গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বাগদা ফার্মের সাঁওতালদের তিনফসলি জমিতে ইপিজেড স্থাপন করা যাবে না বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) সকাল ১১টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে গাইবান্ধায় সাঁওতালদের পূর্বপুরুষের জমিতে বৈধ অধিকারের স্বীকৃতি ও তিনফসলি কৃষিজমি সুরক্ষার দাবিতে ১৪টি ভূমি ও মানবাধিকার সংস্থার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এ দাবি তোলেন।
এ সময় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১. গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ বাগদা ফার্ম এলাকায় সরকারের যদি কোনো উন্নয়ন প্রকল্প থেকে থাকে তা হলে সেটি বাস্তবায়নের পূর্বেই ওই এলাকার ২০১৬ সালে ক্ষতিগ্রস্ত এবং যেসব সাঁওতাল পরিবার পূর্বপুরুষের জমির দাবি করে আসছে, তাদের ন্যায্য দাবির স্বীকৃতিপূর্বক শান্তিপূর্ণ আলাপ আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ীভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে।
২. ইপিজেড বা অন্য কোনো শিল্প স্থাপন করতে হলে সরকারেরই বাধ্যতামূলক শর্ত অনুযায়ী যথাযথ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে প্রস্তাবিত প্রকল্পের পরিবেশগত ফলাফল (ইআইএ) এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব (এসআইএ) নিরূপণ করতে হবে।
৩. প্রস্তাবিত প্রকল্পের প্রভাব শুধুমাত্র গোবিন্দগঞ্জ বাগদা ফার্ম এলাকায় নয় গোটা অ্যাগ্রো ইকোলোজিক্যাল অঞ্চলের ভূমি, পানি, পরিবেশ ও কৃষিতে দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব কী হতে পারে তাও নিরূপণ করতে হবে।
৪. ২০১৬ সালের শহীদ ও আহতদের পরিবার এখনো হত্যার ও নিষ্ঠুরতার বিচার পায়নি। সে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদসহ সব অপরাধীর আইনানুগ সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। নিহত ও আহতদের পরিবারকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৫. স্থানীয় প্রশাসনের কোনো কোনো কর্মকর্তা সরকারের কোনো ইআইএ ও এসআইএ সম্পন্ন হবার আগেই এলাকায় ইপিজেড হয়ে যাবে বলে ঘোষণা দিচ্ছেন এবং সাঁওতাল ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়ানো ও উত্তেজনা সৃষ্টির উৎসাহ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পাকিস্তান আমলে ১৯৬৫ সালে ইক্ষু চাষ ও চিনিকল নির্মাণের জন্য সাঁওতালদের ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর জমি হুকুম দখল করা হয়। পরে ১৯৬২ সালে তৎকালীন সরকার এ জমি রংপুর সুগার মিলকে হস্তান্তর করে। কথা ছিল, যথাযথ কাজের জন্য এসব জমি ব্যবহার না করা হলে জমির মালিককে জমি ফেরত দেয়া হবে। ২০০৪ সালে মিল বন্ধ হয়ে গেলেও জমি ফেরত দেয়া হয়নি। অন্যদিকে বিগত স্বৈরাচারী আমলে এ জমিতে ইপিজেড নির্মাণের কথা বলা হয়েছিল। নানা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সে প্রকল্প বন্ধ হলেও গত ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে এটি করার চেষ্টা করছে। স্থানীয় প্রশাসনের কোনো কোনো কর্মকর্তা ইআইএ ও এসআইএ সম্পন্ন হওয়ার আগেই সেখানে বসবাসরত সাঁওতাল ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
এতে বলা হয়, ২০১৬ সালে ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ওপর সেই সময়ের পুলিশ ও প্রশাসন নিষ্ঠুর নিপীড়ন চালিয়েছিল। এ সময় এলাকায় সাঁওতালদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে তাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করতে তৎকালীন কর্তৃত্ববাদী সরকারের পুলিশ, তাদের গুণ্ডাবাহিনী এবং চিনিকলের দুর্নীতিবাজ কিছু কর্মচারী ঝাপিয়ে পড়ে। সেদিন সাবেক স্বৈরশাসকদলের এমপি আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে এবং তার অন্যতম সরকার