চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো কাঠকয়লার মতো ঝুরঝুরে পাথরকুচি মাড়িয়ে ভারী ব্যাকপ্যাকের চাপে পিঠ ন্যুব্জ করে উপরে উঠে যেতে থাকি আমরা তিন হাইকার। আমাদের সামনে ভলকানো বোর্ডিংয়ের ইকুইপমেন্ট, পানীয়জল, শুকনা খাবার ও ফার্স্টএইড বক্স নিয়ে হাঁটে হাইকিং গাইড কার্লোস ও তার সহকর্মী গুস্তাব। সিজনড হাইকার ম্যাথু কী কারণে জানি অধৈর্য হয়ে, রুমালে ঘাম মুছতে মুছতে ভারী বুটের ঠোকরে টুকরো কৃষ্ণাভ পাথরে কিক কষালে ধারালো প্রান্তে রুপালি গ্লে­ইস দেয়া বোল্ডারের আড়াল থেকে সূর্যালোকে বেগুনি-নীলাভ রঙের ঝিলিক দিয়ে উড়ে দুটি পাখি। ওখান থেকে নিচে, সমভূমির সবুজাভ ছাড়িয়ে দৃশ্যমান হয় লেয়ন শহর।

ঘণ্টা দেড়েক আগে এ শহরের পর্যটকপ্রিয় সস্তা গেস্ট হাউজ বিগফুট হোস্টেল থেকে আমরা সেরো-নেগ্রো আগ্নেয়গিরির দিকে রওনা হয়েছি। আমরা তিন হাইকার মূলত নিকারাগুয়ায় সপ্তা কয়েকের জন্য বাস করছি স্প্যানিশ ভাষা শেখার জন্য। ল্যাংগুয়েজ স্কুলের অছিলায় আমাদের মাঝে খানিক জানাশোনা হয়েছে বটে, তবে আমরা এখনো ঠিক বন্ধু হয়ে উঠিনি। আজ উইকএন্ড, তাই আমরা একত্রে জোট বেঁধেছি খরচ শেয়ার করে সেরো-নেগ্রো আগ্নেয়গিরিতে হাইক তথা ভলকানো সার্ফিং করব বলে।

মিনিট চল্লিশেক জোরকদমে হাইক করে, বাতাসে উড়ে আসা কয়লার মিহি গুঁড়ায় নিঃশ্বাস নিতে নিতে আমরা এখন দেদার হাঁপাচ্ছি। কাশি থেকে বাঁচার জন্য সার্জিক্যাল মাস্ক পরে আছি। তাই গরমে ফাফরা লেগে হাঁসফাঁস করতে করতে আমরা একটু জিরিয়ে নিতে আগ্নেয়গিরির রকওয়ালের ছায়ায় দাঁড়াই। নিচে কলোনিয়াল যুগে তৈরি লেয়ন শহরের ক্যাথিড্রাল স্কোয়ারের গির্জার চূড়া ও ঘণ্টাঘরের আকার-আকৃতি এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। আমাদের হাইক সঙ্গিনী এলিজাবেথ, যাকে আমরা স্প্যানিশ কায়দায় ইসাবেল নামে সম্বোধন করছি, সে মাস্ক খুলে একটু কেশে বাইনোকুলার দিয়ে ক্যাথিড্রাল স্কোয়ারের দিকে তাকায়। রোববারের গির্জায় লোকজন জড়ো হচ্ছে, স্যুট ও গাউন পরা উপাসনাকারীদের লিলিপুটিয়ান আকার-আকৃতির দিকে তাকিয়ে, গলায় ঝুলানো ক্রুশে হাত রেখে সে বলে— যিশাস ক্রাইস্ট, গিভ আস স্ট্রেংন্থ, লর্ড, উই নিড টু গো আ লিটিল ফারদার.. নিড টু হাইক অ্যা ফিউ স্টেপ আপ। আমি গোলাকার একটি পাথরে বসে উত্তর নিকারাগুয়ার অত্যন্ত কাঁচা বয়সের এ সক্রিয় আগ্নেয়গিরির গতর স্পর্শ করি। প্রায় ১ হাজার ৩০০ মিটার উঁচু, জ্বলেপুড়ে কালো খাক হয়ে যাওয়া আগুন পাহাড়ের সর্বত্র ছড়ানো কৃষ্ণাভ সব সিনডার, সালফারের দাগ লাগা রক, আর কুচকুচে কালো পাহাড়টির স্থানে স্থানে উত্থিত হচ্ছে ধূসর বাষ্প। এখানে সর্বশেষ লাভা উদগিরণ হয় ১৯৯০ সালে। ধূমায়িত বাষ্পের সঙ্গে নীলিমায় উিক্ষপ্ত হয় পোড়া পাথর, আঁচে রীতিমতো গনগনে আগ্নেয়শিলা, ছাই আর থিকথিকে লোহিত লাভা। এখান থেকে খানিক দূরের খাড়া হয়ে ওঠা ট্রেইলের চারপাশে সবুজাভ কিছু ঝোপঝাড় দেখে একটু আশ্চর্য হই। উঠে দাঁড়িয়ে ঘাড় বাঁকাতেই, যে ল্যান্ডরবারে করে লেয়ন শহর থেকে ১৮ মাইল কাঁচা রাস্তা পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছি, তাকে দিয়াশলাইয়ের বাক্সের মতো ছোট্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পাই। ইসাবেল আমার অলস পর্যবেক্ষণে বোধ করি তেতো-বিরক্ত হয়ে শিস কেটে বলে— বয়েজ মুভ, লং ওয়ে টু গো, শেইক ইয়োর ডার্ন লেগস, ওয়াক, কিপ ওয়াকিং।

বিগফুট গেস্ট হাউজ থেকে রওনা হওয়ার সময় ল্যান্ডরবার চালু না হলে ইসাবেল হাইক গাইড কার্লোসকে মেজাজ দেখিয়ে গাড়ির বনেট খুলে। তারপর তার নিচে শুয়ে খুটখাট করে ইঞ্জিন নিজেই সারাই করে নেয়। তাতে তার টিশার্ট ও চোখেমুখে লেগে যায় বিস্তর কালিঝুলি। সে এবার চুনকালি দেয়া মুখে নীলাভ গোঁফের হালকা রেখার ওপর থেকে ঘাম মুছে পেশির মাসল কিলবিলিয়ে ব্যাকপ্যাক তুলে নিয়ে হাইক করতে শুরু করে। আমার বিরক্তি লাগে। আরেকটু জিরিয়ে নিলে কী এমন বাইবেল পাঠের আসর বাতিল হতো? তবে অনিচ্ছায় আমিও পা চালাই। অন্য হাইকার ম্যাথু ব্যাকপ্যাকসহ পিঠ সোজা করতে করতে ড্যান্সের স্টেপ তুলে চূর্ণ কাঠকয়লার গুঁড়া ঝুরঝুরিয়ে দিয়ে গেয়ে ওঠে, ‘উই আর গোনা গেট লস্ট ইন দ্য স্টোন ফরেস্ট, উই আর গোনা বার্ন আপ ইন দ্য ফায়ার।’ ইসাবেল সংগীতের চটুল আবেশে স্পষ্টত বিলা হয়। নো ননসেন্স টাইপের মেয়ে সে। শাটাপ ম্যাথু, ম্যান, ফর ক্রাইস্ট সেইক, ডোন্ট ওয়েস্ট এনি টাইম। জাস্ট মুভ ফরোয়ার্ড বলে ইসাবেল তাকে দাবড়িয়ে দিয়ে আগ বাড়ে। শরীর ‘দ’ অক্ষরের মতো বাঁকা করে উপরে উঠে যেতে যেতে ভাবি, কেন আজ এদের সঙ্গে জুটে ভলকানো সার্ফিংয়ে যাচ্ছি!

ছুটির দিনে আগুন পাহাড়ে হেঁটে বেড়ানোর আইডিয়াটা আমার। কিন্তু ইসাবেল কেবল হাইকিংয়ে তুষ্ট না, তার বোর্ডে চড়ে, বালুকার গতর কেটে ব্যালান্স রেখে দ্রুতগতিতে সড়সড়িয়ে নিচে নেমে আসা চাই। একা এ ধরনের ট্রিপের আয়োজন করতে খরচ বেশি পড়ে। গেস্ট হাউজে বসে বই পড়ে দিন কাটানো যেত। কিন্তু এত কাছে এসে সেরো-নেগ্রো পাহাড়কে হ্যালো না বললে কি চলে? এখানে আজ উঠতে না পারলে পরে এ নিয়ে বাগাড়ম্বরইবা করি কীভাবে? মনে মনে ইসাবেলের ওপর বিলা হয়ে, উষ্টা মেরে কিছু পাথর চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে আমি এবার খুব জোশে উপরে উঠতে থাকি। লাভাস্রোত নদী হয়ে নেমে গেছে এখান থেকে সমতলের দিকে। তা সাবধানে অতিক্রম করে আমরা চলে আসি বালুকা চূর্ণ ও পাথরে পরিপূর্ণ এমন একটি উপত্যকায়, যা যেন আকাশ থেকে ঝরঝরিয়ে নেমে যাচ্ছে সমতলের দিকে। ইসাবেল দাঁড়িয়ে পড়ে বাইনোকুলারে চোখ দিয়ে বলে ওঠে— ওহ হেল, নো, দিস ইজ সিম্পলি আ ডেম চারকোল ব্ল্যাক টেরেইন।

হাইকিং গাইড কার্লোস আমাদের হাতে জলের বোতল ধরিয়ে দেয়। পানি পান করতে করতে দেখি, কাঠকয়লার এ টেরেইন ছাড়িয়ে আরো দূরে দূরে ছড়ানো কিছু ঝোপঝাড়ের বিস্তার। ওদিকে খানিক তাকিয়ে থেকে মনে হয়, কে যেন কাঠকয়লার গুদামে টবে করে ফলাচ্ছে সবুজ ফুল ও ফলের চারা। ম্যাথু বোধ করি গরমে বেজায় ঘা খেয়ে গেছে, সে কালোর্সের হাত থেকে সার্ফিংয়ের বোর্ড তুলে নিয়ে ড্যান্সিংয়ের ভঙ্গিতে গেয়ে ওঠে, ‘হোয়াই ডাজ ইট অলওয়েজ রেইন অন মি?’ পরিস্থিতি এমনই খরখরে যে, শুধু ম্যাথু না, আমাদের সকলের ওপর বৃষ্টি হলে, আগুন পাহাড়ে বর্ষা ঝমঝমিয়ে ঝরলে বেশ হতো। ইসাবেল ঘামসিক্ত বাইনোকুলার দিয়ে নিচের উপত্যকার দিকে তাকায়। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে আমিও দেখতে পাই উষ্ণমণ্ডলীয় এক বনানী, তার ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে মেঘ, আরো উপরে বোধ করি সোনালি ডানার সব চিল উড়ছে চক্রাকারে।

আরো মিনিট পঁচিশেক খাড়াই ট্রেইলে পা টিপে টিপে হাইক করে আমরা কিছুক্ষণের জন্য ব্রেক নেই। ঠিক সমতল না হলেও এ জায়গা অনেকটা কালো পাথরের প্লাটোর মতো। অত্যন্ত শার্প দেখতে পাষাণের এক স্তম্ভ আগুন পাহাড়ের নিজস্ব মনুমেন্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শন শন করে হাওয়া খেলছে চারদিকে। ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালে এখান থেকে সেরো-নেগ্রোর চূড়ায় বৃত্তাকার ক্রেইটার দেখা যায়। শিরনির হান্ডি থেকে উত্থিত মুখরোচক ধোঁয়ার মতো তা থেকে বলকে উঠছে ধূসর বাষ্প। ক্রেইটারের প্রান্তে অগ্নির লেলিহান জিহ্বা ছড়াচ্ছে অরেঞ্জ বর্ণের ফুলকি। কর্লোস ব্যাকপ্যাকের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা ভারী বান্ডিল থেকে ভলকানো সার্ফিংয়ের স্যুট বের করছে। তার অ্যাসিস্ট্যান্ট কুলার থেকে বের করে আমাদের খেতে দেয়, লেবু ও লবণ মাখানো ঝলসানো ভুট্টার দানা, চিজ কিউব ও রোদে শুকানো আমের ফালি। হাওয়ার শনশনে ঝাপটা গায়ে মেখে আমরা খেয়েদেয়ে কফি মিশ্রিত ক্যান্ডি চুষে চাঙ্গা হয়ে উঠি।

ইসাবেল তার মুখখানা আমের আঁটির মতো আমসি করে কার্লোসকে স্যালাইন ওয়াটার নিয়ে না আসার জন্য একহাত নেয়। বেচারা দাবড়ানি খেয়ে মুখখানা ধুতরা ফুলের মতো গোলাকার করে স্প্যানিশে— লো সিয়েনতো, ডিসকুলপে মে বা দুঃখিত, এ যাত্রা ক্ষমা চাই সিনোরিটা বলে আমাদের হাতে কমলা রঙের ট্র্যাক স্যুট ও মাস্ক ধরিয়ে দেয়। আমরা ভলকানো সার্ফিংয়ের প্রস্তুতিতে গায়ে ট্র্যাকস্যুট চড়াতে গেলে সে মিনমিনিয়ে আগুন পাহাড়ে ভলকানো সার্ফিং নামক এ স্পোর্টস চালু হওয়ার কাহিনী বলে যায়। আমরা বিগফুট হোস্টেল বলে যে হিপি উপদ্রুত গেস্ট হাউজে থাকছি, বছর কয়েক আগে এখানকার দায়িত্বে ছিলেন ডারিয়ান ওয়েব বলে এক অস্ট্রেলিয়ান। তিনি স্লে-বোর্ডিয়ের আদলে ভলকানো সার্ফিংয়ের আয়োজন করেন। এ তত্পরতার উপযোগী ইকুইপমেন্টও তিনি ডিজাইন করেন, যা আগ্নেয়গিরির পুঞ্জীভূত ছাই ও কয়লা বিচূর্ণ হয়ে সৃষ্ট কালচে বালুকার স্তর অতিক্রম করে তীব্রগতিতে ছুটে যেতে পারে নিচের দিকে। উপযুক্ত একটি ইকুইপমেন্টের ডিজাইন করতে তার বিস্তর চিন্তা-ভাবনা করতে হয়। আগুন পাহাড়ের এ স্পোর্টেসের জন্য পয়লা দিকে তিনি ম্যাটরেস, বুগিবোর্ড ইত্যাদি দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। তারপর তার মাথায় আসে প্লাইউডে তৈরি এ বোর্ডের পরিকল্পনা। শুনতে শুনতে কপাল কুঁচকিয়ে অশোভনভাবে খামোকা মুখ ভ্যাংচায় ইসাবেল। উই অলরেডি নো অল দিস, প্লিজ টক লিটল লেস কার্লোস বা কথাবার্তা একটু কম কপচিয়ে সোজা আমাদের কোথা থেকে সার্ফিং শুরু করতে হবে স্রেফ এটা দেখিয়ে দাও বলে ইসাবেল কার্লোসকে ঝাড়ি মেরে খামোস করে দেয়।

পিরামিডের দেয়ালের মতো আরেকটি রকওয়াল বেয়ে আমাদের উপরে উঠতে হয়। ট্র্যাক-স্যুট, মাস্ক, হ্যালমেট ও গোগুলস পরে এখন আমাদের দেখাচ্ছে ল্যাবরেটরিতে বীজাণু নিয়ে কর্মরত বৈজ্ঞানিকদের মতো। আমরা ভলকানো সার্ফিং করব নিচের ঢালে, যেখানে আছে ছোট ছোট অসংখ্য ভাঙাচোরা আগ্নেয়শিলা। আমরা তা মাড়িয়ে দানাদার বালুকা ও কয়লা চূর্ণের ওপর দিয়ে সার্ফিং করব। প্লাইউডের বোর্ডে চড়ে সড়সড় করে তীব্রগতিতে স্রেফ নেমে যাব নিচে।

পাহাড়ের এ ঢালের দিকে তাকিয়ে ম্যাথু গ্লাভস পরা হাতে বুকে চাপড় মেরে বলে— ওয়াও, হোয়াট এ ভার্টিক্যাল স্লোপ? ইসাবেল বুকে ক্রুশ আঁকতে আঁকতে বলে— যিশাস, ইট ইজ গোয়িং টু বি ডিফিকাল্ট অ্যান্ড ভেরি ফাস্ট। আমি নিচের দিকে তাকাতে চাই না, তাই চোখ মুদে মনঃসংযোগ করি। রকওয়ালের উপরে উঠে এসেছি বলে দূরীভূত হয়েছে বাতাস বিধৌত প্রান্তরের শনশনে আওয়াজ। এখানকার এক ধরনের নির্জনতায় আগুনের পাহাড় যেন বলকানো বাষ্পের ফিসফিসানো শব্দে কথা বলে ওঠে।

বিচূর্ণ কৃষ্ণাভ বালুকার যে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া স্তরের দিকে আমি তাকিয়ে আছি, তার নিচে, অনেক গভীরে, ভূতলে উত্তপ্ত খনিজ জলের সঞ্চালনে তবে কি খেলা করছে লাভায় তৈরি সব নুড়িপাথর? কেন জানি মনে হয়, কোথায় জলতরঙ্গের মতো গিটকিরি দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সুর। আমি এ সুরকে শ্রবণে ধারণ করতে চাই। আওয়াজের দ্রুত পরিবর্তন হয়। মনে হয়, কালো পাষাণের অভ্যন্তর থেকে এবার বেরিয়ে আসছে কালোয়াতি সব হলক আর তান।

সার্ফিং বোর্ডে সওয়ার হয়ে ম্যাথু একেবারে তৈরি। প্রস্তুতি হিসেবে সে আরেক দফা গেয়ে ওঠে— আই অ্যাম গোনা রাইড দ্য ইয়োলো কাইট। ইসাবেল চেঁচিয়ে ওঠে— ম্যাথু, বি মাইন্ডফুল, দিস ইজ আ ভেরি টাফ স্লে­াপ। সে তাকে তর্জনী ঊর্ধ্বে তুলে দেখায়। তারপর মুখ বাঁকিয়ে— আই অ্যাম গোনা ফ্ল­াই টু দি মুন বলে খুব কায়দাসে সে সার্ফিংয়ের বউনি করে। দেখতে দেখতে মনে হয়, প্রায় পঞ্চাশ মাইল বেগে সে যেন পালে হাওয়া লাগিয়ে সেইল করে, কুচকুচে কালো বালুকার চূর্ণ কেটে কেটে নেমে যাচ্ছে নিচে। সার্ফিংয়ের গতি দেখে আমি মুহূর্তের জন্য দ্বিধাগ্রস্ত হই। ইসাবেল কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বলে— ইফ ইউ হ্যাভ আ সেকেন্ড থট, তোমার যদি নার্ভাস লাগে, না হয় আজ ভলকানো সার্ফ না-ই করলে। এ রকম টাফ টেরেইনে এক্সপিরিয়েন্স না থাকলে সার্ফ করা একটু রিস্কি হয়ে যায় না? আমি গোগুলসের ভেতর দিয়ে তার দিকে তাকাই। ততক্ষণে আমার মনস্থির হয়ে গেছে। ইয়েস, স্নো বোর্ডিং বা বুগিবোর্ডে আমার অভিজ্ঞতা কম হলেও বানভাসিতে কি এ শর্মা কলাগাছের ভেলা ভাসায়নি? তার কথায় একটু অপমান লাগে। মনে মনে খেপে ওঠে আমি বোর্ডে পা রেখে স্ট্র্যাপ টাইটসে বাঁধতে বাঁধতে বৃদ্ধাঙ্গুলি নিচু করে তাকে দেখাই— গো টু হেল ইসাবেল। তারপর আস্তে-ধীরে সার্ফিং শুরু করি। না, দাঁড়িয়ে নয়, খুব সাবধানে, বসে বসে, ব্যালান্স রক্ষা করে, সড়সড়িয়ে নিচে নামতে নামতে দেখি— জলে স্রোতের কুণ্ডলীর মতো বোর্ড মুচড়িয়ে চারদিকে কুচকুচে কালো বালির ঘূর্ণায়মান রেখা তৈরি করে ইসাবেল লাফিয়ে ওঠে শূন্যে, তারপর স্মুদলি ল্যান্ড করে, দুই হাত ঈগলের ডানার মতো প্রসারিত করে যেন ফ্লাই করে। তার হাতের ক্যামেরা ছিটকে সূর্যালোকে রুপালি দ্যুতি ছড়িয়ে উড়ে যায় অন্যদিকে।

