কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চে এসে যখন পেছনে তাকাই, তখন একরাশ হতাশাও আমাদের গ্রাস করে। যে নারীরা পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে তাদের এক সূক্ষ্ম ও পরিকল্পিত প্রক্রিয়ায় পুনরায় গৃহবন্দি করার বা ‘ঘরে পাঠিয়ে দেয়ার’ এক রূঢ় বাস্তবতা আমরা লক্ষ করছি। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নারীর যে অবস্থান আজ তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই নারীবান্ধব নয়, বরং একে একটি চরম নারীবিদ্বেষী পরিস্থিতি হিসেবে অভিহিত করা যায়।
২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচন আমার দেখা অন্যতম হতাশাজনক একটি অধ্যায়, যেখানে নারীর অংশগ্রহণ ছিল নজিরবিহীনভাবে নিম্নমুখী। আমরা সেখানে দেখলাম, রাজনৈতিক দলগুলোয় নারীদের সক্রিয়তা থাকলেও নির্বাচনে প্রার্থী ও ভোটার উভয় ক্ষেত্রেই তাদের চরমভাবে প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে। বর্তমানে এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যেখানে নারীর যোগ্যতা নয়, বরং তার পোশাক, তার চলাফেরাকেই মুখ্য করে দেখা হচ্ছে। এটাই যেন নারীর মর্যাদার একমাত্র নির্দেশক।
সামাজিকভাবে নারীর মর্যাদা আজ যে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তার প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া পৈশাচিক ঘটনাগুলোয়। শিশু থেকে বৃদ্ধা এ দেশে কেউই এখন নিরাপদ নয়। এমনকি নিজের ঘরেও না। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে আমরা দেখেছি সীতাকুণ্ডে সাত বছরের শিশুর ওপর পাশবিক নির্যাতন এবং নরসিংদীতে বাবার সামনে থেকে জোর করে মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের মতো ভয়াবহ ঘটনা। এ পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র ও সমাজ নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেটে সাইবার বুলিংয়ের নতুন ভয়ংকরী রূপ। বিশেষ করে নারী প্রার্থীদের যেভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় কুরুচিপূর্ণ ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে, তা তাদের লড়াইকে আরো কঠিন করে তুলেছে। এমনকি রাষ্ট্রের শীর্ষ রাজনৈতিক পর্যায়ের ব্যক্তিত্বের পরিবারের সদস্যদের নিয়েও যেভাবে কুরুচিপূর্ণ আলোচনা হয়, সেটি অত্যন্ত হতাশাজনক। একজন কম বয়সী নারীকে অনলাইনে যেভাবে হেনস্তা হতে হয়েছে, এর বিপরীতে কোনো রাজনৈতিক দল, এমনকি সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এই যদি অবস্থা হয়, সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পরিবারের সদস্যকে এসবের মুখোমুখি হতে হলে সাধারণ মেয়েদের সঙ্গে কী রকম বুলিং-হয়রানি ঘটতে পারে সেটা অভাবনীয়।
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও বর্তমান সময়ের তরুণ নারীরা অনেক বেশি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর, অগ্রসর ও সচেতন। তারা জানে কোথায় কী ঘটছে এবং তাদের অধিকারগুলো কী। কিন্তু ব্যক্তিপর্যায়ে এ সচেতনতা যথেষ্ট নয়, যদি না রাষ্ট্র একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে সরকারের কাছে আমাদের স্পষ্ট দাবি—দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে পশ্চাৎপদ রেখে বা নিরাপত্তাহীনতায় রেখে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে অবশ্যই কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থলে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
মোশরেফা মিশু: সাধারণ সম্পাদক
গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি










