সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও দলিত মানুষের জন্য অধিকারভিত্তিক সেবা ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে সব অংশীজনকে নিয়ে গত ৩১ জুলাই হেকস/ইপার, বণিক বার্তা ও ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লিমিটেডের যৌথ আয়োজনে এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ ক্রোড়পত্রে প্রকাশ হলো
দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
যেসব জেলায় সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আনুপাতিক সংখ্যা বেশি, সেখানে দারিদ্র্যের মাত্রাও অধিক
দেশে দারিদ্র্যের হার কমছে। একটা সময় আমরা দারিদ্র্যের পকেট হিসেবে কুড়িগ্রাম-রংপুরকে জানতাম, তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে দিনাজপুরে দারিদ্র্যের পরিমাণ বেশি। যদিও আগের দারিদ্র্য মানচিত্রে দিনাজপুরের নাম ছিল না। বিভিন্ন জেলায় দারিদ্র্যের অনুপাত সম্পর্কিত তথ্য জানতে গিয়ে আমরা দেখলাম যে, সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উপস্থিতির হার অত্যন্ত বেশি দিনাজপুরে। তাছাড়া যেসব জেলায় সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আনুপাতিক সংখ্যা বেশি, সেখানে দারিদ্র্যের মাত্রাও অধিক। বিশেষ করে সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের মধ্যে দারিদ্র্য হার তুলনামূলক বেশি। আমরা দৈনিক বণিক বার্তায় এ-সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি যে ‘সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের ৮০ শতাংশই দরিদ্র: নারীরাই বেশি ভঙ্গুর’। অর্থাৎ দারিদ্র্য সঙ্গে করে বেঁচে থাকা সমতলের ভঙ্গুর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যেও আবার বেশি ভঙ্গুর নারীরা। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে একই শ্রম দিয়েও তারা পুরুষের চেয়ে কম মজুরি পাচ্ছেন। কাজের সুযোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষার সুযোগও তাদের সীমিত। বর্তমান উন্নয়ন কাঠামোয় এ নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা, আয় বর্ধনের উৎসগুলো তৈরি করার পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যমে কীভাবে তাদের কর্মসংস্থানে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সে বিষয়গুলো অনেক গুরুত্বসহকারে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
পাভেল পার্থ
‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ ও ‘দলিত’ প্রপঞ্চ সামাজিক প্রান্তিকতাকে স্পষ্ট করে
স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ইত্যাদিতে পিছিয়ে পড়া সমতলের আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠীর মানুষ নানা বাস্তবিক কারণে অন্য দশজনের চেয়ে নাগরিক অধিকার লাভে বঞ্চিত। আদিবাসী পরিচয়খানি জাতিগত বৈচিত্র্য এবং দলিত প্রপঞ্চ সামাজিক প্রান্তিকতাকে স্পষ্ট করে। তাই রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই মানুষদের জন্য মৌলিক সেবাগুলো এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ-বিষয়ক প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা কত দূর বাস্তবায়ন হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
কাপেং ফাউন্ডেশন ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম আদিবাসীবিষয়ক এক অবস্থানপত্রে (২০১৮) জানাচ্ছে, বাংলাদেশে সমতলের আদিবাসীদের দারিদ্র্যের হার জাতীয় দারিদ্র্যের হারের চেয়ে অনেক বেশি, যা প্রায় ৮০ শতাংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের সমতলের আদিবাসী ও দলিত জনগণ কার্যত ভূমি ও আবাসহীন।
‘রাষ্ট্রীয় মৌলিক সেবা ও সামাজিক সুরক্ষাবলয়ে’ আদিবাসী ও দলিতজনের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত প্রস্তাব ও সুপারিশগুলো হাজির করছে:
১. জাতীয় আদিবাসী ও দলিত জরিপ: বাংলাদেশের আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক জনপরিসংখ্যান এবং এর তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহ করতে হবে।
