রোল্যান্ড বার্থেসের (১৯১৫-৮০) কাছে ‘যোগাযোগের একটি পদ্ধতি, বিভিন্ন কল্পনার মেলা, ব্যবহার, পরিস্থিতি এবং আচরণের রেওয়াজ হিসেবে খাবারের বর্ণনা দেয়া হয়েছে।’ অন্য কথায়, বিভিন্ন উপাদান তথ্য জোগায় আর অর্থ বহন করে।
ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড-এ বিভিন্ন প্রতীকের ভেতর দিয়ে টেবিলের আওতা এবং সেখানে যা খাওয়া হচ্ছে, সেটার সাহায্যে সহিংসতার ভেতর কলোম্বিয়ান ক্যারিবিয়ানের ইতিহাস জানানোর লেখকের ইচ্ছাটুকুই জোরালো করছে।
গোটা উপন্যাসজুড়ে উরসুলা বুয়েন্দিয়াই কী খাওয়া হচ্ছে এবং কীভাবে খাবার পরিবেশন করা হবে, ঠিক করছে। শহরের উন্নতি-অবনতি দুটোই উরসুলার নিজস্ব বিবর্তন ও ক্রমাবনতির সাথে সম্পর্কিত। প্রথমে পরিবারের টিকে থাকা নিশ্চিত করা সবজিক্ষেতে চাষ ও পশু পালন করছে সে। পরে রান্নাঘরকেই তাদের জীবনযাত্রার টানা উন্নতিতে বিনিয়োগের সুযোগ করে দেয়া মিল্ক ক্যান্ডি এনিম্যাল তৈরির ব্যবসার চেহারা দিচ্ছে। রান্নাঘর ও ওটার টেবিল বাইরে থেকে আসা সুযোগের দুয়ার খুলে দিয়েছে ওদের সামনে। ওদের বাড়ির সচ্ছলতা একাধারে মাকোন্দোরও সমৃদ্ধি বৈকি।
উরসুলার ক্ষমতা খোয়ানোর পরিস্থিতির আওতায়ই শহরের বিপুল পতনের প্রথম আলামতও তুলে ধরছে এটা। বুয়েন্দিয়াদের ভালো রান্নার কথার পাশাপাশি দারিদ্র্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো এবং যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়ায় অবস্থা আরো সঙ্গিন হয়ে ওঠা বিভিন্ন ঘরের যেনতেন খাবারেরও উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমান রচনায় আমরা ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড-এর বদলে চলা জগতে দেখা দেয়া মাকোন্দোর বিভিন্ন টেবিলে নির্দিষ্ট উপাদান ও ডিশের পর্যায় থেকে নানা সম্ভাবনার সুলুকসন্ধান করব।
বরফের আগে
ওকে জ্বালিয়ে মারা ভূতের খপ্পর থেকে বাঁচতে স্ত্রীকে নিয়ে বিদায় নিচ্ছে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া। ২৬ মাস ধরে অভিযানের প্রেতাত্মার হাতে পর্যুদস্ত অন্যান্য পরিবারের সাথে মিলে নতুন জীবন শুরু করতে সিয়েরা নেভাদা দে সান্তা মার্তায় ঘুরে বেড়ায় ওরা। ওদের আগের স্প্যানিশ কনকুইস্তাদোরদের মতো যাত্রার সময় মার্মোসেট আর সাপ খেয়ে বেঁচেছে ওরা।
অভিযাত্রার পরের পর্যায়ে সমুদ্র থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে বনের ভেতর প্রায় চাপা পড়া একটা স্প্যানিশ গ্যালিয়নে হাজির হয়ে ক্ষুধা মিটিয়েছে ম্যাকঅরা। ঘটনাক্রমে হরিণের দেখা পেলে সেটাকে মেরে রান্না করেছে, বাকি অর্ধেকটা লবণ মাখিয়ে ভবিষ্যতের জন্য তুলে রেখেছে। মাছ ও মাংস সংরক্ষণের এ কায়দাটা দুনিয়াময় শত শত বছর ধরেই কাজে লাগানো হয়েছে এবং হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার ভাষায় রান্নাঘরে ‘আমাদের কালের মহা আবিষ্কার’ বরফ ঢুকে পড়ার আগ পর্যন্ত টিকে ছিল।
১৮৬৯ সালে ফরাসি প্রকৃতিবিদ চার্লস সাফ্রে মাংস ও মাছ লোনাকরণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের পর ভয়েজ আ লা নুভেলে গ্রানাদে বইয়ে সেসব প্রকাশ করেছেন:
রান্নার জোগাড়যন্ত্র নেহাতই আদিম: দুটো পাথরে লোনা মাংস পিষে চূর্ণবিচূর্ণ করে ভেজে প্রায়ই বড্ড উত্কট গন্ধসহ এক ধরনের মামুলি তবে এ দেশে দুটো জরুরি শর্ত পূরণ করা খাবারে পরিণত করে ওরা— কম খরচ ও দ্রুত তৈরি।
