পটভূমিকা
ইংলন্ডের পার্লামেণ্টে দাঁড়াইয়া এডমণ্ড বার্ক রংপুর ও দিনাজপুরে ‘যাহার পৈশাচিক তাণ্ডবের কাহিনী বর্ণনা করিতে করিতে এইরূপ উত্তেজিত হইয়া উঠিয়া ছিলেন যে, আর অধিক দূর অগ্রসর হইতে পারেন নাই,’ ইংরেজ শাসকগণের লুণ্ঠনের সেই অংশীদার এবং গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস-এর প্রিয় সুহূদ দেবী সিংহের অবর্ণনীয় শোষণ-উত্পীড়নের প্রত্যক্ষ পরিণতি হইল ১৭৮৩ খ্রীষ্টাব্দের রংপুর-বিদ্রোহ। তত্কালে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র রাজস্বের ইজারাদার শয়তানতুল্য দেবী সিংহের অত্যাচারে ও অবাধ লুণ্ঠনে উত্তর-বঙ্গ অসহায় কৃষকের হাহাকারে পূর্ণ হইয়াছিল, রংপুর দিনাজপুর প্রভৃতি জেলা শ্মশানে পরিণত হইয়াছিল। কোম্পানির বাংলা ও বিহারের দেওয়ানী লাভের পর সমগ্র বঙ্গদেশ ও বিহারে যে অবর্ণনীয় অরাজকতা দেখা দিয়াছিল তাহার প্রধান কারণ ছিল দেবী সিংহের লুণ্ঠন ও উত্পীড়ন।
দেবী সিংহ ছিল পশ্চিম-ভারতের পানিপথের নিকটবর্তী এক গ্রামের বৈশ্য সম্প্রদায়ের লোক। এই ব্যক্তি ব্যবসা উপলক্ষে ভাগ্যান্বেষণে মুর্শিদাবাদে উপস্থিত হইয়া উেকাচ দ্বারা তত্কালের বাংলা দেশের ইংরেজ রাজের নায়েব-দেওয়ান মহম্মদ রেজা খাঁর সহিত পরিচিত হয়। রেজা খাঁর কৃপায় দেবী সিংহ প্রথমে পূর্ণিয়ার ইজারা এবং তৎসঙ্গে উক্ত প্রদেশের শাসনভার লাভ করে১। দেবী সিংহ পূর্নিয়ার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব লাভ করিয়া নিজ মূর্তি ধরাণ করে এবং সুযোগ পাইয়া প্রজাদের যথাসর্বস্ব কাড়িয়া লইতে থাকে। তাহার অত্যাচারে পূর্ণিয়ার কৃষকগণ ঘরবাড়ী ছাড়িয়া বনে-জঙ্গলে পলায়ন করিয়া প্রাণ বাঁচায়। অল্পকালের মধ্যে সমগ্র প্রদেশ প্রায় জনশূন্য হইয়া ধ্বংসের মুখে আসিয়া উপস্থিত হয়। পূর্বে নয় লক্ষ টাকায় পূর্নিয়ার ইজারা বন্দোবস্ত হইত। কিন্তু সুজন্মার বৎসরেও কোনো কালে ছয় লক্ষের অধিক টাকা আদায় করা সম্ভব হয় নাই। অথচ দেবী সিংহ তাহার ইংরেজ প্রভুদের সন্তুষ্ট করিবার জন্য ষোল লক্ষ টাকার বন্দোবস্তে পূর্ণিয়ার ইজারা গ্রহণ করিয়াছিল। এই ষোল লক্ষ টাকা আদায় করিবার জন্য দেবী সিংহ পূর্ণিয়া জেলা জনমানবহীন শ্মশানে পরিণত করে। এই অসহনীয় শোষণ-উত্পীড়নের ফলে যখন চারিদিকে কৃষক-বিদ্রোহ আরম্ভ হয়, তখন ইংরেজ শাসকগণের টনক নড়িয়া উঠে। হেস্টিংস কতৃর্ক দেবী সিংহ ১৭৭২ খ্রীষ্টাব্দে পদচ্যুত হয়। কিন্তু দেবী ছাড়িবার পাত্র নহে। তাহার উেকাচে হেস্টিংস বশীভূত হন। এই সময় হেস্টিংস নিজের সুবিধা মত কয়েকজন অনভিজ্ঞ ইংরেজ যুবককে লইয়া মুর্শিদাবাদে ‘প্রাদেশিক রেভিনিউ-বোর্ড’ গঠন করেন। দেবী সিংহ সেই বোর্ডের সহকারী কার্যাধ্যক্ষের পদে নিযুক্ত হয়। দেবী সিংহ সুযোগ বুঝিয়া বিপুল অর্থ উেকাচ দিয়া এবং বোর্ডের সভ্যদের জন্য একটি নর্তকী-সমাজ গঠন করিয়া বোর্ডের সভ্যদের বশীভূত করে। এইভাবে দেবী সিংহ প্রকৃতপক্ষে বাংলার রাজস্বের কর্তা হইয়া বসে২।
এই সুযোগ দেবী সিংহ রাজস্ব সংক্রান্ত যাবতীয় কার্য নিজের হাতে লইয়া অর্থোপার্জনের চেষ্টা করিতে থাকে। দেবী নিজ নামে বা বেনামীতে বিভিন্ন স্থানের জমিদারীর ইজারার বন্দোবস্ত করিয়া লয় এবং নানারূপ প্রতারণার সাহায্যে তাহার নিজের সম্পত্তি বাড়াইতে থাকে। ক্রমে ক্রমে মুর্শিদাবাদ প্রদেশের রাজস্ব কোম্পানির ভান্ডারে জমা না হইয়া তাহার নিজের সম্পত্তির সহিত এক হইয়া যাইতে থাকে। এই অবস্থা চরম সীমায় পৌঁছিলে শাসকগণের চৈতন্যোদয় হয়। যখন চারিদিক হইতে দেবী সিংহকে পদচ্যুত করিবার দাবি উঠে, তখন হেস্টিংস উেকাচে বশীভূত হইয়া তাহাকে বাঁচাইবার জন্য ‘রেভিনিউ-বোর্ড’ ভাঙ্গিয়া দেন এবং দেবী সিংহকে দিনাজপুর, রংপুর প্রভৃতি অঞ্চলের ইজারা দান করেন। হেস্টিংস তাহাকে মাসিক এক হাজার টাকা বেতনে দিনাজপুরে নাবালক রাজার দেওয়ান নিযুক্ত করিয়া তাহাকে মুর্শিদাবাদ হইতে সরাইয়া দেন। তখন হইতে দিনাজপুর ও রংপুরই রইল দেবী সিংহের শোষণ উত্পীড়নের প্রধান রঙ্গভূমি।
দিনাজপুরের দেওয়ানী লাভ করিবার পরের বৎসরই দেবী সিংহ দিনাজপুর, রংপুর ও এদ্রাকপুর পরগনার ইজারা বন্দোবস্ত করিয়া লইল। ইহার পর ‘হরেরাম নামক এক পিশাচ প্রকৃতির মানুষ্য তাহার সহকারী নিযুক্ত হইয়া দেশমধ্যে ভয়াবহ কান্ডের ক্রীড়া দেখাইতে লাগিল। কি জমিদার, কি প্রজা, কি পুরুষ, কি স্ত্রী—কাহারও বিন্দুমাত্র নিষ্কৃতি ছিল না। এরূপ লোমহর্ষক অত্যাচার কেহ কখনও দেখে নাই, কেহ কখনও শুনে নাই।’৩
ইজারা গ্রহণ করিয়াই দেবী সিংহ জমিদার ও অন্যান্য ভূম্বামীদের উপর আবিশ্বাস্য হারে কর স্থাপন করিল। সেই হারে কর দেওয়া সকলেরই শক্তির বাহিরে, এমন কি ঘরবাড়ী বিক্রয় করিয়াও তাহা দেওয়া সম্ভব হইত না। সুতরাং সেই কর আদায়ের জন্য সকলের উপর অমানুষিক উত্পীড়ন আরম্ভ হইল। জমিদারগণ জমি হারাইল, আর সেই জমি দেবী সিংহ নামমাত্র মূল্যে কিনিয়া রাখিতে লাগিল। এমনকি ‘লাখেরাজ’ (নিষ্কর) জমিও বাজেয়াপ্ত হইল। কর আদায়ের জন্য প্রজাদের স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি বিক্রয় করা হইল। তত্কালে রংপুর ও দিনাজপুরে অনেক স্ত্রী-জমিদার ছিলেন।৪
তাহাদের জমিদারী বিক্রয় হইল এমনকি তাহাদের অলঙ্কার প্রভৃতি মূলবান জিনিসপত্রও বাদ গেল না। ইহার সঙ্গে সঙ্গে নিরীহ চাষীদের উপরেও অত্যাচারের স্রোত বহিল। দেবী সিংহ ও তাহার অনুচরগণ চাষীদের যথাসর্বস্ব কাড়িয়া লইয়া তাহাদের পথের ভিখারী করিল, তাহারা প্রাণের দায়ে বনে-জঙ্গলে আশ্রয় লইতে লাগিল। চাষীদের অবস্থা সম্বন্ধে স্বয়ং দেবী সিংহ লিখিয়াছে:
‘ইহা অত্যন্ত বিড়ম্বনার বিষয় যে, বাংলার অন্যান্য স্থান অপেক্ষা রংপুর প্রদেশের কৃষকদের মধ্যেই অধিক অন্নকষ্ট উপস্থিত হইয়াছে, শস্য কাটার সময় ব্যতীত অন্য কোন সময় তাহাদের ঘরে কোনরূপ সম্পদ পাওয়া যায় না। কাজেই তাহাদিগকে অন্য সময়ে অতিকষ্টে আহারের উপায় করিতে হয়, এবং এই জন্য দুর্ভিক্ষে বহুসংখ্যক লোক কাল-কবলে পতিত হইতেছে। দুই-একটি মৃৎ পাত্র ও এক একখানি পর্ণকুটীর মাত্র তাহাদের সম্বল, ইহাদের সহস্রখানী বিক্রয় করিলেও দশটি টাকা পাওয়া যায় কিনা সন্দেহ।’৫
কিন্তু এই হতভাগ্য পর্ণকুটীর-বাসী চাষীরাও দেবী সিংহের কবল হইতে নিষ্কৃতি পাইল না। ‘কৃষকগণ খাজনার দায়ে দলে দলে শৃঙ্খলাবদ্ধ হইয়া কারাগারে প্রেরিত হইল, অবিরত বেত্রাঘাতে তাহাদের দেহ ক্ষত-বিক্ষত হইল। অধিকাংশ কৃষক পলায়ন করিয়া বনে-জঙ্গলে আশ্রয় লইল। ক্রমে ক্রমে সমস্ত দেশ মহাশ্মশানের ন্যায় হইয়া উঠিল। যাহারা অবশিষ্ট রহিল তাহাদের নিকট হইতে সমস্ত টাকা আদায়ের চেষ্টা হইল।’৬
‘শুনিলে হূত্কম্প উপস্থিত হয় যে, সেই সকল মহাজন বিপন্ন কৃষকদের নিকট হইতে শতকরা বার্ষিক ছয় টাকা সুদ আদায় করিয়াছিল। এক দিকে দেবী সিংহের, অন্যদিকে কুসীদ-জীবিগণের ভীষণ শোষণ-উত্পীড়নে সেই নিরীহ প্রজাগণ প্রতিনিয়ত উর্দ্ধমূখে ভগবানকে আহ্বান করিত। তাহাদের কঠোর পরিশ্রমোৎপাদিত শস্যরাশি বলপূর্বক বাজারে লইয়া গিয়া এক-চতুর্থাংশেরও কম মূল্যে বিক্রয় করা হইতে লাগিল, হতভাগ্যদের সম্বৎসরের আহার অপহূত হইল, আর তাহাদের ঋণের বোঝা বাড়িতেই লাগিল। অবশেষে তাহাদের লাঙ্গল, বলদ, মই প্রভৃতি বিক্রয় করা হইল। এই রূপে তাহাদের ভবিষ্যৎ শস্যৎপাদনের পথও রুদ্ধ হইল। ইহার পর হইতে তাহাদের জীর্ণ পর্ণকুটীর লুণ্ঠন করিয়া দেবী সিংহের অনুচরগণ সেই সকল পর্ণকুটীর অগ্নিমুখে সমর্পণ করিয়া চলিয়া যাইত। এতদিন যাহারা শত কষ্ট স্বীকার করিয়াও আপনাদের আশ্রয়-স্থান ত্যাগ করে নাই, এক্ষণে তাহার বাধ্য হইয়া বন্য পশুর ন্যায় বনে বনে ভ্রমণ করিতে লাগিল।...পিতা পুত্রকে বিক্রয় করিল, স্বামী স্ত্রীকে চিরবিসর্জন দিল। গৃহস্থের সংসার ধ্বংস হইয়া গেল।’৭
এই সমস্ত ভীষণ অত্যাচারের দ্বারাও যখন চাষীদের নিকট হইতে আশানুযায়ী অর্থ-প্রাপ্তির কোনো সম্ভাবনা দেখা গেল না, তখন দেবী সিংহ রাজস্ব সংগ্রহের সুবিধা হইবে মনে করিয়া ক্রমান্বয়ে কর্মচারী পরিবর্তন করিতে লাগিল। ১৭৮১ খ্রীষ্টাব্দে কৃষ্ণপ্রসাদ নামক এক ব্যক্তি দেবী সিংহের দেওয়ান নিযুক্ত হয়, এই বৎসরই তাহাকে বিতাড়িত করিয়া হরেরামকে নিযুক্ত করা হয়। পর বৎসর দেবী সিংহের ভ্রাতা বাহাদুর সিংহ আসিয়া রাজস্ব সংগ্রহের ভার গ্রহণ করে এবং তাহাকে সাহায্য করিবার জন্য সূর্যনারায়ণ নামক এক ব্যক্তিকে নিযুক্ত করা হয়। যে যখনই নিযুক্ত হয় সে তখনই নিজ ক্ষমতার পরিচয় দিবার জন্য নতুন নতুন কর বসাইতে থাকে। কোন কোন সমসয় প্রকৃত খাজনা ব্যতীত অতিরিক্ত কর ও বাঁটা প্রভৃতির জন্য চাষীদিগকে প্রতি টাকায় আট আনা পর্যন্ত দিতে বাধ্য করা হইয়াছিল।৮
বিদ্রোহ
‘যখন চাষীদের উপর এই কর বৃদ্ধি ও তাহাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যার উপর পাশবিক অত্যাচার অবাধে চলিতে লাগিল, যখন তাহারা বন্য পশুর মত দলে দলে বনে বনে ভ্রমণ করিয়াও অত্যাচারের হস্ত হইতে নিষ্কৃতি পাইল না, চক্ষুর সম্মুখে নিজেদের কুটীর ও যথাসর্বস্ব অগ্নিমুখে ভষ্মীভূত হইতে লাগিল, তখন আর তাহারা স্থির থাকিতে পারিল না। কাজেই এই সমস্ত ভীষণ অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া উত্তর-বঙ্গের প্রজাগণ দলবদ্ধ হইয়া ব্যাপক বিদ্রোহ আরম্ব করিল।৯
“দিনজপুরের কুখ্যাত ইজারাদার ‘রাজা’ দেবী সিংহের ভয়াবহ শোষণ-উত্পীড়নের ফলে এই অঞ্চলে ১৭৮৩ খ্রীষ্টব্দে কৃষকদের সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটিয়াছিল।”১০
ইরজারাদার দেবী সিংহের অবর্ণনীয় শোষণ-উত্পীড়নের ফলে দীর্ঘকাল হইতে কৃষকদের মধ্যে যে ক্রোধ পুঞ্জীভূত হইয়া উঠিয়াছিল, তাহা ১৭৮২ খ্রীষ্টাব্দের শেষভাগে ধূমায়িত হইয়া উঠে। উত্তর-বঙ্গের কৃষক অনিবার্য ধ্বংস হইতে আত্মরক্ষার শেষ উপায় হিসাবে ইংরেজ বণিকরাজের শোষণ ও শাসণ-ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা উড্ডীন করে। সমগ্র উত্তর-বঙ্গ জুড়িয়া এক প্রচন্ড আলোড়ন আরম্ভ হইয়া যায়।