২. জাতীয় আদিবাসী ও দলিত উন্নয়ন পরিকল্পনা: আদিবাসী ও দলিতদের প্রতি নেতিবাচক ও বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে বিশেষ অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। গণমাধ্যমকেও আরো সংবেদনশীল হতে হবে।
৩. সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন: পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের মাধ্যমে স্থানীয় ভূমিবিষয়ক বিরোধ, সংকট, মামলা, তথ্য নথি, দলিলপত্র সংরক্ষণ ও কর্মপ্রক্রিয়া সম্পাদন করা হবে।
৪. আদিবাসী ও দলিত জনগণের জন্য বিশেষ অধিদপ্তর: আদিবাসী ও দলিত জনগণের মৌলিক সেবা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বেগবান ও ফলপ্রসূ করতে সরকারের একটি পৃথক অধিদপ্তর গঠন করতে হবে এবং এখানে আদিবাসী প্রতিনিধির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
৫. স্থানীয় সরকার কাঠামো শক্তিশালীকরণ ও আদিবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ: ইউনিয়ন পরিষদের স্ট্যান্ডিং কমিটি, গ্রাম আদালত, বার্ষিক উন্মুক্ত বাজেট সভা ও বার্ষিক কর্মপরিকল্পনায় আদিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত এবং তাদের মতামত নিতে হবে। এ লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার আইনে ও পরিচালনার নীতিতে আদিবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়ে নতুন ধারা যুক্ত করতে হবে।
৬. বিশেষ সেবা ও কোটা সংরক্ষণ: দলিত এলাকায় দলিত জনগণের জন্য বিশেষ স্থায়ী আবাসন তৈরি করতে হবে। আদিবাসী ও দলিতদের জন্য শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা, চাকরি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা সংরক্ষণ করতে হবে।
৭. জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ: বাজেটে আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান ও বহুমুখী জীবিকায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ করতে হবে, যেখানে আদিবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
৮. আদিবাসী আইন ও বর্ণবৈষম্য বিলোপ আইন: প্রস্তাবিত আদিবাসী আইন ও বর্ণবৈষম্য বিলোপ আইন আদিবাসী জনগণের অংশগ্রহণে চূড়ান্ত করতে হবে।
মো. তাজুল ইসলাম এমপি
কাউকে পিছিয়ে রাখার কোনো অভিপ্রায় বা ইচ্ছা আমাদের নেই
বিভিন্ন ধর্ম-পেশা-শ্রেণী-গোত্রের মানুষের বসবাস এ বাংলাদেশে কাউকে বিভাজন করে না দেখার সংস্কৃতি ও শিক্ষা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু আমাদের দিয়েছেন। কাউকে পিছিয়ে রাখার কোনো অভিপ্রায় বা ইচ্ছা আমাদের নেই। সবার জন্য হয়তো এখন কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না, সবার জন্য এ মুহূর্তে সমান সুযোগও হয়তো নিশ্চিত করা যাবে না। এক্ষেত্রে আমাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য কাজ করতে আমাদের অঙ্গীকার, প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। আমরা তাদের এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে কাজ করছি।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সমাজের সব মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কারো কোনো দ্বিমত নেই। ইউনিয়ন পরিষদের অনেক সদস্যের ধারণা নেই, কীভাবে স্থানীয় সরকারে কাজ করতে হয়। আমরা চেষ্টা করছি তাদের প্রশিক্ষিত করে তুলতে। অনেক সময় তারা জানেন না, তাদের দায়িত্ব কী, এসব সমস্যা আমাদের চিহ্নিত করে তার সমাধান করতে হবে। ১১২টি সেবা দেয়ার জন্য ইউনিয়ন পরিষদকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তবে কতজন চেয়ারম্যান বিষয়টি জানেন? ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, তাদের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। তাদের জীবনমান উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে হবে। এটি রাতারাতি সম্ভব নয়। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে ভবন নির্মাণের জন্য এরই মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প পাস হয়েছে।
আরমা দত্ত, এমপি
বাস্তবিক কর্মপন্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ ধরনের বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব
একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, সবার সমান অধিকার, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রায়নের লক্ষ্যেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের সংবিধান করে গিয়েছিলেন। স্থানীয় সরকার ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বড় সুবিধা হচ্ছে, তৃণমূল পর্যায়ে তাদের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন অনেক এনজিও কাজ করে, যাদের সঙ্গে স্থানীয় সরকারও আছে। এনজিওগুলো যদি তাদের বাজেটের ন্যূনতম ৫ শতাংশ দিয়ে একটি সাধারণ তহবিল তৈরি করে, এর সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে একটা তহবিল যোগ করে কাজে নামা যেতে পারে। এতে ক্রমান্বয়ে বৈষম্য কমে আসবে। অনেক এনজিও রয়েছে, যারা নিজ উদ্যোগেই এ ধরনের কাজের সঙ্গে শামিল হবে। অনেক দাতা আছেন, যারা এগিয়ে আসবেন। বিভিন্ন দাতা সংস্থাও আছে। সরকার ও এনজিওর সমন্বয়ে কীভাবে বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা যায়, আপনারা তা নিয়ে আলোচনা করেন। বাস্তবিক কর্মপন্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ ধরনের বৈষম্য কমিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন সম্ভব হবে।
জুয়েনা আজিজ
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ রয়েছে
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষ এরই মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দলিতদের বিষয়টি কর্মসূচিতে আলাদাভাবে উল্লেখ করা না হলেও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ হিসেবে তারা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ রয়েছে। বিভিন্ন জেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এ বরাদ্দ দেয়া হয়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোনো মানুষ গৃহহারা থাকবে না। তার নীতি ও চিন্তার সঙ্গে মিল রেখে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমরা বাসস্থানের ব্যবস্থা করার বিষয়টি শুরু করেছি। চা বাগানের মালিকদের সঙ্গেও আমরা কথা বলেছি এবং স্থানীয় প্রশাসন ও মালিক-শ্রমিকদের যে প্রতিনিধি, তারা এর বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবেন। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে আমরা অন্যান্য গোষ্ঠীর কাছে যাব। এছাড়া দলিতদের মধ্যে যারা প্রচলিত পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যাতে তারা আর্থসামাজিকভাবে উন্নতি করতে পারে।
মো. কামাল উদ্দিন তালুকদার
সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যে বিশেষ সেলটি আছে, তা মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনা প্রয়োজন
বাংলাদেশের জন্মের পেছনে সব সম্প্রদায়ের মানুষের অবদান রয়েছে। তাই কোনো জাতিগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রাখার সুযোগ নেই। সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন আলাদা সেল আছে। তবে বাজেট বরাদ্দ তুলনামূলক কম। এ সেলকে মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনলে তথ্যভাণ্ডার তৈরিসহ সম্প্রদায় ও সংস্কৃতিভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা করা যাবে। পাবর্ত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় রয়েছে। তাদের জন্য আলাদা বরাদ্দও দেয়া হয়। কিন্তু সে তুলনায় সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য বরাদ্দ নেই। বড় কোনো কর্মসূচিও নেই। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন কিছু বরাদ্দ দেয়া হয় বটে, তবে তা যথেষ্ট নয়। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের উদ্দেশ্য হলো সমবায়ভিত্তিক পল্লী এলাকার মানুষের উন্নয়ন সাধন করা। আমরা সব জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণ করতে চাই। ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশের যে স্বপ্ন প্রধানমন্ত্রী আমাদের দেখিয়েছেন, আমরা তা বাস্তবে রূপ দিতে চাই।
মোজাহিদুল ইসলাম নয়ন
অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণের সুপারিশ করছি
বাংলাদেশে বিগত সময়ে দারিদ্র্যের হার কমেছে, এখনো ২২ শতাংশ মানুষ দরিদ্র, যার মধ্যে ১২-১৩ শতাংশ অতিদরিদ্র। ১৬ কোটি মানুষের ২২ শতাংশ সংখ্যার হিসেবে মোটেই কম নয়। আর এ দরিদ্র মানুষের মধ্যে সমতলের আদিবাসী ও দলিত মানুষের সংখ্যাই বেশি। তাদের শুধু দরিদ্র হিসেবে দেখলেই হবে না, দেখতে হবে দরিদ্রতার বহুমুখীন মাত্রার বিচারে, অবস্থার প্রেক্ষিতে ও স্থানীয়-আঞ্চলিক বাস্তবতায়।
সমতলের আদিবাসী ও দলিত জনসংখ্যা সব মিলিয়ে প্রায় এক কোটি। কিন্তু তাদের জন্য চলতি অর্থবছরে কোনো বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়নি। বাজেটে বেদে ও অনগ্রসর মানুষের নামে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া রয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির নামে। সমতলের আদিবাসী ও দলিতদের পশ্চাত্পদতা ও দরিদ্রদের বহুমাত্রিকতা চিন্তা করে বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন করতে হলে অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন উদ্যোগ নিতে হবে।
শুধু চুইয়ে পড়া উন্নয়ন দিয়ে ওই মানুষগুলো হয়তো খেয়ে-পরে বাঁচবে, কিন্তু কোনোদিন তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। তাই আমরা অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণের সুপারিশ করছি।
আনোয়ারুল হক
সমতলের আদিবাসীদের ৮০ শতাংশই দরিদ্র
পরিসংখ্যান অনুযায়ী সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে যদি ৮০ শতাংশই দরিদ্র হয়, তার মানে নিশ্চয়ই তারা পিছিয়ে রয়েছে। আমরা যদি বিশ্বাস করি, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন দরকার কিংবা আমরা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করব, তাহলে কোনো সন্দেহ নেই যে আমাদের ভিন্নভাবে ভাবতে হবে। ২০১৬ সালে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন একটি জরিপের মাধ্যমে জানার চেষ্টা করে, পাশাপাশি বসবাসরত বাঙালি ও আদিবাসীদের মধ্যে বাঙালিরা আদিবাসীদের সম্পর্কে কী মনোভাব পোষণ করে। এ প্রশ্নের উত্তরে ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ বাঙালি বলেছে, আদিবাসীরা খারাপ ও নোংরা। আজকের আলোচনায় আমাদের মনোজগতের পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। আমি মনে করি, মনোজগতের পরিবর্তন যেমন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে দরকার আছে, একইভাবে আমরা যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি, আমাদেরও কিন্তু মেনে নিতে হবে যে আদিবাসীরা সমান নাগরিক অধিকার নিয়ে এ দেশে বসবাস করবে। এ মানসিকতার পরিবর্তন যতক্ষণ পর্যন্ত না হবে, ততক্ষণ কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া খুব কঠিন হবে।
আশেকুর রহমান
আদমশুমারিতে ১৫ লাখ সমতলের আদিবাসীর কথা থাকলেও উপাত্তগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকৃত সংখ্যা জানি না
দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই বললেই চলে, যা এ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রতিফলন আমরা সরকারি বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচিতে দেখতে পাই। আদমশুমারিতে ১৫ লাখ সমতলের আদিবাসীর কথা বলা থাকলেও উপাত্তগত সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের প্রকৃত সংখ্যা জানি না। একই চিত্র দলিত জনগোষ্ঠীকে নিয়েও। তাদের নিয়ে বিশেষায়িত কোনো পরিসংখ্যানও নেই। তথ্যগত এ শূন্যতাটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবলই তথ্যগত ফাঁক নয়, ন্যায্যতারও বিষয়। তাদের স্বীকৃতির বিষয়টিও এর সঙ্গে জড়িত। আমরা যখন দলিতদের বিষয়ে চিন্তা করি, তখন মনে করি, তাদের জন্য সুইপার কলোনি তৈরি করাটাই সবচেয়ে বড় কর্মসূচি। শুধু কলোনি করলেই দলিতদের সমস্যার সমাধান হবে কিনা সন্দেহ আছে। এর সঙ্গে দেখার আরো অনেক বিষয় রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আদিবাসী বা দলিতদের নিয়ে কার্যকর কোনো নীতিপরিকল্পনা আমাদের নেই। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় শুধু পাহাড়ের আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করে। তাই এখানে সংস্কারের সুযোগ আছে। প্রাতিষ্ঠানিক নীতিকাঠামো ছাড়া বাংলাদেশে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কঠিন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন রয়েছে। বিভাগটি যাদের জন্য কাজ করে, তারা কখনো নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরতে কিংবা মতামত দিতে পেরেছে বলে শোনা যায়নি।
সৈয়দ বোরহান কবির
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের অধিক হারে যুক্ত করা প্রয়োজন
সবাই মানুষের কল্যাণ করতে চাইছে, মানুষের ভালো করতে চাইছে। কিন্তু কোথায় যেন সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সরকার জানছে না, উন্নয়ন সংস্থাগুলো কীভাবে কাজ করছে। উন্নয়ন সংস্থাগুলোও জানছে না, সরকার কী করছে। সেই জায়গায় আমরা সমন্বয়ের কাজটি করতে চাই। আমাদের সংবিধান সব মানুষের সমান অধিকার ও বৈষম্যমুক্ত একটি সমাজের স্বীকৃতি দেয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সমস্যার সমাধান করতে চান, সেটি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের আরো অধিক হারে যুক্ত করা, স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। অনেক স্থানে আদিবাসীদের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নেই, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এ সরকারের আমলে দলিতদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণের একটি ভালো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে এর সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও দলিতদের জীবনমান উন্নয়নের এসব উদ্যোগ নিতেই পারে। মন্ত্রীর কাছে আমার অনুরোধ, মন্ত্রণালয়ে যদি ছোট একটি সেল করা যায়, মাসে না হোক, অন্তত তিন মাসে একবার দলিত ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে যারা কাজ করছেন, তাদের নিয়ে যদি করণীয় সম্পর্কে ছোট্ট করে আলোচনা করা হয়, তাহলে ভালো হয়।
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে নিষ্পেষণের মধ্যে রেখে অসাম্যকে উৎসাহিত করা হচ্ছে
২০১৬ সালে সাঁওতালদের ঘর-বাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনাটি আমাদের সবার মনে আছে। ঘটনাটি ঘটেছিল গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে। সে সময় গণমাধ্যমের কল্যাণে সবাই দেখেছে, কারা আগুন দিচ্ছিল। তাদের চেহারা স্পষ্ট, পোশাক স্পষ্ট, কিন্তু ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে তাদের নাম নেই। এটি একটি প্রতীকী ঘটনা হিসেবে আমাদের শাসন ব্যবস্থার অবস্থা বুঝতে সাহায্য করে যে আমরা সমতলের আদিবাসীদের কী চোখে দেখি। এদের কেউ নেই, নেই এ কারণে যে তারা দরিদ্র। দারিদ্র্যসীমার নিচে যে মানুষগুলো থাকে, এরা তারা। এরা ক্ষমতাহীন, এদের সেই অর্থে কোনো শক্তিশালী সংগঠন নেই। এরা নিষ্পেষিত। এদের অধিকার কেড়ে নিতে পারলে অনেকে খুশি হন। এ শাসন ব্যবস্থা যারা পরিচালনা করেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, তাদের মনোজগতে যে দর্শন রয়েছে, সেখানে এদের উন্নয়নের জন্য সত্যিকার অর্থে কোনো ভাবনা আছে কিনা।
আমাদের সামনে প্রশ্ন চলে আসে, সমতলের আদিবাসীদের সম্পর্কে আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? একটি বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে নিষ্পেষণের মধ্যে রেখে আমরা যে উন্নয়নের কথা বলছি, তা আসলে অসাম্যকে উৎসাহিত করছে। অসাম্যকে উৎসাহিত করে, প্রান্তিক মানুষদের নিষ্পেষিত রেখে যে উন্নয়ন হবে, তা কোনো মানুষের হূদয়কে ছুঁয়ে যাবে না।
সিতি সালমা খান
শুধু তথ্য সংগ্রহই নয়, তথ্যপ্রবাহও জোরদার করতে হবে
