এটা প্রায়
প্রতিষ্ঠিত ছিল
যে চকোলেটের
ব্যবহার শুরু
হয়েছিল মধ্য
আমেরিকায়। চকোলেটের
উৎস কোকাও
বা কোকো
গাছকে প্রথম
চাষের আওতায়
আনা হয়েছিল
এখানেই, আজ
থেকে চার
হাজার বছর
আগে। কিন্তু
গবেষকরা এখানেই
থেমে থাকেননি।
জীববিজ্ঞানী ও
নৃতত্ত্ববিদরা চকোলেট
নিয়ে আগ্রহী
থেকেছেন সব
সময়; প্রাচীন
মেসো-আমেরিকান
সভ্যতা যেমন
মায়া ও
অ্যাজটেকদের কাছে
কোকাও কেন
এত গুরুত্বপূর্ণ
হয়ে উঠেছিল
যে চকোলেটকে
তারা ধর্মীয়
অনুষ্ঠানে ও
মুদ্রা হিসেবে
ব্যবহার করত।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন
প্রমাণ করে
যে মেসো-আমেরিকায়
প্রথম কোকো
ব্যবহূত হয়েছিল
৩ হাজার
৯০০ বছর
আগে। দীর্ঘদিন
ধরেই এটা
প্রতিষ্ঠিত ছিল
যে মেসো-আমেরিকানরা
প্রথমবারের মতো
শুধু কোকাও
ব্যবহারই করেনি,
বরং একই
সঙ্গে কোকাও
গাছের চাষও
করেছিল।
কিন্তু বছর
দুয়েক আগে
বৈজ্ঞানিক জার্নাল
কমিউনিকেশনস বায়োলজি
জানায়, কোকাও
বা কোকো
চাষ শুরু
হয়েছিল প্রায়
৩ হাজার
৬০০ বছর
আগে এবং
সেটা মেসো-আমেরিকায়
বা মধ্য
আমেরিকায় নয়,
বরং দক্ষিণ
আমেরিকায় বা
অ্যামাজন বেসিন
অঞ্চলে।
কোকাও প্রথম
কবে চাষ
হয়েছিল, সে
হদিস খুঁজতে
বিজ্ঞানীরা ২০০
কোকাও গাছের
জিনোম বিশ্লেষণ
করেন।
বিজ্ঞানীরা মোটামুটি
নিশ্চিত হন
যে সম্ভবত
প্রথম যে
কোকো জাতটিকে
মানুষ জমিতে
চাষ করেছিল
সেটি ক্রিয়োল্লো।
এটিকে বলা
হয় দুনিয়ার
সবচেয়ে ঈপ্সিত
কোকো জাত।
এটা চকোলেটের
সবচেয়ে দুর্লভ
ভ্যারাইটি। চকোলেট
শস্যের মাত্র
৫ শতাংশ
পাওয়া যায়
এ জাত
থেকে। এখন
অ্যামাজন বেসিনে
যে ক্রিয়োল্লো
পাওয়া যায়
তার সঙ্গে
মধ্য আমেরিকার
গাছের পার্থক্য
আছে। গবেষক
দলের প্রধান
এবং ওয়াশিংটন
স্টেট ইউনিভার্সিটির
পপুলেশন জেনেটিসি
ওমর কোরেনজো
মনে করেন
কোকো খুব
সম্ভবত ৩
হাজার ৬০০
বছর আগে
প্রথম চাষাবাদ
করা হয়।
এবং সেটা
ছিল ক্রিয়োল্লো।
এটা প্রথম
চাষ করা
হয় দক্ষিণ
আমেরিকায়, বর্তমান
একুয়েডরে; আগে
যেমনটা ভাবা
হতো মধ্য
আমেরিকায় তেমনটা
নয়।
চাষ ৩৬০০
বছর আগে
হলেও কোকো
একুয়েডরে ব্যবহার
শুরু হয়েছে
আরো অনেক
আগেই, ৫৩০০
বছর আগে।
ধারণা করা
হয়, বাণিজ্যের
মাধ্যমে উপকূল