১৭৮৩ খ্রীষ্টাব্দের শেষভাগে সমগ্র উত্তর-বঙ্গ ব্যাপিয়া কৃষকদের সভা-সমিতি হইতে লাগিল। কৃষকগণ ইংরেজ অনুচর দেবী সিংহের শোষণ-উত্পীড়নের প্রতিশোধ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল। রংপুরের কালেক্টরের নিকট তাহাদের দাবি সম্নন্ধে একখানি আবেদন-পত্র পেশ করিয়া এই দাবি পূরণের জন্য সময় নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হইল। কিন্তু কালেক্টর দাবি পূরণের জন্য কোনো চেষ্টাই করিলেন না। ইহার পর কৃষকগণ সশস্ত্র বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল। তাহারা কালেক্টরকে জানাইয়া দিল, তাহারা আর খাজনা দিবে না এবং এই শাসন মানিয়া চলিতেও প্রস্তুত নহে। বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকগণ সকলে সমবেতভাবে নূরুলউদ্দিন নামক এক ব্যক্তিকে তাহাদের পরিচালক নির্বাচত করিয়া তাহাকে ‘নবাব’ বলিয়া ঘোষনা করিল।১১
নূরুলউদ্দিন উত্তর-বঙ্গের কৃষকদের এই বিদ্রোহের পরিচালনার ভার গ্রহণ করিয়া দয়া শীল নামক একজন প্রবীণ কৃষককে তাহার দেওয়ান নিযুক্ত করিলেন। নূরুলউদ্দিন এক ঘোষণাপত্রের দ্বারা দেবী সিংহকে কর না দিবার জন্য আদেশ জারি করিলেন এবং বিদ্রোহের ব্যয় সঙ্কুলনের জন্য কৃষকদের উপর ‘ডিং খরচা’ নামে বিদ্রোহের চাঁদা ধার্য করিলেন। এইরূপে উত্তর-বঙ্গের সমস্ত হিন্দু-মুসলমান কৃষক একত্র মিলিত হইয়া দেবী সিংহের বর্বরসুলভ শোষণ-উত্পীড়নের প্রতিশোধ গ্রহণ ও এই অঞ্চল হইতে ইংরেজ শাসনের মুলোচ্ছেদ করিবার জন্য প্রস্তুত হইল।১২
১৭৮৩ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসের প্রথম ভাগে সমগ্র রংপুর পরগণায় বিদ্রোহ আরম্ভ হয়। বিদ্রোহী কৃষক রংপুরের সমস্ত অঞ্চল হইতে দেবী সিংহের কর সংগ্রহকারীগণকে বিতাড়িত করে, বহু কর্মচারী তাহাদের হস্তে নিহত হয়। টেপা ও ফতেপুর চাকলায় বিদ্রোহ ভীষণ আকার ধারণ করে। টেপা জমিদারীর নায়েব একদল বরকন্দাজ লইয়া বিদ্রোহীদের বাধা দিতে আসিলে নায়েব স্বয়ং বিদ্রোহীদের হস্তে নিহত হন এবং বরকন্দাজের দল পলায়ন করে। কোচবিহারের ইতিহাস প্রণেতা লিখিয়াছেন:
