সরদার ফজলুল করিমের সঙ্গে এই প্রজন্মের আমার ব্যক্তিগত পরিচয় প্রায় দেড় যুগেরও বেশি সময় আগে। ১৯৯৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পাঠচক্রে সরদার স্যারের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ। সে সময় থেকে মুগ্ধতা। অনুপ্রেরণা আর মুগ্ধতা থেকেই আমি চেয়েছি স্যারকে নিয়ে কিছু লিখতে। স্যারের সঙ্গে দেখা করা, দেখতে যাওয়া, একান্ত ব্যক্তিগত কিছু অনুভূতি নিয়ে লেখা স্যারকে পড়ে শোনানো— এভাবেই বিনিময় হয় অনুভূতির। ছোট ছোট অনুভব, ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা, অতি সামান্য কিছু লেখা পড়ে স্যারের মন্তব্য, আত্মবিশ্বাস নির্মাণে অনুপ্রেরণা, স্বপ্ন তৈরিতে প্রচেষ্টা থেকেই আমি চেয়েছি, সরদার স্যারের অসমাপ্ত কোনো কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে। এখন থেকে প্রায় এক যুগ আগের এক সন্ধ্যায় আমার ডায়েরিতে লেখা গর্ভস্থ ভ্রূণের সঙ্গে কথোপকথনের কিছু অংশ পড়ে শুনিয়েছিলাম সরদার স্যারকে। ডায়েরি শুনে তিনি আমাকে বলেন, ‘তোমার গদ্যটা সুন্দর, তুমি লিখো, আমাকে নিয়েই লিখো’। পরবর্তীতে সে ডায়েরিটির নির্বাচিত অংশ প্রকাশিত হয় দেশের দুটি জাতীয় দৈনিকে। পরে পূর্ণাঙ্গ ডায়েরিটি প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে মাওলা ব্রাদার্স থেকে আমার মেয়ে: আত্মজার সাথে কথোপকথন নামে।

সরদার ফজলুল করিম ছিলেন আমাদের সময়ের এক অসাধারণ মানুষ। আজ থেকে ৯২ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহান শিক্ষক, দার্শনিক, বিপ্লবী সরদার ফজলুল করিম। ২০১৭ সালের ১ মে তাঁর ৯২তম জন্মবার্ষিকী। ৮৯ বছর সময়কাল অতিবাহিত করে তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০১৪ সালের ১৬ জুন। জন্মদিন ও মৃত্যুদিন সম্পর্কে সরদার ফজলুল করিমের নিজের কথা, ‘মানুষের মৃত্যুদিন হচ্ছে তাঁর সত্যিকারের জন্মদিন। কাজেই আমরা যে জন্ম দিবস পালন করি কেউ পঞ্চাশে, কেউ চল্লিশে বা ষাটে— এটা খুব একটা যথার্থ নয়। কারণ তখনো পর্যন্ত পুরো পোর্ট্রেটটা আমাদের সামনে নেই। সার্কিটটা পূর্ণ হয়নি তখনো।’

কালোত্তীর্ণ ছোটখাটো দেহের প্রচণ্ড আশাবাদী মানুষ সরদার ফজলুল করিম, যিনি মনে করতেন তাঁর পুরো জীবনটাই লাভের— ১১ বছরের জেলজীবন, ৫৮ দিনের অনশন, বিলেতের বৃত্তির আমন্ত্রণপত্র ছিঁড়ে ফেলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাওয়া— এসব অভিজ্ঞতার কোনো কিছুই তাঁর হিসাবে লোকসান নয়।

২০১৩ সালের ১২ জুনের সন্ধ্যায় সরদার ফজলুল করিম স্যারের উপস্থিতিতে অধ্যাপক এমএম আকাশ এবং আত্মজা— আফসানা করিম স্বাতীর সৌজন্যে প্রায় নয় দশকের বিভিন্ন সময়ে লেখা ডায়েরি আমার হাতে আসে। ডায়েরির বিভিন্ন সময়ে লেখা ছিল অসম্ভব দুর্বোধ্য। বিশেষত শেষের দিকের সরদার স্যারের হাতের লেখা এতটাই দুর্বোধ্য যে, তা পাঠোদ্ধার করা কখনো কখনো দুরূহ, প্রায় অসম্ভব মনে হয়েছে। আতশি কাচ দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে পাঠোদ্ধার করতে হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় বিশেষত— পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, ছাত্র, রাজনৈতিক সঙ্গী ও প্রকাশকের সহযোগিতায় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল ‘সরদার ফজলুল করিম: দিনলিপি’ পাঠোদ্ধার করে, বিন্যস্ত করে একটা শৃঙ্খলায় পাঠকের কাছে তুলে ধরার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি।