ধরে ক্রিয়োল্লো
দক্ষিণ আমেরিকা
থেকে মেসো-আমেরিকায়
হাজির হয়েছিল।
শব্দের ব্যুত্পত্তি
গবেষকরা মনে
করেন চকোলেট
শব্দটি এসেছে
অ্যাজটেক ‘জোকোটল’
থেকে। অ্যাজটেক
শব্দ জোকোটলের
অর্থ কোকো
বিন থেকে
তৈরি একটি
তেতো পানীয়।
কোকো গাছের
বৈজ্ঞানিক নাম
থিওব্রোমা
কাকোয়া,
যার অর্থ
দেবতাদের খাবার।
মেসো-আমেরিকাতে
চকোলেটের ব্যবহারের
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য
নিদর্শন দেখা
যায় ক্ল্যাসিক
মায়া সভ্যতায়।
সময়কালটা মোটামুটি
৫০০ থেকে
৮০০ খ্রিস্টাব্দ।
মায়া সভ্যতার
অর্থনীতি, ধর্মীয়
আচার অনুষ্ঠান
এবং রাজনৈতিক
জীবনে চকোলেটের
বেশ গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রয়েছে।
এখনো মায়াদের
মধ্যে এর
বিশেষ গুরুত্ব
রয়েছে। মায়াদের
হায়ারোগ্লিফিক থেকে
জানা যায়,
তাদের মধ্যে
চকোলেটের নানা
রকম ব্যবহার
ছিল। এর
মধ্যে একটি
চিত্র বেশ
সাধারণ—রাজদরবারে
নববিবাহিত যুগলের
চকোলেট ড্রিংক
পান। গবেষকরা
সরেজমিনে দেখেছেন
এখনো মায়াদের
মধ্যে বিয়ের
আনুষ্ঠানিকতায় চকোলেটের
ব্যবহার আছে।
সাধারণ বীজ
বা ড্রিংক
চকোলেট হিসেবে
বরপক্ষ বিয়ের
সময় মেয়েপক্ষকে
উপহার দেয়।
স্প্যানিয়ার্ডরা হাজির
হওয়ার আগে
কোকাও বীজ
বা বিন
মুদ্রার একক
হিসেবেও ব্যবহূত
হতো। উপঢৌকন
দেয়ার ক্ষেত্রেও
এটি মূল্যবান
ছিল। কোকাও
সব জায়গায়
উৎপাদন হতো
না। বেশি
আর্দ্রতা থাকে
এমন এলাকায়
জন্মাত। সেখান
থেকে মায়া
জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন
এলাকায় পৌঁছে
যেত। কুয়েটজাল
পাখির পালকের
মতো কোকাও
ছিল গুরুত্বপূর্ণ
বাণিজ্য পণ্য।
উল্লেখ্য, ক্ষমতাবানরা
তাদের মাথায়
কুয়েটজাল পাখির
পালক গুঁজতেন।
মায়াদের চকোলেট
ব্যবহারের ইতিহাস
আরো অনেক
পুরনো। মায়াদের
বিশ্বাসমতে চকোলেট
মানুষের চেয়ে
পুরনো। তাদের
সৃষ্টি কাহিনী
পোপোল ভুতে
বলা আছে,
ভুট্টার সঙ্গে
চকোলেট এবং
আরো কিছু
উপাদান দিয়ে
মানুষের সৃষ্টি
হয়েছিল।
আজ যা
ইয়ুকাতান পেনিনসুল
নামে পরিচিত
সেখানে বসবাসরত
মায়াদের মধ্যেও
ক্ল্যাসিক্যাল যুগে
চকোলেটের ব্যবহার
ছিল। ষোড়শ
শতাব্দীর শুরু
দিকে ইয়ুকাতান
উপদ্বীপ দখল
