জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিল্পীদের আলাদা করে দেখার আসলে কিছু নেই। তারা আপামর জনসাধারণেরই অংশ। একজন মানুষ হিসেবেই এ অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করা দায়িত্ব ছিল তাদের। তার পরও বলতে হয় শিল্পীদের দায়বদ্ধতা আরো বেশি। কারণ শিল্প জ্ঞানকাণ্ডের অংশ। যারা জ্ঞানের চর্চা করে, সামাজিকভাবে তাদের একটু অগ্রসরই ধরা হয়। সে জায়গা থেকে শিল্পীদের অংশগ্রহণ আমি মনে করি, আরো বেশি হওয়া দরকার ছিল। তার পরও যে অংশগ্রহণটা হয়েছে তা একেবারে খারাপও না। যেমন গণহত্যা ও নিপীড়নবিরোধী সমাজের ব্যানারে যে কর্মসূচিগুলো হয়েছে, সেগুলো খুবই বৈপ্লবিক ছিল। এ ব্যানারে ফটোগ্রাফি, অভিনয়, চিত্রশিল্প নানা খাতের শিল্পীরা ছিলেন। বৃষ্টিতে ছাতা নিয়ে তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার পরও তাদের চোখে যে তেজ, দাবি আদায়ের যে স্পৃহা ছিল তা অনেক বেশি জোরালো ছিল। তখন মনে হচ্ছিল, আসলে সম্মিলিত শক্তি অনেক বড় ব্যাপার।
আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এ আন্দোলনে নারীরা পুরুষের তুলনায় কোনো অংশেই কম ছিলেন না। যদিও শিল্পী তো শিল্পীই। তবু আলাদা করে যদি বলতে হয় তাহলে বলব, নারী শিল্পীদেরও অংশগ্রহণ অনেক বেশি ছিল। অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে নারী বরাবরই সামনে চলে আসে। ছাত্রী, সদ্য পাস করে বের হওয়া নারী শিল্পী, ক্যারিয়ারের মাঝামাঝিতে থাকা নারী শিল্পীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল এ জুলাই অভ্যুত্থানে। বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে শিল্পীরা পারফরম্যান্স করেছেন, ছবি এঁকেছেন, গ্রাফিতি করেছেন। আমি এমন অনেক নারী শিল্পীকে চিনি, যারা আবার পেছনে থেকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
যেকোনো আন্দোলনে নাগরিক হিসেবে নারীরা বরাবরই আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে এসেছেন। এটা নব্বইয়ে হয়েছে। ভাষা আন্দোলনেও নারীরা সামনে ছিলেন, ঊনসত্তরেও তাই। একাত্তরের কথা তো বলাই বাহুল্য। যদিও সমমর্যাদা বা সমদৃষ্টিভঙ্গি নারী পান না। বরং সামাজিকভাবে সবসময় নারীকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। নারীর সম্মান ক্ষুণ্ন করা হয় সমাজে। জুলাই অভ্যুত্থানে নারীর অংশগ্রহণ না থাকলে এ আন্দোলন সফল হতো না। নারী পুরুষের সমান অংশগ্রহণ একটা সমাজে খুবই জরুরি সেটা দাবি আদায়ের ক্ষেত্রেই হোক বা পারিবারিক ক্ষেত্রে।
তবে আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে নারীর সমমর্যাদার প্রশ্নে পরিবর্তনের তেমন কোনো আভাস দেখতে পাচ্ছি না। বরং আরো উসকানিমূলক ও প্রোপাগান্ডামূলক অনেক কিছু ছড়ানো হচ্ছে। গতকালও (বৃহস্পতিবার) একজন আট বছরের কন্যাশিশু ধর্ষিত হয়েছে। ধর্ষণ আগেও ছিল, এখনো চলছেই। তাহলে পরিবর্তনটা কোথায়? অকারণে নারীর পোশাক নিয়ে আলোচনা, কটুক্তি তো কোনো প্রগতিশীল চিন্তা না! অথচ যারা এসব বলছে, করছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। কিন্তু নারীকে দেশের রাস্তায় নিরাপত্তা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।
বিগত সরকারপ্রধান, যাকে আমরা ক্ষমতা থেকে নামালাম, তিনিও তো নারীই ছিলেন। তিনি দেশ শাসন করায় কিন্তু নারীর অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ নারী শাসক হোক বা আন্দোলন করুক, সামগ্রিকভাবে আমাদের দেশে নারীর অবস্থার পরিবর্তন দৃশ্যমান না। এমনকি অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও নারী আন্দোলনকারীদের তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখা হয়নি।










