শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেছেন, আমরা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সঙ্গে তিনটি কনভেনশনে স্বাক্ষর করার ব্যাপারে কাজ করছি। এর ফলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ ও তাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে। গৃহকর্মীরা যেন নির্যাতনের শিকার না হয় তা নিশ্চিতে আমরা বদ্ধপরিকর। ২০১৫ সালের 'গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি‘ বাস্তবায়নে হয়তো খানিকটা ব্যর্থ হতে হয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে। তবে আমাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় যেসব সেবা রয়েছে, সেখানে কিভাবে গৃহকর্মীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়- সেটি নিয়ে আমরা কাজ করতে পারি।

গতকাল সোমবার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অডিটোরিয়ামে গণস্বাক্ষরতা অভিযান, বিএনএসকে, সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশন, আভাস, সহায় এবং আশার আলো সোসাইটির আয়োজনে অক্সফাম ইন বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় গৃহকর্মীদের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, কর্মঘণ্টা ও ছুটির আইনি স্বীকৃতি, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন বন্ধ, সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি এবং বিশেষ আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ আকারে পাঠানোর আশ্বাস দেন শ্রম সচিব। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, ১৬৩৫৭ ও ১০৯২১ নম্বরে যোগাযোগের পরামর্শও দেয়া হয়।

এদিন জাতীয় সংগীত ও মাইলস্টোন স্কুল বিমান দুর্ঘটনা ও জুলাই শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শুরু হয়।

আলোচনা সভায় ’ইডব্লিউসিএসএ প্রকল্পের” লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও অর্জনসমূহ তুলে ধরেন অক্সফাম ইন বাংলাদেশ প্রোগ্রাম অফিসার খাদিজা আক্তার অন্তরা এবং জেন্ডার জাস্টিস এন্ড সোস্যাল ইনক্লুশন এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান তারেক আজিজ। সম্মেলনে গৃহকর্মীদের পক্ষে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন গৃহকর্মী ফিরোজা বেগম এবং রুমা আক্তার।

গৃহকাজে নিয়োজিত নারীদের সুরক্ষায় দ্রুত সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন উপস্থিত গৃহকর্মী, শ্রমিক নেতা এবং বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা। এছাড়াও গৃহকর্মে নিয়োজিত নারীরা প্রতিনিয়ত মারধরসহ নানা ধরনের যে নিপীড়ন সহ্য করতে হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে বলে সভায় অভিমত জানানো হয়।

1

গৃহকর্মীদের জন্য পৃথক বেতনকাঠামো দাবি

গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে গৃহকর্মীদের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন গৃহকর্মীরা। পাশাপাশি গৃহশ্রমিকদের জন্য পৃথক বেতনকাঠামো, পুনর্বাসন, চিকিৎসা ও সন্তানদের অবৈতনিক শিক্ষসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছেন তারা।

সভায় শ্রম আইন সংশোধন করে গৃহশ্রমিকদের নিয়োগপত্র, কর্মঘণ্টা, ছুটি ও চাকরি শেষ করা সম্পর্কিত শর্তাবলি ও সুবিধা নিশ্চিত করাসহ আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪টি দাবি জানান গৃহকর্মী ফিরোজা বেগম ও রুমা আক্তার। এরপর মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সম্মেলনে অংশগ্রহণ করা নারী গৃহকর্মীরা। এ সময় তারা তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন।

যৌক্তিক দাবি

সভায় গৃহকর্মীদের ১৪টি দাবির প্রতিটিই যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব। তিনি বলেন, সরকার বিশ্বকে বার্তা দিচ্ছে দেশের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত ও নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রশমিত করতে তারা আন্তরিক। একই সঙ্গে শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন প্রতিরোধের বিষয়ে চুক্তি সই করার বিষয়টি উপদেষ্টা পরিষদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে বলে জানান তিনি।

সভায় নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বলেন, গৃহকর্মী ও যৌনকর্মী এই দুটি খাতে নারীরা শ্রম দিলেও শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন না। নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে নারী শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এগুলোর মধ্যে নারী শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, পরিবহন সুবিধা ও বয়স্ক ভাতার কথা রয়েছে।

সভায় শ্রম আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন শ্রম অধিকার সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, গৃহকর্মীদের সংগঠিত হওয়ার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা অঞ্চল ও জাতীয় পর্যায়ে ঐক্যবদ্ধভাবে নিজেদের দাবি উপস্থাপন করতে পারে। তিনি আরো বলেন, গৃহকর্মীরা যেন অঞ্চল ও জাতীয় ভিত্তিতে সংগঠন করতে পারে, তাদের সে অধিকার দিতে হবে। গৃহকর্মী নির্যাতন প্রতিরোধ করতে মাঠপর্যায়ের উদ্যোগের ওপর জোর দেন তিনি।

মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি বলেন, গৃহশ্রমিকদের অধিকারের বিষয়ে শুধু শ্রম মন্ত্রণালয় নয়, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের প্রয়োজন। তিনি এ কাজে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করার দাবি জানান।

সভায় আরো বক্তব্য দেন বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।