এমনকি বরফ আমদানির পরও যেসব জায়গায় পশুপালনের চল রয়েছে সেখানে সংরক্ষণের এ কায়দার ব্যবহার চালু রয়েছে; যে কারণে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে কলোম্বিয়ায় এ চর্চা অব্যাহত থাকে। ইদানীং কলোম্বিয়ার সান্তান্দার বিভাগের একটা খাবার কার্নে ওরিয়েদায় এটা টিকে আছে।
গ্রামের পত্তন করল ওরা
ছেলে হোসে আর্কাদিওর জন্মস্থানেই উরসুলা ওদের থেকে যাওয়া উচিত স্থির করার পরই কলোম্বিয়ার লা গোয়াজিরায় সূচিত অভিযান শেষ হয়। এরপর মাতৃতন্ত্রই তার এবং ওদের পত্তন করা শহর মাকোন্দোর কাহিনীর মূল চালিকাশক্তি হয়ে পড়ে। একান্ত বলয়ে এক শক্তিমতী নারীই সংসার চালানো ও ছেলেপুলের শিক্ষার দায়িত্ব নিয়ে থাকে। ওর সৃজনশীলতা ও সাংগঠনিক ক্ষমতা সমীহযোগ্য। প্লাতানোস, মালাঙ্গাস, ইউক্কা, ইয়াম, স্কোয়াশ ও বেগুন ফলানোর পাশাপাশি একই খোঁয়াড়ে শুয়োর ও মুরগি পালতে শুরু করে সে। গোড়ার দিকের ওই বছরগুলোয় দারুণ খাটাখাটনির সুবাদে বাড়ির আঙিনাই হয়ে ওঠে পরিবারের টিকে থাকার উত্স। টিকে থাকার চেয়ে বরং স্থিতিশীলতার ভোজ হয়ে দাঁড়ায় খাবার।
হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া পরশপাথরের খোঁজে ক্ষেপে ওঠার সময়ও মাকান্দো ছোটখাটো একটা শহর। নিজের আদিম পরীক্ষাগারে বিভিন্ন মৌলিক পদার্থকে সোনায় পরিণত করার কসরত করতে থাকে সে, কিন্তু তার সব চেষ্টাই বিফল হয়।
আর্তেফিয়াসের মতো দ্বিতীয় শতকের আলকেমিস্টরা এবং সপ্তদশ শতকের সেন্ট জার্মানের কাউন্ট অরাম পোতাবিলে বা পানযোগ্য সোনার কল্যাণে শত শত বছর আয়ু বাড়িয়ে দেয়ার মতো একটা মিশ্রণ আবিষ্কারের কথা নিশ্চিত করেছিলেন। রেড ওয়াইন ও ঋষিদের পাথর থেকে পাওয়া লাল গুঁড়োর এ মিশেলটিকে ধন্বন্তরি আর প্রাণের আরক ভাবা হতো। এ বস্তুটিই কি মেলকিয়াদেসের রহস্যজনক দীর্ঘায়ুর কারণ ছিল না?
ইউরোপীয় জাঁকালো রাজকীয় দরবারের হেঁশেলেও পবিত্রকারী নির্যাসের খোঁজ করা হয়েছে। ‘বিশেষ উপায়ে নিখুঁত, শুদ্ধ ও আত্মস্থ করা’ খাবারের গন্ধ ও স্বাদ বের করে জমাট বাঁধানোর কৌশল উদ্ভাবন সেকালের রাঁধুনিদের এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সুুইস রাঁধুনি জোসেফ ফাভ্রে (১৮৪৯-১৯০৩) একটি গোপন তথ্য ফাঁস করেছেন: ‘যৌক্তিক মিশেলে বিশুদ্ধতা ও অনবদ্য সৌরভের কৌশলে নিখুঁত তারল্যে তৈরি সসই তরল সোনা।’
হোসে আর্কাদিও পরীক্ষার কৌতূহলকে রান্নাঘর অবধি নিয়ে যায়নি। কিন্তু খাবার রান্নার ভেতর দিয়ে নিজস্ব উন্নতি, পরিবারের সুখ ও মাকোন্দোর সমৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ করে দেয়া প্রজ্ঞার দেখা পেয়ে তাই করেছে উরসুলা।
ক্যান্ডি এনিম্যাল ব্যবসা চালুর ফলে ওদের বাড়ির পাল্টে যাওয়া আর্থিক অবস্থা শহরের কৃষিভিত্তিক থেকে বাণিজ্যিক সমাজে বদলে যাওয়ার একটা অংশ গড়ে তুলছে। জলাভূমির অন্য পাড় থেকে হাজির হওয়া উরসুলার পথ ধরা অভিবাসীদের হাত ধরে বিভিন্ন দোকানপাট ও মিস্ত্রির কারখানা দেখা দেয়। এটা আবার প্রথমে দারচিনি, এলাচ, পাপরিকা, মরিচ ও অন্যান্য মসলাপাতিতে বোঝাই আরবদের নিয়ে আসা বাণিজ্যপথ গড়ে ওঠার দিকেও নিয়ে গেছে। অবশেষে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে: গাধার মতো বেঁচে থাকার বদলে আসন্ন আধুুনিকতার কাছে সমর্পিত হয়েছে ওরা।
স্বাস্থ্যকর খাবার