দলীয় পান্ডা শাকিল চেয়ারম্যানের প্রত্যক্ষ মদদে চিনিকলের ভাড়াটে লোকজন ও স্থানীয় মানুষসহ বহিরাগত প্রায় পাঁচ/ছয়শত দাঙ্গাবাজ সেখানে বসবাসরত আদিবাসী সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দেয় ও লুটপাট করে। কিছু ছবি এবং ভিডিও ক্লিপিং এ দেখা যায় পুলিশ স্বয়ং কিছু বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করেছে। এছাড়াও পুলিশের গুলিতে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ৩ জন সহযোদ্ধা যথাক্রমে শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মারডি ও রমেশ টুডু শহীদ হন এবং অসংখ্য মানুষ আহত হন।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, বাগদা ফার্মের এ জমি যখন রিকুইজিশন করা হয় তখন চুক্তিতে এটা স্পষ্ট ছিল যে উল্লেখিত জমিতে যদি ইক্ষুচাষ না করা হয় তাহলে সে জমি সাঁওতাল অধিবাসীদের ফেরত দেয়া হবে। কিন্তু বাস্তবতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি তার বিপরীতে ইপিজেড করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এই জমিটি তিনফসলি জমি। তবে গোবিন্দগঞ্জের অধিবাসীদের মতে, এ তিনফসলি জমিতে তিন মৌসুমের ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি অন্য শস্য চাষ করা হয়। এ ফসলি জমি অত্যন্ত উর্বর। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা চিন্তা করে, খাদ্য উৎপাদনকে প্রধান্য দিয়ে, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে বিবেচনায় নিয়ে এই জমি সুরক্ষায় সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান সংবাদ মাধ্যমের কর্মীদের গোবিন্দগঞ্জের বাগদা ফার্মের অধিবাসীদের জমি সুরক্ষার লড়াইয়ে তাদের পাশে থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আদিবাসীদের তিনফসলি জমি সুরক্ষার জন্য আপনারা সেখান যান এবং প্রকৃত অবস্থাটি সরকারের কাছে তুলে ধরুন।
বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনিন্দ্র কুমার নাথ গোবিন্দগঞ্জের বাগদা ফার্মের সাঁওতালদের তিনফসলি কৃষিজমিতে ইপিজেড নির্মাণের উদ্যোগ ও দখলদারত্বের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, সাঁওতালদের কৃষিজমিতে কেন ইপিজেড নির্মাণ করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার বলেছিল সবাইকে নিয়ে একটা মানবিক বাংলাদেশ গঠন করবে। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি গোবিন্দগঞ্জের বাগদা ফার্মের ইপিজেড করার পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের প্রেস উইংয়ের কোনো বক্তব্য নেই। আমরা দাবি জানাতে চাই সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে সাঁওতালদের জমিতে ইপিজেড করার সেটি অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির বলেন, দেশে কিছু আইন, নীতিমালা আছে। কিন্তু দেশের আইন-নীতিমালা প্রয়োগ হয় না তখন দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ জনগণকে। আমরা পূর্ববর্তী সরকারের আমলে গোবিন্দগঞ্জের বাগদা ফার্মে ইপিজেড নির্মাণের বিপরীতে স্মারকলিপি প্রদান করেছি। হুকুম-দখলে সরকারি নীতিতে আছে, অধিগ্রহণকৃত জমি যদি নির্ধারিত কাজে ব্যবহৃত না হয় তা হলে তা যাদের জমি তাদের ফেরত দেয়া হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। চিনিকল ২০০৪ সালে বন্ধ হয়ে গেলেও সে জমি আদিবাসী সাঁওতালদের ফেরত দেয়া হয়নি, বরং ২০১৬ সালে তাদের ওপর নিপীড়ন চালানো হয় এবং ৩ জন আদিবাসী তৎকালীন পুলিশ বাহিনী ও প্রশাসনের দমন-পীড়নে নিহত হন। আমরা এ পরিস্থিতিতে নতুন করে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ এলাকায় প্রস্তাবিত ইপিজেড নির্মাণের সরকারি সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়াকে প্রত্যাখ্যানের আহবান জানাই। তিনফসলি জমিতে নতুন কোনো প্রকল্প আর নয়। —বিজ্ঞপ্তি










