সূচনা
প্যারিস, ১৫ অক্টোবর, ১৯১৭— ইন্টারন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি সার্ভিসের জন্য আন্তন ফিশারম্যান ও হেনরি ওয়েলস।
ভোর ৫টার খানিক আগে ১৮ জনের একটা দল— ওদের বেশির ভাগই ফরাসি সেনাবাহিনীর পুরুষ সদস্য সিঁড়ি বেয়ে কারাগার সেন্ট-ল্যাযারের দোতলায় উঠে এল। বাতি জ্বালানোর জন্য মশাল হাতে একজন কারারক্ষীর সঙ্গে ১২ নম্বর সেলের সামনে থামল ওরা।
কারাগারের দায়িত্বে ছিল নানরা। সিস্টার লিওনিদ দরজা খুলে সবাইকে বাইরে থাকতে বলে ভেতরে ঢুকে দেয়ালে ঘষে একটা দেশলাই কাঠি ধরিয়ে ভেতরে লণ্ঠন জ্বালাল। এবার অন্য একজন সিস্টারকে ডাকল তাকে সাহায্য করতে।
যারপরনাই মমতা আর যত্নের সঙ্গে ঘুমন্ত শরীরটাকে জড়িয়ে ধরল সিস্টার লিওনিদ। যেন কোনো ব্যাপারেই আগ্রহ নেই— এমনভাবে জেগে ওঠার চেষ্টা করল নারীটি। ওই নানের কথা অনুযায়ী, পুরোপুুরি জেগে ওঠার পর মনে হচ্ছিল যেন প্রশান্তিময় ঘুম থেকে জেগে উঠেছে সে। কয়েক দিন আগে প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণ ভিক্ষার আবেদন নাকচ হওয়ার খবরটা শুনে শান্ত থাকল। সবকিছু শেষ হয়ে আসতে যাচ্ছে বলে সে বিষণ্ন নাকি স্বস্তি বোধ করছিল, বোঝার উপায় ছিল না।
সিস্টার লিওনিদের ইঙ্গিতে ক্যাপ্টেন বুচারডন ও উকিল মেইত্রে ক্লুনেটকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন ফাদার আরবঅ। কারাবন্দি আগের সপ্তাহে লেখা তার দীর্ঘ চিঠিটার সঙ্গে খবরের কাগজের টুকরোঅলা দুটি ম্যানিলা খাম তুলে দিল উকিলের হাতে।
অবস্থার বিচারে বেমানানভাবে স্টকিংস পরল সে, রেশমি লেসঅলা হাই-হিল জুতোয় পা গলাল। উঠে দাঁড়ানোর সময় সেলের কোনায় হুকে ঝোলানো মেঝে পর্যন্ত ঝুলন্ত ফার কোটের দিকে হাত বাড়াল সে। ওটার হাতা আর কলারে অন্য কোনো পশুর পশম লাগানো। সম্ভবত শেয়াল। রাতে ঘুমোনোর ভারী সিল্ক কিমোনোর ওপর পরে নিল ওটা।
কালো চুল অবিন্যস্ত হয়েছিল। যত্নের সঙ্গে আঁচড়ে ঘাড়ের কাছে বেঁধে ফেলল। মাথায় একটি ফেল্ট হ্যাট চাপিয়ে রেশমের ফিতেয় থুতনির নিচে বাঁধল ওটা, যেন ওকে যেখানে নিয়ে যাওয়া হবে সেখানে হাওয়ার ঝাপ্টায় উড়ে না যায়।
ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকে একজোড়া কালো চামড়ার দস্তানা তুলে নিয়ে নিরাসক্তভাবে আগন্তুকদের দিকে ফিরে শান্ত কণ্ঠে বলে উঠল: ‘আমি তৈরি।’
সেন্ট-ল্যাযারের প্রিজন সেল থেকে বেরিয়ে ওদের ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে যেতে ইঞ্জিন চালু অবস্থায় অপেক্ষায় থাকা একটা অটোমোবাইলের দিকে পা বাড়াল ওরা সবাই।
ঘুমন্ত শহরের ভেতর দিয়ে কাসারনে ভিনসেন্স ব্যারাকের দিকে সবেগে ছুটে চলল গাড়িটা। ১৮৭০ সালে জার্মানদের হাতে ধ্বংসের আগে একটি দুর্গ ছিল ওখানে।
২০ মিনিট বাদে অটোমোবাইলটা থামলে ওটার মানুষগুলো নেমে পড়ল। সবার শেষে নামল মাতা হারি।
গুলি করার জন্য আগেই সার বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়েছিল সৈনিকরা। সারির শেষ মাথায় তলোয়ার বের করে দাঁড়িয়েছিল একজন অফিসার।
এক ফরাসি লেফটেন্যান্ট সামনে বেড়ে এক টুকরো সাদা কাপড় এক নানের দিকে বাড়িয়ে ধরে ‘ওর চোখ বেঁধে ফেলো,’ বলার আগ পর্যন্ত দুপাশে দুজন নানকে নিয়ে ফাদার আরবঅ মৃত্যুদণ্ড পাওয়া নারীর সঙ্গে কথা বললেন।
‘ওটা কি লাগাতেই হবে?’ কাপড়টার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল মাতা হারি।
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে লেফটেন্যান্টের দিকে তাকাল মেইত্রে ক্লুনেট।
‘মাদাম না চাইলে দরকার নেই,’ জবাব দিল লেফটেন্যান্ট।
মাতা হারিকে বাঁধা বা তার চোখে পট্টি বাঁধা হলো না। যাজক, নান আর উকিল পিছু হটে গেলে জল্লাদদের দিকে অবিচল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে।
ফায়ারিং স্কোয়াডের কমান্ডার তার লোকদের রাইফেল পরখ করা থেকে বিরত রাখতে নজর রাখছিল ওদের দিকে— কোনো একটাতে ফাঁকা গুলি ঢোকানোর রেওয়াজ আছে, যাতে সবাই বলতে পারে যে ভয়ঙ্কর গুলিটা সে ছোড়েনি— ওরা স্বস্তিতেই আছে বলে মনে হচ্ছে। শিগগিরই চুকেবুকে যাবে সব।
‘রেডি!’
১২ জন লোক আড়ষ্টভাবে অবস্থান নিল, কাঁধে ওঠাল যার যার রাইফেল।
একটা পেশিও নাড়ল না মাতা হারি।
সবাই যেন দেখতে পায় এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে তলোয়ার উঁচু করে ধরল সৈনিকটি।
‘এইম!’
তার সামনের মহিলা নির্লিপ্ত, এতটুকুও ত্রস্ত নয়।
বাতাস কেটে বৃত্তাকারে নেমে এল অফিসারের তলোয়ার।
‘ফায়ার!’
প্রচণ্ড শব্দে গুলি বেরুতে শুরু করতেই দিগন্তে উদীয়মান সূর্যের আলো রাইফেলের মুখ থেকে বেরুনো ধোঁয়া আর অগ্নিশিখাকে আলোকিত করে তুলল। এর পর পরই সৈনিকরা এক ধরনের ছন্দময় কায়দায় জমিনে নামিয়ে রাখল রাইফেলগুলো।
সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য স্থির দাঁড়িয়ে থাকল মাতা হারি। চলচ্চিত্রে কাউকে গুলি করলে যেভাবে মারা যেতে দেখে থাকেন, সেভাবে মারা যায়নি সে। সামনে বা পেছনে হুমড়ি খেয়ে পড়েনি, দুপাশে বা মাথার ওপর হাত মেলে দেয়নি। মাথা উঁচু রেখে খোলা চোখে নিজের ওপরই লুটিয়ে পড়েছে সে। সৈনিকদের একজন বেহুঁশ হয়ে গেছে।
তারপর হাঁটু ভাঁজ হয়ে যেতেই ডান দিকে হেলে পড়েছে তার শরীর, ফার কোটের নিচে ভাঁজ হয়ে গেছে পা জোড়া। আকাশের দিকে মুখ করে নিথর পড়েছিল সে।
তৃতীয় একজন অফিসার বুকে বাঁধা হোলস্টার থেকে রিভলভার বের করে লেফটেন্যান্টের সঙ্গে নিথর শরীরটার দিকে এগিয়ে গেল।
সামনে ঝুঁকে গুপ্তচরের কপালের পাশে রিভলভারের নলটা ছোঁয়াল সে, ত্বক স্পর্শ না করার ব্যাপারে সতর্ক। ট্রিগার টানল সে, মগজ ভেদ করে গেল বুলেট। উপস্থিত লোকজনের দিকে ফিরে গম্ভীর কণ্ঠে সে বলল: ‘মাতা হারি মারা গেছে।’
চিঠি-১
প্রিয় মিস্টার ক্লুনেট,
এ সপ্তাহের শেষে কী হবে জানি না। বরাবরই আশাবাদী মেয়ে ছিলাম আমি কিন্তু সময় তিক্ত, নিঃসঙ্গ আর বিষণ্ন করে তুলেছে আমাকে।
পরিস্থিতি আশানুরূপ হলে আপনি এ চিঠি পাবেন না। আমাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। হাজার হোক, প্রভাবশালী বন্ধু তৈরি করার পেছনে জীবন কাটিয়েছি আমি। চিঠিটা আমি রেখে দেব যাতে আমার একমাত্র মেয়েটি একদিন ওর মা কে ছিল জানতে এটা পড়তে পারে। সবসময়ই বাস্তববাদী মেয়ে ছিলাম, জানি একবার কোনো একটি মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার পর পেছনে না তাকিয়ে ভিন্ন কোনো মামলা নিয়ে এগিয়ে যান উকিল।
পরে কী ঘটবে কল্পনা করতে পারছি। একজন যুদ্ধাপরাধীর পক্ষাবলম্বনের পর দারুণ ব্যস্ত হয়ে পড়বেন আপনি। আপনার সেবা পেতে দরজায় কড়া নাড়বে বহু লোক। কারণ হেরে গেলেও বিপুল প্রচারণা পেয়েছেন। ঘটনা সম্পর্কে আপনার ভাষ্য শুনতে আগ্রহী সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা হবে, শহরের সবচেয়ে ব্যয়বহুল রেস্তোরাঁয় খাবেন, আপনার দিকে সবাই সমীহের সঙ্গে তাকাবে, আপনার প্রতিদ্বন্দ্বীরা ঈর্ষাতুর চোখে দেখবে আপনাকে। আপনি জানবেন আমার বিরুদ্ধে নিরেট কোনো প্রমাণ ছিল না— কেবল কারিগরি ফলানো কিছু দলিল— কিন্তু একজন নির্দোষ মেয়েকে মরতে দেয়ার কথা প্রকাশ্যে কখনই স্বীকার করবেন না।
নিষ্পাপ? হয়তো জুতসই শব্দ নয় এটা। আমি কখনই নিষ্পাপ ছিলাম না, আমার খুবই প্রিয় এ শহরে পা রাখার পর থেকে তো নয়ই। ভেবেছিলাম যারা রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য চায়, তাদের খেলাতে পারব। ভেবেছি জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ইংলিশ, স্প্যানিশরা কোনো দিনই ঠেকাতে পারবে না আমাকে— কিন্তু শেষমেশ আমিই খেলার শিকার হলাম। যেসব অপরাধ আমি করেছি, আমি পালিয়েছি, পুরুষশাসিত এক দুনিয়ায় মুক্ত ও স্বাধীন একজন নারী হওয়াই তার ভেতর সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল। গুপ্তচরবৃত্তির জন্য আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। অথচ একমাত্র নিরেট যে জিনিসটা বিকিকিনি করেছি তা হলো— হাই সোসাইটি স্যালনের গুজব।
হ্যাঁ, গুজবকেই ‘গোপনীয়’ বানিয়েছি আমি। কারণ টাকা আর ক্ষমতা চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন যারা আমাকে অভিযুক্ত করছে, তারা জানে আমি নতুন কিছুই প্রকাশ করিনি।
কথাটা কেউ জানবে না, এটা খুবই লজ্জাজনক। এ খামগুলো নির্ঘাত অন্যান্য মামলার দলিলে ভরা কোনো ধূলিমলিন ক্যাবিনেটে আশ্রয় পাবে। সম্ভবত আপনার উত্তরসূরি বা তার উত্তরসূরির উত্তরসূরি জায়গা বের করার জন্য এগুলো ফেলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে বিদায় হবে।
তত দিনে আমার নাম বিস্মৃত হবে। কিন্তু স্মরণীয় হতে লিখছি না আমি। নিজেই সবকিছু বোঝার চেষ্টা করছি। কেন? যে নারীটি বছরের পর বছর যা চেয়েছে তা-ই পেয়েছে, সে কীভাবে এত তুচ্ছ কারণে মৃত্যুদণ্ড পেতে পারে?