সংসারের টাকাপয়সা সামলানো, বাড়িঘর দেখশোনা ও শিশুদের খাওয়ানোর অভিজ্ঞতা থেকে চিনির মোরগ ও মাছ বানাতে মাকোন্দোর নব্য বণিকসমাজকে অনুকরণের সিদ্ধান্ত নেয় উরসুলা। একই সময়ে তার স্বামী হোসে আর্কাদিও শহর নিয়ন্ত্রণ করছে এবং মেজো ছেলে অরেলিয়ানো কামারে পরিণত হচ্ছে। ওদের তুলনায় উরসুলা যুক্তিবাদী, সতর্ক ও হিসাবি। এটা এমনকি কম অনুকূল সময়েও পরিবারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সুযোগ দিচ্ছে ওকে। বিপুল জনপ্রিয় হওয়ায় ওর ক্যান্ডি এনিম্যাল গোটা গ্রামে অনিদ্রার মহামারীর কারণে পরিণত হয়েছে। ‘স্মৃতি খোয়ানোর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য’ হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ১৪ হাজার লেবেল লেখা শেষ করলে এ মহামারীর চিকিত্সা করেছে মেলকিয়াদেস।
মাটি আর দেয়ালের চুন খাওয়ার স্বভাবের সাথে অনিদ্রার মহামারী নিয়ে লা গুয়ারিজরা থেকে এসেছে রেবেকা। ওয়েয়ুসহ বিভিন্ন আমেরিকান উপজাতির মিশেল তার পূর্বপুরুষের আমল থেকে আদি খনিজের স্বাদ নেয়ার প্রয়াসে মাটি খাওয়ার ব্যাপারটা চালু ছিল। উরসুলার হেফাজতে রেখে যাওয়া এতিমের এ অভ্যাসের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম অনেকটা অপরিচয়ের অজুহাতে কনকুইস্তাদোরদের আমদানি করা নতুন খাবার প্রতিহত করার মতোই খাবারের সাথে অভ্যস্ত হওয়ার একটা প্রক্রিয়ায় পর্যবসিত হচ্ছে।
অনেক বছর বাদে মেলকিয়াদেসের দাগেররোটাইপ ক্যামেরায় স্বামী ঈশ্বরের ছবি তোলার কসরতের সময় উরসুলা নতুন নতুন পণ্যে ব্যবসা বাড়িয়ে তোলে। পরিবারের সমৃদ্ধি এক অর্থে মাকোন্দোর সমৃদ্ধিতে পরিণত হয়। সংসারের অবস্থা ফেরার সাথে সাথে শহর বেড়ে ওঠে এবং নানা ধরনের রুটি আর ডেজার্টের কল্যাণে উরসুলার জগতে খাবারদাবারের উন্নতি ঘটে।
আমারান্তা ও রেবেকা এখন বিয়ে দেয়ার পক্ষে যথেষ্ট বড় হয়েছে। ওদের একই ছাদের নিচে রাখতে ঘরের আয়তন বাড়ানো দরকার হয়ে পড়ে। কখনো যেন খাবারের ঘাটতি না হয়, সেজন্যে দুটো নতুন চুলো যোগ করতে এবং গুদামের আকার দ্বিগুণ করার আশায় রান্নাঘর নতুন করে সাজানোর সুযোগ লুফে নেয় উরসুলা।
খাওয়ার ঘরে উরসুলার নতুন প্রাচুর্য ফুটে ওঠে: নতুন বাড়ির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলা পিয়ানোলার পাশাপাশি বোহেমীয় স্ফটিক, ইন্ডিয়া কোম্পানি চীনামাটির জিনিসপত্র এবং জায়গার বিন্যাসকে পূর্ণতা জোগানো ড্যানিশ টেবিলক্লথ।
ভাগাভাগি, উদ্ভাবন ও ভ্রাতৃত্বের জায়গা টেবিল। একে ঘিরেই ক্রমাগত পরিবারকে টিকিয়ে রাখা ঘরোয়া ও বাইরের সম্পর্ক গড়ে উঠছে।
দুনিয়াময় ৬৫টি সফর শেষে পরিবারের ছেলে হোসে আর্কাদিওর ফিরে আসায় এ মুহূর্ত পর্যন্ত টিকে থাকা বুয়েন্দিয়াদের ভোজের শক্ত নিয়ম ও সংযম বদলে যাচ্ছে। ‘সর্দিগর্মির কাছে পরাস্ত একদল বন্ধুর কল্যাণে’ একটা জাহাজডুবি থেকে বঁচে এসেছে সে, ভীষণ ক্ষুধা তার, নাশতায় একসাথে ১৬টি কাঁচা ডিম খাচ্ছে, দুপুরের খাবারে অর্ধেক শুয়োরশাবক। হোসে আর্কাদিও ফেরার পর পরই শুরু হলো গৃহযুদ্ধ এবং ওর ভাই বিপ্লবী দলের নেতা অরেলিয়ানো ২০ বছরের জন্য বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। উরসুলার কাছে অস্বস্তিকর এ সময়গুলোয় দুধ যেন মাতৃত্বের প্রতীক ও স্থানের সৃষ্টি করা ভালোবাসার সংযোগে পরিণত হয়েছে।
রক্ষণশীল ও উদারপন্থীদের ভেতর শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে দেখা দেয়া অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার আবেগীয় হতাশা কাটিয়ে ওঠার পর পরই বাড়ির নতুন সংস্কারের ঘটনা ঘটছে। নিয়ারল্যান্ডিয়ার চুক্তি বরখেলাপের জন্য কর্নেল আমরণ যুদ্ধের হুমকি দেয়ার পর সরকারের পাঠানো সৈনিকরাই খাওয়ার আমন্ত্রণ পাওয়া প্রথম লোকজন ছিল। নিজের টেবিলে সেনাবাহিনীকে দেয়া এ দাওয়াত শান্তিকে সম্মান জানানোর কথাই তুলে ধরেছে।
এর পর পরই জলাভূমির অন্যতম ধনীতে হয়ে ওঠা অরেলিয়ানো সেগান্দোর জমকালো পানোত্সবগুলো শুরু হয়। এখন শতবর্ষী ও প্রায় অন্ধ উরসুলা নাতিকে দুঃসময়ের জন্য সঞ্চয়ের পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু খরুচে লোক সে, তো বুয়েন্দিয়াদের ঘরে যেমন, তেমনি অরেলিয়ানো সেগান্দোর রক্ষিতা পেত্রা কোতের ঘরেও শ্যাম্পেন বন্ধ হয় না।
স্বামীর দৌরাত্ম্য আর লাম্পট্যের বিপরীতে ফার্নান্দা দেল কার্পিও খাবার টেবিলে মা-বাবা ও তাকে তালিম দেয়া নানের কাছে শেখা সংযমী মাণদণ্ড আরোপ করছে।
আদবকায়দা ও সৌজন্যের কঠোর আরোপ সংসারে উরসুলার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারানোই তুলে ধরছে। ক্যান্ডি এনিম্যাল ব্যবসা বন্ধের হুকুম দেয়ার পর ফার্নান্দার নির্মম কর্তৃত্ব চরমে পৌঁছে। এমনি স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপ বুয়েন্দিয়াদের সমৃদ্ধি চিরকালের মতো নষ্ট করে দেয়।
চুল্লির কাছে থাকার সুবাদে আয়ত্ত করা প্রশান্তি ও ধৈর্যের সাথেই জীবনযাত্রার এ নতুন কায়দা মেনে নেয় উরসুলা, কারণ গ্যাস-ইলেকট্রিসিটি দূরে থাক, লাকড়িতে রান্নায় ‘সময়ই একাধারে আগুন ও পানি ছিল’। এরপর পরিবারের সদস্যদের ভেতর রান্নাঘরের সাথে সম্পর্কিত এক নতুন ধরনের শিল্প গড়ে ওঠে: অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার বিপ্লবী অভিযানের ফসল অরেলিয়ানো নামে ১৭ ছেলের একজন অরেলিয়ানো ত্রিস্তের বরফ কারখানা। ব্যবসার উত্পাদন দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং জলাভূমির ওধারে বরফ ও আইসক্রিম বিলিবণ্টনের জন্য একটি পরিবহন ব্যবস্থারও প্রয়োজনের দেখা দেয়। দাদির ব্যবসায়িক দূরদৃষ্টি না থাকলেও সমৃদ্ধি ও আধুনিকতাকে হাত ধরাধরি করে মাকোন্দোয় আসার সুযোগ করে দেয়ার মতো একটা ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে সে।
অরেলিয়ানো ত্রিস্তের হলদে ট্রেন উত্তর আমেরিকার মিস্টার হার্বার্টকে নিয়ে আসে। বুয়েন্দিয়ার বাড়িতে তার কলা আবিষ্কার কলা কোম্পানি প্রতিষ্ঠানের নজর কাড়ে। উত্তর আমেরিকার হস্তক্ষেপ মাকোন্দা ও গোটা দেশের এক ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা ঘটায়। আরো একবার উত্পাদন ও রফতানিতে বৈচিত্র্যহীন ঔপনিবেশিক অর্থনীতি বিদেশী শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
কলাগাছের হুজুগের সাথে হাজির হয় কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞের দল এবং তার পিছু পিছু গ্রিংগো ও বিদেশীদের তোড়। এ নতুন ঔপনিবেশিকরা এমনভাবে দৈনন্দিন জীবন বিঘ্নিত করেছে যে, ‘পুরনো বাসিন্দাদের পক্ষে নিজেদের শহর চেনাই দায় হয়ে পড়েছে।’ অন্য কিছুর চেয়ে ফসল তোলার দিকেই বেশি নজর থাকায় পরিবেশই পাল্টে দিয়েছে ওরা: বৃষ্টির ধারা পাল্টে দিয়েছে, ফসল তোলার চক্র দ্রুতগতি করেছে এবং নদী সবসময় যেখানে ছিল, সেখান থেকে সরিয়ে সাদা পাথর বসিয়ে স্রোতকে শহরের অন্য পাশে নিয়ে গেছে।’ একই সময়ে শোয়ার ঘর, ডাইনিং টেবিল, চীনামাটির সামগ্রী ও কাজের লোকদের সাধ্যের চেয়ে বেশি অচেনা অতিথি দিয়ে বুয়েন্দিয়াদের বাড়ির নিত্যকার রুটিনও গুবলেট করে দিয়েছে।
অল্প বয়স থেকেই পেত্রা কোতের জন্য অরেলিয়ানো সেগান্দোর নিয়ন্ত্রণাতীত যৌনাকাঙ্ক্ষা পরিণত বয়সের অতিভোজনের ইচ্ছার সাথে যোগ হয়েছে। উরসুলা আঁচ করে, তার রাক্ষুসে ক্ষুধার কথা উপকূল পর্যন্ত ছড়ালে এলাকার মহাপেটুকরা তাকে মহাকাব্যিক, ভয়ঙ্কর দ্বন্দ্বে নামার আহ্বান জানালে ওর বাড়ি বেইজ্জতির আখড়ায় পরিণত হবে।
হোসে আর্কাদিও সেগান্দোর নেতৃত্বে কলা কোম্পানির শ্রমিকদের ধর্মঘট মৃত্যুর ঘটনায় পর্যবসিত হলে এ পূর্বাভাস সত্যি হয়ে দাঁড়ায়। এর পর পরই বুয়েন্দিয়ারা পতনের সূচনা ঘটায় এবং ধূলির ঝড়ে আক্রান্ত হয়ে পড়ে মাকোন্দো।
সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু না ঘটলেও হোসে আর্কাদিও সেগান্দো সেনাবাহিনী তিন হাজারেরও বেশি শ্রমিককে গুলি করে মারার এবং ২০০ ট্রেন-কারে চাপিয়ে সাগরে ফেলতে বয়ে নিয়ে যাওয়া লাশের ভেতর আহত অবস্থায় জেগে ওঠার দাবি করছে। ফুর্তির ট্রেন পরিণত হয়েছে মৃত্যুর ট্রেনে।
সামান্য মাংস ও মাছ রাঁধো
এ বিপর্যয়কর ঘটনার পর ‘৪ বছর ১১ মাস ২ দিন অবিরাম বৃষ্টি ঝরল।’ হ্যারিকেনের আঘাতে জমিনের সাথে মিশে গেছে কলাবাগান, কলা কোম্পানি তাদের সব স্থাপনা ভেঙে দিয়েছে। দেখা দিয়েছে খাদ্যাভাব। এবং একসময়ের বিশাল বপু, ফর্সা ও গর্দানহীন অরেলিয়ানো সেগান্দো ভীষণ শীর্ণ হয়ে গেছে, হারিয়েছে কামনা। ভাগ্যের হাতে সমর্পিত পিয়েত্রা কোতে খোঁয়াড় আর মাঠের কাদায় ডুবতে বসা পশুগুলোকে বাঁচানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালায়।
ফার্নান্দা টেবিলটাকে ইটের ওপর তুললেও দুঃসময় রেওয়াজের সাথে আপস করার কোনো অজুহাত হতে পারে না বলে লিনেন টেবিলক্লথ, চীনামাটির জিনিসপত্র আর রুপর মোমদানি রেখে দেয়। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই মারাত্মক হয়ে ওঠে এবং স্বামীর উদাসীনতা শেষ পর্যন্ত তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেয়। নিজের তিক্ততা জানাতে দিনের পর দিন পীড়াদায়ক কথা উগরে চলে সে। থালাবাসন আর ভঙ্গুর সবকিছু চুরমার করে এ আক্রমণগুলোর জবাব দিয়েছে অরেলিয়ানো সেগান্দো।
নিজেকে নিঃসঙ্গ ও বিধ্বস্ত আবিষ্কার করে হারানো ভাগ্য ফিরিয়ে আনার শপথ নেয় পেত্রা কোতে। সে এত দৃঢ় যে, লিকলিকে খচ্চরটা নিলামে তোলার আশায় যাজকীয় বিছানার সূক্ষ্ম লিনেন খাওয়ায় সেটিকে। ক্ষুধা জর্জর এ মাকোন্দোয় বিলাসিতা বা অপচয়ের আর সুযোগ নেই।
ফার্নান্দার সূক্ষ্ম চীনামাটির জিনিসপত্রের জায়গায় আসে মামুলি সিরামিকের থালাবাসন এবং রুপার চামচের জায়গা দখল করে নিকেল করা রুপা। ক্যান্ডি এনিম্যালের সাহায্যে অতীতের অলৌকিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে না পারায় রান্নাঘর কাজে লাগিয়েই এ দুর্গতি দূর করার প্রস্তাব দেয় উরসুলা।
সামান্য পরিমাণ মাংস আর মাছ রাঁধো, সবচেয়ে বড় কচ্ছপটা কেনো, আগন্তুকদের বিভিন্ন কোণে মাদুুর বিছাতে দাও, গোলাপ কেয়ারিতে প্রস্রাব করতে দাও ওদের, যতবার মনে চায় খেতে দাও, হেঁচকি তুলুক, বুটের তলায় সবকুি কাদা কাদা করুক, যা ইচ্ছে করতে দাও, কারণ বৃষ্টি খেদানোর এটাই একমাত্র উপায়।
পশু বিক্রি করে অরেলিয়ানো সেগান্দো ও পিত্রা কোতে ওদের অগ্রাধিকার, পরিবারকে অনাহারে মৃত্যু থেকে বাঁচানোর আশা করে। দুর্ভাগ্যের ভেতর ওরা বুঝতে পারে যে, দারিদ্র্য ভালোবাসারই একটা দায়।