করে নেয়
স্প্যানিয়ার্ডরা। ইউরোপীয়
বিবরণী থেকে
জানা যায়,
সে সময়
মায়াদের মধ্যে
বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে
চকোলেটের ব্যবহার
ছিল। এটা
স্থানীয়ভাবে প্লান্টেশনে
চাষ হতো,
আবার তাবাস্কো
ও হন্ডুরাস
থেকে আমদানিও
হতো। ১৫৬৬
সালে বিশপ
দিয়েগো দে
লান্ডার তার
লেখায় উল্লেখ
করেছেন কোকাও
বীজকে মুদ্রার
একক হিসেবে
ব্যবহার করা
হতো। কোকাও
প্লান্টেশনের মালিকরা
তাদের মুয়ান
(এপ্রিলের শেষ
বা মে
মাসের শুরুতে)
মাসে বাণিজ্যের
দেবতাসহ অন্য
দেবতাদের উদ্দেশ্যে
বিশেষ ধর্মীয়
আচার-অনুষ্ঠান
পালন করত।
শিশু ও
বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানো
তরুণদের বিশেষ
এক অভিষেক
অনুষ্ঠানে পবিত্র
পানির সঙ্গে
চকোলেট ও
ফুল মিশিয়ে
ব্যবহার করা
হতো।
প্রাক-হিস্পানিক
যুগের মায়া
হায়ারোগ্লিফিকের (ড্রেসডেন
কোডেক্স) দৃশ্য
থেকে দেখা
যায়, দেবতা
কা’উইল
তার প্রসারিত
হাতে একটি
বাটিতে কোকাও
বীজ ধরে
আছেন। এ
রকম দৃশ্যের
সরাসরি নিদর্শনও
পাওয়া গেছে।
যেখানে এ
রকম বাটি
ও তাতে
কাড়ি খোদাই
করে তৈরি
কোকাও বীজের
মডেল দেখা
গেছে। মায়াদের
দেবতাদের সঙ্গে
কোকোর সম্পর্ক
নিয়ে এ
রকম আরো
অনেক নিদর্শন
পাওয়া যায়।
মায়াদের খোদাই
ও চিত্রকর্মে
কোকাও ও
কুয়েটজাল পাখির
মধ্যে সম্পর্কের
নানা দৃশ্য
দেখা যায়।
উদাহরণস্বরূপ মাদ্রিদ
কোডেক্সে দেখা
যায় বাতাস,
জীবন ও
ফুলের দেবতা
নিক একটি
কোকাও গাছে
পিঠ ঠেকিয়ে
বসে আছেন;
তার হাতে
আরেকটি কোকাও
গাছ ধরা।
দেবতার ওপর
একটি কুয়েটজাল
পাখি এবং
তার ঠোঁটে
কোকাও গাছের
একটি পাতা।
এ রকম
আরো কিছু
দৃশ্য মায়াদের
অঞ্চলে পাওয়া
গেছে। এগুলোর
আক্ষরিক অর্থ
এখনো উদ্ধার
করা সম্ভব
হয়নি। কিন্তু
একটা বিষয়
নিশ্চিত, দেবতাদের
সঙ্গে কোকাও
ও কুয়েটজাল
পাখির সম্পর্ক।
মাদ্রিদ কোডেক্সে
মায়া টেক্সট
থেকে জানা
যায়, বিয়েতে
বর ও
কনেপক্ষের মধ্যে
চকোলেট আদান-প্রদান
হতো। এটা
ছিল বিয়ের
অবশ্যপালনীয় রীতিগুলোর
একটি। গুয়াতেমালায়
মায়াভাষীদের মধ্যে
এখনো এ
রীতি-ঐতিহ্য
প্রচলিত আছে।
গুয়াতেমালার আলটা
ভেরাপাজ অঞ্চলে
বিয়ের প্রতিজ্ঞা
চকোলেট ভর্তি
