ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুর দিকেই জুলাই অভ্যুত্থানের মতো ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। আমার কাছে এ রকম পরিস্থিতি একেবারেই নতুন ছিল। যারা ১০-১২ বছর ধরে কাজ করছেন, তারাও বলেছেন এ সময়টা ভয়ংকর ছিল। সে জায়গা থেকে কাজে ঝুঁকি তো অবশ্যই ছিল। পাশাপাশি পরিবারকে বোঝানো, নিজের বাসায় ফেরাও একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। যেহেতু আমি ফটো সাংবাদিক, আন্দোলনে ছবি তুলতে গিয়ে প্রশাসন, সরকারদলীয় লোক এমনকি আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকেও চাপের সম্মুখীন হয়েছি। সবাইকে বারবার বোঝাতে হয়েছে কেন ছবি তুলছি, কোথায় ছাপানো হবে, আমি কোন পক্ষ ইত্যাদি। এসব উত্তর দিতে দিতে একসময় ক্লান্ত লেগেছে। অনেক দিন বাসায় ফিরতে পারিনি। এখানে ওখানে থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছি।

জুলাই আন্দোলন তো মূলত কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল, আমি শুরুর দিক থেকেই এ আন্দোলনের ছবি তোলা শুরু করি। ২০১৮ সালের সঙ্গে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের কিছু পার্থক্য বারবার আমার চোখে পড়ছিল। মূলত, ২০১৮ সালে আমিও শিক্ষার্থী ছিলাম, আর এবারের আন্দোলন আমি দেখছিলাম পেশাদারত্বের জায়গা থেকে।

১৬ জুলাই পর্যন্ত আন্দোলন যে ধারায় প্রবাহিত হয়েছে, ১৭ জুলাই থেকে তা পরিবর্তন হতে শুরু করে। ১৭ জুলাই পর্যন্ত নারীদের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের চোখে-মুখে সাহস, স্লোগান এসব আমি খুব অবাক হয়ে দেখছিলাম। এসব কারণেই ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের চেয়ে ২০২৪-এর আন্দোলন আমার কাছে অন্যরকম লাগছিল। এবার নারীদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করার মতো।

১৭ জুলাইয়ের পর নানা ঘটনা ঘটতে থাকল, কারফিউ জারি করা হলো। তখন নারীদের সংখ্যা একটু কমে গিয়েছিল। কারফিউর পর আবার যখন সবাই রাজপথে ফিরল তখন দেখা গেল মেয়েরাও আছে। তারা ‘সেফ গার্ড’ হিসেবে আছে, যাতে তাদের বন্ধু-সহপাঠীদের বাঁচানো যায়।

একটা ঘটনার ছবি আপনারা সবাই কম-বেশি দেখেছেন—হাইকোর্টে যেদিন এক শিক্ষার্থীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন একজন নারী শিক্ষার্থী পুলিশের প্রিজন ভ্যান দুই হাতে আটকে রেখেছিল। তখন তার চোখে যে রাগ-ক্ষোভ ও জেদ ছিল তা দেখে আমি ছবি তোলার কথাও ভুলে গিয়েছিলাম। যদিও ছবি তোলাটাই আমার কাজ কিন্তু আমি কিছু সময়ের জন্য থেমে সে দৃশ্যটা আগে দেখেছি। তখন আমার মনে হয়েছে এটাকেই বোধহয় অভ্যুত্থান বলে। আমি আরো একটা খবর পেয়েছিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের। সেখানকার নারী শিক্ষার্থীদের ভিসির বাসা থেকে নিরাপদে বের হওয়ার প্রস্তাব দেয়া হলে তারা সেটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, ‘যেতে হলে শুধু আমরা না, সবাই যাব। আমাদের ছেলে সহপাঠীরাও যাবে। নাহলে আমরা কেউ যাব না।’

আন্দোলনের সব জায়গায়ই নারীদের ভূমিকা ছিল খুবই সক্রিয় কিন্তু পরবর্তী সময়ে এসে আন্দোলনে প্রায় প্রতিদিন যাদের দেখেছিলাম তাদেরও কেন যেন আর দেখা যাচ্ছে না। সবাই কেন যেন একটা নারীবিদ্বেষী মনোভাবে চলে গেল। কিন্তু সংস্কার কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আমরা নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে আশাবাদী ছিলাম। আশাবাদী ছিলাম যেকোনো জায়গায় যে নারীদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন পড়ে সেটা হয়তো এক্ষেত্রে বাস্তবায়ন হবে। সে রকম আশানুরূপ কিছু আমরা দেখতে পাচ্ছি না। তেজী ও সাহসী নারীরা কেন নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন সেটাই প্রশ্ন। এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশসহ অনেক কারণই থাকতে পারে। কিন্তু প্রকৃত কারণ বের করা গেলেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব।