‘আমি শিখেছিলাম একজন পাচককে সবসময় তার হাত পরিষ্কার রাখতে হয়। সঙ্গে পরতে হয় পরিষ্কার কাপড়। আর শাসকদের পাচক হয়ে শিখেছিলাম খাদ্যই হলো শক্তি। খাদ্যের জোগান নিশ্চিত হলে আপনি নারীকে অধিকার করতে পারবেন, আপনার অর্থ উপার্জনেও সমস্যা হবে না, আর তখন মানুষও আপনার প্রশংসা করবে। পাকস্থলী পূর্ণ থাকলে যেকোনো কিছুই অর্জন করা সম্ভব,’ স্বৈরশাসক ইদি আমিনের এক সময়ের পাচক ওতোন্দে ওদেরা এভাবেই খাদ্যের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন।

অঞ্চলভেদে পৃথিবীতে খাদ্যের বৈচিত্র্য রয়েছে, কিন্তু কম-বেশি সব অঞ্চলের মানুষই রসনাবিলাসী। তবে সবার সেই বিলাসের সুযোগ থাকে না। খাদ্য সংকট, দারিদ্র্য ইত্যাদি নানা কারণে পৃথিবীর অনেক মানুষ আজও খালি পেটে ঘুমাতে যায়। বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে এ সংকট অনেক কেটে গেছে কিন্তু গত শতাব্দীর শেষপাদেও খাদ্য সংকট ছিল তীব্র। কিন্তু অর্থের যেখানে অভাব নেই সেখানে খাদ্যেরও অভাব হয় না, বরং খাদ্য নিয়ে নানা গবেষণা হয় যে কীভাবে তা রসনাকে আরো তৃপ্ত করতে পারে। তাই সব সময়েই শাসক শ্রেণীর ছিল বিশেষায়িত পাকশালা এবং পাচক। রাজপরিবার থেকে শুরু করে এখনকার আধুনিক যুগে রাষ্ট্রপ্রধান ও ক্ষমতাধরদের দৈনন্দিন জীবনে তাদের পাকশালা ও পাচকের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। এমনকি আজ অবধি অনেক পাচক তাদের মনিব সম্পর্কে বহু আগ্রহোদ্দীপক তথ্য দিয়ে গেছে। এক্ষেত্রে উগান্ডার বিখ্যাত কিংবা কুখ্যাত শাসক ইদি আমিনের পাচকও ব্যতিক্রম নয়।

কেনিয়ার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে মায়ের চতুর্দশ সন্তান হিসেবে জন্ম ওতোন্দে ওদেরার, জন্ম মুহূর্তে দৈববলে হায়নার থাবা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তখনো জানতেন না, একসময় আরো বড় কোনো বিপদেও পড়বেন। ওদেরার ভাগ্য ভালো ছিল বলে চাকরি পেয়ে গিয়েছিলেন এক শ্বেতাঙ্গ পরিবারে। রবার্টসন নামক এক ব্রিটিশ সিভিলিয়ানের মালী হিসেবে কাজ করতে করতে একসময় মিসেস রবার্টসন তাকে রান্নার কাজ শেখাতে শুরু করেন। খুব দ্রুত কাজ শিখেছিলেন ওদেরা। তার নিজের ভাষায়, ‘এক বছরের মাথায় মেমসাহেব আমাকে ইঙ্গিতে বোঝালেন যে এখন তার সাহায্য ছাড়াই আমি হেঁশেল সামলাতে পারব।’

ঔপনিবেশিক আফ্রিকায় ব্রিটিশ সিভিলিয়ানের অধীনে এ কাজ ওদেরার বাকি জীবনের পাথেয় হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের কাছে যখন তাদের উপনিবেশগুলো বোঝা হয়ে উঠল, তখন অন্যান্য অঞ্চলের মতো উগান্ডাও স্বাধীনতাপ্রত্যাশী হয়ে উঠলে ১৯৬২ সালে উগান্ডা স্বাধীন হয়ে যায়। রবার্টসন পরিবার উগান্ডা ত্যাগ করলে বেকার ওদেরা একদিন খবর পান যে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মিল্টন ওবোতের জন্য পাচক প্রয়োজন। সে পরীক্ষা দিতে গিয়ে ওদেরা সহজেই পাস করলেন। কেননা ওদেরা ব্রিটিশদের খাবার রান্না করতে জানতেন। পরবর্তী সময়ে ওবোতের অত্যন্ত প্রিয় হয়ে ওঠা ওতোন্দে ওদেরা একসময় ইদি আমিনেরও প্রিয় পাচকে পরিণত হন।

ওবোতে প্রধানমন্ত্রিত্ব পাওয়ার আগে থেকেই ইদি আমিন উগান্ডার সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন। উগান্ডার স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ কমান্ডিং অফিসারদের অধীনে ইদি আমিন একজন সৈন্য হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন। প্রায় নিরক্ষর ইদি আমিন সম্পর্কে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, ‘ইদি কেবল নির্দেশ মানতে জানে।’ ওবোতেও সে রকমই মনে করতেন। প্রথম পর্যায়ে ইদি আমিনের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। ১৯৬৯ সালে দুজনের সমঝোতায় তত্কালীন রাষ্ট্রপতি কাবাকাকে সরিয়ে দিয়ে ওবোতে নিজেই রাষ্ট্রপতি হন।

প্রায় একইভাবে ওবোতেকেও ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন ইদি আমিন। ১৯৭১-এর জানুয়ারিতে ওবোতের সিঙ্গাপুর সফরের সময় ইদি আমিন উগান্ডার ক্ষমতা দখল করেন। ইদি আমিনের চাতুরী কিংবা পরিকল্পনার একটি সূক্ষ্ম পরিচয় এখান থেকে পাওয়া যায়। ওবোতে দেশ ছাড়ার পর পরই রেডিওতে তার সম্পর্কে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। কিছুদিনের মধ্যেই কাম্পালার রাস্তায় মিলিটারি কনভয় নেমে যায়। এটেনবি থেকে কাম্পালার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে একসময় স্পষ্ট হয়ে যায় যে একটি অভ্যুত্থান হয়েছে। মানুষ অনেকদিন ধরেই ওবোতের শাসন শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছিল এবং শেষ হতে না হতে তারা যেন খুশিই হলো।

অভ্যুত্থানের রাতে রাষ্ট্রপতি ভবন যখন সৈন্যদের দ্বারা ঘেরাও করা হয় তখন ভেতরের সবাই ভেবেছিল তাদের হত্যা করা হবে। সবাইকে সার বেঁধে বাইরে বের করে আনা হলে ঠিক তখনই ইদি আমিন একটি জিপে করে সেখানে আসেন এবং ভীতদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘তোমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তোমরা যে যেখানে কাজ করতে, সেখানেই কাজ করবে। এখন রাতের খাবারের ব্যবস্থা করো।’


ওদেরা বলেন, ‘আমি শিখেছিলাম একজন পাচকের প্রধান দায়িত্ব, তার মনিবের পাকস্থলী পূর্ণ করার জন্য উপাদেয় খাদ্য তৈরি করা। আগের অভ্যুত্থান থেকে আরো শিখেছিলাম যে এ রকম অভ্যুত্থান উগান্ডায় আরো হবে। এবারের অভ্যুত্থানের খবর আমরা আন্দাজ করেছিলাম আর আমি জানতাম প্রাসাদ দখলের পর প্রথমেই প্রয়োজন হবে খাদ্যের। আমি সে ব্যবস্থা করেই রেখেছিলাম। কেননা ক্লান্ত হয়ে তিনি যখন আসবেন তখন ক্ষুধার কারণেই হয়তো কাউকে হত্যা করতে পারেন। আমি অনেক ঠেকে শিখেছি, ক্ষুধা মিটলে মানুষের মেজাজ অনেক ঠান্ডা থাকে।’

সে রাতে তেলাপিয়া মাছ, ছাগলের মাংস এবং পোলাউ পরিবেশনের সঙ্গে সঙ্গে ওদেরা নিজের পাশাপাশি অনেকের জীবন নিশ্চিত করেছিলেন, কেননা সত্যিই ইদি আমিন উন্মত্ত হয়ে তালজ্ঞান হারায়, যা তিনি পরে জেনেছিলেন। পাশাপাশি ইদি আমিনের মনোযোগ আকর্ষণ করতেও সক্ষম হয়েছিলেন। আমিনের ক্ষমতা দখলের কিছুদিন পর কিছু ব্রিটিশ অতিথি তার রান্না খেয়ে ইদি আমিনকে তার পাচক সম্পর্কে প্রশ্ন করেন যে সেই পাচক শ্বেতাঙ্গ কিনা। রসিকতা করে ইদি আমিনের উত্তর ছিল, ‘সে আমার মতোই শ্বেতাঙ্গ।’

পছন্দের মানুষদের প্রতি ইদি আমিন ছিলেন অত্যন্ত উদার। ব্রিটিশ অতিথিদের সামনে গর্বিত প্রেসিডেন্ট বুঝলেন এসব সম্ভব হয়েছিল ওদেরার জন্য। তিনি ওদেরাকে প্রশ্ন করেন, ‘তোমার বেতন কত?’ ৩৯০ শিলিঙে কাজ করা ওদেরা, তার ভূতপূর্ব মনিব ওবোতেকে পছন্দ করলেও তার কৃপণতা নিয়ে কিছুটা হলেও অসন্তুষ্ট ছিলেন। ওবোতের মুখ থেকে যেমন প্রশংসা আসত না, তেমনি বেতনের বেলায়ও কৃপণতা করতেন। ওদেরার বেতনের পরিমাণ শুনে ইদি তত্ক্ষণাৎ তার প্রধান তত্ত্বাবধায়ককে বললেন, ‘লেক ভিক্টোরিয়া হোটেলে ফোন করে সেখানকার প্রধান বাবুর্চির বেতন জিজ্ঞেস করো।’ সে মুহূর্ত থেকেই পাঁচ তারকা হোটেলের প্রধান পাচকের মতো ওদেরার বেতন ১,০১৭ শিলিং নির্ধারণ করা হয় এবং ইদি আমিন ক্ষমতা নেয়ার শুরু থেকে সেই বেতন কার্যকর হওয়া হিসেবে তিন মাসের অতিরিক্ত বেতনও দেয়া হয়। এখানেই শেষ হয়নি। কিছুদিনের মধ্যে ইদি আমিন তাকে একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ উপহার দেন।

ইদি আমিনের খামখেয়াল নিয়ে একটা গল্প শোনান তার ভূতপূর্ব মেজর গ্রাহাম। হিথরো বিমানবন্দরে একটি বিমান হঠাৎ করেই অবতরণের অনুমতি চাইতে থাকে এবং বলে এই বিমানে উগান্ডার প্রেসিডেন্ট রয়েছেন। সে মুহূর্তে ‘প্রেসিডেন্ট’-কে অভ্যর্থনা করার মতো তেমন কেউ ছিল না। কেউ জানতও না তিনি কেন এসেছেন। সৌভাগ্যক্রমে রানী তার বাসভবনেই ছিলেন এবং মধ্যাহ্নভোজের পর তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘মি. প্রেসিডেন্ট, আমি কি জানতে পারি আপনার এ অপ্রত্যাশিত ভ্রমণের মাধ্যমে আমাদের সম্মানিত করার উদ্দেশ্য কী?’ ইদি আমিন তার চায়ের কাপ নিয়ে উচ্চস্বরে হেসে বললেন, ‘মাননীয়া, উগান্ডায় ১৪ মাপের জুতো পাওয়া যায় না।’