প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ডায়েরির লেখা নিয়ে মাওলা ব্রাদার্স থেকে ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় সরদার ফজলুল করিম: দিনলিপি। দীর্ঘ চার বছর সময়কালে তাঁর দিনলিপি পাঠ, সম্পাদনা ও বিভিন্ন গ্রন্থ পাঠ সরদার ফজলুল করিম জীবনীগ্রন্থ প্রণয়নে আমাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। অমর একুশের বইমেলা-২০১৭তে প্রকাশিত হয় গদ্যপদ্য থেকে প্রকাশিত হয় সরদার ফজলুল করিম জীবনীগ্রন্থ। উল্লেখ্য জীবনীগ্রন্থে শিক্ষা, রাজনীতি ও জেলজীবন, মানবিক গুণাবলি, দর্শনচিন্তা এবং রাজনৈতিক ভাবনা, গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও লেখালেখি, রচনা নিদর্শন, চিঠি গ্রন্থপঞ্জি মৃত্যু ও সমকালীন প্রতিক্রিয়া, সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি সংকলিত হয়েছে।

&dquote;&dquote;

উল্লেখ্য, জীবনীগ্রন্থ প্রণয়নে আমি সরদার ফজলুল করিমের মাধ্যমে অনেক মনীষী, শিক্ষক, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সহযোগ লাভ করেছি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, মণি সিংহ, রবি গুহ, রণেশ দাশগুপ্ত, মুজফ্ফর আহমদ, সত্যেন সেন, হরিদাস ভট্টাচার্য, সোমেন চন্দ, মুনীর চৌধুরী, কাজী মোতাহার হোসেন এবং আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ মনীষীর সংস্পর্শে সরদার ফজলুর করিম প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত হন, যাঁরা তাঁর জীবন গঠনে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাব বিস্তার করেন।

 

সরদার ফজলুল করিমের জীবনে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের প্রভাব

অগ্রজ: মৌজে আলী সরদার

কৃষক পরিবারের চতুর্থ সন্তান— বাবা খবিরউদ্দিন সরদার। মা সফুরা বেগম। যিনি সর্বদাই নিঃসংকোচে স্মরণ করতেন, বলতেন, ‘আমার দরিদ্র পিতা-মাতার দান করা জীবন নিয়ে এই পথটা হেঁটে এসেছি।’ প্রকৃতপক্ষে সরদার ফজলুল করিমের অগ্রজ— বড় ভাই মৌজে আলী সরদার ছিলেন সরদার পরিবারের অভিভাবক। ১৯২৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে এমএতে ভর্তি হন। পাস করার আগেই সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করেন। পরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হন। সরদার ফজলুল করিম বড় ভাইয়ের কর্মস্থলে তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুল থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করেন। কর্মস্থল বদলির আদেশ পাওয়ার পর মৌজে আলীর নির্দেশনায় বরিশাল জিলা স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাসের পর তিনি ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (বর্তমানে ঢাকা কলেজ নামে পরিচিত) আইএতে ভর্তি হন।

বড় ভাই সম্পর্কে বলেন, ‘মিয়াভাই সাহেবের ঋণের কোনো পরিশোধ হতে পারে না। এ কথা আমি সচেতনভাবে সবসময়ই মনে করেছি। তিনি সেদিন না পড়ালে আমার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এসে পৌঁছাও সম্ভব হতো না। কিন্তু এ ঋণের কথা মুখে প্রকাশ করা যায় না। শব্দের কৃত্রিমতায় তা লঘু হয়ে দেখা দেয়।’

মৌজে আলী ছিলেন ধর্মপ্রাণ কিন্তু মুক্তমনের। সরদার ফজলুল করিম তাঁর বড় ভাই সম্পর্কে স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ‘এক ঘরে সন্ধ্যা আহ্নিকের কাঁসার-ঘণ্টা বাজছে আর পাশের ঘরে মুসলিম বড় ভাই নামাজ পড়ছেন হিন্দু ভদ্রমহিলার ধোয়া শাড়ি কাপড় বিছিয়ে।’ তাঁর এক সন্তান হুমায়ুন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন।

 

সতীর্থ: মোজাম্মেল হক

সরদার ফজলুল করিমের সহপাঠী, যিনি ছিলেন বরিশালের রিভলিউশনারি সোস্যালিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া বা আরএসপিআইয়ের সদস্য। সরদার ফজলুল করিম স্কুলে পড়াকালীন মোজাম্মেল হকের কারণেই বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। একদিন তিনি একটি বই দিয়ে সরদার ফজলুল করিমকে বলেন, ‘এই বইটি তুমি নেবে। এটি এক রাতের মধ্যে পড়ে শেষ করতে হবে। কেউ যেন না দেখে।’ সাধারণত বইয়ের নাম উপরে লেখা থাকে। এ বইটির উপরে নামের জায়গাটুকু কাটা ছিল। বইটি হচ্ছে কথাশিল্পী শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘পথের দাবী’। পরবর্তীতে কায়রোয় পাকিস্তান এয়ারলাইনস বিমান দুর্ঘটনায় সতীর্থ— মোজাম্মেল হক মারা যান।

 

সতীর্থ: রবি গুহ

রবি গুহ ছিলেন কমিউনিস্ট। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরদার ফজলুল করিমের সতীর্থ। যদিও তিনি ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র। রবি গুহ ও নাজমুল করিমের মাধ্যমেই অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে সরদার ফজলুল করিমের ঘনিষ্ঠতা হয়। রবি গুহের সঙ্গে সরদার ফজলুল করিমের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। সে সময় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা নিজেদের এক পরিবারের সদস্য মনে করতেন। রবি গুহের সঙ্গে সরদার ফজলুল করিম ১৯৪৫ সালে নেত্রকোনায় কৃষক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের পরও কমরেড রবি গুহের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আজীবন হূদ্যতাপূর্ণ এবং পারিবারিক। ২০০২ সালের ২৯ এপ্রিল বিপ্লবী রবি গুহ মৃত্যুবরণ করেন। রবি গুহের স্মরণসভায় স্মৃতিচারণে সরদার ফজলুল করিম বলেন, ‘তবু এ কথা জানবেন, আপনারা যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আজ কথা বলছেন, সংগ্রাম করছেন তার জমাট শক্ত মাটি, জীবনের কোদাল দিয়ে আমার এই রবি গুহ— তিনিও কিছু খুঁড়েছিলেন।’

 

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব: কমরেড মুজফ্ফর আহমদ

ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সংগঠক কমরেড মুজফ্ফর আহমদ বিশ্ববরেণ্য রাজনীতিবিদ, বিপ্লবী, ভারত উপমহাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে কমরেড মুজফ্ফর আহমদ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপের মুসাপুর গ্রামে এক দরিদ্র কিন্তু অভিজাত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

একদিকে রাজনৈতিক জ্ঞান, অন্যদিকে সাহিত্যকীর্তি— এ দুয়ের মেলবন্ধনে সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁর জীবনপ্রবাহ। সরদার ফজলুল করিমের রাজনৈতিক জীবনপ্রবাহ নির্মাণে মুজফ্ফর আহমদের সুনির্দিষ্ট প্রভাব রয়েছে। ১৯৪৫ সালে সরদার ফজলুল করিম কলকাতায় রওনা হন একটি স্কলারশিপের ইন্টারভিউ দেয়ার জন্য। বিলেতের সেই স্কলারশিপটি মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ইন্টারভিউ দেয়ার আগে সরদার ফজলুল করিম কমিউনিস্ট পার্টির হেডকোয়ার্টারে যান। সেখানে কমরেড মুজফ্ফর আহমদ ও নৃপেন চক্রবর্তীকে জানান, তিনি অনার্স ও এমএতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছেন। মুসলিম ছাত্রদের জন্য সংরক্ষিত আসনে বিলেতেও যাচ্ছেন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে সরদার ফজলুল করিম ইন্টারভিউ কার্ড ছিঁড়ে ফেলেন এবং কর্তব্য স্থির করেন দেশে অবস্থান করেই দেশের জন্য কিছু করার।