দলিত সম্প্রদায়ের সংখ্যাগত তথ্য, সাংস্কৃতিক জীবনমানের সংখ্যাগত তথ্য, অর্থনৈতিক অবস্থার তথ্য—এর কোনোটিই আমাদের কাছে নেই। যে জনগোষ্ঠীর সঠিক তথ্য আমাদের কাছে নেই, সেই মানুষদের নিয়ে আমরা কেমন করে কাজ করব, কেমন করে এগিয়ে যাব! এখানে লাকি রাণী বাসফোরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, উনি একটা চিনিকলে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ করছেন। তিনি ওখানে কাজ করছেন, কিন্তু কর্মী হিসেবে নথিভুক্ত হতে পারেননি। ওই চিনিকলে মূল নথিভুক্ত কর্মচারী হিসেবে আছেন একজন বাঙালি, যিনি তার মাসিক ১২ হাজার টাকা বেতন থেকে লাকি রাণীকে মাত্র ২ হাজার টাকা দিয়ে তার কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। আমাদের কার কাছে এ বিষয়গুলো সম্পর্কে কতখানি তথ্য আছে? তাই তথ্যভিত্তিকে জরুরিভাবে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শুধু তথ্য সংগ্রহই নয়, তথ্যপ্রবাহকেও জোরদার করতে হবে। তাহলেই দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য সত্যিকার অর্থে কিছু করা সম্ভব হবে।
লাকী রাণী বাসফোর
আমরা হাসপাতালে রোগী নিয়ে গেলে ডাক্তার-নার্স আমাদের দেখে না
আমরা রেলের জায়গায় থাকি। সেখানে ছোট একটা ঘরে সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়িসহ সবাইকে নিয়ে আমরা থাকি। ওইটুকু জায়গার মধ্যেই আমাদের সন্তানদের মানুষ করতে হচ্ছে। অনেকে আমাদের এ জায়গা থেকে সরিয়ে দেয়ার কথা বলে। কিন্তু আমরা কোথায় যাব। আমরা যখন হাসপাতালে রোগী নিয়ে যাই, ডাক্তার, নার্স আমাদের দেখে না। আমরাও তো মানুষ। খাওয়ার হোটেলে ঢুকলে আমরা খেতে পারি না। আমাদের বাইরে খেতে বলে। বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা আমরা পাই না। আমি চিনিকলে বদলির কাজ করে যে ২ হাজার টাকা পাই, ওই টাকা দিয়ে আমি সন্তানদের পড়ালেখা করাব, নাকি সংসার চালাব!
বিমল মুর্মু
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আমাদের জন্য কোটা রাখা হোক
সমতলের আদিবাসীদের বহু সমস্যা, যার সামান্যই আমরা জানি, বেশির ভাগটুকুই জানি না। বয়স্ক ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফ প্রভৃতি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যদি আমাদের জন্য কোটা রাখা হয়, তাহলে আমরা সহজে এ সেবা পেতে পারি, নইলে বরাদ্দের সবটুকু বাঙালিরাই পায়। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান সবার উপাসনালয়ের জন্য বিশেষ বরাদ্দ আছে, আমাদের সম্প্রদায়ের বার্ষিক উৎসব রয়েছে, আমাদের উপাসনালয় রয়েছে, সেগুলোর জন্যও বিশেষ বরাদ্দ রাখা দরকার।
রোকেয়া প্রাচী
দুর্দশাগ্রস্ত অঞ্চলে ছোট ছোট বরাদ্দের বিষয়টি ভাবতে হবে
প্রধানমন্ত্রী উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। এসডিজি বাস্তবায়নের যে লক্ষ্যে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, সেখানে কাউকে পিছিয়ে রাখা যাবে না, এ সত্যটাকে আমরা সবাই গ্রহণ করেছি, মানছি, কিন্তু কার্যকারিতার জায়গায় আমরা ততটা দেখতে পারছি না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চমৎকার একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু ফ্লাইওভারের ঠিক নিচে ৫০-৭০টি পরিবার একটি ছোট জায়গা নিয়ে বাস করছে। তাদের দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি গোসল এমনকি খাবারের পানির চাহিদা মেটায় সেখানকার একটি নোংরা নর্দমা। অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার তো প্রশ্নই আসে না। আজকের বাংলাদেশের সঙ্গে বিষয়টি একদমই যায় না। আমার মনে হয়, এ ধরনের বৈষম্যের চিত্র বাংলাদেশের প্রত্যেকটি এলাকায় পাওয়া যাবে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, দলিত সম্প্রদায়—এভাবে শ্রেণীবিন্যাস না করলেও মানুষ হিসেবে তাদের প্রয়োজনীয় সেবা দেয়ার বিষয়টি কিন্তু স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব। দুর্দশাগ্রস্ত অঞ্চলে ছোট ছোট বরাদ্দের বিষয়টি ভাবতে হবে।
নির্মল চন্দ্র দাস
হরিজন জনগোষ্ঠীর এক ইঞ্চি জমিও নেই
