আমি একজন পেশাদার ভিজুয়াল আর্টিস্ট। তবে আন্দোলনে নিজেকে শিল্পী হিসেবে হাজির না করে প্রথমে একজন মানুষ হিসেবে সামনে রেখেছিলাম। আন্দোলন যখন মজলুমের-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করল, তখন থেকেই একজন সক্রিয় আন্দোলনকারী হিসেবে রাস্তায় ছিলাম, সবার সঙ্গে শামিল ছিলাম শহরের নানা জায়গায়। সময়গুলোয় কখনো আমার ক্যামেরা ছিল, আবার কখনো ছিল না, ছিল মুঠোফোন। সেটার মাধ্যমেই তখন নানা ছবি কিংবা ভিডিও ধারণ করেছি। এ ধারণের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ছিল না; ব্যক্তিগত জায়গা থেকে ইতিহাসকে খানিকটা প্রসারিত করতে এবং বিশেষভাবে সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গণসচেতনতা আরো বিস্তৃত করতেই ধারণ করেছিলাম।
জুলাই অভ্যুত্থানে নারী ও অন্যান্য লিঙ্গের শিল্পীদের ভূমিকা নিঃসন্দেহে উজ্জ্বল ও অনস্বীকার্য। যে যার নিজস্ব মাধ্যম থেকে আন্দোলনকে গভীরতা ও পরিপূর্ণতা দিয়েছেন, ইতিহাস তাদের ভূমিকা স্মরণ করবে। রাস্তায়, ঘরে কিংবা কম্পিউটারের পর্দায় তাদের সম্পৃক্ততা আন্দোলনকে গতি দিয়েছে। নারী শহীদদের রক্তের ত্যাগ আমাদের এক স্রোতে বেঁধে ফেলেছে, এক শপথে সংযুক্ত করেছে। আমি বিশ্বাস করি, এ শপথ, এ রোধ বাংলার নারী ও অন্যান্য লিঙ্গের মানুষকে মুক্তির পথে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে। গেঁথে রাখবে শহীদদের রক্তের ত্যাগকে সম্মানের শেকড়ে।
হাসিনার স্বৈরশাসনের পতনের যে আন্দোলন অভ্যুত্থানে রূপ নিল, সেখানে নারী ও অন্যান্য লিঙ্গের মানুষের অবদান কেবল গুরুত্বপূর্ণই ছিল না, তাদের সাহসই রাস্তাকে গড়ে দিয়েছিল অভ্যুত্থানের পূর্ণতা। শুধু অভ্যুত্থান নয়, এ ভূখণ্ডের প্রতিটি আন্দোলনে তাদের সম্পৃক্ততা বারবার প্রমাণ করেছে তাদের অগ্রণী ভূমিকা। অথচ প্রতিবারের মতোই তাদের অবদানকে পিতৃতান্ত্রিক আখ্যানের ছদ্মবর্ণনায় আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবু নারী ও অন্যান্য লিঙ্গের মানুষের প্রতিরোধ থেমে থাকেনি, তাদের কণ্ঠস্বর কখনো নীরব হয়নি। তবে রাষ্ট্র যদি এ পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকেই প্রতিষ্ঠিত করে রাখে, তবে কীভাবে তা বহুত্বকে ধারণ করবে? কীভাবে রচনা করবে এক নতুন বাংলাদেশ? সে নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
তারপরও সত্যি বলতে, আন্দোলনের পর তেমন কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আমি লক্ষ করিনি। বরং যুগের নানা পরতে আমি দেখেছি কীভাবে এ অভ্যুত্থানকে পিতৃতান্ত্রিক আখ্যানের কাঠামোয় রূপ দেয়া হচ্ছে। আমি প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করেছি, কীভাবে শুধু শিল্পী নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা নারী ও অন্যান্য লিঙ্গের মানুষকে সামনে থেকে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। কখনো পুরুষতান্ত্রিক স্টেকহোল্ডারদের ষড়যন্ত্রে, কখনো প্রকাশ্য বঞ্চনার মাধ্যমে। উল্টো নারীদের প্রতি সহিংসতা যে হারে বাড়ছে, তাতে আমি আরো শঙ্কিত হয়ে পড়েছি। তবু আমি পুরোপুরি হতাশ হতে চাই না। আমি বিশ্বাস করতে চাই, নতুন বাংলাদেশে এসব বৈষম্য একদিন ভেঙে পড়বে। এ ভাঙনের জন্য সাহসী নারী নেতৃত্ব যেমন রয়েছে, তেমনই তারা নিরলসভাবে কাজও করে যাচ্ছে।
আমার জন্য অভ্যুত্থানের প্রতিটি দিন, রাত, প্রতিটি মুহূর্ত সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়েছে জুলাই থেকে আগস্টের ৫ তারিখ পর্যন্ত সময় যেন একরকম মনে হচ্ছিল, একই বৃত্তে ঘুরছি, একই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। কখনো মনে হয়নি থেমে যেতে হবে। পুরো সময় মনে হয়েছিল এর শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা সবাই আছি এবং থাকব। অভ্যুত্থানে আমার মুঠোফোনে নানা মুহূর্ত ধারণ করেছি, কিন্তু ১৯ জুলাই নিজের সামনে লাশের স্তূপের এক দৃশ্য দেখেছিলাম উত্তর বাড্ডার এএমজেড হাসপাতালে। সেদিন সে দৃশ্য ধারণ করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম। শরীর যেন ঠাণ্ডায় জমে গিয়েছিল, মনে হচ্ছিল এক লাশের স্তূপের ওপর দিনগুলো পার করছি। সে বিকালের দৃশ্য আমাকে আরো জোর গতিতে বারবার রাস্তায় ফিরতে বাধ্য করেছিল, বাধ্য করেছিল স্বৈরশাসনের পতন নিশ্চিত না করা পর্যন্ত নিজেকে এবং আশপাশের মানুষকে সাহস জুগিয়ে অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত দিনের দিকে এগিয়ে নিতে।
শুরু থেকেই বলে আসছি বাংলার নারীদের এবং অন্যান্য লিঙ্গের মানুষের ইতিহাস প্রতিরোধের ইতিহাস, প্রতিবাদের ইতিহাস, আত্মত্যাগের ইতিহাস। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় সে ইতিহাস কখনই গণমানুষের পরিসরে হাজির হতে দেয়া হয়নি। বরং, রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা বারবার নারী ও অন্যান্য লিঙ্গের মানুষের প্রতি আরো সহিংস হয়ে উঠেছে। অথচ আমরা দেখেছি, রাষ্ট্র কখনই এ সহিংসতা রোধে কাজ করে না। রাষ্ট্রের কাছে এ সহিংসতা যেন ‘গৌণ বিষয়’। আমার আফসোস বাংলাদেশ রাষ্ট্র কখনই মানবিক হয়ে উঠতে পারেনি; বরং বিভিন্ন সময়ে এ সহিংসতাকে উসকে দিয়েছে, অপরাধীদের রক্ষা করার জন্য ক্ষমতার আশ্রয় দিয়েছে।
আমি শুধু একজন নারী শিল্পী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে চাই নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠুক সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। জনগণই যেন হয় ক্ষমতার প্রকৃত অধিকারী, জনগণই যেন বহুত্বের ধারণাকে ধারণ করে। তবে এমন বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের সবাইকে সব বিভাজন অতিক্রম করে একসঙ্গে কাজ করে যেতে হবে। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ চলুক, যতদিন না এ স্বপ্ন বাস্তবে রূপান্তর না হয়। সে প্রত্যাশাই রইল।










