একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ক্ষমতা কাঠামো যখন একজন পুরুষের সত্য কথা থামিয়ে দিতে চায়, তখন তাকে বলা হবে দুর্নীতিবাজ। কিন্তু নারীর বেলায় তখন তার চরিত্র নিয়ে বাজে কথা বলা হবে। সেটা ৫ আগস্টের আগে যেমন ছিল, পরেও তেমন ছিল। তবে ৫ আগস্টের আগে আমাকে নারী হিসেবে এর পাশাপাশি অন্যান্য সমস্যারও সম্মুখীন হতে হয়েছে।
৫ আগস্টের পর কি কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?
হ্যাঁ, পরিবর্তন কিছু হয়েছে। আগে সাংবাদিক হিসেবে নানা সমস্যা মোকাবেলা করেছি। যেমন কোন নিউজটা করা যাবে, কোনটা করা যাবে না। সেটাও বিশেষ জায়গা থেকে নানা বিধিনিষেধ থাকত। জীবনের হুমকিও ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পরের হুমকিগুলো ছিল অন্যরকম। সেটা অনলাইনে বিশেষ মহলের পরিচালিত নানা ধরনের ট্যাগিং রাজনীতি। কখনো ইসলামবিদ্বেষী, কখনো কারো দালাল ট্যাগ দিয়ে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এই যে কিছুদিন আগে একটি বাচ্চা মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হলো। কী ভয়ানক ঘটনা! এখন আমি তার জন্য কাঁদব, নাকি আমাকে যে অনলাইনে হেনস্তা করা হচ্ছে সেটা মোকাবেলা করব? মূলত ৫ আগস্টের পর অবস্থা এমন হয়েছে যে আপনি নিজেকে বাঁচাবেন? নাকি আপনার লড়াই জারি রাখবেন? আপনাকে সেই দ্বিধার মধ্যে পড়ে যেতে হবে।
অভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে নারীদের অবস্থান কেমন দেখছেন?
শুধু ৫ আগস্ট নয়, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ যেকোনো আন্দোলনের সময় নারীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন আসে না। কিন্তু যখন নির্বাচন আসে, তখন নারীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন আসে, যোগ্যতার প্রশ্ন সামনে আসে। এটা হচ্ছে মূল সংকট। নারীদের বায়োলজিক্যাল সত্তাকে সামনে এনে ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হয়। এ চিন্তায় পরিবর্তন আনতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপির কাছে আশা করেছিলাম যে তারা আরো বেশি সংখ্যক নারীকে মনোনয়ন দেবে। আগামীতে তারা সেটি করবে বলে আশা করছি।
আর জামায়াতের ক্ষেত্রে বিষয়টি একদম বিপরীত। কিছুদিন আগেও টকশোতে আনার জন্য তাদের একজন নারীকেও পাইনি। তাদের নেতাদের মুখে শুনি, জামায়াতে সদস্যদের প্রায় অর্ধেক নারী। তবে সম্প্রতি কয়েকজনকে পেয়েছি যারা জামায়াতের নারীবিষয়ক অবস্থান নিয়ে কথা বলছেন। তারা নিজেরাও জানেন তারা কখনো আমির বা প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। অর্থাৎ নারী অধিকার বিষয়ে তাদের চিন্তা অস্পষ্ট।
এনসিপি থেকে কি নারীরা ছিটকে গেলেন?
আমি বলব, ছিটকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল বলেই তারা ছিটকে গেছেন। তাদের মধ্যে এমন কয়েকজন নারী নেত্রী ছিলেন, গণতান্ত্রিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাদের স্পষ্ট অবস্থান ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নারী বিষয়ে তাদের জোটের অবস্থানেরই প্রতিফলন দেখা গেছে। ভোটের জন্য শরিক দলগুলোর মতামতকেও আমলে নিতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই যেসব নেত্রী নারীর গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলেন, তারা তো সেই জোটে থাকতে পারবেন না। তবে আমি চাই, তারা যেন রাজনীতি থেকে সরে না যান।
অর্থনীতিতে নারীদের ভূমিকা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
অর্থনীতিতে নারীদের অবদান অনেক বেশি। অর্থনীতির পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রে নারীদের যে ভূমিকা আছে, সেটা যদি স্বীকার করা না হয়, তাহলে সেটা আর বাড়বে না। বরং পিছিয়ে যেতে পারে। আমি মনে করি, নারীর স্বাধীনতার বিষয়ে শুধু আইন থাকলেই হবে না। এক্ষেত্রে সমাজ বা মানুষের মানসিকতাটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। এ পরিবর্তনটা পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। এখানে রাজনৈতিক নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা যদি বলেন, নারীকে ঘরে থাকতে হবে, তাহলে পরিবর্তনটা হবে না।
নারীরা গৃহে যে সময়টুকু দিচ্ছেন, সেটা কিন্তু হিসাব করা হচ্ছে না। সেটা যদি গণনা করা হতো, তাহলে অর্থনীতিতে নারীরা কতটুকু ভ্যালু যুক্ত করে, সেটা আমরা জানতে পারতাম। আশা করছি, ভবিষ্যতে সেটা পাব।
আগামী দিনে সামগ্রিক ক্ষেত্রে নারীদের অবস্থান কেমন হবে?
৫ আগস্টের পর আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম যে নারী-পুরুষ বৈষম্যের বিলোপ ঘটবে। কিন্তু সেটা ঘটেনি। বরং বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সমাজে নারীদের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি আছে, সেটার পরিবর্তন করতে হবে। আগামীতে সেটা ঘটবে বলে আশা করছি।
সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, নারী অধিকারের বিষয়ে নারীকেই সচেতন থাকতে হবে। তা না হলে আমরা আমাদের অধিকার কখনই প্রতিষ্ঠা করতে পারব না। তাছাড়া নারীদের সচেতন করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রও ভূমিকা পালন করতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু বয়স থেকেই তাদের অধিকারবিষয়ক শিক্ষা দেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে।
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সরকার কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে?
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলকেও বড় ভূমিকা রাখতে হবে। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে সেটির মূল উদ্ঘাটন করে এমনভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর না ঘটে। সেটিকে যেন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা না হয়। তাছাড়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।