মুজফ্ফর আহমদের জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে পার্টি অফিসে, কারাগারে কিংবা গোপন আস্তানায়। নিজের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে কিছু করেননি। ন্যাশনাল বুক এজেন্সি ও গণশক্তি প্রেস তাঁরই সৃষ্টি। তাঁর বিভিন্ন বিষয়ের ওপর লেখা অসংখ্য প্রবন্ধ বিভিন্ন জার্নাল ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। কমরেড মুজফ্ফর আহমদের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’। কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে আপসহীন এ মানুষটি ১৯৭৩ সালে কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

শিক্ষক: হরিদাস ভট্টাচার্য

সরদার ফজলুল করিমের শিক্ষক। যার দর্শন, জ্ঞান, সত্য-মিথ্যাবিষয়ক দরাজ গলার আলোচনা শুনে তিনি ইংরেজি বিভাগ পরিবর্তন করে দর্শন শাস্ত্রে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী বাঙালি হরিদাস ভট্টাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে যোগদানের আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘রিডার’ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ‘প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলার’, ‘দর্শন সাগর’ পদবির অধিকারী হরিদাস ভট্টাচার্য দর্শন বিভাগের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। অধ্যাপক জিএইচ ল্যাংলি ছুটিতে যাওয়ার পর তিনি দর্শনের বিভাগীয় প্রধান নিযুক্ত হন।

তিনি বাগ্মী হিসেবে ভারতবর্ষে বিখ্যাত ও পরিচিত ছিলেন। বাংলা-ইংরেজি উভয় ভাষায় বিরামহীনভাবে ভাষণের অসাধারণ ক্ষমতার জন্য সবার কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত হূদ্যতাপূর্ণ। ১৯৪৭ সালে কলকাতার বাড়ি থেকে টাইপ মেশিনে নিজের হাতে টাইপ করে ‘এইচডি ভট্টাচারিয়া’ স্বাক্ষরে প্রিয় ছাত্র সরদার ফজলুল করিমকে প্রশংসাপত্র পাঠিয়েছিলেন। প্রশংসাপত্রের কয়েকটি ছত্র নিম্নরূপ:

‘Apart from his intellectual brilliance, Mr. Sardar has been a steadying force in the Department. Genial by tempertment and social to a fault, Mr. Sardar has proved a cementing force among various sections of students, belonging to different halls of the university and I can testify from personal knowledge to his popularity as a student of the university. He was also noted for his social service and his sympathy for the poor and the needy. His teachers are all praise for him and justifiably so’

 

১৯৫৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বরে এই ক্ষণজন্মা দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ মৃত্যুবরণ করেন।

 

 

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব: মণি সিংহ

 

সুসং দুর্গাপুরে ১৯০১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কালীকুমার সিংহ প্রচুর ভূসম্পত্তির মালিক ছিলেন। স্ত্রী কৃষক নেত্রী অণিমা সিংহ। সুসং দুর্গাপুরে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে কলকাতায় চলে যান। ১৯২৫ সালে তিনি মার্কসবাদের দীক্ষা গ্রহণ ও কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। ১৯৪৫ সালে নেত্রকোনায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত কৃষক সভার ঐতিহাসিক সম্মেলনে তিনি ছিলেন অন্যতম সংগঠক ও সভাপতি।

সে সম্মেলনেই মণি সিংহকে প্রথম দেখেন এবং পরিচিত হন সরদার ফজলুল করিম। সেই বিশাল কৃষক সম্মেলনের একটি ঘটনা সরদার ফজলুল করিম তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেন— মঞ্চে মণি সিংহের নাম ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্মেলনে যোগ দিতে আসা হাজং কৃষকরা এক অন্যকে বলছে, ‘শোন, শোন, আমাদের মণি বেটা বলছে।’ এ বাক্যটি সরদার ফজলুল করিমের স্মৃতিতে অমলিন ছিল আজীবন।

