট’ এনজিও সংক্রান্ত মূলধারার বিতর্কের অনেক বিষয়ই লেখক অপ্রাসঙ্গিক মনে করেন। ক্ষুদ্রঋণ ও অন্যান্য সেবা গ্রামীণ জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেয়ার প্রক্রিয়ায় এ দেশে আজ ছোট-বড় অনেক সংস্থা গড়ে উঠেছে। এসব সংস্থা যেমন ভালো-মন্দে মানুষ তৈরি করেছে, তেমনি বিবিধ উপায়ে অর্জিত অর্থকে পুঁজিতে রূপান্তর করছে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ ও এনজিও কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় পাওয়া লেখকের দৃষ্টিতে, এসব সংস্থা। এগুলোকে সঠিক পথে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব সবার এবং রাষ্ট্রীয় সুশাসন ও উপযোগী নীতিমালার মাধ্যমে এ প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজিকে গণমুখী ও দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা খুবই জরুরি।৫
প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজি বিকাশের যে প্রক্রিয়ার বর্ণনা দেয়া হলো, তা এখনো পূর্ণতা অর্জন করেনি। এ দেশে হাজারের অধিক সংস্থা রয়েছে এবং সেগুলোর চরিত্র বিভিন্ন রঙের। বাজার প্রতিযোগিতার দোহাই দিয়ে অনেকে বৃহদাকার পুঁজির উদ্ভবের/পুঞ্জীভূত করার পক্ষে সায় দেন, যা নেটওয়ার্কের উদ্ভাবনী ক্ষমতা খর্ব করবে এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে সেই পুঁজি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে হাত মিলিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত রূপ নিতে পারে।৬ অন্যদিকে সংস্থা প্রতিষ্ঠার দোহাই দিয়ে যেসব ব্যক্তি (খাজনা ভোগের ও নিজস্ব লাভের উদ্দেশ্যে) সংস্থাগুলোর পরিচালনা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে চান, তারা পুঁজির কাম্য বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারেন। আজ বাংলাদেশের এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ খাত এমন এক ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দুই অশুভ শক্তিই সজীব। তাই প্রয়োজন সামাজিক দায়বদ্ধশীল বিচক্ষণতার— এ খাতের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বিধি-ব্যবস্থাপনায় ও সংস্থা পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে নতুন পথে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজন নতুন মানুষের।৭
টীকা:
১। এ নিবন্ধ প্রকাশের পরবর্তীকালে ক্ষুদ্রঋণকে বিতর্কিত করার পেছনে নানা কারণ রয়েছে, যা ২০০৯-১০ সালে মূর্ত ছিল না।
২। অর্থনীতিতে ব্যক্তি পুঁজির রূপের সঙ্গে রাজনীতির পূর্বেকার সম্পর্কে পরবর্তীকালে আমূল পরিবর্তন এসেছে, যা পাঠকদের গোচরে থাকা প্রয়োজন।
৩। এ প্রস্তাবনাটি প্রশ্নসাপেক্ষে।
৪। স্পষ্টতার জন্য বাক্যটি সংশোধন করা হয়েছে।
৫। যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশে অর্থায়নে ভূমিকা রেখেছিল, তারা ঋণ কর্মসূচিতেই দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সীমাবদ্ধ রাখতে সচেষ্ট ছিল। পরবর্তীকালে এর বিরোধিতা করে অনেকেই এখনো প্রকল্পভিত্তিক বিদেশী সহায়তার ওপর নির্ভরশীল রয়েছে। আত্মনির্ভরতা অর্জনের জন্য পুঁজি বিকাশের পথকে সুগম করতে তাই উপযুক্ত সময়ে বিধি প্রণয়নে ব্যর্থতা লক্ষণীয়।
৬। বিশ্ব পরিসরে বৃহদাকার পুঁজির সঙ্গে সম্পৃক্ততার ভালো-মন্দ দিক রয়েছে। ২০০৯/১০ এর মন্তব্যটি একপেশে ছিল। এ বিষয়ে পাঠকরা অধিক অনুধাবনে সচেষ্ট হবেন।
৭। প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিধি ব্যাপ্ত হওয়ার সঙ্গে তার বিধি-ব্যবস্থার সহনশীলতার সংযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে অধিক অনুধাবন প্রয়োজন।
[বিআইডিএস থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষা, ১৯৯০’ থেকে পুনঃমুদ্রণ]
লেখক: অর্থনীতিবিদ; ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক






