এ অগ্রগতির সম্পূর্ণ ক্রেডিট আমি নারীদের নিজস্ব লড়াইকে দেব। গত ৫৪ বছরে নারীর যতটুকু পথচলা, তার পেছনে রাষ্ট্রকাঠামো, সমাজ বা রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন সহযোগিতার কথা বলা হলেও বাস্তবে নারী নিজে সংগ্রাম না করলে এ পর্যন্ত আসা হতো না। তবে যদি প্রশ্ন করা হয় নারীর বর্তমান অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট কিনা, তবে এর উত্তর হলো আমি সন্তুষ্ট নই। জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা নারীরা ছাড়াও অসংখ্য মা-বোন ও সাধারণ নারী ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু সেই সামনের সারির যোদ্ধাদের আমরা স্বীকৃতি কতটুকু দিচ্ছি? জুলাই সনদে সংসদে ১০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণের যে অঙ্গীকার ছিল, সব রাজনৈতিক দল তার সঙ্গে নির্লজ্জভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এক্ষেত্রে এনসিপির একটা চেষ্টা ছিল, কিন্তু আমরা পুরোপুরি সফল নই, আংশিক সফল। আরো হতাশাজনক বিষয় হলো, এ বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কেউ জবাবদিহিতাও চায়নি। আমাদের যারা নারী অধিকারকর্মী আছেন তাদের কাছে নারীর রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়গুলোয় জবাবদিহিতা নিশ্চিতের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে নারীর সামাজিক আচার-আচরণ, নারী কী পোশাক পরবে, টিপ পরবে নাকি হিজাব পরবে; এ ধরনের বিষয়গুলো। এসব বিষয়ই বুঝিয়ে দিচ্ছে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ ও তাদের রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়গুলোয় আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি।

সদ্যসমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে একজন নারী প্রার্থী হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

নির্বাচনে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই হয়েছে। যেমন নির্বাচনে শারীরিক পরিশ্রম একটা বড় বিষয় ছিল এবং সহকর্মী বা সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন সংশয় ছিল— ‘মেয়ে মানুষ এত পরিশ্রম করতে পারবে কিনা।’ তৃণমূল রাজনীতির বাস্তবতায় একজন প্রবাসী হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়াও কঠিন ছিল। তবে পাঁচ-সাতদিনের মধ্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। নারী হিসেবেই আমি অভাবনীয় সাড়া পেয়েছি। বিশেষ করে সাভার-আশুলিয়ার সাধারণ নারীদের ভোট ও সমর্থন ছিল আমার শক্তির বড় জায়গা। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য, জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীরা আমার জন্য যেভাবে পরিশ্রম করেছেন, তা ছিল অভূতপূর্ব। তারা নিজেদের সবটুকু দিয়ে আমার পক্ষে কাজ করেছেন। এছাড়া ১১ দলীয় জোটের পুরুষ কর্মীরাও আমাকে প্রয়োজনীয় সবধরনের সহযোগিতা করেছেন। নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা বললে, অনলাইনে আমাকে ভয়াবহ ট্রলের শিকার হতে হয়েছে। ট্রলটা কোনো মৌলবাদী গোষ্ঠী করেনি, করেছে তথাকথিত ‘প্রগতিশীল’ মহল। যেহেতু আমার অধিকাংশ প্রচারণাকারী ছিলেন আলেম-ওলামা, তাই তাদের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকে আমি মাথায় ওড়না দিতাম। এই ওড়না পরা নিয়েই প্রগতিশীলরা আমাকে আক্রমণ করেছেন। অথচ তারা এটা বিবেচনা করেননি যে হাজার হাজার পুরুষের সামনে একজন নারী নেত্রী হিসেবে আমার নেতৃত্ব দেয়া এবং যাদের সম্পর্কে বলা হয় যে তারা নারী নেতৃত্ব সমর্থন করেন না; তাদেরও আমাকে নেতা হিসেবে সমর্থন করা নারী নেতৃত্বের জন্য কত শক্তিশালী একটা অর্জন। তারা নারীর পোশাকের মধ্যে নিজেদের চিন্তাভাবনাকে আটকে ফেলেছেন, নারীর অধিকার নিশ্চিতের মৌলিক প্রশ্নে নয়।

নির্বাচনী প্রচারণায় নারী ভোটারদের কাছ থেকে কী ধরনের প্রত্যাশা ও অভিযোগ সবচেয়ে বেশি শুনেছেন? বিরোধী দলের একজন হিসেবে এ প্রত্যাশা পূরণ বা অভিযোগ সমাধানে কী করতে চান?