১৯৪৭-এ দেশভাগের পর মণি সিংহ পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ময়মনসিংহ জেলার হাজং কৃষকদের টংক আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদানের জন্য পাকিস্তান সরকার হুলিয়া জারি ও সম্পত্তি ক্রোক করে এবং টানা ২০ বছর আত্মগোপন অবস্থায় কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালনা করেন। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রাণপুরুষ মণি সিংহ মৃত্যুবরণ করেন।

 

 

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব: তাজউদ্দীন আহমদ

 

 

চল্লিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে থাকাকালীন তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সরদার ফজলুল করিমের প্রথম পরিচয় হয়।

সরদার ফজলুল করিম তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি নিয়ে সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতায় অনুভূতি প্রকাশ করে ব্যক্তিগত স্মৃতিকথায় লেখেন ‘দৈনিক খবর’-এর উপসম্পাদকীয়তে, ‘তাজউদ্দীন আহমদের এই ডায়েরি আমাদের সমাজ ও রাজনীতির ইতিহাস ও সময়ের প্রেক্ষিতে এক অনন্য স্মারক দলিল। কেবল যে অমূল্য দলিল তাই নয়, এর রচয়িতা ইতিহাসের এক অনন্য কর্মী। নিরহঙ্কার ও আত্মগোপনকারী সচেতন এক স্বেচ্ছাসেবক এবং কর্মী। এমন কর্মীর দৃষ্টান্ত আমার জীবনে আমি খুব কমই লাভ করেছি।’

১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় রেসকোর্সের সভায় ভাষণে বললেন, ‘আই টেল ইউ, অ্যাজ ফার অ্যাজ ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ কনসার্নড উর্দু অ্যান্ড উর্দু অ্যালোন শ্যাল বি দ্য স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অব পাকিস্তান।’ জিন্নাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ও রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্ররা ধর্মঘট আহ্বান করে ১১ মার্চে। সরদার ফজলুল করিম সাধারণ ধর্মঘটের পিকেটিংয়ে তাজউদ্দীন আহমদের হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলেন রমনা পোস্ট অফিসের সামনে। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি পড়ে তিনি জানতে পারেন ওই সন্ধ্যায় ফজলুল হক হলে কামরুদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সভায় উপস্থিতিদের নাম— জনাব শামসুল হক, সরদার এফ. করিম, তোয়াহা, অলি আহাদ, আজিজ আহমদ, নৈমুদ্দীন, অধ্যাপক কাশেম, মিস লিলি খান, আনোয়ারা খাতুন, টি. আলী, এটিএম হক, আলী আহমদ, মাহবুব, নুরুল আলম, অজিত বাবু, এ. ওয়াহেদ চৌধুরী প্রমুখ।

আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ তাজউদ্দীন আহমদের জন্ম ১৯২৫ সালে দরদরিয়া গ্রাম, কাপাসিয়া, ঢাকায়। ছাত্রজীবন থেকেই প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ। চল্লিশের দশকে নির্যাতিত, বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্রলীগ ও বঙ্গীয় প্রাদেশিকে মুসলিম লীগের নেতৃস্থানীয় সদস্য হিসেবে পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে কারাবরণ করেন। ১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৬তে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন হন এবং দেশরক্ষা আইনে গ্রেফতার হন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে সদস্য নির্বাচিত।

১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৭২-এ শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হলে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলে ২৩ আগস্ট গ্রেফতার হন।

ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় (সহযোদ্ধা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলীসহ) কারাগারের প্রচলিত নিয়ম অগ্রাহ্য করে প্রবেশকারী সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় ব্যক্তির হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এ— যা ঐতিহাসিক জেলহত্যা নামে পরিচিত।

 

 

সতীর্থ: মুনীর চৌধুরী

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও ইংরেজি বিভাগের জনপ্রিয় অধ্যাপক। নাট্যকার, সমালোচক, প্রগতিশীল চিন্তাধারার অধিকারী মুনীর চৌধুরী বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী হিসেবে খ্যাত। তিনি ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ নিখোঁজ হন। পিতা ছিলেন খান বাহাদুর আব্দুল হালিম চৌধুরী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।

মুনীর চৌধুরী ছিলেন চল্লিশের দশকে প্রতিক্রিয়াশীলতার বিপরীতে প্রগতিশীল মুসলিম তরুণদের প্রতিনিধি। সে দলে ছিলেন সরদার ফজলুল করিম, সানাউল হক, সৈয়দ নুরুদ্দীন, একেএম আহসান, হেসামুদ্দীন এবং আরো অনেকে। সরদার ফজলুল করিম মুনীর চৌধুরী সম্পর্কে ১৯৭২ সালে একটি প্রবন্ধে লেখেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মুনীরের নাম দিয়েছিলাম King of wards অর্থাত্ ‘শব্দের রাজা’। তিনি ছিলেন অত্যন্ত হিউমারিস্ট, ছিলেন মাস্টার স্পিকার, মাস্টার ডিবেটার।” সচেতনভাবেই মুনীর চৌধুরীকে ভালোবাসতেন সরদার ফজলুল করিম।

মুনীর চৌধুরীও তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, ‘আমি যদি সরদারদের না চিনতাম তা হলে আমার জীবন কি হত আমি তা জানি না।’

 

 

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব: জাতির জনক ও রাষ্ট্রনায়ক

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

 

শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধু, সরদার ফজলুল করিম তাঁকে ‘মুজিব ভাই’ সম্বোধন করতেন। ১৯৫৫ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে এবং সরদার ফজলুল করিম গণপরিষদের সদস্যপদ লাভ করেন। রাজনৈতিকভাবে গণপরিষদের বিভিন্ন অধিবেশনে যোগ দেয়ার সময় শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসেন সরদার ফজলুল করিম। ১৯৫৬ সালে গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে যোগ দেয়ার প্রাক্কালে প্লেন থেকে গ্রেফতারের সময়ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের প্রচেষ্টায় দ্বিতীয়বারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে তাঁর যোগদানও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে হয়েছিল। যদিও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ কম ছিল, কিন্তু পরোক্ষভাবে সরদার ফজলুল করিম তাঁর দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। বিশেষ করে ১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে অব্যাহতির পর জনতার ভিড়ে শেখ মুজিবকে তাঁর বাসভবনে দেখতে যাওয়ায় সময় তাঁর উপলব্ধি ছিল, ‘জনতাই মুজিব, মুজিবই জনতা’। ১৯৭০ সালের ৭ মার্চের ভাষণ, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ২০ ডিগ্রির নির্জন সেলে যেখানে তিনি ছিলেন, সেই একই কক্ষে শেখ মুজিবও ছিলেন, এমনকি ১৯৭৫ সালে যখন ভোরের দিকে একটা মাইকের আওয়াজে ‘মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে’ ঘোষণা শুনে ঘুম ভাঙে। সরদার ফজলুল করিমের এসব অনুভূতি তাঁর বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও দিনলিপিতে উল্লেখ করেছেন।

 

 

শিক্ষক ও বিজ্ঞানী : সত্যেন্দ্রনাথ বসু, বিজ্ঞানাচার্য

 

বিজ্ঞান সাধক, কোয়ান্টাম স্ট্যাটিসটিকসের উদ্ভাবক, পদার্থ তত্ত্ববিদ ও মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃত্ সত্যেন্দ্রনাথ বসু কলকাতায় ১৮৯৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন, মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭৪ সালে। ১৯২১-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে পদার্থবিদ্যার রিডার হিসেবে যোগদান করেন। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকাকালীন ড. মেঘনাদ সাহার সাহচর্য লাভ করেন। চল্লিশের দশকে সরদার ফজলুল করিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আবাসিক হল সলিমুল্লাহ থেকে যখন কলাভবনে যেতেন, তখন প্রায়ই কার্জন হলে সত্যেন বসুকে দেখতেন গবেষণাগারে কাজে মগ্ন অবস্থায়। তাকে কেউ না ডাকলে তিনি গবেষণাগার থেকে বাসায় খেতে যাওয়ার কথাও ভুলে যেতেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিভিন্ন দেশ থেকে ঢাকায় আগত সৈন্যদের অনেকেই ছিলেন আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট ক্যাডার। আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংকের অধ্যাপক— এক মিলিটারি অফিসার রানাপোর্ট সরদার ফজলুল করিমের কাছে অধ্যাপক বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের সন্ধান করেন। সত্যেন বোসের জ্ঞানার্জনে একাগ্রতা ও গবেষণায় মনোনিবেশে সরদার ফজলুল করিম মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর নিজের দিনলিপিতে দীর্ঘ রচনা লেখেন। বিশেষত সত্যেন বোসের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মাঝে তাঁর সম্পর্ক ও যোগাযোগের প্রসঙ্গ নিয়ে নোট খাতায় প্রায় দুইশ পৃষ্ঠার বেশি বিভিন্ন স্মৃতিকথা লেখেন। ১৯২৪ সালে প্রকাশিত সত্যেন বোসের ‘লাইট কোয়ান্টাম হাইপোথেসিস’ পাঠ করে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন চমত্কৃত হন। আইনস্টাইন সত্যেন বোসের এ গবেষণা প্রবন্ধটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করে বিজ্ঞান পত্রিকায় প্রকাশ করেন। এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি ‘বোস-আইনস্টাইন’ সংজ্ঞা নামে সমাদৃত হয়। তিনি ছিলেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য, বিশ্বভারতী কর্তৃক ‘দেশিকোত্তম’ এবং ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মবিভূষণ’ উপাধিতে সম্মানিত।

