২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার এক বছর পর নতুন জীবন ও জীবিকার পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস), আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) ও অন্যান্য সহযোগী সংস্থার সহায়তায় এখন পর্যন্ত তিন লাখ দুই হাজারের বেশি মানুষ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জীবিকা, গৃহায়ণ, স্বাস্থ্যসেবা ও দুর্যোগ প্রস্তুতিসহ নানা ক্ষেত্রে এ সহায়তা তাদের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।
বন্যার প্রথমদিন থেকেই রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকেরা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তারা উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি জরুরি খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও নগদ সহায়তা পৌঁছে দিয়েছেন। সংস্থাটির তথ্যনুযায়ী, এক হাজারের বেশি পরিবারের ঘর মেরামত ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে, আর নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় দেড় হাজার স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা। টেকসই জীবনব্যবস্থা গড়ে তুলতে ১ হাজার ১০০ পরিবারকে জীবিকার সহায়তা দেয়া হয়েছে। বন্যাকালীন জরুরি সহায়তার অংশ হিসেবে ৪৭ হাজার ৪৯২ পরিবারকে ছয় হাজার টাকা করে নগদ অর্থ দেয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতিবন্ধী পরিবারকে দেয়া হয়েছে অতিরিক্ত নগদ সহায়তা।
দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের পাশাপাশি পরিবেশ ও কৃষি পুনরুদ্ধারেও নেয়া হয়েছে উদ্যোগ। স্থানীয়দের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে এক লাখেরও বেশি গাছের চারা ও ১৪ হাজার প্যাকেট সবজির বীজ। নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১৫টি মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে ও সরবরাহ করা হয়েছে ওষুধসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম। নিরাপদ পানির জন্য মেরামত ও নতুন করে স্থাপন করা হয়েছে ৬৭০টি টিউবওয়েল।
নোয়াখালীর রুবিনা খানমের জীবন পরিবর্তনের গল্প যেন এই সহায়তারই প্রতিচ্ছবি। বন্যায় সব হারিয়ে তিনি ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি জানান, বন্যায় তার ঘরবাড়ি সব ভেসে গিয়েছিল। রেড ক্রিসেন্টের সহায়তায় পরে তিনি ঘর বানিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া জীবিকার জন্য পাওয়া টাকায় আমার বড় ছেলে মাছ বিক্রি করে সংসার চালায়। এখন আর তাদের ভিক্ষা করতে হচ্ছে না, তিনবেলা অন্তত খাবারের ব্যবস্থা তাদের হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টের মহাসচিব ড. কবির এম. আশরাফ আলম বলেন, তারা সব সময় দুর্যোগে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেন। আইএফআরসি ও পার্টনারদের সহায়তায় হাজারো পরিবারের জীবন পুনর্গঠনে কাজ করতে পেরে তারা গর্বিত।
আইএফআরসি বাংলাদেশের প্রধান আলবার্টো বোকানেগ্রা বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সাহস ও দৃঢ়তা সত্যিই অনুপ্রেরণামূলক। এ সময় তারা সব সময় বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রত্যয় জানান।
এর আগে, বন্যাকালে রেড ক্রিসেন্ট ও আইএফআরসি প্রায় ৫ লাখ ৬৯ হাজার লিটার নিরাপদ পানি, ২ লাখ ৪৮ হাজার ৭০০টি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ৭০ হাজার মানুষের জন্য রান্না করা খাবার ও ৬০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করে। তাদের ১৬টি মোবাইল মেডিকেল টিম ২৭ হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেয় এবং ৩,৬৮১ জনকে মানসিক সহায়তা প্রদান করে। রোগ প্রতিরোধে বিতরণ করা হয় ১ লাখ ৫৫ হাজার ওরস্যালাইন ও ১৮ হাজার ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট।
২০২৪ সালের আগস্টের বন্যায় দেশের ১১ জেলায় প্রায় ৫৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ৭৪ জনের মৃত্যু হয় ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এক বছর পর রেড ক্রিসেন্ট ও আইএফআরসির সহায়তায় ঘুরে দাঁড়ানো মানুষগুলোর গল্প আজ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
—বিজ্ঞপ্তি