এ মুহূর্তে নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছি— স্মৃতি হচ্ছে নদী, যেটা সবসময় উল্টো প্রবাহিত হয়।
স্মৃতি বরাবর খেয়ালি, যেখানে আমাদের অভিজ্ঞতার বিভিন্ন ইমেজ কোনো তুচ্ছ বিষয় বা তাত্পর্যহীন শব্দে আমাদের শ্বাসরুদ্ধ করে তুলতে পারে। বেকিং রুটির সুবাস আমার সেলে ভেসে এসে স্বাধীনভাবে বিভিন্ন ক্যাফেতে ঘুরে বেড়ানোর দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয় আমাকে। এটা এখন মোকাবেলা করা মরণভীতি বা নিঃসঙ্গতার চেয়ে বেশি করে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে।
স্মৃতি বিষণ্নতা নামে এক দানবকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে— ইশ, এই নিষ্ঠুর দানোর কবল থেকে নিস্তার পাই না। কোনো কয়েদির গান গাওয়া শোনা, ভক্তদের কাছ থেকে অল্প কিছু চিঠি পাওয়া, যারা আমাকে গোলাপ আর জেসমিন ফুল এনে দিত। সেই সময় ঠিক উপলব্ধি করতে পারিনি কোনো শহরের কোনো দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যাওয়া। এখন আমার সফর করা দেশগুলোর এইটুকুই অবশিষ্ট আছে আমার।
স্মৃতি সবসময়ই জিতে যায় আর তাদের সঙ্গে হাজির হয় বিষণ্নতার চেয়েও ভয়ঙ্কর দানো অনুশোচনা। এ সেলে এটাই আমার একমাত্র সাথী, কেবল সিস্টাররা যখন গল্প করতে আসে তখন বাদে। ঈশ্বরের কথা বলে না ওরা বা সমাজ যাকে ‘আমার মাংসের পাপ’ বলে, সেজন্য নিন্দাও করে না। সাধারণত দু-একটা কথা বলে আর আমার মুখ থেকে স্মৃতি উগড়ে আসে যেন সময়ের পেছনে ফিরে যেতে চাই আমি, উল্টো বয়ে চলা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাই।
ওদের একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল: ‘ঈশ্বর তোমাকে দ্বিতীয় দফা সুযোগ দিলে তুমি ভিন্নভাবে করতে কিছু?’
হ্যাঁ, বলেছি আমি কিন্তু সত্যি আমি জানি না। শুধু জানি, আমার এখনকার হূদয় একটা ভুতুড়ে শহর; আবেগ, উত্সাহ, নিঃসঙ্গতা, গ্লানি, বিশ্বাসঘাতকতা আর দুঃখের বাস সেখানে। এগুলোর কোনোটা থেকেই নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারি না, এমনকি যখন নিজের জন্য খারাপ লাগে, নীরবে কাঁদতে থাকি, তখনো না।
আমি একজন নারী, যে কিনা ভুল সময়ে জন্ম নিয়েছে এবং সেটা শোধরানোর পক্ষে কিছুই করার নেই। জানি না ভবিষ্যত্ আমাকে মনে রাখবে কিনা কিন্তু যদি রাখে আমাকে যেন ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে না দেখে, বরং এমন কেউ হিসেবে দেখে নিঃশঙ্ক চিত্তে যে মাশুল গোনার কথা ছিল, সেটা মিটিয়েই সাহসের সঙ্গে সামনে এগিয়ে গেছে।
একবার ভিয়েনা সফরের সময় অস্ট্রিয়ার নারী-পুরুষের ভেতর দুর্দান্ত সফল এক লোকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তার নাম ছিল ফ্রয়েড— ফার্স্ট নেম মনে নেই— লোকে পছন্দ করত তাকে, কারণ আমাদের নিষ্পাপ হওয়ার সম্ভাবনা আবার ফিরিয়ে এনেছিল সে। আমাদের দোষগুলো আসলে মা-বাবার।
আমার মা-বাবার কোথায় ভুল হয়েছিল, বোঝার চেষ্টা করছি এখন। কিন্তু নিজের পরিবারকে দোষ দিতে পারব না। অ্যাডাম ও আন্টি জেলে টাকায় মেলে এমন সবই দিয়েছে আমাকে। একটা টুপির দোকান ছিল ওদের। লোকে তেলের গুরুত্ব বোঝার আগেই তাতে বিনিয়োগ করেছিল, ফলে প্রাইভেট স্কুলে পড়ার সুযোগ মিলেছে আমার। নাচ শিখেছি, ঘোড়ায় চড়ার তালিম নিয়েছি। লোকে যখন আমাকে ‘শিথিল চরিত্রের নারী’ বলে অভিযোগ তুলতে শুরু করে, আমাকে সমর্থনে বাবা একটা বই লিখেছিল— যে কাজটা করা ঠিক হয়নি মোটেই। আমি যা করছিলাম তাতে আমার কোনো অস্বস্তি ছিল না। তার কথাগুলো বেশ্যাবৃত্তি আর মিথ্যাচারের অভিযোগের দিকে বেশি করে নজর কেড়েছিল।
হ্যাঁ, বেশ্যা ছিলাম আমি— এ কথায় আপনি যদি আমোদের বিনিময়ে আনুকূল্য আর অলঙ্কার নেয়া বোঝান। হ্যাঁ, আমি মিথ্যুক ছিলাম, এমনই ঝোঁক ছিল তাতে যে কী বলেছি, প্রায়ই ভুলে যেতাম এবং ভুলগুলোকে আড়াল করতে গিয়ে বিপুল মানসিক শক্তি খরচ করতে হতো।
সম্ভবত ভুল শহরে জন্ম দেয়া ছাড়া মা-বাবাকে আর কোনো কিছুর জন্যই দোষ দিতে পারব না। লিউওয়ার্ডেন, যে জায়গার কথা আমার সতীর্থ ওলন্দাজরা কোনো দিনই জানবে না, যে শহরে আসলে কিছুই ঘটে না, প্রতিটি দিন ঠিক আগের দিনটির মতো। আগে কিশোর বয়সেই বন্ধুরা যেভাবে জানাত, আমি যে সুন্দরী সেটা জানা হয়ে গিয়েছিল আমার।
