বিশ্বের কোনো দেশই এককভাবে টিকে থাকতে পারে না এবং সম্ভবও নয়। প্রতিটি দেশের চাই অন্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, বিশেষ করে দ্বিপক্ষীয়। এ সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন, এমনকি সামরিক সাহায্য ও সহযোগিতা। তবে দেখা যায়, অনেক সময় সেসব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকে উভয় দেশের স্বার্থ এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।

গ্রেট ব্রিটেন ও সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে একে অন্যের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ব্রিটিশ সরকারের নথি অনুযায়ী জানা যায়, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক শুরু হয়েছে ১৮৪৮ সালে, যখন দ্বিতীয় সৌদি রাষ্ট্রের শাসক ফয়সাল বিন তুর্কি আল সৌদ১ আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রুসিয়াল ওমান২-এর বুশায়ারে তার প্রতিনিধির জন্য ব্রিটিশ রাজনৈতিক বাসিন্দার সমর্থনের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে হাউজ অব সৌদের, অর্থাৎ সৌদ রাজপরিবারের, সঙ্গে ব্রিটেনের সখ্য আরো গভীর হয়। অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পাকাপোক্ত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, যখন যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি (সুপার পাওয়ার) হিসেবে আবির্ভূত হয়। তবে ১৯৩৭ সালে সৌদি আরবে বিশাল তেলের মজুদ আবিষ্কৃত হওয়ার পরে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ সৃষ্টি হয়।

আলোচ্য লেখায় সৌদ বংশের তথা সৌদি আরবের সঙ্গে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সূত্রপাত এবং পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। তবে তার আগে সৌদ রাজপরিবারের উত্পত্তি ও উত্থানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হলো।

সৌদ রাজপরিবারের উত্থান

উচ্চাভিলাষী মরুযোদ্ধা মুহাম্মদ বিন সৌদ আল মাকরিন রিয়াদের কাছে অবস্থিত দিরিয়া এলাকার প্রধান ছিলেন। আরবের বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা শেখ মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব (১৭০৩-১৭৯২), যিনি ওয়াহাবি মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত, ১৭৪৪ সালে তার সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি করে ‘দিরিয়া আমিরাত’ গঠন করেন। তুরস্কের উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে শিরক-বিদাত পালনের অভিযোগ এনে এ দুজন ঐক্যবদ্ধ হন। তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল একজন ধর্মীয় (শেখ মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব) এবং আরেকজন (মুহাম্মদ বিন সৌদ আল মাকরিন) রাজনৈতিক দিক দেখভাল করবেন। সারা পৃথিবীতে ওয়াহাবি মতবাদ ছড়িয়ে দেয়া ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।

হাউজ অব সৌদের তিনটি পর্ব রয়েছে: দিরিয়া আমিরাত, যা প্রথম সৌদি রাষ্ট্র (১৭২৭-১৮১৮) হিসেবে ধরা হয় এবং সেই প্রায় এক শ বছরকে সালাফি মতবাদের সম্প্রসারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়; নেজদ আমিরাত, যা দ্বিতীয় সৌদি রাষ্ট্র (১৮২৪-১৮৯১) এবং ক্রমাগত অন্তর্দ্বন্দ্বের জন্য পরিচিত এবং তৃতীয় সৌদি রাষ্ট্র (১৯০২-বর্তমান), যা ১৯৩৪ সালে নামকরণ করা হয় ‘কিংডম অব সৌদি অ্যারাবিয়া’। তবে জানা যায়, এই দীর্ঘ সময়ে উসমানীয় সাম্রাজ্য, মক্কার শাসনকর্তা, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হা’ইল প্রদেশের আল রশিদ পরিবার এবং দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরের অসংখ্য ইসলামী দল এবং স্বদেশে শিয়া সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সৌদ বংশের দ্বন্দ্ব ছিল।

ব্রিটেনের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রপাত ও বিস্তার

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে গ্রেট ব্রিটেন এবং সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে একে অন্যের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং সেই মিত্রতা শুরু হয়েছে ১৮৪৮ সালে। তবে বিশ শতকের গোড়ার দিকে সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে ব্রিটেনের মধ্যে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে সম্পর্ক গভীর হয়।