‘ইহার পর কাকিনা, ফতেপুর, ডিমলা, কাজিরহাট এবং টেপা পরগণায় বিদ্রোহীরা দলবদ্ধ হইয়া কর-সংগ্রাহক নায়েব এবং গোমস্তা প্রভৃতিকে যত্র তত্র বধ করিতে আরম্ভ করে। ডিমলার জমিদার গৌরমোহন চৌধুরী বিদ্রাহিগণকে বাধা দিতে অগ্রসর হইরে তাহারও জীবনান্ত ঘটে।’১৩
বিদ্রোহীদের আহ্বানে কোচবিহার ও দিনাজপুরের বহু স্থানের কৃষকগণও নবাব নূরুলউদ্দিনের বাহিনীতে যোগদান করিয়া নিজ নিজ অঞ্চলের নায়েব, গোমস্তাদের বিতাড়িত করে।
এদিকে দেবী সিংহ ভীত সন্ত্রস্ত হইয়া রংপুরের তত্কালীন কালেক্টর গুডল্যান্ডের শরণাপন্ন হয়। দেবী সিংহের লুটের টাকা গুডল্যান্ডও পাইতেন বলিয়া তাহাদের মদ্যে প্রগাঢ় বন্দুত্ব জন্মিয়াছিল।১৪
কালেক্টর গুডল্যান্ড তাহার ও ইংরেজ শাসকগণের যোগ্য ভৃত্য দেবী সিংহকে কৃষকগণের ক্রোধাগ্নি হইতে বাঁচাইবার জন্য অবিলম্বে কয়েকদল সিপাহি প্রেরণ করেন। একটি বিরাট সিপাহি-বাহিনী লইয়া লেফটানাণ্ট ম্যাক ডোনাল্ড উত্তর দিকে এবং একজন সুবেদার দক্ষিণ দিকে প্রেরিত হয়। এদিকে কোম্পানির সৈন্যগণ যাহাকে সম্মুখে পাইল তাহাকেই গুলি করিতে করিতে এবং গ্রামের পর গ্রাম অগ্নিমুখে ভস্মীভূত করিতে করিতে অগ্রসর হইল। তাহাদের সহিত বিদ্রোহীদের বহু খণ্ডযুদ্ধ হইল। বিদ্রোহীরা দেবী সিংহ ও ইংরেজ শাসনের প্রধান ঘাঁটি মোগলহাট বন্দরের উপর আক্রমণ করিলে এই স্থানে ভীষণ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে বিদ্রোহের নায়ক নবাব নূরুলউদ্দিন গুরুতররূপে আহত হইয়া শত্রুহস্তে বন্দী এবং তাহার দেওয়ান দয়া শীল নিহত হয়। নূরুলউদ্দিন সেই আঘাতের ফলেই অল্প কয়েক দিন পর প্রাণ ত্যাগ করেন।
মোগলহাটের যুদ্ধের সময় বিদ্রোহীদের প্রধান বাহিনীটি পাটগ্রাম নামক স্থানে অবস্থিত ছিল। ইংরেজ সেনাপতি লেফটেন্যান্ট ম্যাকডোনাল্ড তাহার প্রকাণ্ড সিপাহি বাহিনী লইয়া বিদ্রোহীদের দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু পথে বিদ্রোহীদের শক্তি সন্বন্ধে যে সংবাদ জানিতে পরেন, তাহাতে ভীত হইয়া তিনি এক কৌশল অবলম্বন করেন। তাহার আদেশে সিপাাহিরা তাহাদের যুদ্ধের পোশাকের উপর সাধারণ বস্ত্র পরিয়া সাধারন মানুষের ছদ্মবেশ ধারন করে এবং নিঃশব্দে রাত্রির অন্ধকারে পাটগ্রামের নিকটবর্তী হইয়া বিদ্রোহীদের ঘাঁটি ঘিরিয়া ফেলে। ১৭৮৩ খ্রীষ্টাব্দের ২২শে ফেব্রুয়ারী অতি প্রত্যূষে ম্যাকডোনাল্ডের বহিনী বিদ্রোহীদের উপর গুলিবর্ষণ আরম্ভ করে। এই আকস্মিক আক্রমণে হতভম্ব বিদ্রোহী সৈন্যগণ দলে দলে নিহত ও আহত হয়, অবশিষ্ট সৈন্যগণ পলায়ন করে। যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত বিদ্রোহী সৈন্যের সংখ্যা ছিল ষাট জন এবং আহতের সংখ্যা কয়েক শত। পাটগ্রামের যুদ্ধে বিদ্রোহীদে চূড়ান্ত পরাজয়ের পর আরম্ভ হয় ইংরেজ বাহিনীর পৈশাচিক তাণ্ডব।১৫
