গ্রাহকদের বিশেষ প্রয়োজন অনুযায়ী এসব কার্ড সাজানো হয়েছে। যেমন ব্র্যাক ব্যাংকের জনপ্রিয় কার্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘মাস্টারকার্ড মিলেনিয়াল’ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে সাধারণ গ্রাহকেরা বিদেশ ভ্রমণে ইন্টারন্যাশনাল লাউঞ্জ ব্যবহারসহ অনেক সুবিধা পাচ্ছেন। আবার যেসব গ্রাহক কেনাকাটায় ক্যাশব্যাক বা ডিসকাউন্টকে বেশি গুরুত্ব দেন, তাদের জন্য রয়েছে ‘ভিসা ক্যাশব্যাক’ ক্রেডিট কার্ড। এছাড়া নারী গ্রাহকদের জন্য বিশেষ ফিচারসহ আমাদের রয়েছে ‘মাস্টারকার্ড তারা ওয়ার্ল্ড’ ও ‘ভিসা তারা প্লাটিনাম’ ক্রেডিট কার্ড। একই সঙ্গে আমাদের প্রিমিয়াম গ্রাহকদের জন্য ‘ভিসা ইনফিনিট’, ‘ভিসা সিগনেচার’সহ বেশকিছু ক্রেডিট কার্ড রয়েছে।

কোন কোন বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে আপনাদের কার্ড অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কার্ডের তুলনায় আলাদা?

ব্র্যাক ব্যাংক সবসময় গ্রাহকসেবাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে আমরা গ্রাহকদের চাহিদার কথা বিবেচনায় রাখি। আমরা বিশ্বাস করি, প্রত্যেক গ্রাহকেরই নিজস্ব কিছু চাহিদা থাকে। আমাদের ক্রেডিট কার্ডের ফিচারগুলো এমনভাবেই সাজানো হয়, যেন একজন গ্রাহকও নিরাশ না হন। এসব কার্ড ব্যবহার করে গ্রাহকেরা জরুরি প্রয়োজনে ৪৫ দিন পর্যন্ত সুদমুক্ত সুবিধায় টাকা ধার করতে পারেন।

এসব কারণে সমাজের উচ্চবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তসহ সব শ্রেণীর গ্রাহকই ব্র্যাক ব্যাংকে কেনাকাটার প্রয়োজন মেটাতে পছন্দের কার্ড খুঁজে পাবেন। ক্রেডিট কার্ডে আমরা গ্রাহকদের সুরক্ষায় স্বাস্থ্য বীমা চালু করেছি। ফলে ক্রেডিট কার্ডের বিভিন্ন ফিচার উপভোগ করার পাশাপাশি গ্রাহকের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়।

ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ১৫ হাজার টাকার বেশি কেনাকাটাকে মাসিক কিস্তিতে রূপান্তরের সুবিধাও আমরা দিচ্ছি। একই সঙ্গে কেনাকাটায় বেশি বেশি ক্যাশব্যাক, রিওয়ার্ড পয়েন্ট, বিদেশ ভ্রমণে লাউঞ্জ সুবিধা, দেশী-বিদেশী নামকরা ব্র্যান্ডের পণ্যে বিশেষ ছাড়, তারকা মানের হোটেলে বছরজুড়ে ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান/টু/থ্রি’ ফ্রিসহ অনেক ফিচারই রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডে। এছাড়া নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমাদের ক্রেডিট কার্ডে বার্ষিক ফি মওকুফের সুবিধাও রয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্যই ব্র্যাক ব্যাংককে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখছে।

এবারের রমজান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কার্ডভিত্তিক কেনাকাটার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জন্য আপনাদের বিশেষ অফারগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবেন?

দেশের প্রধান প্রধান উৎসবের সময়ে উৎসবকেন্দ্রিক কেনাকাটা করা আমাদের শহুরে সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি মাথায় রেখে এবারের রমজান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মাসজুড়ে আমরা ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডে বিভিন্ন অফার নিয়ে এসেছি। ঈদ উপলক্ষে আমাদের ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড গ্রাহকেরা ক্যাশব্যাক অফার, সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ডিসকাউন্ট অফার, বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেল ও রেস্টুরেন্টে ‘বাই ওয়ান গেট ফোর’ অফারসহ বোনাস রিওয়ার্ড পয়েন্ট পাচ্ছেন।

এসব অফার প্রতি বছরই গ্রাহক পর্যায়ে যথেষ্ট সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে। ফলে উৎসবের সময়ে আমাদের ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। এ বছর আমরা অন্য বছরের তুলনায় আরো বেশি অফার নিয়ে এসেছি। আশা করছি, এবারো আমরা ভালো সাড়া পাব।

দেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের প্রসার ও সম্প্রসারণের পথে অন্তরায়গুলো কী কী বলে আপনি মনে করেন? এগুলোকে কাটিয়ে ওঠার উপায় কী?

ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের প্রসারের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রথমেই বলতে হবে ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ বা ডিজিটাল সাক্ষরতার কথা। এখনো দেশের জনগণের একটি বড় অংশ ডিজিটাল পেমেন্ট করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানে না। এটি নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বিধা বা ভয়ও কাজ করে। সবাইকে ডিজিটাল পেমেন্টে অভ্যস্ত করতে পারাটাই এখানে মূল চ্যালেঞ্জ।

এছাড়া স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার কম থাকাটাও ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে একটি বাধা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৭৫ শতাংশ পরিবার স্মার্টফোন এবং ৫৪ শতাংশ পরিবার ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। এটিকে শতভাগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে, যাতে তারা ডিজিটাল পেমেন্ট করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে থাকাটাও একটি বড় সংকট। কারণ দেশের নগদ লেনদেনের মূল অংশটাই আবর্তিত হয় এ শ্রেণীকে ঘিরে। এসব ব্যবসায়ীকে ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে আসতে পারলে ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম আরো বড় হয়ে যাবে। ব্র্যাক ব্যাংক অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে আসতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষ করে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোর সীমানা পেরিয়ে গ্রাম ও মফস্বল অঞ্চলে ক্যাশলেস আর্থিক লেনদেনকে জনপ্রিয় করতে ব্যাংক এবং মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো একযোগে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে অ্যাপ বা কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনের প্রক্রিয়াটি আমাদের বিপুল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহজবোধ্য ও সহজগম্য করা গেলে দেশে দ্রুত ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের সম্প্রসারণ হবে।

জনসাধারণের মধ্যে কেনাকাটায় কার্ড ব্যবহারকে আরো জনপ্রিয় করতে আপনাদের উদ্যোগগুলো কী কী?

শুরুর দিকে আমাদের দেশে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার পিওএস মেশিনভিত্তিক ছিল। ঢাকাসহ কয়েকটি বিভাগীয় শহরে পিওএস মেশিনের ব্যবহার সীমাবদ্ধ থাকায় কার্ডের গ্রাহকও এ কয়েকটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। তবে ধীরে ধীরে এ অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। এরই মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে ‘অ্যাকোয়ারিং’ ব্যবসার সম্প্রসারণ করেছে, যার ফলে গ্রাহক কার্ড ব্যবহারের ব্যাপক সুযোগ পাচ্ছে।

ডিজিটাল পেমেন্ট জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে ‘বাংলা কিউআর’ স্ট্যান্ডার্ডের ভিত্তিতে আমরা কিউআর পেমেন্ট চালু করেছি। একই সঙ্গে ব্র্যাক ব্যাংক ‘আস্থা’ অ্যাপের মাধ্যমে আমাদের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকেরা দেশব্যাপী সাড়ে তিন লাখেরও বেশি মার্চেন্ট পয়েন্টে কিউআর স্ক্যান করে পেমেন্ট করতে পারেন।

এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের সর্বত্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী। সেই সঙ্গে গ্রাহকদের মধ্যেও কার্ড ব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়বে।

অতি সম্প্রতি ব্র্যাক ব্যাংক ভিসা ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের জন্য ‘গুগল পে’র মাধ্যমে পেমেন্ট সম্পন্ন করার সেবা নিয়ে এসেছে। ফলে এখন গ্রাহক কেবল তার এনএফসি সক্রিয় মোবাইল ফোন ব্যবহার করেই ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবেন।

ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধিতে সরকার কী উদ্যোগ নিতে পারে?

ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানো। এ লক্ষ্যে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও সরকার অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল পেমেন্ট নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকার বিভিন্ন ক্যাম্পেইন করতে পারে, যা দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে বড় ভূমিকা রাখবে।

সরকারি অফিসগুলোয় ধাপে ধাপে ডিজিটাল লেনদেন বাধ্যতামূলক করা হলে জনগণের একটি বড় অংশ প্রভাবিত হবে এবং লেনদেন করার ক্ষেত্রে আস্থা পাবে। এসব কাজে ব্যাংকের সঙ্গে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সমন্বয় ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সরকারি ভর্তুকি। ডিজিটাল লেনদেনে সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে খরচ কমিয়ে আনা গেলে এটি জনগণকে ক্যাশলেস লেনদেনে উৎসাহিত করবে।