১৮৮৯ সালে আমার পরিবারের ভাগ্য পাল্টে যায়। দেউলিয়া হয়ে যায় অ্যাডাম আর আন্টি অসুস্থ হয়ে পড়ে, দুই বছর পর মারা যায় সে। ওরা যে অবস্থায় ছিল, আমাকে তার ভেতর দিয়ে যেতে দিতে চায়নি ওরা। লেইডেন নামে অন্য একটা শহরের স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছিল। আমি যেন ভালো শিক্ষা পাই, সে ব্যাপারে অটল ছিল তারা। আমার দায়দায়িত্ব নিতে একজন স্বামীর অপেক্ষায় থাকার সময় কিন্ডারগার্টেন টিচার হতে প্রশিক্ষণ নিয়েছি ওখানে। বিদায়ের দিন মা আমাকে ডেকে এক প্যাকেট বীজ তুলে দিয়েছিল আমার হাতে।
‘এটা সঙ্গে নিয়ে যাও, মারগারেতা।’
মারগারেতা— মারগারেতা জেলে— আমার নাম ছিল ওটা, দারুণ অপছন্দের। এক বিখ্যাত ও সম্মানিত অভিনেত্রীর কারণে অগুনতি মেয়ের এই নাম রাখা হয়েছিল।
বীজগুলো কীসের জন্য জানতে চাইলাম।
‘টিউলিপের বীজ ওগুলো, আমাদের দেশের প্রতীক। কিন্তু তার চেয়েও বেশি, এগুলো তোমাকে যে সত্যি জানতেই হবে তার প্রতিনিধিত্ব করে। এখন অন্য ফুল থেকে আলাদা করতে না পারলেও সবসময় টিউলিপই থাকবে এগুলো। কোনো দিনই গোলাপ বা সূর্যমুখী হয়ে উঠবে হবে না। যতই আশা করুক। আর নিজেদের অস্তিত্ব অস্বীকার করতে চাইলে তিক্ত জীবন কাটিয়ে মরবে।’
‘সুতরাং তোমাকে অবশ্যই খুশি মনে নিজের নিয়তি অনুসরণ করা শিখতে হবে। সেটা যা-ই হোক। ফুল বড় হওয়ার সময় সৌন্দর্য তুলে ধরে আর সবাই তারিফ করে; তারপর মারা যায় ওগুলো, অন্যরা যাতে ঈশ্বরের কাজ চালিয়ে যেতে পারে সেজন্য বীজ রেখে যায়।’
অসুস্থতা সত্ত্বেও দিনের পর দিন যত্নের সঙ্গে সেলাই করা একটা ছোট ব্যাগে বীজের প্যাকেটটা রাখল সে।
‘ফুল আমাদের শেখায় যে কিছুই স্থায়ী নয়; ওদের সৌন্দর্য নয়, এমনকি নেতিয়ে পড়ার ব্যাপারটাও নয়। কারণ তার পরও নতুন বীজ জোগাবে ওরা। যখনই আনন্দ, বেদনা বা বিষণ্ন বোধ করবে— এ কথা মনে করো। সবকিছু শেষ হয়ে যায়, বুড়িয়ে যায়, মারা যায় এবং নতুন করে জন্ম নেয়।’
কথাটা বুঝতে কতগুলো ঝড়-তুফান মোকাবেলা করতে হবে আমার? সেই সময় ওর কথাগুলো ফাঁপা শুনিয়েছিল; একই রকম দিন আর রাত নিয়ে দমবন্ধ করা শহর থেকে বিদায় নিতে ব্যাকুল ছিলাম। কিন্তু আজ এটা লিখছি যখন বুঝতে পারছি, নিজের কথাও বলেছিল মা।
‘এমনকি কি লম্বা গাছগুলোও এমন খুদে বীজ থেকেই বেড়ে উঠতে পারে। কথাটা মনে রেখো আর সময়কে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করো না।’
চুমু খেয়ে আমাকে বিদায় জানিয়েছিল সে। বাবা আমাকে রেলস্টেশনে নিয়ে গেছে। যাওয়ার পথে বলতে গেলে কথাই হয়নি আমাদের। ...
মাতা হারি
এভাবেই শুরু হয়েছে আইনজীবী মেইত্রে ক্লুনেটের কাছে লেখা মাতা হারির চিঠি। চিঠিতে নিজের কাহিনী আদ্যোপান্ত তুলে ধরেছে সে। ছোটবেলা থেকে শুরু করে পড়াশোনা, নানা দেশ সফর, সমাজের উঁচু স্তরের প্রভাবশালী লোকজনের সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে নানা সুবিধা অকপটে বলে গেছে। এক পর্যায়ে রাশিয়া ও জার্মানির পক্ষে গুপ্তচরের ভূমিকা পালন করার অপরাধে ফরাসি সরকার তাকে গ্রেফতার ও বিচার করে। বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় তাকে।
পরে মাতা হারির উদ্দেশে লেখা তার আইনজীবী মেইত্রে ক্লুনেট প্রহসনমূলক বিচার ও বানোয়াট সাক্ষী প্রমাণ-সংক্রান্ত ব্যাখ্যামূলক একটি চিঠি লেখে, যদিও সেটি তার হাতে পৌঁছেনি। নিচে সেই চিঠির সংক্ষিপ্ত রূপ তুলে ধরা হলো—
চিঠি-২
প্রিয় মাতা হারি,
আপনি এখনো জানেন না যদিও প্রেসিডেন্ট আপনার ক্ষমা প্রার্থনা নাকচ করে দিয়েছেন। তো আগামীকাল ভোরে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসছি আমি। এটাই হবে আমাদের শেষ দেখা।
আমার হাতে খুব বেশি সময় নেই, জানি এক ফোঁটা ঘুমুতে পারব না। সেজন্যই এ চিঠি লেখা, যেটি যাকে উদ্দেশ করে লেখা তিনি কখনই পড়বেন না। কিন্তু তদন্তের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে এটা তুলে ধরতে চাই। যদিও আইনের দৃষ্টিতে এটা নেহাতই অর্থহীন হতে পারে, আমি আশা করছি, আমি জীবিত থাকতেই আপনার খ্যাতি ফিরিয়ে দেবে।
এ মামলায় নিজর অযোগ্যতা প্রমাণের ইচ্ছা নেই আমার। আপনার অনেক চিঠিতে যেমন অভিযুক্ত করেছেন, অতটা বাজে উকিলও আমি নই। আমি শুধু যে পাপ আমি করিনি, সেটা থেকে মুক্তি পেতে হলেও গত কয়েকটা মাস যে বিপত্তির ভেতর দিয়ে গেছি তাকে জাগিয়ে তুলতে চাই। আমি একাই এ বিপদের ভেতর দিয়ে যাইনি। ভালোবাসার নারীটিকে বাঁচানোর সব রকম চেষ্টা করছিলাম, যদিও কখনো স্বীকার করিনি।
গোটা জাতিই গেছে এ বিপত্তির ভেতর দিয়ে। দেশে এমন কোনো পরিবার নেই, যুদ্ধক্ষেত্রে যারা ছেলে হারায়নি। এ কারণে আমরা নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছি, অন্যায় করেছি, আমার দেশে ঘটছে কখনো কল্পনা করিনি এমন সব ব্যাপার। ...
প্রিয় মাতা হারি, ঠিক কাজটি করার জন্য ভুল মানুষকে বেছে নেয়াই ছিল আপনার সবচেয়ে বড় ভুল। কাউন্টার এসপিওনাজের কর্তা জর্জ ল্যাডক্স। আপনি প্যারিসে ফেরামাত্রই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সে। মুখোশ উন্মোচন হওয়ার পর ‘শত্রুর পরবর্তী পদক্ষেপ জানতেই তার কাজ সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমাদের বন্ধুদের মনোবল নষ্ট করা থেকে বিরত রাখাও তার দায়িত্ব’ বলে নিজের কাজকে জায়েজ করেছে। প্রমোশন চেয়েছিল সে কিন্তু সেটা নাকচ করা হয়েছে।
মানুষ কেবল মৃত্যুর কথা ভাবতে পারে না, কোনো ধরনের জয়ে বিক্ষিপ্ত হতে চায়। এটা জেনেই আপনাকে প্রথম দেখামাত্র নিজের হীন জাল বুনতে শুরু করেছিল সে। নিজের লেখায় আপনাকে এভাবে বর্ণনা করেছে সে:
“আনুষ্ঠানিক পোশাকে আমাকে মুগ্ধ করার কসরত করে মঞ্চে ঢোকার কায়দায় আমার অফিসে ঢোকে সে। তাকে বসার আমন্ত্রণ জানাইনি। কিন্তু একটা চেয়ার টেনে আমার ডেস্কের সামনে বসেছে সে। দ্য হেগে জার্মান কনসালের দেয়া প্রস্তাবের কথা জানিয়ে ফ্রান্সের পক্ষে কাজ করতে তৈরি থাকার কথা বলেছে। তাকে অনুসরণ করে চলা আমার এজেন্টদের নিয়েও পরিহাস করেছে। ...কী করে দেশের সেবা করতে চায় জানতে চেয়েছি। বিরক্তির সুরে সে জবাব দিয়েছে, ‘সেটা ভালো করেই জানো। জার্মানদের কাছে আমি এইচ২১। ফরাসিদের হয়তো তাদের পক্ষে গোপনে যারা কাজ করে তাদের আরো ভালো নাম রয়েছে।’
দ্ব্যর্থবোধক কথায় পাল্টা উত্তর দিয়েছি আমি: ‘আমরা সবাই জানি, সব কাজেই বেশ ব্যয়বহুল তুমি। কত খরচ পড়বে এতে?’
‘সব কিংবা কিছুই না,’ ছিল তার জবাব।
‘সে বিদায় নিতেই সেক্রেটারিকে মাতা হারির ডোশিয়ে পাঠাতে বললাম। বিপুল খাটুনির পর তৈরি করা ডোশিয়ে পড়ার পর দোষী সাব্যস্ত করার মতো কিছু পেলাম না’।”
অন্য কথায় আপনি অপরাধী হলেও ওরা আপনাকে দোষী সাব্যস্ত করার মতো কিছু পায়নি। এজেন্টরা দৈনন্দিন রিপোর্ট দাখিল অব্যাহত রেখেছে। জার্মান হামলায় মাস্টার্ড গ্যাসে অন্ধ হয়ে যাওয়া মেয়েটিকে নিয়ে আপনি ভিটেলে গেলে ‘রিপোর্ট’ সংগ্রহের ব্যাপারটা হাস্যকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে মুহূর্তেই প্রিয় মাতা হারি ভয়ঙ্কর আঘাতটা আসে। জার্মানরাও আপনাকে অনুসরণ করছিল। ওরা আরো দক্ষ ও আড়ালে ছিল। ক্যাপ্টেন ল্যাডক্সের ওখানে যাওয়ার পরই ওরা আপনার ডাবল এজেন্ট হওয়ার ইচ্ছা টের পায়। আপনি ভিটেলে ঘুরে বেড়ানোর সময় দ্য হেগে আপনাকে কাজে নেয়া কনসাল ক্র্যামারকে বার্লিনে জেরা করা হচ্ছিল। আপনার কাছে কোনো এজেন্ট তথ্য জানতে চাইলে কিছুই না পাওয়ার কথা বলছিলেন আপনি।
অবশ্য মাদ্রিদে কাউন্টার এসপিওনাজের প্রধান হতভাগ্য ল্যাডক্সের কাছে পাঠানো একটা চিঠি হাত করতে পেরেছিল ওরা। তাতে এক জার্মান বড় কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনার বিস্তারিত বিবরণ ছিল। জার্মানদের সন্দেহ পোক্ত হয়ে যায়। কনসাল ক্র্যামারের কী হয়েছে, আমরা জানি না। তবে মাতা হারি নিশ্চিতভাবেই একজন ডাবল এজেন্ট। ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো তথ্যই জোগায়নি সে। আইফেল টাওয়ারের চূড়ায় একটা রেডিও সার্ভেইল্যান্স পোস্ট ছিল আমাদের, ওদের ভেতর বিনিময় হওয়া বেশির ভাগ তথ্যই সাংকেতিক ছিল বলে বোঝা কঠিন। ল্যাডক্স তাদের রিপোর্ট পড়লেও কিছুই বিশ্বাস করেনি বলেই মনে হয়। মরক্কোর উপকূলে পৌঁছানো অস্ত্রশস্ত্রের খোঁজ করতে সে কাউকে পাঠিয়েছিল কিনা জানতে পারব না কখনো, তবে সহসা ফরাসিদের অর্থ উদ্ধার করে ফেলা সাংকেতিক ভাষায় মাদ্রিদ থেকে বার্লিনে পাঠানো একটা টেলিগ্রাম বিচারের মূল বিষয়ে পরিণত হয়, যদিও তাতে আপনার ছদ্মনাম ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
‘এজেন্ট এইচ২১-কে মরক্কোর উপকূলে সাবমেরিন পৌঁছানোর কথা জানানো হয়েছে। মেরিনদের কাছে অস্ত্রশস্ত্র পৌঁছানোর তদারকি করতে হবে। প্যারিসে যাচ্ছে সে। আগামীকাল ওখানে পৌঁছবে।’
আপনাকে ফাঁসানোর জন্য দরকারি সব প্রমাণই এখন হাতে পেয়ে গেছে ল্যাডক্স। কিন্তু মিলিটারি ট্রাইব্যুনালকে স্রেফ একটি টেলিগ্রাম বিশ্বাস করাতে পারবে বিশ্বাস করার মতো নির্বোধ আমি নই। বিশেষ করে স্বাক্ষর আর তারিখহীন একটা লেখার কারণে একজন নিরীহ লোকের অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ার ড্রেফাস মামলার কথা যেখানে সবার মনে জ্বলজ্বল করছে। তো অন্য ফাঁদের দরকার পড়বে।
আপনি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকার সময় মিথ্যাচার করছিল ওরা, কিন্তু আমি প্রকাশ্যে বিশ্বাস হারানো একজনের পক্ষাবলম্বন করছিলাম। গোড়া থেকেই প্রসিকিউটরদের অভিযোগের তালিকা একেবারেই জঘন্য ছিল, আপনার সত্যি কথার সঙ্গে ওদের মনগড়া মিথ্যার মিশেল। আপনি বেকায়দা অবস্থায় পড়েছেন বুঝতে পেরে আমাকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর এবং আমাকে পাঠানো দলিলপত্র পাঠানোর পর হতভম্ব হয়ে গেছি। এখানে কয়েকটা অপরাধের বর্ণনা দিচ্ছি:
১. জেলে ম্যাকলিয়ড জার্মান ইন্টেলিজেন্সের সদস্য, সেখানে সে এইচ২১ নামে পরিচিত।
২. বৈরিতার শুরু থেকে দুবার ফ্রান্সে গেছে সে, নিশ্চিতভাবেই পরামর্শকদের নির্দেশনায় শত্রুর জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে। (দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ল্যাডক্সের লোক অনুসরণ করেছে আপনাকে— কীভাবে সেটা করতে পারেন আপনি?)
৩. দ্বিতীয় সফরের সময় ফরাসি ইন্টেলিজেন্সকে নিজের সেবা দেয়ার প্রস্তাব রাখে সে। আসলে পরে যেমন দেখা গেছে, জার্মান এসপিওনাজের সঙ্গে সবই ভাগাভাগি করেছে সে। (এখানে দুটি ভুল রয়েছে: হেগ থেকে একটি মিটিংয়ের ব্যবস্থা করার জন্য ফোন করেছিলেন আপনি; আপনার প্রথম সফরের সময় এ মিটিংটা হয়েছিল ল্যাডক্সের সঙ্গে এবং নিশ্চিতভাবেই জার্মান ইন্টেলিজেন্সের সঙ্গে গোপন তথ্য ‘ভাগাভাগি’র কোনো প্রমাণ উত্থাপিত হয়নি।)
৪. ফেলে যাওয়া কাপড়চোপড় নেয়ার অজুহাতে জার্মানিতে ফিরে আসে সে। কিন্তু কিছু না নিয়েই ফিরে যায়। গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের হাতে ধরা পড়ে। ওদের ক্যাপ্টেন ল্যাডক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করতে জোর করে সে, নিজের পরিচয় নিশ্চিত করতে অস্বীকার করে। তাকে আটকানোর পক্ষে কোনো যুক্তি বা প্রমাণ না থাকায় স্পেনে পাঠিয়ে দেয়া হলে আমাদের লোকজন তাকে জার্মান কনস্যুলেটের দিকে যেতে দেখেছে। (সত্যি।)
৫. গোপন তথ্য থাকার ভান করে অচিরেই মাদ্রিদে ফরাসি কনস্যুলেটে হাজির হয়ে শত্রুপক্ষের অস্ত্রশস্ত্র আসার খবর থাকার কথা জানায়। ওই মুহূর্তে মরক্কোয় তুর্কি ও জার্মানদের হাতে ছিল সেসব। আমরা এরই মধ্যে তার ডাবল এজেন্ট হওয়ার কথা জানি বলে ফাঁদের ইঙ্গিত দেয়া একটা মিশনে কাউকে পাঠানোর ঝুঁকি নিইনি...(???)
এমনই আরো অনেক; পরে জেরাকারীদের কাছে ক্র্যামারের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ‘আমাদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য বেছে নেয়া গুপ্তচরদের ভেতর সবচেয়ে বাজে’ একজন নারীকে চিরকালের জন্য কলুষিত করতে খোলা চ্যানেলে পাঠানো টেলিগ্রামের কথায় পর্যবসিত মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে উল্লেখের অনুপযুক্ত কতগুলো কথা। এমনকি আপনিই এইচ২১ নামটা বানিয়েছেন বলে দাবি করেছে ল্যাডক্স। আপনার সত্যিকারের ছদ্মনাম এইচ৪৪। অ্যান্টওয়ের্প হল্যান্ডে ফ্রলিন ডক্টর শ্র্যাগমুলারের বিখ্যাত স্পাই স্কুলে ট্রেনিং পেয়েছেন।
মানবীয় মর্যাদা যুদ্ধের প্রথম বলি। আগেও যেমন বলেছি, আপনার গ্রেফতার ফরাসি সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা প্রদর্শন আর যুদ্ধক্ষেত্রে হাজার হাজার তরুণের মৃত্যু থেকে দৃষ্টি সরানোর কাজে লাগবে। শান্তির সময় কেউই এ ধরনের মিথাচারকে আলামত হিসেবে মেনে নেবে না। যুদ্ধের সময় আপনাকে গ্রেফতারের জন্য বিচারকের এটুকুই দরকার।
আমাদের ভেতর সেতুবন্ধ হিসেবে ভূমিকা পালনকারী সিস্টার পলিন কারাগারের সব ঘটনা সম্পর্কে আমাকে ওয়াকিবহাল রাখার চেষ্টা করে। আমাকে একবার লজ্জিত মুখে আপনাকে নিয়ে প্রকাশিত সবকিছুসহ আপনার স্ক্র্যাপবুক দেখতে চাওয়ার কথা বলেছিল। আমার পাশেই অ্যালবামটা খোলা রয়েছে, পত্রিকার খবরে বিচারের পরের দিনের ঘটনার বর্ণনা রয়েছে তাতে। লেখাটায় মাত্র একটা ভুলই দেখতে পাচ্ছি, আপনার জাতীয়তার ব্যাপারে।
থার্ড ওয়ার কাউন্সিল ঠিক ওই মুহূর্তে তার মামলার বিচার করার বাস্তবতা উপেক্ষা করে কিংবা নিজেকে সবসময় ভালো-মন্দের ঊর্ধ্বে মনে করে আসায় কী ঘটছে, সে ব্যাপারে নিরুদ্বিগ্ন থাকার ভান করে, ফরাসি ইন্টেলিজেন্সের বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে সবসময় সচেতন থাকায় রাশিয়ান গুপ্তচর মাতা হারি তার প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চাইতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যায়। তার চোখজোড়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধ করতে বাধ্য করা হচ্ছিল। পূর্ব রণাঙ্গণে কী হচ্ছে না জানার ভান করে ভার্দুনের কথা বলে সে। তাকে জানানো হয় যে, সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র এসে পৌঁছায়নি আর স্বয়ং মন্ত্রীই এর তদারক করছেন।
রুদ্ধদ্বার বৈঠকের শেষে গ্রেফতারি পরোয়ানা তুলে দেয়া হয়, সাংবাদিকদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল সেটা। বিচারের কাজ শেষ হলেই জনগণের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।
যুদ্ধমন্ত্রী তিনদিন আগেই প্যারিসের মিলিটারি গভর্নরের কাছে গ্রেফতারি পরোয়ানা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন— অফিস ৩৪৫৫ এসসিআর-১০— কিন্তু এ ধরনের সমন বাস্তবায়ন করার আগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উত্থাপন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।
থার্ড ওয়ার কাউন্সিলের প্রসিকিউটরের নেতৃত্বে পাঁচজনের একটি দল অবিলম্বে হোটেল এলিসি প্যালসের ১৩১ নম্বর রুমে হাজির হলো। সন্দেহভাজনকে রেশমি জোব্বা গায়ে তখনো নাশতা খেতে দেখে তারা। কাজটা কেন করছে জিজ্ঞেস করা হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যেতে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠার কথা জানায় সে। ওই মুহূর্তে ক্ষুধার্ত ছিল সে।
