পুরান কেল্লার বিপরীত পাশে মথুরা রোড। ঠিক পাশেই অবস্থিত খায়রুল মানাজিল। অবস্থানগত কারণে সুবিধা ও অসুবিধা দুটিই রয়েছে অবশ্য। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনের পাশে থাকায় ষোলো শতকের স্থাপনাটি সংরক্ষিত হচ্ছে। প্রধান ফটকের সামনে নিযুক্ত রাখা হয়েছে কয়েকজন প্রহরী। ফলে দুষ্ট মানুষের উৎপাত থেকে অন্তত মুক্তি পেয়েছে। দেয়ালেও পড়েনি ভাঙাচোরা ক্ষত। বিপরীত দিকে যেহেতু রাস্তাটি সবসময় ব্যস্ত থাকে, অধিকাংশ পর্যটকই এদিকে পা বাড়াতে সাহস করে না। দেখা হয় না ‘লাল দরজা’র ধ্বংসস্তূপের পাশে অবস্থিত মসজিদ ও মাদ্রাসাটি। এমনকি শুক্রবারের নামাজেও এখানে অল্প মানুষই আসে। তার পরও কখনো কেউ যদি গাড়ি নিয়ে পথটি ধরে যায় কিংবা সন্ধ্যার জ্যামের মধ্যে আটকে থাকে, অনায়াসে চোখ পড়বে শত শত কবুতরের দিকে। স্থাপনার গম্বুজের ওপর উড়ে বেড়াচ্ছে কিংবা বিশ্রামরত কবুতরগুলো।
স্থাপনার তোরণটিতে রয়েছে প্রধান প্রশস্ত খিলান, অর্ধগম্বুজ, প্রলম্বিত খাম ও ঠিক ওপর দিকে ছোট গবাক্ষ। নির্মাণে মোগল স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট। তবে ভেতরের দিকে অবস্থিত মসজিদটা ব্যতিক্রম। সেখানে যেন ফুটে উঠেছে দিল্লি সালতানাতের প্রভাব। আঙিনা ও কেন্দ্রীয় পুকুরটি সংস্কারাধীন। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া হাত দিয়েছে মেরামতে। মসজিদের দুই পাশজুড়েই অবস্থিত দ্বিতল মাদ্রাসা। বড় রুমগুলো নিচতলাতেই। সেখান থেকেই দ্বিতীয় তলায় ছোট রুমগুলোর দিকে চলে গেছে সরু রাস্তা। মসজিদের দেয়ালের বাইরে ও ভেতরের দেয়ালে সজ্জিত টাইলস। অনেকটা আগ্রার ‘চিনি কা রওয়াজা’র মতো। কোনো দুটি টাইলস এক রকম নয়। অবশ্য দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে নান্দনিক স্থাপত্যটির খুব অল্প অংশই টিকে আছে আজ।
রোদের দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে সেখানকার আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় কিছু ব্যক্তিকে। দেখে যেন প্রথম দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। যেন প্রথমবারের মতো মসজিদ তৈরি করে খুলে দেয়া হয়েছে সবার জন্য। পাশেই ‘লাল দরজা’, তৈরি হয়েছে কোয়ার্টজাইট ও লাল পাথরের দ্বারা। নিঃসন্দেহে তখন মনোরম নির্মাণ ছিল। দুই পাশজুড়ে থাকা দোকানগুলো এখন শুধুই ধ্বংসাবশেষ। স্পষ্ট বোঝা যায়, একসময় কত জমজমাট ছিল দোকানগুলো। লাল দরজার পেছনের ধ্বংসস্তূপে বসবাস করত সম্ভ্রান্ত কোনো পরিবার। সন্তানদের হয়তো তারা এ মাদ্রাসাগুলোতেই পড়াতে দিত। মসজিদের নামের আক্ষরিক অর্থ ‘উত্তম আবাস’। ১৫৬১ সালে মাহাম আঙ্গার তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়। সম্ভবত দিল্লিতে মোগল স্থাপত্যের প্রথম নিদর্শন। মাহাম আঙ্গা ছিলেন মোগল সম্রাট আকবরের দাইমা। সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য হলেও অঘোষিত শাসকে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। আচ্ছা, তিনি কি প্রতিদিন মসজিদে আসতেন? প্রশ্নটি পাক খাচ্ছিল বারবার। মাথার ওপরে কবুতরের ঝাঁক সে চিন্তাকে থামিয়ে দিল। ওপরে তাকালাম। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা ভদ্রোচিত কণ্ঠস্বর উপদেশ দিল সূর্যের দিকে না তাকাতে। যেন রোদ থেকে সরে ছায়ায় গিয়ে দাঁড়াই। চাইলে স্থাপনার কূপ থেকে পানির ঝাপটা দিয়ে নিতে পারি মুখে। ভদ্রলোক সম্পর্কে এক অদ্ভুত সত্য জানলাম তখন। এককালে তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। বৃহত্তর কৈলাসের অভিজাত মার্কেটে ছিল দোকান। সব ছেড়ে দিয়ে মসজিদে এসে গ্রহণ করেছেন ফকিরি। সেদিনের আলি শের খান হয়েছেন আজকের আলি বাবা। সূর্যাস্তের সময় চত্বর বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি অবস্থান করেন এখানে। তারপর চলে যান পূর্ব দিল্লিতে। সেখানেই তার বাড়ি। ফের পরদিন সকালে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে হাজির। আলি বাবা জিন ও ফেরেশতাদের নিয়ে কথা বলেন। তারাই নাকি তাকে ফকির হওয়ার পথে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে জিন বসবাস করেন, তারা আমার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেন।’
আলি বাবার দাবি, মসজিদটি সম্রাট আকবরের আমলেরও অনেক আগে নির্মিত। আমি শিলালিপির প্রসঙ্গ তুলতে চাই। শিলালিপিতে আকবরের নাম লেখা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এ আকবর তুঘলক বংশের, মুহম্মদ বিন তুঘলকের ভাতিজা তিনি। তাছাড়া স্থাপত্যের ধরনের দিকেই খেয়াল করুন। মোগল স্থাপত্য এমন নয়।’ তার দাবিতে চমকিত হই। কিন্তু আমিও হাল ছাড়তে নারাজ। বলে ফেলি, ‘ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপে মসজিদকে সম্রাট আকবরের সময়েই নির্মিত বলেই লেখা। তোরণটাও তো মোগল বৈশিষ্ট্য বহন করে।’ তিনি আমার কথা শুনে হাসেন। যেন কোনো ধরনের তর্কে যেতে চান না। নামাজের ওয়াক্ত হয়ে এসেছে। তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বললেন, ‘শান্তি লাভের একমাত্র রাস্তা হচ্ছে ইবাদত।’ কিছুক্ষণের মধ্যেই স্থাপনার গেট বন্ধ হয়ে যাবে। আমি ধীরে ধীরে গেটের দিকে চলে এলাম। সূর্য ডুবতে চলছে। কবুতরগুলো ফিরে আসছে ঘরে। বসছে মসজিদের গম্বুজের ওপর। সূর্যাস্তের পর কেবল তারাই স্থাপনার ভেতরে বসবাসের সুযোগ পায়। ও হ্যাঁ, আরো কেউ পারে—‘জিন’।
অনুবাদক: আহমেদ দীন রুমি