শেষ পরিণতি
এই বিদ্রোহের ফলে দেবী সিংহ কৃষকদের নিকট হইতে এক কপর্দকও কর আদায় করিতে পারিল না। রংপুুর অঞ্চলের ৩৯০২০০ টাকা রাজস্ব অনাদায় পড়িয়া রহিল। কোম্পানির কর্তৃপক্ষ তাহার নিকট হইতে কোন না পাইয়া পিটার্সন নামক এক ব্যক্তিকে কমিশনার-পদে নিযুক্ত করিয়া রংপুরে পাঠাইলেন। এই স্থানে উপস্থিত হইয়া প্রজাদের দুর্দশা স্বচক্ষে দেখিয়া স্তম্ভিত হইয়া যান। তাহারা অনুসন্ধানের ফলে দেবী সিংহের উত্পীড়নের অনেক নতুন নতুন তথ্য বহির হইতে থাকে। তিনি কলিকাতায় নিম্নোক্ত মন্তব্য লিখিয়া পাঠান।
‘আমার প্রথম দুই পত্রে প্রজাদের উপর কঠোর অত্যাচার, এবং তাহারই জন্য যে তাহারা বিদ্রোহী হইয়াছে সে কথা সাধারন ভাবে বিবৃত করিয়াছি।...আমার প্রতিদিনের অনুসন্ধানে তাহা আরও দৃঢ় হইতেছে। তাহারা যদি বিদ্রোহী না হইত, তাহা হইলেই আমি আশ্চর্য জ্ঞান করিতাম। প্রজাদের নিকট রাজস্ব করা হয় নাই, তাদের উপর রীতিমত দস্যুতা এবং সঙ্গে সঙ্গে তাহাদিগকে কঠোর শারীরিক যন্ত্রনা ও সর্ব প্রকার অপমানে জর্জরিত করা হইয়াছে।...মানুষ চির অধীন অবস্থায় থাকিলেও সেখানে অত্যাচার এর সীমা অতিক্রম করে, সেখানে প্রতিবিধানের জন্য তাহাদের বিদ্রোহ করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।...’১৬
‘রেভিনিউ-কমিটি’ দেবী সিংহের অনাচারে প্রমাণ পাইয়া কতকটা ডাইরেক্টর-গণের দেবী সিংহের হস্ত হইতে রাজস্ব আদায়ের ভার তুলিয়া লন এবং জমিদার প্রজাদিগকে দেবী সিংহের নিকট খাজনা দিতে নিষেধ করিয়া পাঠান। তাহারা দেবী সিংহকে কলিকাতা ডাকিয়া কৈফিয়ৎ দিতে বলেন। দেবী সিংহ প্রজাদের রক্ত শোষণ করিয়া ৭০ লক্ষেরও অধিক টাকা লইয়া কলিকাতায় উপস্থিত হন।১৭
গভর্নর জেনারেল হেন্টিংস ষড়যন্ত্র পাকাইয়া গুডল্যাডের কোন দোষ নাই বলিয়া তাহাকে অব্যাহতি দেন। দেবী সিংহ তাহার সঞ্চিত বিপুল অর্থ দ্বারা বহু উচ্চপদস্থ কর্মচারীকে বশীভূত করিয়া রাখিয়াছিল। হেস্টিংস তাহাদের লইয়া দেবী সিংহের বিচারের জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটি বিচার করিয়া