ইসাবেলের খানিক পর পরই আমি নিচে নেমে আসি। একটু সমস্যা হয় সার্ফিং বোর্ডের গতি কমিয়ে তা থামাতে। হাত বালুকা স্পর্শ করে, আগুন পাহাড়ের উত্তাপ অনুভব করতে করতে, আমি হোঁচট খেয়ে, খানিকটা মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে যেতে অবশেষে নিজের স্নায়ুকে সামলিয়ে ব্রেক কষি।

মাস্ক ও গোগুলস খুলে আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাত হাত বাজিয়ে হাঁকিয়ে ওঠি— ইয়েস উই ডিড ইট, আগুন পাহাড় সেরো-নেগ্রোয় আমরা ভলকানো সার্ফিং করেছি। এখন আর এ নিয়ে বন্ধুবান্ধবদের কাছে বাগাড়ম্বরে আপত্তি কিছু নেই। কার্লোস প্ল­াস্টিকের ছোট্ট শটগ্লাসে সেলিব্রেশনের জন্য আমাদের হাতে তুলে দেয় নিকারাগুয়ান রাম। আমি ম্যাথুর কাছে জানতে চাই— হাউ ইজ দ্য ফিলিং? সে দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে বলে— আই থট দ্য সার্ফিং উড বি এক্সাইটিং। কিন্তু বিষয়টি উত্তেজনাকর না হয়ে কেন জানি আমার মন ভরিয়ে দিল বিষণ্নতায়। নিকারাগুয়ায় আসার আগে যে বান্ধবীর সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হয়, সার্ফ করে নামতে নামতে তার কথা খুব করে মনে পড়ল। আই শুড সিং এ সং ফর হার, বলেই ম্যাথু গুনগুনিয়ে গাইতে শুরু করে, ‘হোয়ার ডিড ইউ স্লি­প লাস্ট নাইট?’

তাকে একটু একাকিত্ব দিতে আমি ও ইসাবেল সরে আসি খানিকটা দূরে। হাঁটতে হাঁটতে ইসাবেল বলে— ইট ওয়াজ নট অনলি এক্সাইটিং, বাট রাদার ভেরি সেক্সি, কিক দ্য বাট এক্সিপিরিয়েন্স। বালি কেটে নিচে নামতে নামতে মনে হচ্ছিল, টাফ কোনো পুরুষকে জাপটে ধরে সার্ফিং বুট দিয়ে ব্যাটার পশ্চােদশে কষে কিক লাগাচ্ছি।

হাইকিং গাইড কার্লোস এগিয়ে এলে ইসাবেল ট্রিপে কী কী মিস ম্যানেজড হয়েছে, সে সম্পর্কে ফিডব্যাক দিতে শুরু করে। সবকিছুতে খুঁত ধরার তার স্বভাব আছে। আমি এ আলোচনায় থাকতে চাই না। তাই তাদের ছেড়ে একটু একা একা হাঁটি। কালো রঙের বালুকা চূর্ণে আমার পায়ের ছাপ কেটে বসে। মনে হয়, শনশনে বাতাসে এ ছাপ মুছে যাবে এবং তার ওপর আঁকা হবে অন্য কোনো মহাদেশ থেকে আগত অজানা ভিন্ন কোনো হাইকারের পদছাপ। আমার পদচিহ্নে এসে বসে দুটি পতঙ্গ, তার একটি ময়ূরকণ্ঠী রঙের ডানা ছড়িয়ে মৃদু গুঞ্জন তুলে ঘুরপাক খায় অন্যটির চারপাশে।