 

 

শিক্ষক: আবদুর রাজ্জাক

 

জন্ম ঢাকার কেরানীগঞ্জে ১৯১২ সালে। জাতীয় অধ্যাপক। অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দৃষ্টির স্বচ্ছতা নির্মাণে, নির্মল জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে প্রচলিত জনমত উপেক্ষা করে নিজের বিশ্বাসের প্রতি অবিচল থাকার ক্ষেত্রে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সমকক্ষ ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নেই। তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে যেকোনো সম্ভাবনাময় মানুষের ভেতর জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার তীব্র স্পৃহা জাগিয়ে তুলতেন। তাঁর আলাপচারিতা ও কথোপকথনের মধ্যে মণি-মানিক্যের মতো জ্ঞানের বিচ্ছুরণ হতো। সরদার ফজলুল করিম নিজেকে সক্রেটিসের নয়, বরং অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের শিষ্য পরিচয় দিতে বেশি পছন্দ করতেন। জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ: আলাপচারিতায় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক’ রচনা করেছেন। ড. কামাল হোসেন, বদরুদ্দীন উমর, আনিসুজ্জামান, সালাউদ্দিন আহমেদ, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আহমদ ছফা, সরদার ফজলুল করিমের মতো অসংখ্য বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদ তৈরিতে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিল। অধ্যাপক রাজ্জাকের সঙ্গে সরদার ফজলুল করিমের দীর্ঘদিনের অবিচ্ছিন্ন যোগসূত্র। ছাত্রদের শিক্ষা পদ্ধতি, আদর্শ, শিক্ষকদের সম্মান, নির্মোহ, সাধারণ জীবনযাপন, অর্থের তুলনায় জ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে নিরপেক্ষ পরীক্ষা ও মূল্যায়ন— এসব বিষয়গুলোর প্রভাব সরদার ফজলুল করিমের যাপিত জীবনে স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। সম্ভবত রুশো ও অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকই সরদার ফজলুল করিমকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের উত্থান ও জ্ঞানচর্চার বিদ্যাপীঠ; এর প্রথম প্রজন্ম নিশ্চিতভাবে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক এবং দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হলেন সরদার ফজলুল করিম। ক্ষণজন্মা এই মনীষীর মৃত্যু হয় ১৯৯৯ সালে।

 

সরদার ফজলুল করিম ছিলেন বহুমাত্রিক মানুষ। তিনি শুধু বিনয়ী আদর্শ শিক্ষকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আত্মত্যাগী বিপ্লবী, দার্শনিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, লেখক, অনুবাদক এবং সর্বোপরি একজন চিরায়ত আশাবাদী মানুষ। তাঁর আদর্শ, কর্ম, চিন্তার প্রবহমানতায় মহত্ জীবন সৃষ্টির সংগ্রামকে প্রবাহিত করবে নিঃসন্দেহে অনাগত প্রজন্মে, কালের পরিক্রমায় মানব সমাজে।

(লেখক পরিচয়: মার্জিয়া লিপি: লেখক, পরিবেশবিদ)

সম্পাদক: সরদার ফজলুল করিম: দিনলিপি এবং লেখক: সরদার ফজলুল করিম জীবনীগ্রন্থ)