ভুল বুঝবেন না! আমি সত্যিই অনুপ্রাণিত হই এমন অসাধারণ নারীদের দেখে। তারা সমাজ বদলাচ্ছে, শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে, স্বাস্থ্য ও অধিকার রক্ষার জন্য লড়ছে। সবাইকে অভিনন্দন। আপনি আমাকে প্রতিদিন অনুপ্রাণিত করছেন।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার চিন্তাধারা কিছুটা অন্য রকম হয়ে গেছে। কিছুটা জনমতের বাইরে।

হ্যাঁ, নারীরা অনেক অগ্রগতি করেছে। অনেক অধিকার ও সুযোগ পেয়েছে। সত্যিই অনুপ্রেরণামূলক। কিন্তু হাজার হাজার নারী এখনো কষ্ট পাচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে, উন্নয়নশীল দেশে, এমনকি আমাদের আশপাশে। প্রশ্নটা খুব সরল, যদি নারী আজও প্রতিদিন নির্যাতিত, খুন, ধর্ষিত ও নিরাপত্তাহীন থাকে তাহলে আমরা কেন শুধু ফুল, রঙ, পোস্টার ও লোগো দিয়ে দিনটি উদযাপন করে থাকি?

আন্তর্জাতিক নারী দিবস প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন ক্লারা জেটকিন, একজন জার্মান ফেমিনিস্ট এবং সোশ্যালিস্ট, ১৯১০ সালে আন্তর্জাতিক কর্মরত নারী সম্মেলনে। প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন হয় ১৯১১ সালে, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে। এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষ নারী অধিকার সমর্থনে র‍্যালি ও প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিল। বিশ্বযুদ্ধের সময়, আন্তর্জাতিক নারী দিবস যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ ও শান্তির আহ্বান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার নারীরা ‘রুটি ও শান্তির’ জন্য হরতাল করেছিল।

কিন্তু আজ ১১৫ বছর পরে আমরা কি সেই আদর্শটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দিনটিকে উদযাপন করছি?

বাংলাদেশে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য ও অন্যান্য পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৫ সালে কমপক্ষে ৭৮৬টি ধর্ষণের ঘটনার অভিযোগ এসেছে, যা ২০২৪ সালের ৫১৬টি থেকে প্রায় ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৫৪৩ জন ধর্ষণের শিকার ছিলেন ১৮ বছরের কমবয়সী মেয়েরা। অর্থাৎ ধর্ষণের শিকার শিশু ও কন্যাশিশুর সংখ্যা বিপুল মাত্রায় বেড়েছে।

এ ঘটনাগুলো পুলিশে দায়েরকৃত মামলা, যার বাইরে আরো বহু ঘটনা অপ্রকাশিত থাকে সামাজিক কলঙ্ক, সাইবার হামলা ও অপরাধী ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ার কারণে। কিন্তু এ অপরাধের মাত্রা আমাদের সেই গ্ল্যামারভিত্তিক ‘একদিনের উদযাপন’ সংস্কৃতিতে কেন উঠে আসে না?

রাজনৈতিক ক্ষমতায় নারীরা অংশ নিচ্ছে কি? বাংলাদেশ বর্তমানে ৩৫০ সদস্যের সংসদে প্রায় মাত্র ১৬ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব পেয়েছে (এবার নির্বাচনে মোট সাতজন নারী সরাসরি নির্বাচিত ও ৫০টি সংরক্ষিত আসনসহ প্রায় ৫৭ জন)। আর সরাসরি নির্বাচিত নারীর সংখ্যা সরকারি নির্বাচনে মাত্র সাতজন (২ শতাংশেরও কম)। অথচ দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী।

এ বাস্তবতা, প্রতিদিনের ভয়ানক ধর্ষণ ও নির্যাতন এবং রাজনীতিতে নারীর সীমিত ক্ষমতা—এ দুটি মিলিয়ে আমার মনে হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ অনেক সময় শুধু মার্কেটিং, গ্ল্যামার, ফুল-ফানুস হয়ে গেছে।

সব অসাধারণ নারীদের প্রতি—আমি গর্বিত। কিন্তু আমার বিনীত মত—আমি সেই উদযাপনের অংশ হতে চাই না, যা আজকের নারীদের কঠিন বাস্তব থেকে আমাদের মনোযোগ সরিয়ে দেয়। নারীরা যখন মারা যাচ্ছে, যখন তারা তাদের মৃত সন্তানদের দাফন করছে, যখন তারা নির্যাতিত হচ্ছে—তখন আমি আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনে শুধু একদিনের জন্য পার্পল পরব না, যখন আকাশ এরই মধ্যেই রক্ত লাল!

আমি বাঁশি বাজাব না, যখন আমার গোষ্ঠী আগুনে পুড়ছে।

আমাদের উদযাপন সেদিন হবে, যেদিন নারীদের ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য, সহিংসতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই আর করতে হবে না।

শামারুহ মির্জা: মানবাধিকার কর্মী