সৌদি আরব ও ব্রিটেনের জোটের উত্পত্তি দুটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় থেকে। প্রথম চুক্তিটি ‘দারিনের চুক্তি’ (ট্রিটি অব দারিন) নামে পরিচিত, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর) সৌদি বাদশা ইবনে সৌদ এবং ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশ সরকার সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের রক্ষাকর্তার ভূমিকা পালন করার জন্য অঙ্গীকার করে। তবে সেই চুক্তি বাদশা ইবনে সৌদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ তখনই ব্রিটেন নতুন সৌদি রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছিল। সেই চুক্তিতে ব্রিটেন সৌদি আরবকে মেশিনগান ও রাইফেল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যা ১৯২৪ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশ সরকার মাসিক ৫ হাজার পাউন্ড স্টার্লিং ভর্তুকি দিয়েছে এবং ১৯২২ সালে তা ১০০ হাজার পাউন্ড স্টার্লিংয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ১৯২৭ সালের ২০ মে নেজদ রাজ্য এবং ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে ‘জেদ্দার চুক্তি’ (ট্রিটি অব জেদ্দা) সম্পাদিত হয়, যা বাদশা ইবনে সৌদের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং হেজাজ ও নেজদের রাজ্য নামে পরিচিত দুটি অঞ্চলের ওপর সার্বভৌমত্ব দেয়া হয়েছিল। সেই স্বীকৃতি ১৯৩২ সালে দুটি অঞ্চলের একত্রীকরণের পথ প্রশস্ত করে। এছাড়া সেই চুক্তিটি আরব অঞ্চলে ব্রিটিশ রক্ষাকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল।

সুচতুর ব্রিটিশ সরকার ১৯১৬ সালে অনুভব করেছিল, আবদুলআজিজ ইবনে সৌদ উদীয়মান শক্তি এবং তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া যায়। ব্রিটিশ সরকার বিশ্বাস করত, একসময় আবদুলআজিজ ইবনে সৌদ তুর্কিদের ধ্বংস করবে (উল্লেখ্য, তখন তুরস্ক ছিল ব্রিটিশদের শত্রু)। সুতরাং ব্রিটিশদের নতুন করে কোনো শক্তি প্রয়োগ করতে হবে না, বরং তাদের লাভই হবে। সেজন্য তারা রিয়াদ দখল করা আবদুলআজিজ ইবনে সৌদকে মেনে নিয়ে সমর্থন দিয়েছিল। অন্যদিকে আবদুলআজিজ ইবনে সৌদও দেখলেন যে সেই মুহূর্তে স্বাধীন শাসক হওয়ার জন্য ব্রিটেনের সহযোগিতা বেশি দরকার। তবে এ কথা সত্যি যে ব্রিটিশদের মনের ভেতর লুকিয়ে ছিল দুরভিসন্ধি। ব্রিটিশরা ভালো করেই জানত (তারা এখনো জানে) সব সম্পর্কের মধ্যে ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ নীতি কাজ করে। তাই তারাও দীর্ঘ সময় মুনাফা লাভের আশায় শুরুতে সৌদ পরিবারকে সহযোগিতা করেছিল।

এভাবেই সৌদ রাজপরিবারের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্কের সূত্রপাত হয়। পরবর্তী সময়ে সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে বিকশিত হয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তার লাভ করে এবং সম্পর্ক আরো বেশি জোরদার হয়েছে। এসব ক্ষেত্রের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য (ব্রিটেনের সামরিক সরঞ্জাম রফতানি এবং সৌদি আরব থেকে তেল আমদানি) এবং ব্রিটেনে সৌদি আরবের ব্যবসায়িক বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য।

সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রসঙ্গে বলা যায়, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে ব্রিটিশ ও সৌদি কোম্পানির মধ্যে ২০০-এর বেশি যৌথ উদ্যোগ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) রয়েছে। এছাড়া সৌদি আরব সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। দীর্ঘদিনের সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ফলাফল হিসেবে উভয় দেশ কয়েক দশক ধরে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিষয়ে সহযোগিতা করে আসছে।

তবে এ কথা সত্যি, ইয়েমেনের যুদ্ধ সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সামরিক সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। কেননা ২০১০ সালের আগে (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ) যুক্তরাজ্য সৌদি আরবকে যে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল, তার বেশির ভাগই ব্যবহার করা হয়নি; কিন্তু ইয়েমেনের সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব পশ্চিমা দেশের উসকানিতে সাড়া দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে জোট বেঁধে সেসব সামরিক সরঞ্জাম ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। এছাড়া সৌদি আরব পরোক্ষভাবে সিরিয়া এবং লিবিয়ায় বোমাবর্ষণে অংশগ্রহণ করেছে।

শুরু থেকে বর্তমানে সময় পর্যন্ত যে সৌদি আরব এবং ব্রিটেনের মধ্যে সম্পর্ক ইতিবাচক এবং বন্ধুসুলভ ছিল, তা নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল ধরে। কেননা তখন সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের আধা-রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠে এবং ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল সংকটের পর অল্প সময়ের জন্য যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবের সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যায়। যা হোক, ১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে সম্পর্ক পুনরায় শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৫ সালে যুক্তরাজ্য সৌদি আরবে প্রথম বড় অস্ত্র চালানে মুখ্য ভূমিকা পালন করে এবং ২৮০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বিমান, রাডার এবং অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহ করেছিল। সৌদি আরবের লাভজনক অস্ত্রবাজারের জন্য যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতার সূত্রপাত হয়। তবে ১৯৭০ এবং ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্য বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য নতুন চুক্তি অর্জন করে। সেই যুদ্ধের সরঞ্জাম বিক্রির ধারা আজও বহাল আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রিটিশ সরকার ২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরবের কাছে কমপক্ষে ৪.৭ বিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিংয়ের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছে। শুধু ২০১৭ সালেই তার পরিমাণ ছিল ১.১ বিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিংয়েরও বেশি। এছাড়া ২০১৮ সালের মার্চে BAE Systems (প্রাক্তন ব্রিটিশ অ্যারোস্পেস কোম্পানি) অতিরিক্ত ৪৮টি টাইফুন জেট ফাইটার সরবরাহের জন্য একটি অস্থায়ী চুক্তি স্বাক্ষর করে।

এছাড়া বিগত কয়েক দশক ধরে সৌদি আরবের মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ের ওপর, যেমন বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড; নারীর অধিকার; নারীর প্রতি সহিংসতা এবং নারী অধিকার কর্মীদের কারাদণ্ড; রাজনৈতিক মৃত্যুদণ্ড ও নির্যাতন ইত্যাদি নিয়ে একাধিকবার ব্রিটেন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের সূচনা

যদিও সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, তবে সৌদি আরবের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ সৃষ্টি হয় ১৯৩৭ সালে, যখন দাম্মামের কাছে মার্কিন সার্ভেয়াররা কূপ খনন করে তেলের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেছিল, যা পরে সৌদি আরবের বিশাল তেলের মজুদ বলে প্রমাণিত হয়েছে। সেই সময় আরব ও ইসলামী বিশ্বে সৌদি আরবের অনন্য ভূমিকা, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেলের মজুদ এবং ভৌগোলিক দিক থেকে কৌশলগত অবস্থানের জন্য সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধি সংরক্ষণে যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের প্রচণ্ড আগ্রহ দেখা গেছে। তবে তার আগে (১৯৩১ সালে) সৌদি আরবকে স্বীকৃতি দেয়ার পরেই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়।

জানা যায়, ১৯৩৩ সালে সৌদি বাদশা আবদুলআজিজ ইবনে সৌদকে গুরুতর আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তার মূল কারণ ছিল বাদশার আয়ের প্রধান উৎস হাজিদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ভাটা পড়েছিল। তাই তিনি ৫০ হাজার পাউন্ড স্টার্লিংয়ের সমপরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়ে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব ক্যালিফোর্নিয়াকে (SOCAL) তেলের জন্য ছাড় দিয়েছিলেন। আব্দুলআজিজ ইবনে সৌদ এবং SOCAL-এর মধ্যে চুক্তিটি নতুন বাদশাকে তার অনিশ্চিত শাসনকে সুসংহত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তহবিল সরবরাহ করেছিল। কিন্তু সেই সময়ে তার শাসন এতটাই দুর্বল ছিল যে সৌদ রাজপরিবারের ওপর ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সৌদ রাজপরিবারের নির্ভরতার চেয়ে বেশি ছিল। যাহোক, SOCAL বাদশাকে ২৮ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছিল এবং ১৯৩০-এর দশকে তেল অনুসন্ধানের অধিকারের বিনিময়ে বার্ষিক ২.৮ মিলিয়ন ডলার প্রদান করেছিল।

