এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে সহনশীলতা অবলম্বন করতে হবে। নারীর মর্যাদাকে নিজেদের কথা ও আচরণে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা এখানে অনেক বড় একটি প্রশ্ন। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বহু আগেই যে প্রশ্নটি আসে তা হলো নারীর রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের অধিকার। বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি, অন্য পক্ষকে ভোট দেয়ার কারণে এক পক্ষ নারীর ওপর আক্রমণ করেছে। ২০২৬-এর সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রচারণায় বের হয়েও বাংলাদেশের শহর, এমনকি গ্রামের নারীদের সহিংসতার শিকার হতে হয়েছে। শুধু তা-ই না, এসব দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের নারীদের রাজনৈতিক চেতনার ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।
এ সংকটগুলোর সমাধানে দলগুলোর করণীয় কী?
এসব সংকটের সমাধানে রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা প্রয়োজন। দলগুলোকে নারীর প্রতি আচরণে শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। দল থেকেই নারীকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন, দক্ষ ও যোগ্য হওয়ার প্রশিক্ষণ দেয়ার চর্চা শুরু করতে হবে। সর্বোপরি নারী যে দলেরই হোক না কেন, তার প্রতি যেকোনো পর্যায়ের অবমাননাকারীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
জামায়াতের রাজনীতিতে নারীদের অবস্থান কেমন?
জামায়াতে ইসলামীর ‘মহিলা বিভাগ’ একটি স্বতন্ত্র অংশ হিসেবে কাজ করে। আমিরে জামায়াতের অধীনে মহিলা ও পুরুষ বিভাগ দুটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র বিভাগ। এর মধ্যে মহিলা বিভাগে প্রতিটি পর্যায়ে পৃথক শূরা (পরামর্শ সভা), নির্বাহী ও সেক্রেটারিয়েট থাকে। সব আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম আলাদাভাবে অনুষ্ঠিত হয়। মহিলা বিভাগের সব সিদ্ধান্ত মহিলা শুরার পক্ষ থেকে নেয়া হয়। বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয় করার জন্য মহিলা ও পুরুষ বিভাগের নির্ধারিত প্রতিনিধিরা আলাপ করেন এবং পারস্পরিক পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত নেন। সব পর্যায়ে মহিলা বিভাগ আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত নিলেও সংশ্লিষ্ট আমিরকে অবহিত করতে হয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমিরের। তবে তিনি সাধারণত মহিলা বিভাগের মতামতকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, যেহেতু মহিলা বিভাগও আমিরের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়।
নারী দিবসে রাজনীতিবিদদের কী প্রত্যাশা এবং রাজনীতিবিদ হিসেবে কী করণীয় রয়েছে?
ইসলাম নারীকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক যে মর্যাদা দিয়েছে এবং বাংলাদেশে আইনও যা নিশ্চিত করে, তার সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠা দরকার। এজন্য সবার সদিচ্ছা প্রয়োজন। ইসলামের রাজনৈতিক মতাদর্শকে অনুসরণ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সব দল-মত-শ্রেণীর নারী-পুরুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত। কোনো রকম ইসলাম বিদ্বেষের শিকার হয়ে জামায়াত এ কাজ থেকে বিরত থাকবে না। সরকার এবং সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা ও সহনশীলতা এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকেই মনে করেন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে নারীর নেতৃত্বের সুযোগ সীমিত। এ ধারণাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করেন? বাস্তবে আপনার অভিজ্ঞতা কী বলছে?
এ ধারণা একেবারে ভিত্তিহীন নয়। বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কেবল ধর্মশিক্ষায় সীমিত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ব্যতিক্রম। জামায়াত তার সুবিশাল নারী জনশক্তিকে যথাযথ ধর্মীয় প্রশিক্ষণ দেয়, রাজনীতির বিষয়ে সচেতন করে এবং স্বতন্ত্রভাবে সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে এর পরবর্তী প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জামায়াতের নারীরা বাংলাদেশের ঘরে ঘরে গেছেন। এ বিপুলসংখ্যক নারী তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিদআত অর্থাৎ ধর্মীয় বিচ্যুতি থেকে মুসলিম পরিবারগুলোকে সতর্ক করা, কোরআন পড়া শেখানো, সাধারণ (মাদ্রাসা নয় এমন) শিক্ষায় শিক্ষিত নারীদের শরিয়তের হালাল-হারাম বিষয়ে শেখানো ও অনুশীলনে সহযোগিতা করা, সন্তান লালন-পালনের নানা দিক সম্পর্কে শেখানো ইত্যাদি কাজ করে আসছেন। মহিলা বিভাগ স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার কারণে, বিভিন্ন পেশাজীবী বিভাগসহ আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অডিট, প্রকাশনা বের করা ও সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণ, নারী সমাবেশ আয়োজন ইত্যাদি অত্যন্ত যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করে আসছে। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় নিরাপত্তা ও যথাযথ পর্দা সহযোগে এসব কাজে অংশগ্রহণ সম্ভব এবং প্রয়োজনীয়—বিষয়টি এখানে প্রমাণিত হয়।
কর্মক্ষেত্রে সমান মজুরি, নিরাপদ পরিবেশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ—এ তিনটি ইস্যুতে আপনার দল কী ধরনের নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছে?
জামায়াতের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি নাগরিকের জন্য মর্যাদার সমতা প্রতিষ্ঠা। নারী কেবল কর্মক্ষেত্রে সমান মজুরিরই হকদার নন, বরং তার জন্য নারীবান্ধব ও নিরাপদ কর্মক্ষেত্র এবং পরিবহনের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শুধু তা-ই নয়, একজন নারী বা শিশু যেন নিজ ঘর, পরিবার ও সমাজে নিরাপদ থাকে, এর যেকোনো ব্যত্যয় ঘটলে সে ব্যাপারে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। এক্ষেত্রে জামায়াত নীতিগতভাবে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখাতে আগ্রহী নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজন নারীর পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। এ বিষয়ে জামায়াত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, আল্লাহর দেয়া সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার, তথা উত্তরাধিকার, বিবাহের কাবিন এবং নিজের আয়ে নিজের অধিকার নিয়ে যে বিধান রয়েছে, তার সঠিক বাস্তবায়নই এ মর্যাদা আদায়ে নারীকে এগিয়ে নিয়ে যায়। জামায়াত এ অধিকার আদায়ে নারীর পাশে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতাকে পৌঁছে দেয়াকে বাস্তবায়ন করতে চায়।
গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর কী ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠন—সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রথমত, নারীদের জন্য বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ (যেমন কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কারুশিল্প, প্রযুক্তি ব্যবহার ইত্যাদি) সহজলভ্য করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সুদমুক্ত বা স্বল্পসুদে ক্ষুদ্র অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে নারীরা নিজের উদ্যোগ শুরু করতে পারেন। তৃতীয়ত, নারীদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য স্থানীয় ও অনলাইন বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি নিরাপদ যাতায়াত, শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার সুবিধা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক বেড়ে যাবে। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হবে এসব বিষয়কে নীতিগত অগ্রাধিকার দেয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব গড়ে তুলে তাদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা। এতে গ্রামীণ নারীরা শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও আরো আত্মবিশ্বাসী ও সক্ষম হয়ে উঠবেন।