​সাভার-আশুলিয়া শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় নারী ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ ছিল নিরাপত্তা। সন্ধ্যার পর গার্মেন্টস কর্মীরা ছিনতাইয়ের শিকার হন। আমার ইশতাহারে রাস্তার পাশে পর্যাপ্ত লাইট ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের প্রতিশ্রুতি ছিল। এছাড়া মায়েরা অভিযোগ করেছেন যে স্কুল ও মাদ্রাসার সামনে ময়লার ডাম্পিং জোন করা হয়েছে, যার দুর্গন্ধে বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না। এর বাইরে সর্বজনীন অভিযোগ ছিল ফুটপাতে দোকান ও চাঁদাবাজি। আমি বিজয়ী না হলেও এসব বিষয় বর্তমান এমপির কাছে উত্থাপন করেছি। এরই মধ্যে দেখেছি তিনি আমার ইশতাহারের বিষয়গুলো নিজের বক্তব্যে নিয়ে আসছেন, যা আমি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। তিনি এগুলো বাস্তবায়ন করলে তো ভালো বিষয়। আর না করলে বিরোধী হিসেবে আমাদের দল এনসিপি মাঠ পর্যায়ে নারীদের এসব অধিকার আদায়ের দাবিগুলো নিয়ে সোচ্চার থাকবে।

​ দেশে নারী সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থতার পেছনে কোন বিষয়গুলো দায়ী এবং করণীয় কী?

​নারীর প্রতি সহিংসতার সঙ্গে সরাসরি ক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে। একে আমি বলি ক্ষমতার রাজনীতি। বিশেষ করে প্রতিটি নির্বাচনের পরই তৃণমূল পর্যায়ে একদল মানুষের মধ্যে এমন বোধ কাজ করে যে ‘আমি ক্ষমতায় আছি, আমাকে কে ধরবে।’ এ চিন্তাভাবনাই ধর্ষণ ও সহিংসতাকে উসকে দেয়। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের এ ক্ষমতার রাজনীতির সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে না পারে, তবে শুধু সামাজিক সচেতনতা দিয়ে এটি আটকানো সম্ভব নয়। ধর্ষণের মতো অপরাধকে তারা রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে মামুলি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। এছাড়া আরেকটি সমস্যা হলো বিচার প্রক্রিয়ায় ৮৯-৯০ শতাংশ মামলায় সমঝোতা বা চাপের মুখে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করা হয়। তাই সবার আগে ক্ষমতার এ দম্ভ ভাঙতে হবে এবং আইনের শাসনকে কার্যকরী করতে হবে।

​নাগরিক হিসেবে নারীর অধিকার নিশ্চিত ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত?

আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ‘টিপ না হিজাব’-এর মতো সস্তা বিতর্ক থেকে বের করে আনতে হবে। শহুরে এলিট নারীবাদীরা নারীর সমস্যাকে কেবল সামাজিক বা পারিবারিক সমস্যার মধ্যে আটকে রেখে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছেন। অথচ এটি একটি নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় অধিকারের প্রশ্ন। জুলাই সনদের ১০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ৫০টি সংরক্ষিত আসন নয়, পার্লামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় নারীদের অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমার প্রত্যাশা থাকবে, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি কার্যক্রমে নারীদের তারা যেন প্রমোট করে। নির্বাচনগুলোয় যেন জুলাই সনদ অনুযায়ী নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। আর সরকারকে রাষ্ট্রকে নাগরিকের জন্য দেয়া প্রতিশ্রুতি পালন করতে হবে। নিজ গৃহ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায় সর্বত্র যাতে নাগরিক হিসেবে নারী তার অধিকার পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য নারীর সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাগুলো যথাযথভাবে অনুধাবন করতে হবে। যতক্ষণ আমরা নারীর সমস্যাকে শুধু সামাজিক আচরণ বা পারিবারিক সমস্যা হিসেবে দেখব, ততক্ষণ রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আমরা শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারব না।