একসময় SOCAL অন্য তিনটি মার্কিন তেল কোম্পানির (এসসো, টেক্সাকো, মোবিল) সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরবীয় আমেরিকান অয়েল কোম্পানি (আরামকো) গঠন করে। আরামকো পূর্ব আরবে তেল অনুসন্ধান শুরু করে এবং ১৯৩৮ সালে তেল উৎপাদন শুরু হয়। সৌদি আরবের উন্নয়নশীল রাজনৈতিক অর্থনীতি দ্রুত আরামকো এবং তার আমেরিকান পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে যুক্ত হয়। কারণ সংস্থাটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তেল উৎপাদন ও রফতানির অজুহাতে শ্রম শিবির, করপোরেট শহর, রাস্তা, রেলপথ, বন্দর এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি করে। এ অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলো মার্কিন সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকিতে যুক্ত করা হয়েছিল, যা কোটি কোটি ডলারের সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর হয়। যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্রের আমদানীকৃত তেলের তৃতীয় প্রধান উৎস সৌদি আরব, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিদিন প্রায় অর্ধমিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ করে।

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের তথ্য (যা প্রকাশিত হয়েছে ১১ মে ২০২২) অনুযায়ী জানা যায়, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক সরঞ্জাম আমদানিকারক দেশ, যার পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন সাম্রাজ্যের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে সৌদি আরবের ভূমিকা শক্তিশালী হয়েছিল। তবে সুযোগ বুঝে যুদ্ধের মাঝেই ১৯৪৩ সালে ওয়াশিংটন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ‘সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্য অত্যাবশ্যক’। তাই যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে ঋণ-ইজারা দিয়ে সহযোগিতা করে। আব্দুলআজিজ ইবনে সৌদের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়া ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী দাহরানে (তেলকূপের কাছে) বিমান ঘাঁটি নির্মাণ করে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে কায়রো এবং আবাদানের অবস্থিত ব্রিটিশ ঘাঁটি থেকে স্বাধীন অবস্থান দিয়েছিল। উল্লেখ্য, ঘাঁটিটি জার্মানি ও জাপানের মধ্যে বৃহত্তম এবং এর অবস্থান ছিল সোভিয়েত শিল্প-কারখানার কাছাকাছি। যদিও ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ঘাঁটিটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধকারীরা সৌদি রাজতন্ত্রকে বাধ্য করেছিল মার্কিনদের চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ১৯৯০ সালের আগস্টে কুয়েতে ইরাকের আগ্রাসনের পরে মার্কিনরা ঘাঁটিটি পুনরায় দখল করার মওকা পেয়েছিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট এবং সৌদি বাদশা আবদুলআজিজের মধ্যে ১৯৪৫ সালে অনুষ্ঠিত সুয়েজ খাল নিয়ে এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যকার সম্পর্কটি নতুন মোড় নেয়। দুই নেতা একমত হন যে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে তেল সরবরাহ করবে এবং বিনিময়ে মার্কিন সরকার সৌদি আরবকে বাইরের শত্রুদের হাত থেকে নিরাপত্তা ও সামরিক সহায়তা প্রদান করবে। তার পর থেকে আজ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে দেয়া-নেয়ার সম্পর্ক বহাল আছে এবং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শেষকথা

আরব বিশ্বে সৌদ বংশের রাজত্ব, অর্থাৎ তৃতীয় সৌদি রাষ্ট্র শুরু হয় ১৯০২ সালে। আরব দেশগুলোতে যেখানে রাজবংশের উত্থান-পতনের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে সৌদ রাজবংশ শক্ত হাতে দেশের শাসনকার্য চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও এ সাফল্যের রহস্য সম্পর্কে বলা হয় সৌদ রাজবংশের সদস্যদের ঐক্যবন্ধন, তবে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ (বিশেষ করে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক) জড়িত থাকার বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না।

পাদটীকা

১. ফয়সাল বিন তুর্কি আল সৌদ (১৭৮৫-১৮৬৫) ছিলেন দ্বিতীয় সৌদি রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শাসক (১৮৩৪ থেকে ১৮৩৮ সাল) এবং সৌদ রাজপরিবারের সপ্তম প্রধান।

২. ব্রিটিশ সরকার ট্রুসিয়াল ওমান (অন্য নাম ট্রুসিয়াল অ্যারাবিয়া) নামটি দক্ষিণ-পূর্ব আরবের উপজাতীয় কনফেডারেশনের একটি দলকে দিয়েছিল। সেই দলের নেতারা ১৮২০ থেকে ১৮৯২ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের সঙ্গে প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি বা যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর করেছিল।

 

ফজল হাসান: লেখক ও অনুবাদক