অভিযুক্তকে ওরা কাপড় পরতে বলার পর অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালিয়ে বহু কিছু খুঁজে পায়, বেশির ভাগই মেয়েদের কাপড় আর খুচরো জিনিস। ভিটেলে যাওয়ার অনুমতিপত্র আর ১৩ ডিসেম্বর ফ্রান্সে মজুরির বিনিময়ে কাজের অনুমতিও পাওয়া গেছে।
ব্যাপারটা ভুল বোঝাবুঝি দাবি করে সব জিনিসের বিস্তারিত তালিকা করতে বলে সে, যাতে তারা কিছু ঠিকমতো ফিরিয়ে না দিলে পরে মামলা করতে পারে।
থার্ড ওয়ার কাউন্সিলের প্রসিকিউটর ক্যাপ্টেন বুচারডন অভিযোগপত্র তুলে দেয় তার হাতে, পড়তে বলে। শেষ করার পর উকিল লাগবে কিনা জানতে চাওয়া হলে সরাসরি নাকচ করে দেয় সে। কেবল বলে: ‘কিন্তু আমি নির্দোষ! কেউ আমার সঙ্গে রসিকতা করছে, সবসময় এমন হয় না।’
ক্যাপ্টেন বুচারডন আমাদের সূত্রের লেখা একটি দলিলে স্বাক্ষর করতে বলে তাকে, স্বেচ্ছায় স্বাক্ষর দেয় সে। সেদিন বিকালেই হোটেলের আরামদায়ক পরিবেশে ফিরে এসে প্রভাবশালী বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল সে, যাতে ওকে তারা অভিযোগের অসম্ভাব্যতা স্পষ্ট করতে পারে।
কথিত ঘোষণায় স্বাক্ষর দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে সরাসরি সেন্ট-ল্যাযারে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
কেবল তার পরই আমরা যাকে ‘তোরকিমাদা দে প্যারিস’ বলি, সেই লোকের অসংখ্য জেরার পর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন আপনি। আপনার সঙ্গে দেখা করতে সেন্ট-ল্যাযারে গিয়েছি আমি। কিন্তু তখন দেরি হয়ে গেছে। এরই মধ্যে দেয়া বহু বিবৃতি প্যারিসের অর্ধেক লোকের জানা স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতার শিকার একজন লোকের চোখে আপনাকে দোষী সাব্যস্ত করে ফেলেছিল। প্রিয় মাতা হারি, এমন একজন মানুষ বিচারের বদলে বদলার খোঁজে থাকা ভয়ঙ্কর কোনো পশুর মতো।
হাজির হওয়ার আগে আপনার বিবৃতি পড়ে মনে হয়েছে, নিজের নির্দোষিতা প্রমাণের চেয়ে বরং গুরুত্ব তুলে ধরতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন আপনি। প্রভাবশালী বন্ধুবান্ধব, আন্তর্জাতিক সাফল্য এবং জনাকীর্ণ থিয়েটারের কথা বলেছেন আপনি, যেখানে ক্যাপ্টেন ল্যাডক্সের বলির পাঁঠা হিসেবে, নিজেকে শিকার হিসেবে তুলে ধরে ঠিক উল্টোটি করা উচিত ছিল। কাউন্টার এসপিওনাজ সার্ভিসের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সতীর্থদের সঙ্গে লড়াইয়ে যে আপনাকে ব্যবহার করেছে। ...এদিকে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। কারণ আপনাকে দোষারোপ করার মতো তেমন কিছু আপনার জিনিসপত্রে পায়নি ওরা। কয়েকটা বিজনেস কার্ডসহ একটি পার্স পেয়েছিল কেবল। বুচারডন যেসব লোক এত দিন ধরে আপনার নজর কাড়তে অনুনয়-বিনয় করেছিল, তাদের একেক করে জেরা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা আপনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছে। প্রসিকিউটর ডক্টর মর্নেটের যুক্তিগুলো বলতে গেলে করুণ ছিল। প্রমাণের অভাবে একপর্যায়ে তিনি দাবি করে বসেছেন:
‘জেলে আজকাল আমরা যেমন বিপজ্জনক নারীদের দেখি, ঠিক সেই রকম। বিভিন্ন ভাষায় যেমন অনায়াসে নিজেকে প্রকাশ করে সে— বিশেষ করে ফরাসি— সর্বক্ষেত্রে তার নানা সম্পর্ক, সামাজিক বলয়ে তার মিশে যাওয়ার সূক্ষ্ম কায়দা, অসাধারণ মেধা, নীতিহীনতা— এসবই সম্ভাব্য সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে দেখার পক্ষে অবদান রাখে।’
কৌতূহলোদ্দীপকভাবে শেষতক ক্যাপ্টেন ল্যাডক্সও লিখিতভাবে আপনার পক্ষে সাক্ষী দিয়েছে। তোরকেমাদা দে প্যারিসকে দেখানোর মতো কিছুই ছিল না তার কাছে।
‘আমাদের শত্রুর পক্ষে তার কাজ করার ব্যাপারটা পরিষ্কার, কিন্তু আপনাকে অবশ্যই সেটা প্রমাণ করতে হবে এবং এটা প্রমাণ করার মতো কিছুই নেই আমার হাতে...। আমার তরফ থেকে আমি নিশ্চিত, যে মানুষটা আমরা যে সময় বাস করি, তখন সফর করতে পারে আর এত এত অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, প্রমাণ হিসেবে সেটাই যথেষ্ট। যদিও লিখিত কিছু নেই...।
...আসলে নিজের জন্যই লিখছি এ চিঠিটা, নিজেকে প্রবোধ দিতে যা সম্ভব ও কল্পনাযোগ্য সবই করেছি আমি। প্রথমে আপনাকে সেন্ট-ল্যাযারে থেকে বের করে আনার চেষ্টা, তারপর আপনার জীবন বাঁচানোর জন্য লড়াই এবং সর্বশেষে অবিচারের কথা বলার জন্য একটি বই লেখার সুযোগ পাওয়া, যেখানে আপনি নারী হওয়ার বিরাট পাপ, স্বাধীন হওয়ার আরো বড় পাপ, প্রকাশ্যে নগ্ন হওয়ার অপরাধ, যেকোনো মূল্যে সুনাম রক্ষা করতে হবে এমন একজন লোকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পাপের শিকার। ফ্রান্স বা দুনিয়া থেকে কেবল আপনি অদৃশ্য হলেই সেটা সম্ভবপর। ...