একটা পাত্রে
সিল করে
দেয়া হয়।
সমসাময়িক ও
প্রাক-হিস্পানিক
মায়ারা কোকাও
পানীয় ব্যবহার
করত মধু
ও বীজের
চূর্ণ মিশিয়ে।
অ্যাজটেকরা একসময়
মেসো-আমেরিকার
কিছু অংশ
(মেক্সিকো ও
মধ্য আমেরিকার
কিছু অংশ)
দখল করে
নেয়, যেগুলো
ছিল মায়াদের
আবাস। এরপর
অ্যাজটেকরা মায়াদের
চকোলেট উৎপাদন
ও সম্পর্কিত
আচার-অনুষ্ঠানের
অনেক কিছুই
আপন করে
নেয়। অ্যাজটেকদের
দখলকৃত এলাকাগুলোর
মধ্যে ছিল
জোকোনোছো প্রদেশ,
যা তখনই
কোকাও উৎপাদন
ও উন্নতমানের
কোকাওয়ের জন্য
বিখ্যাত ছিল।
ওলমেক, মায়া
ও অ্যাজটেকরা
দেবতাদের প্রতি
চকোলেট উৎসর্গ
করতেন। আবার
সে সময়ে
অনেক পাণ্ডুলিপি
থেকে জানা
যায় কোকাওয়ের
শতাধিক ঔষধি
ব্যবহারের কথা।
এসবের মধ্যে
আছে দুর্বলদের
ওজন বৃদ্ধি,
স্নায়ুকে উজ্জীবিত
করা, হজমশক্তি
বৃদ্ধি। এছাড়া
তারা বিভিন্ন
ওষুধের সঙ্গে
চকোলেট পেস্ট
মিশিয়ে সেগুলোকে
সুস্বাদু করে
তুলত।
স্প্যানিয়ার্ড হের্নান্দো
কর্টেজ একসময়
মেক্সিকো দখল
করে নিয়েছিলেন।
তিনি যখন
প্রথম অ্যাজটেক
রাজা মন্টেজুমার
দরবারে যান
তখন দেখেছিলেন,
‘মেক্সিকান
স্টাইলে প্রায়
দুই হাজার
জগ তরল
চকোলেট রাখা’।
রাজা এবং
তার নাগরিকরা
চকোলেট খুবই
পছন্দ করতেন
এবং তাতে
নাকি ভ্যানিলা
ফ্লেভার ও
গোলমরিচ মেশানো
হতো। অনেক
সময় অ্যাজটেকদের
নিজস্ব মদের
সঙ্গেও মেশানো
হতো চকোলেট।
১৯৯৯ সালে
প্রকাশিত হয়
ইংরেজ লেখক
জোয়ান হ্যারিসের
উপন্যাস চকোলেট।
গল্পের মুখ্য
চরিত্র এক
সিঙ্গেল মাদার
ভিয়ানে রোচার।
তিনি একবার
হাজির হলেন
ফ্রান্সের এক
গ্রামে নিজের
চকোলেটারি চালু
করতে। তিনি
ছিলেন আলকেমিস্ট।
চকোলেট উৎপাদনের
প্রাচীন বিদ্যায়
তিনি ডুবে
গিয়েছিলেন। তিনি
লেখেন, ‘চকোলেট,
ভ্যানিলা, উত্তপ্ত
কপার আর
দারুচিনির মিলিত
ঘ্রাণ দারুণ
শক্তিশালী এবং
উন্মাদক; এ
যেন আমেরিকার
মাটির ঘ্রাণ;
রেইনফরেস্টের উত্তাপ
আর সুবাস।
অ্যাজটেকরা যেমন
তাদের পবিত্র
অনুষ্ঠানে করত
আমিও সেভাবে
ভ্রমণ করি।
মেক্সিকো, কলম্বিয়া,
ভেনেজুয়েলা। মন্টেজুমা,
কর্তেজ ও
কলম্বাসের দরবার।
দেবতাদের খাবার,
পাত্রে বুদবুদ
ওঠা—জীবনের
তেতো অমৃত।’
শানজিদ অর্ণব: লেখক ও সাংবাদিক