ইদি আমিন লন্ডন গিয়েছিলেন অস্ত্র কেনার উদ্দেশ্যে। পাশাপাশি তানজানিয়ায় অবস্থানরত ওবোতের বিরুদ্ধে ইউরোপ থেকে সমর্থন লাভ করার চেষ্টাও ছিল। সে উদ্দেশ্য বিফল হওয়ার পর থেকেই ব্রিটেনকে তিনি প্রধান শত্রু হিসেবে ঘোষণা করেন। তার আগ পর্যন্ত ব্রিটেনের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল তীব্র। ইদি আমিনের নানা উপাধি ছিল। নিজেই নিজেকে ফিল্ড মার্শাল ঘোষণা করেছিলেন। পাশাপাশি প্রাচীন আমলের মতো লম্বা খেতাবও ধারণ করতেন। সেগুলো বেশ অদ্ভুত। রেডিওতে তার নামের সঙ্গে ‘বিশ্বের সব পশুর রাজা এবং সমুদ্রের মাছেদের অধীশ্বর’ বলা হতো এবং একপর্যায়ে নিজেকে ‘কিং অব স্কটল্যান্ড’ এবং ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ধ্বংসকারী’ ঘোষণা করেন।

মেজর গ্রাহাম বলেন, ‘স্কটল্যান্ডের প্রতি তার ভালো লাগা তৈরি হওয়ার জন্য আমি দায়ী। আমি একজন স্কট। একসময় আমরা তাঁবুতে বসে গল্প করতাম। আমিই তাকে স্কটল্যান্ডের গল্প শুনিয়েছি।’ ইদি আমিন তার বাহিনীতে ব্যান্ড দল তৈরি করিয়েছিলেন, যারা নানা অনুষ্ঠানে ‘ব্যাগপাইপ’ বাজাত।

ইদির খামখেয়ালিপনার দৃষ্টান্ত হিসেবে ওদেরা আরেকটি গল্প শোনান। ইদি আমিন একসময় ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি ভবনে কাজ করতে হলে সব পুরুষকে খত্না করতে হবে। ইদি এবং তার পরিবার যে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নেন সেই হাসপাতালেই এ ব্যবস্থা করা হবে। অগত্যা সবাই আদেশ মেনে নিজেদের খত্না করিয়ে নেয়। এদের মধ্যে প্রধান খানসামা ওদেরো ওশোরে এক ধাপ এগিয়ে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে চাইলে ইদি আমিন আপত্তি করেন। যদিও ওশোরে মুসলিম হয়েছিল কিন্তু ইদি তাকে কোনো আলাদা খাতির করেননি। কিন্তু ধর্ম পরিবর্তন না করে কেবল খত্নার প্রতি এ আদেশের কোনো উপযোগিতা খুঁজে পাওয়া যায় না।

ততদিনে বেশ অর্থ কামিয়ে ফেলেছেন ওতোন্দে ওদেরা। ইদি আমিন তাকে প্রায় সময়েই বলতেন একজন স্ত্রী তার জন্য যথেষ্ট নয়। ওদেরাকে আরো একটি বিয়ে করার জন্য তিনি প্রলুব্ধ করতে থাকেন। একদিন একটি অনুষ্ঠানে ওদেরা যখন একজন ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলছিলেন, প্রেসিডেন্ট সেখানে এসে দুজনের কাঁধে হাত দিয়ে মেয়েটিকে প্রশ্ন করেন, ‘আমাদের পাচক ওদেরাকে আপনার কেমন লাগে?’ এবং এরপর ওদেরার প্রশংসা চলতে থাকে। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট যেখানে ‘ঘটক’, ওদেরা দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করতে বাধ্য হন। এ বিয়ে উপলক্ষে ইদি আমিন বর, কনে উভয়কে খামে করে মোটা অংকের অর্থ ‘উপহার’ দেন। ওতোন্দে ওদেরা বলেন, ইদি আমিন এই কাজটি মাঝে মাঝেই করতেন। কারো কোনো কাজ পছন্দ হলেই একটি ‘খাম’ তাদের দিতেন উপহার হিসেবে।