রায় দেয় যে, দেবী সিংহ সম্পূর্ণ নির্দোষ, পিটার্সনই তাহার নামে মিথ্যা রিপোর্ট দিয়াছেন। হেন্টিংস ইংলন্ডে যে রিপোর্ট প্রেরণ করেন তাহাতেও তিনি এই রায় সমর্থন করেন। ইহার কিছুদিন পরেই লর্ড কর্নওয়ালিশ গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন এবং হেস্টিংস ইংলন্ডে চলিয়া যান। সুতরাং হেস্টিংসের পক্ষে দেবী সিংহকে আর কোন সরকারী কার্যে নিযুক্ত করা সম্ভব হয় নাই। দেবী সিংহ এত কাল ধরিয়া যাহা লুণ্ঠনের দ্বারা সংগ্রহ করিয়াছিল তাহা দ্বারাই সে বাকী জীবন যাপন করিয়া গিয়াছে এবং ইংরেজ শাসকগণের দেওয়া রাজা উপাধি লইয়া ও লুণ্ঠিত অর্থদ্বারা বিপুল ভূসম্পত্তি ক্রয় করিয়া মুর্শিদাবাদের নসীপুর রাজ পরিবারের প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। দেবী সিংহের অপসারণের পর লর্ড কর্নওয়ালিশ রাজস্ব আদায়ের জন্য ইজারা প্রথা রহিত করেন এবং ১৭৯০ খ্রীষ্টাব্দে উত্তর বঙ্গ তথা সমগ্র বঙ্গদেশের ও বিহারের জমিদার গোষ্ঠীর সহিত দশশালা বন্দোবস্ত করিয়া তাহাদের অবাধ শোষণ-উত্পীড়নের মুখে এই দুই প্রদেশের কৃষকগণকে সমর্পণ করেন।
টীকা
১. নিখিলনাথ
রায়,
মুর্শিদাবাদ-কাহিনী,
পৃষ্ঠা-
৪৯৬
২. নিখিলনাথ
রায়,
মুর্শিদাবাদ-কাহিনী,
পৃষ্ঠা-৫০০-১
৩. নিখিলনাথ
রায়,
মুর্শিদাবাদ-কাহিনী,
পৃষ্ঠা-৫১১
৪. দৃষ্টান্ত
স্বরূপ
দেবী
চৌধুরানীর
নাম
উল্লেখ
করা
যায়।
৫. নিখিলনাথ
রায়,
মুর্শিদাবাদ-কাহিনী,
পৃষ্ঠা-
৫১৩
৬. নিখিলনাথ
রায়,
মুর্শিদাবাদ-কাহিনী,
পৃষ্ঠা-৫১৪,
চণ্ডীচরণ
সেন,
দেওয়ান
গঙ্গাগোবিন্দ
সিংহ,
পৃষ্ঠা-৩৬
৭. মুর্শিদাবাদ-কাহিনী,
পৃষ্ঠা-
৫১৫
৮. Glazier’s Report on Rangpur,
Vol. I, P. 21
৯. মুর্শিদাবাদ-কাহিনী,
পৃষ্ঠা-
৫২১
১০. Gazetteer
of Rangpur Dist, P-30
১১. Gazetteer of Rangpur Dist,
P-30
১২. মুর্শিদাবাদ-কাহিনী,
পৃষ্ঠা-৫২২, Gazetteer
of Rangpur Dist,
P-30
১৩. খাঁ
চৌধুরী
আমানতুল্লা
আমেদ:
কোচবিহারের
ইতিহাস,
পৃষ্ঠা-
২১৯
১৪. মুর্শিদাবাদ-কাহিনী,
পৃষ্ঠা-
৫২২
১৫. Glazier:
Report on the District of Rangpur (Appendix-
Goodlad’s Report of the Insurrection, P. 68-71, মুর্শিদাবাদ-
কাহিনী,
পৃষ্ঠা-৫২২,
Gazetteer
of Rangpur Dis, P-30
১৬. Quoted from impeachment of W.
Hastings,
Vol. I, P-194-95
১৭. Impeachment of W. Hastings,
Vol. I, P-196-200
সুপ্রকাশ রায়: ইতিহাসবিদ