উরসুলা ওর দিব্যদৃষ্টি ও স্বচ্ছতা হারিয়ে বসে। তালহীন কথাবার্তা শুরু করে এবং কেবল চামচভর্তি চিনিই খাওয়ানো যায় ওকে। পুষ্টিহীনতার কারণে নিস্তেজ হয়ে মারা যায় সে। ভীষণ কষ্টকর গলার ক্ষত অরেলিয়ানো সেগান্দোকে অচিরে তারও মৃত্যুর ইশারা করে। আসন্ন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে, যে মৃত্যু ভাই হোসে আর্কাদিওকেও নিয়ে যাবে, প্লাবনে বিনষ্ট জমিন বিক্রি করে ছোট মেয়ে আমারান্তা উরসুলাকে পড়াশোনার জন্য ব্রাসেলসে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি রাখে সে।
দায়সারা দাফনের পর ফার্নান্দার কাছে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে ঝুড়িভর্তি রসদপত্র পাঠায় পেত্রা কোতে। বিধবা ভাবে, পুরনো দায় শোধের অংশ হিসেবে এসব পাচ্ছে সে। সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ ছেলে, বউ ও নাতি অরেলিয়ানো বাবিলোনিয়ার হয়ে রান্নার ভার নেয়, বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ও লাল পিঁপড়ার হামলার কাছে নতি স্বীকারের আগ পর্যন্ত চালিয়ে যায় সেটা। সে তাড়াহুড়ো করে বিদায় নিলে অরেলিয়নো বাবিলোনিয়াই নতুন রাঁধুনিতে পরিণত হয়।
কীভাবে চুলা ধরাতে হয়, এমনকি কফি বানানোর কায়দায়ও জানে না ফার্নান্দা দেল কার্পিও। সেজন্যই বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে আসে অরেলিয়ানো বাবিলোনিয়া; অবৈধ সন্তান হওয়ায় সবসময় যেখানে আটকে ছিল সে। দিনের বেলা নাশতা, দুপুরের খাবার কিংবা রাতের খাবার তৈরির সময় হলেই মনোযোগ দিয়ে মেলকিয়াদেস পড়া বাদ দিয়ে উঠে আসে, ১৫টি খালি চেয়ারওয়ালা টেবিলের মাথায় বসে খায় ফার্নান্দা। অরেলিয়ানো বাবিলোনিয়া কয়লার ওপর আগের দিন ফার্নান্দার জন্য রেখে যাওয়া খাবার দেখার আগ পর্যন্ত সবাই যার যার নিঃসঙ্গতায় নৈমিত্তিক কাজকর্ম করে চলে। বিছানায় জীবনের শেষ বছরগুলোয় প্রায়ই স্মৃতিযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা নিজের রানীর পোশাকের এর্মিন কেপে জড়িয়ে শুয়ে থাকতেই মৃত্যু দেখা দিয়েছে তার কাছে।
অরেলিয়ানো সেগান্দো ও ফার্নান্দার ছেলে হোসে আর্কাদিও পোপ হবে আশা করে উরসুলা যাকে শিক্ষা দিয়েছিল, মাকে কবর দিতে রোম থেকে ফিরে ওদের পরস্পরকে ঠকানোর কথা জানতে পারে। নিজের ধর্মশিক্ষা চালিয়ে যায়নি সে, তেমনি ওই মহিলাও ভয়ঙ্কর কোনো উত্তরাধিকারেরও বাহক নয়। ক্ষুধার কবল থেকে পালাতে গিয়ে রুপার মোমদানি আর পরিবারের সোনার মূত্রাধারগুলো বিক্রি করতে বাধ্য হয় সে।
কিন্তু র্যাফল টিকিট বিক্রির সময় ওর বাবার ঘোষণা মোতাবেক ‘কেবল শতবছর পরই’ অলৌকিক বিধান আসে। হোসে আর্কাদিওকে দেখতে আসা অসংখ্য অবৈধ সন্তানের চারজনের সুবাদে যুদ্ধের শেষে বাড়িতে ফেলে যাওয়া প্রমাণ সাইজের সেন্ট জোসেফের প্লাস্টারের মূর্তির ভেতর লুকিয়ে রাখা ধন-সম্পদের তিনটা ক্যানভাসের বস্তা আবিষ্কার করে সে। দারিদ্র্যকে ঠেকিয়ে রাখতে অরেলিয়ানো সেগান্দোর বদঅভ্যাস থেকে সোনা বাঁচিয়ে রেখেছিল উরসুলা, কিন্তু এখন হোসে আর্কাদিওর হাতে পড়ায় একে কার্যকরভাবেই একটা অধঃপতিত জায়গায় নিয়ে যাবে সে।
নিজের প্রতি বিতৃষ্ণ হোসে আর্কাদিও নিজেকে সাঙ্গোপাঙ্গদের থেকে মুক্ত করে রোমে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের দূরে নিয়ে যাওয়া নৌকার অপেক্ষায় থাকার সময় তখনো প্যান্ট্রিতে থাকা চমত্কার খাবার চাচাতো ভাই অরেলিয়ানো বাবিলোনিয়ার সাথে ভাগাভাগি করে খায়: হ্যাম, আচার, মদ ও বসন্তের স্বাদমাখা চিনি মাখানো ফল। সন্তানরা তাকে ওদের লাম্পট্যময় অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে শ্যাম্পেনে ভরে তোলা সেই একই সুইমিং পুলে ডুবিয়ে মারায় যাত্রা করা হয় না তার।
স্বামী গ্যাস্টনের সাথে ইউরোপ থেকে ফিরে আসে ওর বোন আমারান্তা উরসুলা। তিন মাসের ভেতর বাড়িটাকে পিয়ানোলা ও ডাচ টেবিলক্লথের সেই বছরগুলোর জৌলুশে ফেরাতে বাড়ি মেরামত করে। বেলজিয়ান ক্রিওল ভোজনবিদ্যার অনুরাগী এবং দুনিয়া ঘুরে বেড়ানোর সুবাদে আমদানি করা হোসে আর্কাদিওর মতো অতিভোজন তুলে ধরে ৮২টা ইগুয়ানার ডিম খেতে পারে, কিন্তু তার স্ত্রীর মার্জিত রুচি, কেবল সামুদ্রিক খাবার, কৌটার মাংস ও ট্রেনে করে আসা রসালো ফলেরই অনুমোদন দেয়। ডাইনিং টেবিল আবারো মিলনস্থলে পরিণত হয় এবং অরেলিয়ানো বাবিলোনিয়া ওদের সাথে খাওয়ার জন্য জোর করে নিজেকে পার্চমেন্ট থেকে তুলে আনে।
বুয়েন্দিয়াদের বাড়ির নবজন্ম মাকান্দোর একমাত্র ধূলিমলিন পথঘাটের উল্টো চেহারা। নৃতাত্ত্বিকের আগ্রহ নিয়ে অরেলিয়ানো এখন কারো মনে না থাকা সেই অতীত নতুন করে গড়ার চেষ্টা চালায়। কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া সম্পর্কে বলা হয় যে, ‘উদারপন্থীদের হত্যার অজুহাত হিসেবে’ সরকার তাকে বানিয়েছে। বানানা রিপাবলিক সম্পর্কে কখনই এর অস্তিত্ব ছিল না এবং শ্রমিকদের হত্যাকাণ্ড স্রেফ রূপকথা। শহর ঘুরে বেড়ানোর সময় ধ্বংসস্তূপে পরিণত আবর্জনার ভাগাড় বেশ্যাপাড়া পর্যন্ত যায় সে। সেখানে বুয়েন্দিয়া পরিবারের কথা মনে রাখা একমাত্র যে মানুষটির দেখা মেলে, সে এক বুড়ো ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান।
বিভ্রান্তিকর ও অস্বস্তিকর আবেগ থেকে পালিয়ে আমারান্তা উরসুলার কথা ভাবে সে। অরেলিয়ানো বাবিলোনিয়া কৃষাঙ্গিনী নিগ্রোমান্তার বানানো মুরগির মাথার স্যুপে মুগ্ধ হয়। কিন্তু এ নতুন অভিজ্ঞতা স্রেফ তার খেয়ালি ভালোবাসাকেই ইন্ধন জোগায়। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানের নাতনির অনন্যসৌন্দর্য বা ক্ষুধার কারণে তার সাথে ঘুমানো শহরের উপকণ্ঠের মেয়েদের তারুণ্যের কোনোটাই সেই নারীর জায়গা দখল করতে পারেনি, যার জন্য বড় দাদি পিলার তারনেরার কোলে মাথা রেখে কাঁদে সে।
নিজের বিমানের খোঁজে ব্রাসেলসে ফিরে আসে গ্যাস্টন। স্ত্রীর নতুন অনুভূতির কথা জানার পর স্বাধীনভাবে চলার জন্য ছেড়ে দেয় তাকে। অরেলিয়ানো বাবিলোনিয়া পার্চমেন্ট ছেড়ে নিজেকে পুরোপুরি আমারান্তা উরসুলার হাতে সঁপে দেয়। কাতালান বন্ধুর খাবারের উপমায় জীবনের বাস্তব অর্থ জানতে পারে সে: ‘মটরশুঁটি রান্নার একটা কায়দা বের করার কাজে না লাগানো হলে প্রজ্ঞার কোনো মূল্য নেই।’
অরেলিয়ানো বাবিলোনিয়া ও আমারান্তা উরসুলার ভালোবাসা উদ্বেগ ও বাস্তব দুনিয়ার নির্মম আঘাত ঠেকায়: আবেগময়, ঝামেলাহীন ও স্বাধীন। সে অন্তঃসত্ত্বা হলে বড় দাদির মতোই অর্থনৈতিক সংকটে নিজেদের চালিয়ে নিতে একটা ব্যবসা শুরুর প্রয়াস পায়। একমাত্র নীরব ওষুধ বিক্রেতা মার্সিডিসই ওর এক ডজন মাছের কশেরুকা কেনে। পিঁপড়া, মথ ও আগাছা শেষ হামলা চালায়, কিন্তু নিঃসঙ্গ প্রেমিক-প্রেমিকা অবনতি থেকে নিজেদের বাঁচায়।
ডাইনিং টেবিলেই ভালোবাসার কারণে পেটে আসা একমাত্র বুয়েন্দিয়া জন্ম নেবে। মা তার নাম রাখতে চায় রদ্রিগো, কিন্তু বাবা চায় অরেলিয়ানো। কিন্তু লাম্পট্য আর পাপাচার তাকে দুর্বৃত্তপনা ও মৃত্যুতে পর্যবসিত করায় ভবিষ্যদ্বাণী মোতাবেক ৩২টা যুদ্ধে জিতবে না সে।
ছেলের জন্মের পর পরই আমারান্তা মারা যায়, অতীত খুঁজে পাওয়ার চেষ্টায় বেরিয়ে পড়ে অরেলিয়ানো; কিন্তু সবকিছু অদৃশ্য হয়ে গেছে। সঙ্গী হিসেবে স্রেফ এক গরিব বারটেন্ডার নিয়ে রাফায়েল এস্কালোনার গান শুনতে শুনতে আখের মদে দুঃখ চাপা দেয় সে। দিনের আলো ফুটলে কেবল নিগ্রোমান্তার স্যুপই ওর বিষাদের উপশম ঘটাতে পারে।
ঘরে ফেরার পর ভীতি পার্চমেন্টের রহস্য উদ্ধাদের চাবিকাঠি জোগায় ওকে এবং পরিবারের ১০০ বছরের ইতিহাস পড়ার সুযোগ দেয়। এখানে মেমের বিদ্রোহ ও মরিসিও বাবিলোনিয়ার হলদে প্রজাপতিতে নিজের উত্স খুঁজে পায়। শেষ অনুচ্ছেদগুলোয় পৌঁছার পর যেমন লেখা ছিল, দেখা যায় হাওয়ার তোড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মাকোন্দো।
গার্সিয়া মার্কেসের কাছে আতঙ্ক ও নিপীড়ন, আগ্রাসন ও হত্যাকাণ্ডে আক্রান্ত পরিবেশে থাকা একটা দেশে বারবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে। রোজ একই খাবার খেতে বাধ্য করা বিরক্তিকর ডিনারের অতিথির মতো নৈমিত্তিক সহিংসতার অবসান ঘটিয়ে বিবেক জাগানোর আশা করছেন তিনি, অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা পেরোতে চান এবং প্রাকৃতিক সম্পদের বিদেশীদের লুটপাট পাল্টে দিতে চান। আগে দেখা দেয়া সবকিছু ধ্বংসই রক্ষার একমাত্র উপায়। ক্ষমতা কাঠামোর এক ধরনের বিপ্লবী পরিবর্তন। একমাত্র তাহলেই মাকোন্দোর ‘পৃথিবীর বুকে দ্বিতীয় সুযোগ’ মিলবে।
ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড-এ উল্লেখ করা প্রতিটি খাবারের পেছনে একটা গল্প রয়েছে। কোনো কোনোটার প্রাক-হিস্পানিক যুগে উত্স রয়েছে, অন্যগুলো স্পেনীয়দের হাত ধরে এসেছে, আর অনেকগুলোই ক্যারিবিয়ানের সাংস্কৃতিক সংকরের ইঙ্গিত দিয়ে দুটি সংস্কৃৃতির ভেতর খাদ্যবিদ্যার মিলনে সৃষ্টি হয়েছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর উপন্যাসের বিপরীতে বর্ণনার ভেতর খাদ্যবিদ্যার উপাদানের সংযুক্তি পার্থক্যকরণের প্রতীক ফুটিয়ে তোলার এবং স্থানীয় ও জাতীয় পরিচয় নিশ্চিত করার প্রয়াস নয়; বরং এখানে কোন পরিপ্রেক্ষিতে কী খাওয়া হচ্ছে, সে প্রশ্নটিকে কলোম্বিয়ার সামজিক বৈষম্য তুলে ধরতেই ব্যবহার করা হয়েছে। শেষে সাধারণ পটভূমির এ অনুপস্থিতি যুদ্ধের চাহিদা জনগণকে সরলীকৃত দারিদ্র্যে পর্যবসিত করার ব্যাপারটাই স্পষ্ট করে দিচ্ছে। বিদেশী পুঁজির শ্রম ও প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাটের ভেতর দিয়ে পাওয়া মেকি সমৃদ্ধির মুহূর্তগুলো অরেলিয়ানো সেগান্দোর জাঁকালো পানোত্সবে প্রতীকায়িত হয়েছে। অবশ্য শ্যাম্পেন ছাড়া কখনো ফরাসি, ইংরেজ বা ইতালীয় শেফদের কোনো দুর্বোধ্য কিংবা উচ্চারণ কঠিন জটিল অথবা অভিজাত খাবারের উল্লেখ নেই। সবই স্থানীয় ও সাধারণ। বিভিন্ন পণ্যের আমদানি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে, উপন্যাসে বিলাসিতা কেবল বিদেশে বাসকারীদের জন্যই, অর্থনৈতিক সংকটের কাছে নতি স্বীকার করা মুহূর্তের খেয়াল।
উপকূলীয় খাদ্যাভ্যাস দেশের বাকি অংশ থেকে ভিন্ন। প্লান্টেইন পুডিং, নারকেল-ভাত, মাছ ভাজি, কারিমোনালোস, ডিমের আরেপাস আর কেয়েয়েই। এসব কেবল মাকোন্দোর রান্নাঘরেই কল্পনা করতে পারি আমরা, যদিও দ্য জেনারেল ইন হিজ ল্যাবিরন্থের ব্যতিক্রম বাদে তার অন্য কোনো উপন্যাসেই কলোম্বিয়ান ক্যারিবিয়ান বা দেশের বাকি অংশের ঐতিহ্যবাহী খাবারের কথা উল্লেখ করেননি। ভোজবিদ্যার বৈচিত্র্য বর্ণনার বদলে অভাবের দিকেই জোর দিয়েছেন গার্সিয়া মার্কেস। যুদ্ধের সময় অভাব বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ন্ত্রণের পরিণতি নয়, বরং এক ধরনের কায়দা।