নারীদের নিয়ে ইদি আমিন বেশ আগ্রহী ছিলেন। ওদেরার ভাষ্য অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের পাঁচজন স্ত্রী ছিলেন। এর বাইরেও ইদি আমিনের আসক্তি ছিল। প্রথম জীবনে একবার এক নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রকাশিত হলে ইদি আমিন তাকে নিজের বোন বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আর এমন কিছুর পরোয়া করেননি। পাশাপাশি তিনি তার কাছের মানুষদেরও নানাভাবে প্রলুব্ধ করতেন। ইদি আমিনের একজন খাস লোক একটি ব্রিফকেস ভর্তি টাকা নিয়ে বসে থাকত। কোনো অনুষ্ঠানে একজন নারী একজন পুরুষের সঙ্গে একটু ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলছে দেখলেই সে ব্রিফকেস নিয়ে এগিয়ে যেতেন। ওদেরাকে এভাবে টাকা দিতে চেয়েছেন তিনি। ওদেরার মতে, ‘তিনি এসব পছন্দ করতেন। উপভোগ করতেন বলা যায়।’

পাশাপাশি এক অদ্ভুত চাতুর্য ছিল ইদি আমিনের এ কাজে, যা ওদেরা পরে বুঝতে পেরেছিলেন। ইদি আমিন আসলে এভাবে তার আশপাশের প্রতিটা মানুষকে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে তোলেন। কেননা, একাধিক স্ত্রী গ্রহণ বাদেও ওদেরা একটি ভক্সওয়াগন কিনেছিলেন। অর্থাৎ, তার খরচের বহর বেড়ে গিয়েছিল। যেখানে ৩৯০ শিলিং নিয়ে তিনি জীবনযাপন করতেন, সেখানে এর তিন গুণ অফিশিয়াল বেতনেও তার পোষাচ্ছিল না, কেননা ওদেরা ততদিনে ইদি আমিনের দেয়া ‘খামগুলো’ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

উগান্ডার এ কুখ্যাত খামখেয়ালি প্রেসিডেন্ট রগচটা ছিলেন এবং তার প্রমাণ ওদেরা দেখেছিলেন নিজের চোখে। প্রেসিডেন্ট একা গাড়ি চালিয়ে শহরের বাইরে যেতেন না বললেই চলে। কিন্তু একবার এভাবে গেলেন এবং সড়ক দুর্ঘটনার কথা শোনা যায়। তখন তার একজন স্ত্রী সাদামাটা পোশাক পরে হাসপাতালে যাওয়ার উদ্যোগ করলে প্রায় তখনই ইদি উপস্থিত হন। প্রেসিডেন্টের কেবল একটি হাত হালকা জখম হয়েছিল। ওই অবস্থায় ফিরে স্ত্রীকে দেখে ক্ষিপ্ত প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘কী ভেবেছিলে? আমি মরে গেছি?’

ওই অবস্থাতেই ইদি আমিন তাকে মারতে শুরু করেন। রাষ্ট্রপতি ভবনের সব কর্মচারী অসহায়ের মতো এ ঘটনা দেখা ছাড়া কিছু করার ছিল না। সেই স্ত্রীকে উন্মত্তের মতো মারতে থাকলে এক পর্যায়ে ইদি আমিনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোক কিজিতো কেবল একবার চিত্কার করে বললেন, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, এবার বন্ধ করুন।’ এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কিজিতোকে লক্ষ্য করে ইদি আমিন পরপর তিনটি গুলি করেন। যদিও একটা গুলিও কিজিতোর গায়ে লাগেনি।

ইদি আমিন নিজেকে একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ অবস্থানে নিয়েছিলেন এবং চাইতেন মানুষ তাকে ভয় করুক। প্রাসাদে এমন একটা দৃষ্টান্ত তিনি রাখলেন যে তিনি যে কাউকে যা কিছু করার ক্ষমতা রাখেন। এমনকি পরবর্তী সময়ে তার দুই স্ত্রীকেও সম্ভবত তিনিই হত্যা করিয়েছিলেন। এমনকি ওশোরের অভিযোগে পাচক ওদেরাকেও গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ ছিল ওদেরা নাকি প্রেসিডেন্টকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। ওদেরা ভেবেই নিয়েছিলেন পরিবারসহ তাকে হত্যা করা হবে কিন্তু কোনো দৈববলে যেন বেঁচে গিয়েছিলেন আবার। তাকে হত্যা না করে কেনিয়ায় তার গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

ইদি আমিনের কতটা কাছে ছিলেন ওদেরা, তা বোঝা যায় ওদেরার নিজের কথা থেকেই, যখন তিনি বলেন যে কীভাবে অনুষ্ঠানে ইদি আমিন তার কাঁধে হাত রেখে গল্প করেছিলেন। ফলে ইদি আমিনের অনেক কথাই তার জানার কথা এবং বিষয়টি যখন খাওয়া-দাওয়া প্রসঙ্গে, তখন ওদেরার চেয়ে ভালো কে জানবে! ভণিতা না করে স্পষ্ট করেই বলা যাক। ইদি আমিন সম্পর্কে একটি প্রচলিত কথা রয়েছে, তিনি মানুষের মাংস খেতেন। তিনি যাদের হত্যা করতেন তাদের রক্ত পান করতেন।

ওতোন্দে ওদেরাকে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলেন, ‘তার এবং ভবনের সব মাংস, আনাজ আমার হাত হয়েই যেত। আমি কখনো অপরিচিত ধরনের কোনো মাংস খুঁজে পাইনি। আমিও শুনেছি লোকে এসব কথা বলে। অনেকে আমাকে জিজ্ঞেসও করেছে আমি কখনো প্রেসিডেন্টের জন্য মানুষের মাংস রান্না করেছি কিনা। রান্নার জন্য কখনো আমি বাজার করতাম, কখনো সৈন্যরা পৌঁছে দিত। না আমি কোনোদিন এমন কোনো মাংস কিনেছি, না তারা সরবরাহ করেছে। তিনি এমন কিছু ভক্ষণ করতেন না।’

ইদি আমিন সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে কদর্য অভিযোগটি নরখাদক হওয়ার। এ সম্পর্কে তার ভূতপূর্ব মন্ত্রী হেনরি কায়েম্বা বলেছিলেন, ‘যেকোনো হত্যার পরই ইদি আমিন লাশের পাশে একা থাকতে চাইতেন। তিনি একাকী সেখানে কী করতেন তা অজানা।’ এখান থেকে অনেকের সন্দেহ পোক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় কিন্তু অন্যত্র কায়েম্বা নিজেই বলেছেন, ইদি আমিন তার প্রতি মানুষের ভয় সৃষ্টি করার জন্য অনেক কাজই করতেন। মানুষের মাংস খাওয়া প্রসঙ্গে মেজর গ্রাহাম বলেন, ‘নিঃসন্দেহে ইদি অনেক মানুষকে হত্যা করেছে এবং আমি এজন্য ক্রুদ্ধ। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না যে সে নরখাদক।’ মূলত ইদি আমিন সম্পর্কে নানা গুজব তো ছিলই পাশাপাশি এ নরখাদক তত্ত্ব প্রমাণ করা গেলে উগান্ডার ওপর ইউরোপীয় আধিপত্য বাড়ানো যাবে বলে এসব গল্পে ইন্ধন দেয়া হতো বলেও অনেকে মনে করেন।

প্রশ্ন হলো ইদি আমিনের নিয়মিত খাবার তাহলে কী ছিল? ওদেরার কথা থেকে বোঝা যায় ইদি আমিনের পছন্দের খাদ্য উগান্ডার অন্যান্য শাসকদের মতোই স্বাভাবিক ছিল। তিনি পোলাওয়ের সঙ্গে মুরগির তরকারি, ছাগলের মাংস যার মধ্যে ওদেরার বিশেষভাবে তৈরি আস্ত ছাগলের রোস্ট পছন্দ করতেন। এর বাইরে ইউরোপীয় খাবারও পছন্দ করতেন। ইদি আমিনের স্ত্রীরা যদিও অন্য ভবনে বাস করতেন, খাবার সময় হলে তারাও ওদেরার হেঁশেল থেকেই খাবার খেতে পছন্দ করতেন। কেননা ওতোন্দে ওদেরা জানতেন কেমন করে পাকস্থলীকে আনন্দ দেয়া যায় আর ‘পেট ঠান্ডা তো দুনিয়া ঠান্ডা’—হোক সে একনায়ক কি এক সাধারণ মানুষ।

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক