বিশ শতকের শুরুর দিকে কংগ্রেস যখন সর্বভারতীয় দল হিসেবে ইংরেজ শাসনের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে, কিছু রাজনৈতিক চেতনা তৈরি করছে, সেই সময়ে বঙ্গভঙ্গের পর মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতে রাজনীতির একটি নতুন স্রোত তৈরি হলো। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বাংলা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। তিরিশের দশকে এসে পূর্ববঙ্গে সেই আঞ্চলিক রাজনীতির বঙ্গীয় স্বরূপ স্পষ্ট হয়। সে রূপ প্রকাশে এ কে ফজলুল হক এবং তাঁর কৃষক প্রজা পার্টি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল।
ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের সূচনা হতেই তাদের ব্যবসা ও শাসনের কেন্দ্র ছিল কলকাতা। পরবর্তী সময়ে তাই পশ্চিমবঙ্গে একটি শিক্ষিত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণী গড়ে ওঠে যারা বঙ্গীয় রাজনীতির প্রধান পুরুষ হয়ে উঠেছিলেন। অন্যদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতির চিত্রে দেখা যায় সেখানে ব্যবসায়ী, আইনজীবী এবং বিলাতফেরত ব্যক্তিদের প্রাধান্য ছিল যাদের অনেকেরই চিন্তাভাবনা বিলেতি ধারা থেকে কখনো বের হয়নি। এসব আলোচনার মধ্যে যে বিষয়টি আড়ালে পড়ে যায় তা হলো বাংলার একটা অংশ, অর্থাৎ পূর্ব বাংলার কৃষককুল অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে। ইতিহাসের গলি ধরে অতীতে গেলে দেখব এককালে এ বাংলা থেকেই সর্বাধিক রাজস্ব দিল্লিতে পাঠানো হয়েছে। মুর্শিদ কুলি খাঁর সেসব দিন পেরিয়ে আলীবর্দি খাঁর আমলে মারাঠাদের লুটের শিকার হয়েছে বাংলা। ভারতের উন্নতির বড় রসদ জুগিয়েছিল বাংলা এবং ভুগেছিল বাংলার কৃষক, যাদের সম্পর্কে বিশ শতকের সূচনাতেও তৎকালীন কংগ্রেস বা নবগঠিত মুসলিম লীগ ভাবেনি। ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ সে ভাবনাকে সামনে এনেছিল।
ফজলুল
হকের নেতৃত্বে হঠাৎ করেই তিরিশের দশকে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ গঠিত হয়েছে বিষয়টি এমন নয়, মূলত এমন একটি আঞ্চলিক দল গঠনের পরিকল্পনা বা প্রক্রিয়া বহুদিন ধরেই চলছিল। ১৯২৯ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদের ১৮ জন সদস্য উদ্যোগী হয়ে ‘নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি’ গঠন করেন। স্যার আবদুর রহিম ছিলেন সভাপতি। ফজলুল হক প্রথমে এর সহসভাপতি ছিলেন। ১৯৩৫ সালে তিনি সভাপতি হন এবং পরের বছর ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। মূলত বাংলার কৃষকদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের এজেন্ডা নিয়ে এ দলের আত্মপ্রকাশ। বাংলায় বিশেষত পূর্ববঙ্গে ফজলুল হকের অবিসংবাদিত জনপ্রিয়তা তাকে এ দল গঠন ও এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিল। অল্প সময়ের মধ্যে দলটি প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং সাধারণ মানুষ মনে করেছিল এ দলটির মাধ্যমে খেটে খাওয়া মানুষের উন্নতি হবে। পাশাপাশি রাজনীতিসচেতন মানুষের বিশ্বাস ছিল কৃষক প্রজা পার্টির মাধ্যমে বাংলার আঞ্চলিক রাজনীতিতে অভূতপূর্ব পরিবর্তন দেখা যাবে।
যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে সে সময়ে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও আঞ্চলিক রাজনীতির প্রভাব ছিল। কংগ্রেস যে সর্বভারতীয় রাজনীতি নিয়ে এসেছিল তা এ সময়ের মধ্যে অনেকটাই ভেঙে যায়। কিন্তু অন্যান্য অঞ্চলে আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক ‘জাতি’র (শিখ, মারাঠা ও রাজপুত) ধারণার বাইরে এসে বাংলায় কৃষক প্রজা পার্টি ধর্ম কিংবা আঞ্চলিকতার কথা না বলে কৃষি, কৃষক ও খেটে খাওয়া মানুষের কথা বলেছিল। ফলে নির্বাচনের কেবল এক বছর আগে গঠিত ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ ১৯৩৭-এর নির্বাচনে ৩৬টি আসন নিয়ে তৃতীয় স্থান লাভ করে। ৪৭টি আসন নিয়ে কংগ্রেস প্রথম ও ৩৯টি আসন নিয়ে মুসলিম লীগ দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। কোনো দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে ব্যর্থ হওয়ায় কোয়ালিশন সরকার গঠন ছাড়া উপায় ছিল না ও এখান থেকেই কৃষক প্রজা পার্টির ভাঙনের সূচনা।
ফজলুল
হকের কৃষক প্রজা পার্টির কাছে মানুষের যে বিপুল রাজনৈতিক প্রত্যাশা ছিল তা ব্যর্থ হওয়ার ক্ষেত্রে ইতিহাস গবেষক সেমন্তী ঘোষ তিনটি পর্যায়কে শনাক্ত করেছেন। প্রথম পর্যায় কংগ্রেসের সঙ্গে বনিবনা না হওয়া, দ্বিতীয় মুসলিম লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন করলেও তা কার্যকর না হওয়া ও তৃতীয় পর্যায়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মন্ত্রিসভা গঠন করে ব্যর্থ হওয়া। এ প্রতিটি পর্যায়ের পেছনে নানাবিধ কারণ ছিল। এক্ষেত্রে কখনো কেউ সরাসরি ফজলুল হককে দায়ী করেছেন, কেউ তৎকালীন রাজনীতির চলমান গতিকে দায়ী করেছেন। Different
Nationalisms : Bengal 1905-1947
বইয়ে সেমন্তী ঘোষ লিখেছেন, ‘কৃষক
প্রজা পার্টি তৎকালীন সর্বভারতীয় দুদল অর্থাৎ কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সঙ্গে সংঘর্ষের কারণে নানা পর্যায়ে ব্যর্থ হয়েছে।’
আমরা
ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে এ মতের পক্ষে নানা প্রমাণ পাই। প্রথমেই কংগ্রেস কোয়ালিশন করতে অস্বীকৃত হলে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ স্বাভাবিকভাবেই মুসলিম লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন করেছিল। কংগ্রেসের এ অস্বীকৃতির কারণে এ কে ফজলুল হক হতাশ হয়েছিলেন। মূলত কংগ্রেস যে আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করে, ‘কৃষক
প্রজা পার্টি’র আদর্শ ছিল তা থেকে ভিন্ন। এ সময় দলটি গণমানুষের রাজনীতি শুরু করে যেখানে কংগ্রেসের নীতিতে এ ‘গণমানুষ’ ধারণাটি অস্পষ্ট রাখা হয়েছিল। কংগ্রেস বড় বড় নীতি-আদর্শের তত্ত্বকথা বলে গেলেও বাংলার কৃষকের জন্য তা খুব আকর্ষণীয় ছিল না। নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের কোনো সিনিয়র নেতা আঞ্চলিক পর্যায়ে তৈরি হওয়া কৃষকদের বিভিন্ন সমিতির সঙ্গে দেখা করার প্রয়োজন পর্যন্ত অনুভব করেননি। অগত্যা মুসলিম লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন করে ফজলুল হক প্রধানমন্ত্রী হলেন। কিন্তু মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টির আদর্শ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। মুসলিম লীগ একদিকে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং অন্যদিকে সরকারে থাকার উদ্দেশ্যে কোয়ালিশন গঠন করল। ১১ জনের মন্ত্রিসভায় কৃষক প্রজা পার্টির ছিলেন মাত্র দুজন, বাকিরা ছিলেন মুসলিম লীগ ও সংখ্যালঘু দলগুলোর। মুসলিম লীগ প্রথম সুযোগেই প্রজা পার্টির আদর্শের ওপর নিজেদের নীতি চাপিয়ে দেয়। ফলে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’র অভ্যন্তরেই ভাঙন ধরে। ১৯৩৭ সালের শেষের দিকে দলের ১৭ জন সদস্য ফজলুল হকের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করে। তার পক্ষে ছিলেন মাত্র ১৯ জন। কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার, এ ১৯ সদস্যের সমর্থন নিয়ে ফজলুল হক দুদফায় মোট সাত বছরের মতো সময় অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
ফজলুল
হকের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ কৃষকের কথা বলত। এ দলের প্রতি পূর্ববঙ্গের শ্রমজীবীদের আস্থা তৈরি হওয়ার পেছনে এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সাংবাদিক মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ লিখেছেন, ‘বৈদিক
যুগ থেকে কলিযুগ পর্যন্ত এ অঞ্চলের মানুষ কখনো নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারেনি। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে আমি এ নির্বাচনের ঘটনাকে বাল্মীকির রামায়ণ, অশোকের কলিঙ্গ অভিযান, আলাউদ্দিন খিলজির বাজার ব্যবস্থা, শের শাহর গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড, আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহী কিংবা শাহজাহানের তাজমহল নির্মাণের চেয়ে ছোট করে দেখি না।’ অর্থাৎ ওয়ালিউল্লাহর মতো একজন সাংবাদিকের যদি এ ধরনের মত হয়, বোঝাই যায় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল আরো বেশি।
সে
প্রত্যাশা খোদ ফজলুল হক বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বলা চলে বিশের দশকের স্বদেশী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হাওয়াকে তিনি ঘুরিয়ে ফেলেছিলেন এ সময়। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ যখন বড় বড় ভাবগম্ভীর কথা বলে চলেছে ফজলুল হক তখন বললেন, ‘ডাল-ভাত আর মোটা কাপড়ের সমস্যা সমাধান না করে অন্য সমস্যার দিকে এগোনো যাবে না।’ সাধারণ মানুষও ভেবেছিল ‘কৃষক প্রজা পার্টি’কে ভোট দিয়ে নিজেদের ডাল-ভাত নিশ্চিত করবে। পরে একটা সময়ে হক সাহেবের এ তত্ত্বকে অনেকে ‘ডাল ভাতের রাজনীতি’ বলে বিদ্রূপ করেছেন, এখনো করে থাকেন। কিন্তু ‘কৃষক প্রজা পার্টি’র ম্যানিফেস্টো মূলত বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। যেখানে ১২ দফার মধ্যে জমিদারি বিলোপ, কৃষকের ওপর খাজনা হ্রাস, জমিদারি সেরেস্তায় নজর, সেলামি, ভেট প্রভৃতি বিলোপ, কৃষকের ঋণ সমস্যার সমাধান প্রভৃতির কথাই গুরুত্ব সহকারে বলা হয়েছিল।
কিন্তু
হক সাহেব তথা ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ প্রথমেই সমালোচিত হলো এর সরকার গঠনের কোয়ালিশনের কারণে। যে দলটি জমিদারি বিলোপের কথা বলছে সে দলই জমিদার, জোতদার, তালুকদারের সমন্বয়ে গঠিত মুসলিম লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। এ মন্ত্রিসভার ১১ সদস্যের মধ্যে নয়জনই ছিলেন ধনিক শ্রেণীর। মুসলিম লীগের সঙ্গে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’র আত্মিক সমন্বয় কখনো সম্ভব ছিল না। কেননা মুসলিম লীগের ভিত্তি ছিল সৈয়দ, নওয়াব, খান বাহাদুর ঘরানার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ। আর ফজলুল হকের দলটি এদেরই স্বার্থবিরোধী কর্মসূচির অঙ্গীকার করেছিল। বিখ্যাত সাংবাদিক-রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ দলটিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, ‘মূলত
মধ্যবিত্ত মুসলিমদের একটি দল যা তৎকালীন হিন্দু এবং মুসলিম উভয় ঘরানার সামন্ততান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।’ কিন্তু সেটি পরিপূর্ণ রূপে করা সম্ভব হয়নি। তাই সরকার গঠনের পর লীগের সঙ্গে অবনিবনার মধ্যে ফজলুল হক ‘ফ্লাউড কমিশন’ নামে একটি কমিশন গঠন করে জমিদারি প্রথা বিলোপের সুপারিশ করেন। যদিও ফ্লাউড কমিশন জমিদারি বিলোপের পক্ষে রিপোর্ট প্রদান করে, ফজলুল হক তা কার্যকর করতে অক্ষম হন। কেননা জমিদার মন্ত্রীরা কখনো জমিদারি বিলোপে রাজি ছিলেন না।
‘কৃষক প্রজা পার্টি’ ও ১৯৩৭-এর নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ—এ প্রশ্ন আমাদের মনে জাগতেই পারে। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ফজলুল হকের এ দলটি মূলত বাংলাকেন্দ্রিক একটি মুসলিম প্রধান দল। ইলেক্টোরাল বোর্ডে ২৫ জনের মধ্যে ২১ সদস্যই ছিলেন মুসলিম। যদিও মুসলিম লীগ সর্বভারতীয় মুসলিমদের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের প্রকাশ করেছিল কিন্তু ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ কেবল কৃষকদের নয় বরং ‘বাঙালি মুসলমান’দের দলে পরিণত হয়েছিল। সে সঙ্গে ফজলুল হকের ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব কাজ করেছিল। এ প্রসঙ্গে সেমন্তী ঘোষ লিখেছেন, ‘তিনি
বাঙালি মুসলমানের সত্তার প্রতিনিধিত্ব করতেন এবং তাদের পরিচিতির মূল হয়ে ওঠেন। এছাড়া তার রাজনীতি মূলত তার সময়ের অনেকের তুলনায় জনপ্রিয় ছিল কেননা তিনি অতি সহজেই অধিক মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক চিত্র তৈরি করতে পারতেন, তা গ্রামীণ হোক বা শহুরে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত কিংবা নিরক্ষর কৃষক যে শ্রেণীরই হোক না কেন।’
কিন্তু
রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত উভয় সিদ্ধান্তের কারণেই ফজলুল হকের এ ‘ক্যারিশমা’ দিয়ে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’কে টিকিয়ে রাখা যায়নি। দলের সদস্যের অনাস্থা এবং তার মুসলিম লীগে যোগদানের পর কৃষক প্রজা পার্টি মূলত ভেঙে গিয়েছিল। তিনি মুসলিম লীগের দিকে ঝুঁকে পড়েন ও পরবর্তী সময়ে ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ’-এর সভাপতি হয়ে বসেন। এ সময় থেকে তার বক্তৃতায় ইসলাম, মুসলিমদের অতীত গৌরবের কথা উঠে আসতে শুরু করে। অর্থাৎ যে দলটি কৃষকের ডাল-ভাতের নিশ্চয়তা দেয়ার কথা বলে নির্বাচিত হয়েছিল সেখানে ধর্ম প্রাধান্য লাভ করল। এমনও হয়েছে ফজলুল হক ভাষণে বলেছেন, ‘মুসলমানরা
৭০০ বছর ভারত শাসন করেছে।’ অর্থাৎ সেসব দিন ফিরিয়ে আনার জিকির তুললেন। ওদিকে জমিদারি বিলোপ, ঋণ মওকুফের কোনো কথাই আর রইল না।
এভাবে
সহমত, দ্বিমতের মধ্য দিয়ে লীগের সঙ্গে মোটামুটি বছর তিনেক কাটিয়ে এ কোয়ালিশনও ব্যর্থ হলো। জিন্নাহ তথা লীগকে না জানিয়ে ফজলুল হক ‘ওয়ার কমিশন’-এ যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৪১ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মুসলিম লীগ থেকে তার পদত্যাগ, পুনর্নিয়োগ ও পুনঃপদত্যাগের নাটক চলতে থাকে। অবশেষে এ বছরই লীগের সঙ্গে তার সম্পর্ক চুকে যায়। এর পরপরই ফরোয়ার্ড ব্লক, হিন্দু মহাসভার সঙ্গে তিনি মৈত্রী করেন। ১৯৪১-৪৩ পর্যন্ত মহাসভার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে চলা সরকার আজও ‘শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা’ নামেই অধিক পরিচিত। এ দুজনের নাম থাকলেও কোয়ালিশনে ফজলুল হক ও শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে সুভাষ চন্দ্র বসুর ফরোয়ার্ড ব্লক, কৃষক প্রজা পার্টির অপর একটি অংশ, তফসিলি সম্প্রদায়ও যুক্ত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এ কোয়ালিশন সরকার বা মন্ত্রিসভায় আট মন্ত্রী ছিলেন। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এ কোয়ালিশনে বিভিন্ন ঘরানার মানুষ এক হয়েছিলেন। তাদের ছিল ভিন্ন ভিন্ন মত, আদর্শ ও উদ্দেশ্য। আমরা জানি, এ সময়ের মধ্যে (১৯৪১-৪৩) সুভাষ বসুর নেতৃত্বে হলওয়েল মনুমেন্ট উৎপাটন, সিরাজদ্দৌলার স্মরণে সিরাজ দিবস পালন প্রভৃতির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই ভিন্ন ভিন্ন আদর্শের মধ্যে উপযুক্ত সমঝোতা না হওয়া এবং নানা বাহ্যিক চাপের কারণে এ কোয়ালিশনও দৃঢ় হয়নি।
