তাহার বয়স
অনুমান করা
ভার - পঁচিশ
বৎসরের নিচে
তেমন পূর্ণায়ত
দেহ দেখা
যায় না;
পঁচিশ বৎসরের
উপর তেমন
যৌবনের লাবণ্য
কোথাও পাওয়া
যায় না।
বয়স যাই
হউক - সে
স্ত্রীলোক পরম
সুন্দরী, সে
বিষয়ে কোন
সন্দেহ নাই।
এ সুন্দরী
কৃশাঙ্গী নহে
অথচ স্থূলাঙ্গী
বলিলেই ইহার
নিন্দা হইবে।
বস্তুত ইহার
অবয়ব সর্বত্র
ষোলোকলা সম্পূর্ণ
- আজি ত্রিস্রোতা
যেমন কূলে
কূলে পুরিয়াছে,
ইহারও শরীর
তেমনই কূলে
কূলে পুরিয়াছে।
তার উপর
বিলক্ষণ উন্নত
দেহ। দেহ
তেমন উন্নত
বলিয়াই স্থূলাঙ্গী
বলিতে পারিলাম
না। যৌবন-বর্ষার
চারি পোয়া
বন্যার জল,
সে কমনীয়
আধারে ধরিয়াছে
- ছাপায় নাই।
কিন্তু জল
কূলে কূলে
পুরিয়া টলটল
করিতেছে - অস্থির
হইয়াছে। জল
অস্থির, কিন্তু
নদী অস্থির
নহে; নিস্তরঙ্গ।
লাবণ্য চঞ্চল,
কিন্তু সে
লাবণ্যময়ী চঞ্চলা
নহে - নির্বিকার।
সে শান্ত,
গম্ভীর, মধুর
অথচ আনন্দময়ী;
সেই জোছনাময়ী
নদীর অনুষঙ্গিনী।
সেই নদীর
মতো, সেই
সুন্দরীও বড়
সুসজ্জিতা। এখন
ঢাকাই কাপড়ের
তত মর্যাদা
নাই - কিন্তু
একশত বৎসর
আগে কাপড়ও
ভালো হইত,
উপযুক্ত মর্যাদাও
ছিল। ইহার
পরিধানে একখানি
পরিষ্কার মিহি
ঢাকাই, তাতে
জরির ফুল।
তাহার ভিতর
হীরামুক্তাখচিত কাঁচুলি
ঝকমক করিতেছে।
হীরা, পান্না,
মোতি, সোনায়
সেই পরিপূর্ণ
দেহ মণ্ডিত;
জোছনা আলোকে
বড় ঝকমক
করিতেছে। নদীর
জলে যেমন
চিকিমিকি - এই
শরীরেও তাই।
জোছনার পুলকিত
স্থির নদীজলের
মতো - সেই
শুভ্র বসন;
আর জলে
মাঝে মাঝে
যেমন জোছনার
চিকিমিকি চিকিমিকি
- শুভ্র বসনের
মাঝে মাঝে
তেমনি হীরা,
মুক্তা, মোতির
চিকিমিকি। আবার
নদীর যেমন
তীরবর্তী বনচ্ছায়া,
ইহারও তেমনি
অন্ধকার কেশরাশি
আলুলায়িত হইয়া
অঙ্গের উপর
পড়িয়াছে।
শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসে নদীবক্ষে বজরার ছাদে পুরু গালিচার উপর উপবিষ্টা দেবী চৌধুরানীর এরূপ বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর এই বয়ানকে দেবী চৌধুরানীর ‘আইডিয়াল টাইপ’ হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে। অর্থাৎ, দেবী চৌধুরানী বাস্তবিকই এমন ছিলেন কিনা, সেটা এখানে মুখ্য নয়; বরং দেবী চৌধুরানীকে লোকে কিভাবে দেখতে চায়, সেটাই লেখক এখানে উপস্থাপন করেছেন। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সাহিত্যিকের রচনায় ঘটে জনমানসের যথার্থ প্রতিফলন। ঔপনিবেশিক শোষণ ও স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে নেতৃস্থানীয় ফকির ও সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে দরিদ্র কৃষক, বেকার কারিগর এবং দলচ্যুত সৈনিকদের সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক প্রতিবাদ হিসেবে ইংরেজি ১৭৬০ সালের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৮০০ সাল পর্যন্ত সময়ে পূর্ণিয়া, মালদহ, ঢাকা, দিনাজপুর, রংপুর, কুচবিহার এবং মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে জারি থাকা সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ যে কয়েকজন কিংবদন্তির জন্ম দেয়, তাঁদের মধ্যে ফকিরদের পক্ষে ফকির মজনু শাহ ও চেরাগ আলী শাহ, আর সন্ন্যাসীদের পক্ষে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানী অন্যতম। দেবী চৌধুরানী সম্পর্কে ইতিহাসে নিরেট তথ্যের স্বল্পতা হেতু তাঁকে ঘিরে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি এবং ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। ঐতিহাসিক গৌতম কুমার দাস তাঁর ‘হিস্টরিক্যাল প্রেজেন্স অব দেবী চৌধুরানী অ্যান্ড দ্য দেন সোসাইটাল স্ট্রাকচার অব রংপুর, বাংলাদেশ’ নামক একটি গবেষণাপত্রে দেবী চৌধুরানী সম্পর্কে প্রাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাঁর মতে, আঠারোশ শতকে সুবা বাংলার রংপুর বিভাগে অন্তত বারো জন ‘দেবী চৌধুরানী’ ছিলেন, যাঁদেরকে ১৭৮৩ সালে রংপুরে সংঘটিত কৃষক আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। এই বারো জনের মধ্যে আবার তিন জনের নামের মধ্যে বেশ মিল দেখা যায় এবং তাঁরা প্রায় কাছাকাছি সময়েই রংপুরের বিভিন্ন অঞ্চলের জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এঁদের মধ্যে জয়দূর্গা দেবী চৌধুরানী ১৭৬৫ সালে মন্থনা (পীরগাছা) এবং জগদীশ্বরী জয়দুর্গা দেবী চৌধুরানী ১৭৭৯ সালে বামনডাঙ্গা জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আরেক জয়দুর্গা দেবী চৌধুরানীও এই সময়ে ঘোড়াঘাট (বর্ধনকোট) অঞ্চলের জমিদার হিসেবে আবির্ভুত হন। এখানে ‘বারো’ সংখ্যাটি তাত্পর্যপূর্ণ। এটি অনির্দিষ্ট সংখ্যা হিসেবে ব্যবহূত হতে পারে। অর্থাৎ, দেবী চৌধুরানীর সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। তত্কালে প্রায় সকল জমিদার তাদের বংশীয় পদবী নির্বিশেষে ‘রায় চৌধুরী’ খেতাব ধারণ করতেন, আর তাদের স্ত্রীরা ‘দেবী চৌধুরানী’ সম্বোধনে সম্বোধিত হতেন। রাজাদের অকাল মৃত্যু, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে এ সকল দেবী চৌধুরানী সরাসরি কিংবা রাজার নাবালক উত্তরাধিকারির পক্ষে দায়িত্ব গ্রহণ করে জমিদারি পরিচালনা করতেন। একই সময়ে এত অধিক সংখ্যক দেবী চৌধুরানীর উপস্থিতি আসল দেবী চৌধুরানীকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকদের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
তত্কালীন সরকারি নথিপত্রে, রংপুরের প্রশাসক রিচার্ড গুডল্যাড এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাপতি লেফটেন্যান্ট ব্রেনানের বিভিন্ন চিঠিপত্রে সন্ন্যসীদের নেতা ভবানী পাঠকের সাথে সম্পৃক্ত একজন ‘দেবী চৌধুরানী’র উল্লেখ পাওয়া যায়। স্রেফ এতটুকুই। এই ‘দেবী চৌধুরানী’ ঠিক কোন জন তাঁর বিশদ পরিচয় আর পাওয়া যায় না। ইতিহাসের এসব গোলযোগ এবং তথ্যের অপ্রাপ্যতা হেতু ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহে যে ফাঁক ফোকর তৈরি হয়, তা পূরণে তৈরি হয় কিংবদন্তি। এছাড়াও বিজ্ঞানসম্মত ঐতিহাসিক গবেষণালব্ধ ফলাফলের সমান্তরালে গণ মানুষের বিচিত্র সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে জন্ম নেয় নানা ধরনের কিংবদন্তি। অর্থাৎ, একই ব্যক্তি কিংবা ঘটনার ঐতিহাসিক সত্য আর কিংবদন্তি আলাদা হতে পারে। কিছু ইতিহাস, কিছু কিংবদন্তির মিশেলে দেবী চৌধুরানীর যে রূপটি মোটামুটি দাঁড়িয়েছে তা হল- আঠারো শতকের শেষ ভাগে দুর্ভিক্ষ পীড়িত বাংলার এক সন্ধিক্ষণে, যখন মুসলমান শাসনের সূর্য অস্তমিত, ইংরেজ রাজত্বের সূচনা লগ্নে যথাযথ আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনুপস্থিতিতে দেশে বিরাজিত এক অরাজক অবস্থা, সেই ক্রান্তিকালে বৃহত্তর রংপুরের কোন একটি অঞ্চলের প্রজা বৎসল জমিদার হিসেবে প্রকাশ ঘটে দেবী চৌধুরানীর, গরিব কৃষক প্রজাদের উপর ইংরেজদের প্রতিনিধি অত্যাচারি ইজারাদার রাজা দেবী সিংহের অন্যায় শোষণের মুখে যিনি ঢাল হয়ে অধিক খাজনা আদায়ের প্রতিবাদে বিদ্রোহের নিমিত্তে কৃষকদের মধ্যে সঞ্চার করেন ব্যাপক গণ জোয়ার, আর ইংরেজদের স্বার্থবিরোধী প্রজা হিতৈষী এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ যাঁর জমিদারি বাজেয়াপ্ত হয়, ফলত যাঁকে জমিদারি পুনরুদ্ধারের মামলার খরচ এবং গরিব প্রজাদের ভরণ পোষণের যোগান দেয়ার জন্য জঙ্গলে আত্মগোপন করে বিরাট দস্যু দল গঠন করে দস্যুবৃত্তিতে লিপ্ত হতে হয়, যেই সময়টাতে তাঁর সাথে মোলাকাত হয় সন্ন্যাসী নেতা ভবানী পাঠকের, রংপুরের তিস্তা নদীর অববাহিকা থেকে শুরু করে জলপাইগুড়ি অঞ্চলের করলা নদীর উভয় পাশে বিস্তৃত ঘন জঙ্গলে বিস্তৃত ছিল তাঁর সাম্রাজ্য, যেখানে তিনি নদীপথে বজরা যোগে, বিপুল পাইক বরকন্দাজ সহযোগে আনাগোনা করতেন, আর সুযোগ বুঝে এসব এলাকার অত্যাচারি বিত্তবান লোকেদের সম্পদ লুট করে রংপুর এবং জলপাইগুড়ির জঙ্গলের বিভিন্ন স্থানে দরবার বসিয়ে লুণ্ঠিত সম্পদ গরিব দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। মোট কথা, অতুলনীয় দান, অনন্য রূপ, গুণ, বুদ্ধিমত্তা, শক্তি, সাহস, প্রজা তোষণ- যাবতীয় মহান গুণে গুণান্বিতা দেবী চৌধুরানী হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ প্রজাদের ‘মসীহা’। সার্বিক দিক বিবেচনায় এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, ব্যক্তি দেবী চৌধুরানী এখানে মুখ্য নন, বরং দেবী চৌধুরানীর নামে বহু গুণে ফুলে ফেঁপে ছড়িয়ে পড়া যে কিংবদন্তি, সেটিই কৃষকদের আন্দোলনে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। ‘দেবী চৌধুরানী’ নামের জোশ বা জযবা, তাঁর প্রায় অলৌকিক কর্মকাণ্ডের প্রচার, এসবই এই আন্দোলনে প্রেরণা যুগিয়েছে। সংকট কালে লড়াইয়ে যখন কোন জনগোষ্ঠীর নিজের শক্তিতে কুলোয় না, তখন তাকে কিংবদন্তির উপর নির্ভর করতে হয়। কিংবদন্তি ছাড়া কোন জাতি টিকে থাকতে পারে না। যে জাতির কিংবদন্তি যত সমৃদ্ধ, সে জাতি তত শক্তিশালী। কোন জাতির নিজস্ব কিংবদন্তি না থাকলে, তবে তাকে তা ধার করতে হয়। কিংবদন্তি ব্যতীত কোন জাতি কল্পনা করা অসম্ভব। সমসাময়িক বাস্তবতার অনুকূলে যথাযথ কিংবদন্তি না থাকলে, তা তৈরি করে নিতে হয়। রংপুরে সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ এবং কৃষক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সেখানকার জনগোষ্ঠীর সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতায় তৈরি হওয়া এমনই একটি কিংবদন্তি হল ‘দেবী চৌধুরানী’। রক্ত মাংসের দেবী চৌধুরানী, হতে পারেন তিনি কোন সাধারণ নারী, কোন জমিদার পত্নী, অথবা নিজেই হয়তো জমিদার - এতে কোন ফারাক হয় না; কিংবদন্তির দেবী চৌধুরানী হওয়া চাই মজবুত, সর্বগুণ ও সর্বশক্তি সম্পন্না হয়ে যিনি দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন করবেন। ব্যক্তি দেবী চৌধুরানী দিয়ে বিদ্রোহীদের কোন কাজ ছিল না, বরং তাদের প্রয়োজন ছিল একটি ‘আইডিয়াল টাইপ’ বা একজন ‘আদর্শ রাজা’, যিনি এক সর্বব্যাপী ক্ষমতা নিয়ে আন্দোলনে শক্তি যুগিয়ে যাবেন। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেইবারের ‘আইডিয়াল টাইপ’ এবং দার্শনিক প্লেটোর ‘দার্শনিক রাজা’র ভিত্তিতে দেবী চৌধুরানীকে নিয়ে তৈরি হয় বিচিত্র সব কিংবদন্তি, যা আন্দোলনকারীদের দিয়েছিল অনুপ্রেরণা, আর অত্যাচারি ব্রিটিশ রাজ ও তাদের দোসরদের বুকে ধরিয়েছিল কাঁপন। একজন নারীকে ঘিরে এই কিংবদন্তি তৈরি হওয়ার নেপথ্যে আবহমান বাঙ্গালি সংস্কৃতির মাতৃভক্তি, মাতৃপূজার যে চেতনা তা ক্রিয়াশীল থাকতে পারে। ইতিহাসে পাওয়া দেবী চৌধুরানীদের ‘জয়দুর্গা’, ‘জগদীশ্বরী জয়দুর্গা’ নাম সমূহ এই ক্ষেত্রে বেশ ইঙ্গিতবহ। এগুলো তাঁদের আসল নাম নাও হতে পারে। সাধারণ কৃষক প্রজাদের নিকট দেবী চৌধুরানী মা দুর্গার অবতার, ইংরেজদের দোসর ইজারাদার অসুরদের বধ করে সন্তানদের উদ্ধার করতে যাঁর আবির্ভাব।
সন্ন্যাসীদের কাছে তিনি কালীর রূপান্তর। সাধারণ সম্বোধনে সকলের নিকট তিনি ‘মা’। দেবী চৌধুরানী সম্পর্কে এ সকল আধাখেঁচড়া ইতিহাস আর বিচিত্র কিংবদন্তির সার্থক উপস্থাপন ঘটেছে বঙ্কিমের দেবী চৌধুরাণী উপন্যাসে। সম্পূর্ণ উপন্যাসটিকে তাই পাঠ করা যেতে পারে দেবী চৌধুরানীর একটি ‘আইডিয়াল টাইপ’ হিসেবে। উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র ভবানী পাঠক এই ‘আইডিয়াল টাইপ’ বা ‘দার্শনিক রাজা’রই প্রতীক্ষায় ছিলেন। উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহে তাঁর সাথে প্রফুল্লের (উপন্যাসে দেবী চৌধুরাণীর নাম) পরিচয় ঘটার পর শিষ্য রঙ্গরাজের সাথে তাঁর এই কথোপকথনে তা পরিষ্কার হয় - ভবানী তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘রঙ্গরাজ! এখানে কেন?’ রঙ্গরাজ বলিল, ‘আপনার সন্ধানে। আপনি এখানে কেন?’