বাংলাদেশে যারা নিজেদের হরিজন বলে দাবি করে, তাদের প্রধান পেশা মূলত পরিচ্ছন্নতা কর্মী। দলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন গোত্র-সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে। এ দলিতরাই কিন্তু হরিজনদের অনেক সময় বৈষম্যের দৃষ্টিতে দেখে। সেক্ষেত্রে মূলধারার সঙ্গে তাদের বৈষম্যের মাত্রাটি অনুমান করা যায়। দরিদ্রদের মধ্যেও দরিদ্র এ মানুষগুলো তাদের কাজটি না করলে আপনারা পরিচ্ছন্ন থাকতে পারতেন না, আপনারা স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে পারতেন না। আজ আমরা যখন আপনাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য কাজ করছি, সেখানে আমরা কি সুস্বাস্থ্যের মধ্যে আছি? আমরা কীভাবে আছি, সেই জায়গা কি আপনারা দেখেছেন? যারা এ কাজগুলো করছে, তাদের কত টাকা বেতন দেয়া হয়? সরকার দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বলছে। দারিদ্র্য বিমোচন করতে হলে তো তাকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে হবে। পৌরসভায় হরিজন সম্প্রদায়ের যারা চাকরি করেন, তারা ১ হাজার ৪০০ টাকা বেতন পান। এ বেতনে কীভাবে একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী ভালো থাকবেন? বাংলাদেশে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর কিছু জমি থাকলেও হরিজন জনগোষ্ঠীর এক ইঞ্চি জমিও নেই। তাই বলব, উন্নয়নের ছোঁয়ায় যদি আমাদের আনতে চান, তাহলে আমাদের কথা শুনতে হবে।
সোহেল হাজং
সমতলের আদিবাসীদের দেখার জন্য এখনো কোনো পৃথক মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর নেই
আমি সরকারকে ধন্যবাদ জানাব যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকায় ২৭টি জাতিগোষ্ঠীর জায়গায় ৫০টি জাতিগোষ্ঠীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদিও আরো কয়েকটি জাতির নাম আসেনি। সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ভিয়েনা রিপোর্ট ও টেকসই উন্নয়নের যে বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে, সেক্ষেত্রে কাউকে বাদ দিয়ে নয়, এ মূলমন্ত্র আমলে নিয়ে আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেবেন বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেটি আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু উন্নয়নের দৌড়ে আদিবাসীরা এখনো পেছনে পড়ে আছে, তাদের দারিদ্র্যের হার অনেক বেশি, মাথাপিছু আয়ের হার অনেক কম এবং সেবা খাতে তাদের প্রবেশগম্যতা নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পক্ষ থেকে আমাদের বলা হয়েছে, আগামী আদমশুমারিতে তারা এই ৫০টি জাতির তথ্য আলাদা করে সংগ্রহ করবেন। তাহলে বর্তমানে ১৫ লাখ আদিবাসীর যে সংখ্যা হিসাব করা হয়, সেটি ৩০ লাখ ছুঁয়ে যাবে। জাতীয় বাজেটে আমরা বরাবরই আদিবাসীদের বঞ্চিত দশা দেখি। আদিবাসীদের জন্য একটি সেল রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা, যেটিতে ৬ কোটি টাকা দিয়ে শুরু হলেও নতুন বাজেটে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে এর বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সমতলের আদিবাসীদের বিষয়টি দেখার জন্য এখনো কোনো পৃথক মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর নেই। তাদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করা সময়ের দাবি।
শীষ রহমান
বিপুলসংখ্যক মানুষকে বঞ্চিত রেখে জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়
সংবিধান অনুযায়ী দেশের সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমঅধিকার ও সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমতলের আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ চরম বৈষম্যের শিকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ এবং জীবিকায়নে বিকল্প তৈরির ক্ষেত্রে তারা নানা কাঠামোগত বাধার সম্মুখীন হয়। ফলে জীবন ও জীবিকায়নের স্বীকৃত প্রমিত মান থেকে তারা অনেক পিছিয়ে। বিপুলসংখ্যক মানুষকে বঞ্চিত রেখে সরকারের যে জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, তা অর্জন করা সম্ভব নয়।
শ্রুতলিখন: রুহিনা ফেরদৌস
আলোকচিত্রী: সোহেল আহমেদ