‘কৃষক প্রজা পার্টি’ সম্পর্কে আলোচনা করার ক্ষেত্রে পার্টির তুলনায় ফজলুল হকের কথাই বেশি চলে আসে। এর কারণ মূলত হক সাহেবের প্রভূত জনপ্রিয়তা। বলা বাহুল্য, পার্টির প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষার কারণের কেন্দ্রে ছিল পার্টিতে তার উপস্থিতি। এ কারণে দলের ব্যর্থতার দায়ও তাকেই দেয়া হয়। কিন্তু কোয়ালিশনের চেষ্টায় প্রথমে কংগ্রেসের উন্নাসিক আচরণ, পরবর্তী সময়ে লীগ কর্তৃক প্রজা পার্টিকে গ্রাস করার চেষ্টাও এ দল এবং ১৯৩৭ সালের নির্বাচন-পরবর্তী মানুষের আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হওয়ার দায় এড়াতে পারে না। শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা সম্পর্কে আলোচনার জন্য আরো বিস্তৃত পরিসর প্রয়োজন। তবে অনেকেই বলে থাকেন, লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর লীগ এই মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করেছিল। ইস্পাহানী, আদমজী প্রমুখ ব্যবসায়ীদের আনুকূল্যে মুসলিম লীগ কৃষক প্রজা পার্টি এবং হক সাহেবের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে আরম্ভ করে এবং তারা সফলও হয়েছিল।
এসব
বিষয়কে মোটামুটি সরাসরি চিহ্নিত করা চলে। কিন্তু সেমন্তী ঘোষ তাঁর লেখায় বেশকিছু নেপথ্য কারণ উল্লেখ করেছেন। সরাসরি কারণ হিসেবে চিহ্নিত না করলেও তৎকালীন হিন্দু সমাজে শুরু হওয়া হিন্দুত্ববাদের চর্চা, বঙ্কিমের আনন্দমঠ নিয়ে পুনরায় আলোচনা, শিবাজিকে হিন্দু রাজা হিসেবে একটি সর্বভারতীয় চরিত্র দেয়া, বন্দেমাতরমকে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব প্রভৃতি বিষয় একটি হিন্দু-মুসলিম সংকট তৈরি করেছিল যা শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। কৃষক প্রজা পার্টি এ বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করতে পারেনি কিংবা পারলেও শক্ত কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। আবার অন্যদিক থেকে দেখা যায় যে বঙ্গভঙ্গ রদ, স্বদেশী আন্দোলনের সময় থেকে শিবাজি, গেরুয়া পতাকা থেকে শুরু করে আরো নানা চিহ্ন, আদর্শ কংগ্রেস ব্যবহার করতে শুরু করে। শুরুতে ধর্মের কথা না থাকলেও ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ও ইসলাম ধর্মকে রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহার করতে শুরু করে।
‘কৃষক প্রজা পার্টি’ বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের দল হয়ে উঠতে পারত। দলটি ও দলের প্রধান ব্যক্তি ফজলুল হকের কাছ থেকে মানুষের সে প্রত্যাশাই ছিল, যদি তা সফল হতো তবে বাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অবস্থা পুরোপুরি বদলে না গেলেও চল্লিশ শতকের রাজনীতিতে আরো বেশি প্রভাব ফেলা সম্ভব ছিল। ‘বাঙালি-মুসলমান’ বলে যে রাজনৈতিক শক্তি পরবর্তী সময়ে উঠে এসেছিল, তা আরো আগে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হতো। বলা চলে, ১৯৩৭ সফল হলে হয়তো ’৪৭-এর ইতিহাসও ভিন্ন হতো। এত কিছু না হলেও প্রথমে কংগ্রেসের সঙ্গে কোয়ালিশন হলে একটি শান্ত, স্থিতিশীল অবস্থা তৈরি সম্ভব হতো। সেমন্তী ঘোষ মনে করেন, ‘কৃষক
প্রজা পার্টি এবং কংগ্রেসের মৈত্রী হলে হিন্দু অধ্যুষিত, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের বৈষম্য চিহ্নিত করে সমাধান সহজ হতো।’ কিন্তু উপমহাদেশের রাজনীতির নানা সমীকরণ, নিয়তি আর বিশেষ সিদ্ধান্তের কারণে সেসব সম্ভাবনার মৃত্যু হয়েছিল।
মাহমুদুর
রহমান: লেখক