ভ। যা এতদিন সন্ধান করিতেছিলাম, তাহা পাইয়াছি।
রঙ্গ। রাজা?
ভ। রানি।
রঙ্গ। রাজা রানি আর খুঁজিতে হইবে না। ইংরেজ রাজা হইতেছে। কলিকাতায় নাকি হস্টিন (ওয়ারেন হেস্টিংস) বলিয়া একজন ইংরেজ ভালো রাজ্য ফাঁদিয়াছে।
ভ। আমি সেরকম রাজা খুঁজি না। আমি খুঁজি যা, তা তো তুমি জানো।
রঙ্গ। এখন পাইয়াছেন কি?
ভ। সে সামগ্রী পাইবার নয়, তৈয়ার করিয়া লইতে হবে। জগদীশ্বর লোহা সৃষ্টি করেন, মানুষ কাটারি গড়িয়া লয়। ইস্পাত ভালো পাইয়াছি; এখন পাঁচ - সাত বৎসর ধরিয়া গড়িয়া শাণিতে হইবে।...
ভবানী পাঠকের ‘সেই সামগ্রী পাইবার নয়, তৈয়ার করিয়া লইতে হবে’ উক্তিটিকে অনায়াসে কিংবদন্তি নির্মাণের সমার্থক রূপে পাঠ করা যেতে পারে। ভবানী পাঠক এখানে গণ মানুষের রূপক। সেই নির্মাণ প্রক্রিয়া কেমন ছিল তা উপন্যাসের এই অংশ থেকে আমরা ধারণা লাভ করতে পারি—প্রফুল্লের শিক্ষা আরম্ভ হইল। নিশি ঠাকুরানি, রাজার ঘরে থাকিয়া, পরে ভবানী ঠাকুরের কাছে লেখাপড়া শিখিয়াছিলেন - বর্ণশিক্ষা, হস্তলিপি, কিঞ্চিৎ শুভঙ্করী আঁক প্রফুল্ল তাঁহার কাছে শিখিল। তারপর পাঠক ঠাকুর নিজে অধ্যাপকের আসন গ্রহণ করিলেন। প্রথমে ব্যাকরণ আরম্ভ করাইলেন। আরম্ভ করাইয়া দুই - চারি দিন পড়াইয়া অধ্যাপক বিস্মিত হইলেন। প্রফুল্লের বুদ্ধি অতি তীক্ষ, শিখিবার ইচ্ছা অতি প্রবল - প্রফুল্ল বড় শীঘ্র শিখিতে লাগিল।...ব্যাকরণ কয়েক মাসে অধিকৃত হইল। তারপর প্রফুল্ল ভট্টিকাব্য জলের মত সাঁতার দিয়া পার হইয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে অভিধান অধিকৃত হইল। রঘু, কুমার, নৈষধ, শকুন্তলা প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ অবাধে অতিক্রান্ত হইল। তখন আচার্য একটু সাংখ্য, একটু বেদান্ত এবং একটু ন্যায় শিখাইলেন। এ সকল অল্প অল্প মাত্র। এই সকল দর্শনে ভূমিকা করিয়া, প্রফুল্লকে সবিস্তারে যোগশাস্ত্রাধ্যয়নে নিযুক্ত করিলেন; এবং সর্বশেষে সর্বগ্রন্থ শ্রেষ্ঠ শ্রীমদ্ভগবদগীতা অধীত করাইলেন। পাঁচ বৎসরে শিক্ষা সম্পূর্ণ হইল।
এছাড়াও শয়ন, বসন, স্নান, নিদ্রা, আহার - এই সকল বিষয়ে নানা রূপ কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে এই পাঁচ বছরে ভবানী পাঠক প্রফুল্লকে গড়ে তুলেছিলেন। সর্বশেষ তিনি তাঁকে মল্লযুদ্ধে পারদর্শী করে তুললেন। আর এই উপায়ে ভবানী পাঠক মূলত একটি কিংবদন্তি নির্মাণ করলেন, যার প্রয়োজন তিনি তখনকার প্রেক্ষাপটে উপলব্ধি করেছিলেন। প্রফুল্লের শিক্ষা সম্পূর্ণ হওয়ার পর তিনি তাঁকে তাঁর দস্যু দলের সাথে ঘুরে বেড়াতে বলেন দেবী চৌধুরানী হয়ে ওঠার জন্য। প্রকৃত অর্থে, তিনি একটি কিংবদন্তিই চালু করেন তাঁর ডাকাত বাহিনীর মাঝে, যা কালক্রমে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মনের মন্দিরে তিনি দেবী চৌধুরানীর মাতৃমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। শিষ্যদের তিনি বলেন, ‘এই বালিকাকে তোমরা চিনিয়া রাখ। ইহাকে আমি মা বলিয়াছি। ইহাকে তোমরা সকলে মা বলিবে এবং মা’র মত দেখিবে। তোমরা ইহার কোন অনিষ্ট করিবে না, আর কাহাকেও করিতে দিবে না।...’ দেবী চৌধুরানী ডাকাতি করেছেন কি করেন নাই, সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়, যে দিকটা খেয়াল করতে হবে তা হল, দেবী চৌধুরানীর মূর্তিকে সামনে রেখে ‘ডাকাইত’ তথা সন্ন্যাসী বিদ্রোহীদের দল তাদের কাজ আদায় করে নিয়েছিল। উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ডের দশম পরিচ্ছেদে দেবী চৌধুরানীকে বলা ভবানী পাঠকের কিছু কথা এখানে তুলে ধরা হল— ‘...দেশ অরাজক, দেশে রাজশাসন নাই, দুষ্টের দমন নাই; যে যার পায়, কাড়িয়া খায়। আমরা তাই তোমায় রানি করিয়া রাজশাসন চালাইতেছি। তোমার নামে আমরা দুষ্টের দমন করি, শিষ্টের পালন করি।...আর কাহাকেও এ রাজ্য সাজে না। আর কাহারো অতুল ঐশ্বর্য নাই-তোমার ধন দানে সকলেই তোমার বশ।...কেবল তোমার ধনেই কি সকলেই তোমার বশ? তুমি রূপে যথার্থ রাজরানি-গুণে যথার্থ রাজরানি। অনেকে তোমাকে সাক্ষাৎ ভগবতী বলিয়া জানে-কেননা তুমি সন্ন্যাসিনী, মা’র মতো পরের মঙ্গল কামনা কর, অকাতরে ধন দান কর, আবার ভগবতীর মত রূপবতী। তাই আমরা তোমার নামে এ রাজ্য শাসন করি - নহিলে আমাদের কে মানিত?...’
শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসটি প্রকাশ করেন ১৮৮২ সালে, তথা সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের প্রায় একশ বছর পরে। তত দিনে ভারতবর্ষে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ সহ ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে এবং পরবর্তী আন্দোলন সমূহ ঘটার প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছে। এ থেকে অন্তত দুই ধরনের ধারণা করা যেতে পারে - এক. দেবী চৌধুরানীর কিংবদন্তি নির্মাণ সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের সমসাময়িক কালেই সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল, অথবা, দুই. সেই সময়ের কিছু সুতা ধরে সিপাহী বিদ্রোহ সহ ভারতীয় জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ ঔপনিবেশিকতা বিরোধী পরবর্তী আন্দোলন সমূহের সংঘটন কালে অনুপ্রেরণাদায়ী অন্যতম চরিত্র হিসেবে দেবী চৌধুরানীর কিংবদন্তি নির্মাণ সম্পন্ন হয়ে, কালে কালে আরো কিছু কিছু বিয়োজন যোজনের মাধ্যমে এই পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে।
নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক






