আগামীতেও নারীদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে লড়াই করতে হবে। শুধু একটি দিনকে নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে সভা-সেমিনার করাটা আমার কাছে যথেষ্ট বলে মনে হয় না। নারীদের উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে রাজনীতিতে যদি তাদের এগিয়ে আনতে হয়, তাহলে রাজনৈতিক পরিবেশটাও ঠিক করতে হবে।

রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে অনেক শিক্ষিত, ভদ্র, রুচিশীল ও মার্জিত নারীরা এ জায়গায় আসতে চায় না। এ অনীহার একটি কারণ তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রোপাগান্ডা-হয়রানির শিকার হতে হয়। সবাই মনে করে মেয়েদের ওপর দোষারোপ করাটা খুব সহজ। সুতরাং, কেবল নারী দিবস পালন নয়, বরং নারীর অধিকার নিয়ে আমরা কাজ করব সেটাই আমাদের মূল প্রতিপাদ্য।

রাজনীতির মাঠে নারীরা অতীতেও সক্রিয় ছিল, বর্তমানেও আছে। জাতীয় সংসদে সরাসরি নির্বাচিত হয়ে আসার পাশাপাশি সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমেও নারীরা ভূমিকা রেখে চলেছেন। বিগত নির্বাচনে অন্তত ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেয়ার চেষ্টা বিএনপির পক্ষ থেকে করা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনটা তো ভোটের বিষয়। সেখানে শুধু মনোনয়ন দিলেই হবে না, তাদের পাস করে আসার মতো দক্ষ হতে হবে। সে জায়গা থেকে হয়তো পুরোটা দেয়া সম্ভব হয়নি। তার পরও বিএনপি থেকে এবারের নির্বাচনে প্রায় নয়জনকে মনোনয়ন দিয়েছিল। কিন্তু জামায়াতে ইসলাম বা অন্যান্য কয়েকটি দল কোনো নারীকে মনোনয়ন দেয়নি। এনসিপি থেকে কয়েকজন নারী অংশগ্রহণ নিয়েছিল। সুতরাং নারীরা রাজনীতিতে আছে ঠিকই, কিন্তু ভোটের যে রাজনীতি, সেখানে আসলে নারীরা একটু পিছিয়ে আছে।

ভোটের রাজনীতিতে পিছিয়ে থাকার কারণ হলো নারীদের পুরুষদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে কিছু প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। গ্রামাঞ্চলের রাজনীতির বহুলাংশে পুরুষকেন্দ্রিক। সেখানে কিন্তু নারীরা ঘর থেকে সহজে বের হয়ে আসে না বা যথেষ্ট পরিমাণে রাজনীতিতে অংশ নেয় না। একজন নারী যখন সংসদ সদস্য প্রার্থী হন, তখন তাকে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে পুরুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়, যা প্রকৃত অর্থেই তাদের জন্য একটা খুব কঠিন একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

তবে ভোটের রাজনীতিতে নারীদের আর্থিক সংকটে ভুগতে হয়, এমন কথা আমি বলব না। নির্বাচন করতে গেলে প্রয়োজনীয় অর্থকড়ি হয়তো জোগাড়ও হয়ে যায়। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে একজন পুরুষ যত সহজে একটি চায়ের দোকানে বসে চা খেতে পারবেন বা বাজারে গিয়ে মানুষের সঙ্গে যেভাবে করমর্দন করতে পারবেন, একজন নারী তা পারবেন না। যদিও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীরাও অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু সেখানে নারীর বিরুদ্ধে নারীদের নির্বাচন হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি হয় না বলে সেখানে স্থানীয় সরকারের তুলনায় নারী জনপ্রতিনিধির সংখ্যা থাকে কম।

নারীরা সর্বত্রই আছেন। তারা নিজেদের যোগ্যতায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পৌঁছে যাচ্ছেন। কিন্তু সেটা প্রশাসনের ক্ষেত্রে। রাজনীতির ক্ষেত্রটা আসলে আলাদা। এখানে তো আসলে কোনো বিশেষ শ্রেণী না, সব ধরনের সব শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়।

এবারের নির্বাচনে আমরা এলাকায় নারীদের ওপর অনেক বেশি ফোকাস করেছি। তাদের ঘিরে বেশকিছু বিশেষ কর্মসূচিও ছিল। বিপণিবিতানগুলোয় গিয়ে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। একটি বিষয় উল্লেখ করতে হবে, গ্রামাঞ্চলের নারীরা রাজনীতি করা দূরের কথা, তারা তো ভোট কেন্দ্রে আসতেই আগ্রহ পাচ্ছিল না। সেজন্য আসলে তাদের নির্বাচন ও ভোট কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে অনুপ্রাণিত করা দরকার।

তাহসিনা রুশদীর লুনা: সংসদ সদস্য, সিলেট-২