দুর্ভাগ্যবশত বুচারডনের সঙ্গে আপনার সব আলাপের সময় আমি হাজির ছিলাম না। তার কারণ ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি ল’ নামে কালাকানুন জারি হয়েছিল। বহু সেশনেই বিবাদী পক্ষের আইনজীবীকে উপস্থিত থাকতে দেয়া হয়নি। তবে উঁচু জায়গায় আমার বন্ধুরা আছে, ল্যাডক্সকে আপনি কঠিনভাবে জেরা করেছেন শুনেছি, ডাবল এজেন্ট আর ফ্রান্সের পক্ষে কাজ করার জন্য টাকা দেয়ার প্রস্তাব তোলার সময় তার আন্তরিকতায় বিশ্বাস করার কথা বলেছেন তাকে। এ পর্যায়ে আপনার কী পরিণতি হতে যাচ্ছে জার্মানদের সেটা জানা ছিল। জানত আপনার অবস্থা আরো খারাপ করে তুলতে পারবে ওরা। কিন্তু আপনার দেশের ঘটনার কারণে ওরা আগেই এইচ২১’র কথা ভুলে গিয়েছিল।...
আপনার গ্রেফতারের দিন ১৩ ফেব্রুয়ারির পর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যখন আপনি ফায়ারিং স্কোয়াডের মোকাবেলা করতে যাচ্ছেন, এর মাঝখানের সময়টুকুতে ঘটা সব ঘটনা বলা অসম্ভব। ইতিহাসকেই বিচারের ভার দিচ্ছি আমি। হয়তো ইতিহাস একদিন আপনার প্রতিও সুবিচার করবে, যদিও আমার সন্দেহ আছে। আপনি কেবল গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত একজন মানুষই নন, বরং এমন একজন— যে কিনা বিশেষ রেওয়াজকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখিয়েছে। সে কারণে আপনাকে ক্ষমা করা যাবে না।
অবশ্য সারাংশ টানার জন্য এটুকুই যথেষ্ট হবে: আপনার টাকার উত্স বের করার চেষ্টা করেছে ওরা, তারপর ‘গোপনীয়’ বলে এ অংশটুকু আড়াল করেছে। কারণ ওরা বুঝতে পেরেছিল যে তাতে উচ্চপদস্থ অনেকেই ফেঁসে যাবে। ব্যতিক্রমহীনভাবে সাবেক প্রেমিকরা আপনাকে চেনার কথা অস্বীকার করেছে।
বিচারকদের বুচারডনের তরফ থেকে এ-জাতীয় বক্তব্য শুনতে বাধ্য করা হয়েছে: ‘যৌনতার যুদ্ধে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা নির্বিশেষে সব পুরুষই অনায়াসে পরাস্ত হয়েছে।’
২৪ জুলাই আপনাকে আদালতে ঢুকতে দেখার সময় আপনার চুল অবিন্যস্ত ছিল, পোশাক ছিল ফ্যাকাশে কিন্তু আপনার মাথা ছিল উন্নত, অবিচল পদক্ষেপ বজায় রেখেছেন আপনি, যেন ওরা আপনাকে প্রকাশ্যে যে অপমানের শিকার করতে চেয়েছিল, তাকে প্রত্যাখ্যান করে নিজের ভাগ্য মেনে নিয়েছেন।
আপনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, লড়াইয়ের অবসান ঘটেছে, কেবল আত্মমর্যাদার সঙ্গে বিদায় হওয়াটাই আপনার পক্ষে সম্ভব। কয়েক দিন আগে মার্শাল পেটেইন অগুনতি সৈন্যকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন, জার্মান মেশিনগানের সামনে মুখোমুখি যুদ্ধ করতে অস্বীকার করায় তাদের সবার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনা হয়েছিল। ফরাসিরা বিচারকদের সামনে আপনার এমন অবস্থানকে ওই মৃত্যুগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার একটা উপায় হিসেবে দেখেছে...
আজ আপনি ফরাসি জনগণের হাতে বন্দি কিন্তু সূর্য উদয়ের মতোই একদিন মুক্ত হবেন। আপনার মৃত্যুকে জায়েজ করার জন্য অভিযোগকারীদের আপনার পায়ে গলানো শিকল বহন করার জন্য আরো বেশি শক্তির দরকার হবে।
মেইত্রে ক্লুনেট
পরিশিষ্ট
মাতা হারির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার চারদিন পর, ১৯ অক্টোবর তার প্রধান অভিযোগকারী ক্যাপ্টেন জর্জ ল্যাডক্সের বিরুদ্ধে জার্মানদের পক্ষে গুপ্তচরগিরির অভিযোগ এনে কারাবন্দি করা হয়। নির্দোষ দাবি করা সত্ত্বেও বারবার ফরাসি কাউন্টার এসপিওনাজ সার্ভিস তাকে জেরা করে, যদিও বিরোধের সময় বৈধতা দেয়া সরকারি সেন্সরশিপ খবর কাগজে ওই খবর প্রকাশ পাওয়া ঠেকিয়ে রেখেছিল। আত্মপক্ষ সমর্থন করে শত্রুপক্ষ তথ্য গোপন করেছে বলে দাবি করে সে।
মাতা হারির মরদেহ একটি অগভীর কবরে দাফন করা হয়, কখনই যেটা শনাক্ত করা হয়নি। সে সময়ের রীতি মোতাবেক তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে সরকারের প্রতিনিধির হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। অনেক বছর রু দেস সেন্ট-পেরেসের অ্যানাটমি মিউজিয়ামে রাখা হয়েছিল সেটা, তারপর একদিন অদৃশ্য হয়ে গেছে। জাদুঘরের কর্মকর্তারা ২০০০ সালেই কেবল ওটার অনুপস্থিতি খেয়াল করেছেন। যদিও বিশ্বাস করা হয় যে, মাতা হারির মাথা আরো আগেই চুরি হয়ে গেছে।
১৯৪৭ সালে প্রসেকিউটর আঁন্দ্রে মর্নেট লেখক ও সাংবাদিক পল গিমার্ডের কাছে গোটা বিচার প্রক্রিয়াটিই অনুমান, প্রক্ষেপ আর ধারণাভিত্তিক ছিল বলে জানান।
[দ্য স্পাইয়ের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ।]






