‘The journey of a thousand miles begins with a Single Step’ : LAOTSE

‘আমাদের মনে রাখতে হবে ভারতবর্ষের বিপ্লবী জনতা কমিউনিস্ট আন্দোলনে বারবার সংগ্রাম করেছেন, অসীম আত্মত্যাগ স্বীকার করেছেন, জীবন দিয়েছেন, পুনাপ্পা ভায়ালার বীর শহীদরা, তেলেঙ্গানার বীর সংগ্রামীরা, ভারতবর্ষের প্রত্যেকটা প্রদেশের শ্রমিক কৃষক সংগ্রামীরা জীবনদান করে যে ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, সেই ঐতিহ্য বহন করে নিয়ে যেতে হবে আমাদের। আমরা তারই উত্তরসাধক। যে কমিউনিস্ট পার্টির নাম করে কায়ূরের বীরেরা ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন, সেই কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি আমরা, সেই কমিউনিস্ট পার্টিই আজকের ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী)। সেই মহান ঐতিহ্যকে বহন করার জন্যই আজ আমাদের সেই মহান অভিজ্ঞতার সার সংকলন করা এবং ভুল চিন্তাগুলোর বিরুদ্ধে তীব্রতম শ্রেণীঘৃণা সৃষ্টি করা।’ এ বাক্যটিই এই পুস্তকের ভূমিকা হতে পারে এবং কথাগুলো বলেছেন এমন একজন মানুষ, যার বিরুদ্ধে তারই একটা আলোচনার ভগ্নাংশ তুলে ধরে বলা হয়, তিনি সব অতীতকে ঘৃণা করতে বলেছেন। এ রকমভাবে বিকৃতি ও মিথ্যা দিয়ে সেদিনগুলোকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা সেদিন থেকেই চলছিল।

‘কমরেডগণ, মনে রাখবেন ভারতবর্ষে কৃষক জনতা বারবার সংগ্রাম করেছেন, বহুত্যাগ স্বীকার করেছেন। বহু শহীদের দেশ এই ভারতবর্ষ। সুতরাং সেই সংগ্রামী কৃষকের ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে গেলে আমরা বিপুল শক্তির অধিকারী হব এবং বিপ্লবকে সফল করে তুলতে পারব।

তাই বিপ্লব দুর্বল হয় এমন সব চিন্তা পরিহার করুন, সেগুলিকে ভুল চিন্তা বলে চিহ্নিত করতে শিখুন। শত্রুর শক্তিকে বড় করে দেখার প্রতিটি ঝোঁককে সংশোধনবাদী ঝোঁক বলে (মার্ক্সবাদের মৌলিক সত্যগুলো সংশোধন করে মার্ক্সবাদকে অর্থাত্ শ্রমিক কৃষকের শত্রুদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চায় যে সমস্ত মেকি মার্ক্সবাদীরা, তাদের সংশোধনবাদী বলা হয়— (লেখক) চিহ্নিত করুন। তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করুন। ভারতবর্ষের বিপ্লবী কৃষককে, দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের শ্রদ্ধা করতে শিখুন, তাদের ওপরে ভরসা রাখুন, তাহলে পথের কোনো দিন ভুল হবে না...।’

                                             (চারু মজুমদার— ১৯৬৯)

ভারতবর্ষ যে কৃষকের দেশ এবং এখানকার যা কিছু মহান সম্পদ, সেগুলো সবই কৃষক ও কৃষকঘর থেকে আসা আর্টিজান সম্প্রদায়ের সৃষ্টি। যুগ যুগ ধরে শাসন ও প্রচারের ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্ব করার সুবাদে শোষক এবং তাদের প্রতিনিধিরা এ সত্যটাই ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে। সেই প্রচারে বংশপরস্পরায় প্রভাবিত হয়ে গেছে মধ্যবিত্ত, এমনকি নিজেদের ওপর আস্থা হারিয়ে কৃষকরাও বিভ্রান্ত হয়েছেন। সবকিছুকে ‘ভাগ্য’ বা পূর্বনির্ধারিত বলে ভেবে নিয়ে তারা টিকে থাকার যন্ত্রণাটাকে লাঘব করার চেষ্টা করে গেছেন। ষাটের দশকের প্রথমার্ধ থেকে এই ভুল ভাঙানোর কাজ শুরু হয়। কৃষকদের  আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে পারলে সব অসম্ভবই সম্ভব হবে।

এর জন্য ১৯৬৬ সালেই একটা প্রাথমিক কাজ মোটামুটি সারা হয়ে যায়। ব্যক্তিগত সম্পত্তির পবিত্র অধিকার রক্ষার মন্ত্রগুপ্তির শপথ নিয়ে মন্ত্রিত্বে যাওয়ার পথকে অস্বীকার করে ’৬৫-৬৬ সালেই সদ্য গঠিত সিপিআই (এম)-এর শিলিগুড়ি মহকুমা কমিটি দীর্ঘদিনের ফেলে রাখা কৃষক সংগ্রামগুলোকে সংগঠিত করার জন্য ওই সময়ের মধ্যেই গোটাছয়েক প্রচারপত্র বিলি করেন। এ প্রচারপত্রগুলোর মধ্যে একটাতে পরিষ্কারভাবে ‘তরাই’ অঞ্চলে ছয় মাসের মধ্যে কৃষকদের পার্টিজান লড়াই গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। বিপ্লবী যুবক ও সংগঠকরা চারু মজুমদারকে সামনে রেখে গ্রামে গ্রামে কৃষকদের পার্টি সেল গঠন করতে থাকেন। তীর-ধনুক এমনকি কোথাও কোথাও জোগাড় করা আগ্নেয়াস্ত্রে কৃষক-জনতাকে সশস্ত্র করে তোলেন। উদ্দেশ্য, অচলায়তন ভাঙা। যুগ যুগ ধরে যে অচলায়তনটা জীর্ণ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ভারতীয় সমাজের বুকে চেপে বসে আছে আর বিকাশের সব রাস্তা রুদ্ধ করে দিয়েছে, সেটাকে খতম করা। বহুবার এটা চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু ভাঙা যায়নি। পণ্ডিতরা একে চিহ্নিত করেছেন প্রাচ্য লোচ্চাবাদ বা ওরিয়েন্টাল ডিসপোর্টিজম বলে। কবি চিহ্নিত করেছেন অচলায়তন বলে। যুগে যুগে শাসন পাল্টেছে, শাসক পাল্টেছে, কখনো সেটা এসেছে বহিরাগতদের সরাসরি শাসনরূপে, কখনো বিদেশী মদদপুষ্ট দেশীয়দের মাধ্যমে। মানুষ কিন্তু কোনো সময়েই এটা মেনে নেয়নি। তারা বিদ্রোহ করেছে, পরাজিত হয়েছে। কারণ (এক) শত্রুর শক্তির উত্সটাই তারা ধরতে পারেনি। কোথায় আঘাত করতে হবে বুঝতে পারা বা বুঝিয়ে দেয়ার মতো কোন শক্তি ছিল না। (দুই) কেমন করে আঘাত করতে হবে— সে সম্পর্কে অজ্ঞতা।

শিলিগুড়ি মহকুমার কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা এ দুটো সমস্যার সমাধান করেন। চারু মজুমদারের নেতৃত্বে তারা প্রথমেই চিহ্নিত করেন শত্রু কে? শত্রুর নাম সামন্ত কর্তৃত্ব। তার উত্স ভূমি ব্যবস্থার মধ্যে। এই ভিতের ওপরই গড়ে উঠেছে শোষণ ও শাসনের ইমারত। এই কর্তৃত্ব তিন রকমের— (ক) অর্থনৈতিক (খ) সামাজিক এবং রাজনৈতিক (গ) সাংস্কৃতিক। এই কর্তৃত্ব সে চালায় তিনটে একচেটিয়া অধিকারের জোরে— (১) সামাজিক সম্পদের ওপর একচেটিয়াপনা (২) হত্যা করার একচেটিয়াপনা (৩) প্রচারের একচেটিয়াপনা।

সুতরাং যে কেউ দেশকে পুনর্গঠন করতে চান, সুখী-সমৃদ্ধ করতে চান, তাদের প্রথম কাজ হবে এই কর্তৃত্বটা খতম করা। এই কর্তৃত্বই রুদ্ধ করে দিয়েছে আমাদের দেশের বিকাশ। যুগ যুগ ধরে লাঞ্ছিত হচ্ছি আমরা। একটা বদ্ধ জলাশয়ের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে গেছে আমাদের সৃজনী শক্তি ও প্রতিভা। এই জগদ্দল পাথরটাকেই সরাতে হবে। তাহলেই পরিবর্তন আসবে উত্পাদন ব্যবস্থায়। কেবল কি কৃষকদের হাতে দু-চার বিঘে জমি দিয়ে দিলেই ভূমি সংস্কার হয়ে যাবে? না, কারণ জমির সঙ্গে যুক্ত থাকে বীজধান, লাঙল, সার-জল এবং চাষাবাদ সময়ের জন্য পরিবারকে ভরণ-পোষণ, এককথায় মূলধন। আর এর নিয়ন্ত্রণ থাকে ভূস্বামী বা তাদের প্রতিনিধিদের হাতে। মূলধনবিহীন জমি মানে জোতদারের ঘরে নিখরচায় ফসল তুলে দেয়া। কারণ টাকাটা তারাই দেয়। কৃষক বিশেষ করে ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষক থাকেন সেই তিমিরে।

এক্ষেত্রে দ্বিতীয় আরেকটি সমস্যা আছে— জমির পরিমাণ সীমাবদ্ধ। সুতরাং বণ্টনের ব্যাপারটা কর্তৃত্বকারী সংস্থাই স্থির করে থাকে। কৃষকদের মধ্যে সচেতনভাবেই ঝগড়া-মারামারি লাগিয়ে দেয়া হয়। শ্রেণী সংহতিতে ভাঙন ধরতে বাধ্য। আজ যে পশ্চিম বাংলায় কৃষক কৃষককে হত্যা করছে, তার উত্সটা সেখানেই। সুতরাং চারু মজুমদার তার ঐতিহাসিক আটটি দলিলে সমস্যাটির সমাধান করলেন ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষকের নেতৃত্বে পাল্টা কর্তৃত্ব স্থাপনের মাধ্যমে। কার্যত তিনি কৃষি বিপ্লবের একপ্রস্থ রণনীতি ও রণকৌশল উপস্থাপন করেন প্রথমে পার্টির কাছে [সিপিআই(এম)]। পার্টির নেতৃত্ব সেগুলো চেপে দিলে তিনি সেগুলো কর্মীদের মধ্যে নিয়ে যান।

লক্ষ্য ও কর্তব্য স্থির করে কৃষকরা হাজার মাইল অতিক্রমের প্রথম পদক্ষেপটি ফেলেন, প্রথম পদক্ষেপই তো হাজার মাইলের সূচনা। ১৯৬৭ সালের মার্চে একদল কৃষক নকশালবাড়ি থানা অঞ্চলে একটা জমির চারপাশে লাল পতাকা পুঁতে ঘোষণা করেন, এ জমির ধান তাদের। কারণ জমিটা জোতদারের নয়। এবং ফসল কাটতে শুরু করেন।

১৮ মার্চ চারটি এলাকার কৃষক সংগঠকরা একটি সম্মেলনে বসেন, চার মাস ধরে তারা প্রস্তুত হন। কৃষকদের মেজাজ দেখে অকংগ্রেসী যুক্তফ্রন্ট সাত-তাড়াতাড়ি ভূমি সংস্কারের কথা ঘোষণা করে। বিপ্লবী কৃষকরা এসব ভাওতায় না ভুলে নিজেদের কমিটি তৈরি করে জোতদারদের জমির হদিস খুঁজে বের করতে শুরু করেন এবং সেগুলো বাজেয়াপ্ত করতে থাকেন। লাঠি-সড়কি, তীর-ধনুক আর লাল পতাকা নিয়ে হাজার হাজার কৃষকের মিছিলে গ্রামাঞ্চল কাঁপতে থাকে। তাদের কণ্ঠে একটাই স্লোগান— ‘কৃষি বিপ্লবের পথে এগিয়ে যান—’। জমি নয়। ফসল নয়। ক্ষমতার দাবিতে জমি এবং ফসলকে কাজে লাগানো।&dquote;&dquote;

প্রথম সংঘর্ষ শুরু হয় যখন বিপুল কিষাণ নামে এক কৃষককে জোতদারদের দালাল গুণ্ডারা অতর্কিতে আক্রমণ করে মারধর করে। এ ঘটনা বারুদের স্তূপে আগুন ধরায়। তিনটে থানাজুড়ে কৃষকরা জমি, ফসল ও জোতদারদের জমানো খাদ্যশস্য দখল করার উত্সবে মেতে ওঠেন। দু-চার জায়গায় জোতদাররা প্রতিরোধের চেষ্টা করলে কৃষকদের সশস্ত্র ইউনিটের হাতে চূর্ণ হয়। কয়েকটা জায়গায় ওদের কেউ কেউ খতম হয়। জোতদার-মহাজনরা এলাকা ছেড়ে পালাতে শুরু করে।

জ্যোতিবাবু তখন পশ্চিম বাংলার উপমুখ্য তথা স্বরাষ্ট্র (পুলিশ) মন্ত্রী। প্রথমে নেতারা ছুটে আসনে কৃষকদের সংগঠকদের ঠাণ্ডা করার জন্য। ব্যর্থ হয়ে জ্যোতিবাবু পুলিশ বাহিনীকে মার্চ করার নির্দেশ পাঠান। ২৩ মার্চ বিশাল পুলিশ বাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে এলাকায় ঘেরাও দমন করতে ঢুকলে একজন ইন্সপেক্টর কৃষকদের তীরে নিহত হন। ২৫ তারিখ আরো পুলিশ বাহিনী এলাকায় ঢোকে এবং কয়েক হাজার মহিলার ঘেরাওয়ের মুখে পড়ে ফিরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। ওদের প্রতিশ্রুতিতে ভুলে কৃষক রমণীরা ঘেরাও তুলে নিলে পশ্চাত্পদ বাহিনী হঠাত্ ঘুরে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে নয়জন কৃষক রমণীকে খুন করে!&dquote;&dquote;

জুনে সংগ্রামের তীব্রতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি, ফাঁসিদাওয়া থানায় পাল্টা কর্তৃত্ব গড়ে তোলার সংগ্রাম শুরু হয়। কৃষক কমিটিগুলো এলাকার শাসনক্ষমতা কায়েম করে। জমিতে পারস্পরিক সাহায্যে চাষ, বিচার, প্রাথমিক শিক্ষার সংগঠনগুলোর পাশাপাশি গ্রামরক্ষী বাহিনী গড়ে তোলা এবং জোতদারদের বাড়ি থেকে আগ্নেয়াস্ত্র বাজেয়াপ্ত করে সেগুলো দিয়ে বাহিনীকে সজ্জিত করা প্রভৃতি কাজ করতে থাকেন।

১৯ জুলাই এক বিশাল সামরিক-আধা সামরিক বাহিনী এলাকার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের চা বাগানের শ্রমিকরা কৃষকদের সমর্থনে এগিয়ে আসেন। ১৯ তারিখে চলে নির্বিচারে হত্যা। শোভান আলি, বরকা মাঝি, তিলকা মাঝি শহীদ হন। চারু মজুমদার লিখলেন, ‘ভারতের গ্রামে গ্রামে নকশালবাড়ির জন্ম হচ্ছে। নকশালবাড়ি মরেনি, মরতে পারে না... কখনই মরবে না। ভলগার রুদ্ধ স্রোত নকশালবাড়ির মেচিতে উদ্দাম। মেকং-এর গর্জন আজও বহতা। সেই স্রোতে ভারতবর্ষের ইতিহাস রচনা হচ্ছে।’

বিশ্বজনতার স্বীকৃতি

‘বিশ্ব-মানবের শৃঙ্খল মুক্তির বিজয় রথের রাস্তা চলে গেছে চীন এবং ভারতের উপর দিয়ে।’ নকশালবাড়ির এই অভ্যুত্থান লেনিনের স্বপ্নকে বাস্তব করে। ভারতের একটি অঞ্চলের কৃষকদের এই অভ্যুত্থান বিশ্বব্যাপী সমর্থন লাভ করে। ১৯৬৭ সালের ২৮ জুন, পিকিং (বর্তমানে উচ্চারণ বেইজিং) রেডিও ঘোষণা করে— ‘ভারতের কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার গ্রামাঞ্চলে (ভারতবর্ষে) কৃষক জনতার সশস্ত্র সংগ্রামের অধ্যায় শুরু হয়েছে... (মোটা অক্ষর, আমার... আ হ) ভারতীয় বিপ্লবীদের শুরু করা সশস্ত্র সংগ্রামের এটা হল সম্মুখ পদক্ষেপ। ...’

ঠিক এর এক সপ্তাহ পরে ৫ জুলাইয়ের পিপলস ডেইলির বিখ্যাত “ভারতের আকাশে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। তাতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়, মুহুর্মুহু বজ্রনির্ঘোষে ভারতের আকাশ প্রকম্পিত। দার্জিলিং অঞ্চলের নির্ঘোষে ভারতের আকাশ প্রকম্পিত। দার্জিলিং অঞ্চলের বিপ্লবী কৃষকরা বিদ্রোহে ফেটে পড়েছেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বিপ্লবী অংশের নেতৃত্বে (অর্থাত্ কমিউনিস্ট পার্টিতে সবাই বিপ্লবী মনে করার কারণ নেই... আ হ) গ্রামাঞ্চলে বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনার জন্য লাল এলাকা গড়ে তুলেছেন... চীনা জনগণ পরম উত্সাহে পৃথিবীর সমস্ত মার্ক্সবাদী লেনিনবাদীদের মতই একই ভাষায় দার্জিলিং জেলার কৃষকদের এই বিপ্লবী তুফানকে অভিনন্দন জানাচ্ছে...।”&dquote;&dquote;

পিপলস ডেইলির এ প্রবন্ধটির অনুসরণে লিন পিয়াও পরিচালিত চীনা গণমুক্তি ফৌজের মুখপত্রে ভারতীয় বিপ্লবের রণনৈতিক সমস্যাবলির সমাধান মিলতে পারে— এমন সব সৃজনশীল প্রবন্ধ ও প্রতিবেদন প্রকাশ হতে থাকে। এবং বিশ্বের বিপ্লবী তাত্ত্বিকরা কান পেতে শুনলেন নকশালবাড়ির বজ্রনির্ঘোষ। ২০ বছর ধরে মালয়ের রাবারবনে গেরিলা যুদ্ধরত মালয়ের  কমিউনিস্টরা সোত্সাহে এগিয়ে এলেন। সমর্থনস জানালেন, নেপালের বিপ্লবীরা, সিংহলের শ্রেণীসংগ্রামে বিশ্বাসী জনতা। কলম ও রসদ হাতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন অপ্রতিরোধ্য থাকিন-থান টুন, থাকিন-বা-টিন। বার্মার (মিয়ানমার) কমিউনিস্টদের নিঃশর্ত সমর্থন এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার থমকে থাকা বিপ্লবী সংগ্রামগুলোকে একটা ধাক্কা দেয়। এসব দেশ কার্যত বিপ্লবী সংগ্রামের ঝটিকা কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফলে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওসের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মৃক্তিযুদ্ধ গুণগতভাবে নতুন করে উন্নত হয়।

এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার জনগণের এই সশস্ত্র সংগ্রাম পাশ্চাত্যের মানুষকেও উত্সাহিত করে তোলে। এসব দেশের শাসকরা এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর শাসকদের সহযোগিতায় নিরুপদ্রবে শোষণ করে তার একটা অংশ নিজেদের দেশের গণবিক্ষোভ দমাতে খরচ করত। এসব দেশকে এখানকার শাসকদের সহায়তায় নিরুপদ্রবে লুট করে এবং তার একটা অংশ খরচ করে। পাশ্চাত্যের শোষকরা নিরুপদ্রবে কাটাত। অর্থাত্ তাদের যুক্তি, ‘থাকার জঙ্গল নিরুপদ্রব রাখা’। এবং এর উপায় অর্থাত্ নিজেদের দেশের জনগণের বিক্ষোভ সামাল দেয়ার জন্য জনগণকেও লুটের মালের কিঞ্চিত্ বখরা দেয়া। কিন্তু ’৬৫ সালের পর থেকে পরবর্তী কয়েকটা বছরে স্বর্গরাজ্যে এই গোলযোগ লুণ্ঠনের ক্ষেত্রকে সীমাবদ্ধ করে তোলে। বাজার ক্রমে সংকুচিত হয়ে ওঠে। ফলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে স্ব-স্ব প্রভাবাধীন এলাকা বজায় রাখার সংগ্রাম শুরু হয়। সমর খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় যে চাপ সৃষ্টি করে, তার ফলে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের নাভিঃশ্বাস ওঠে। কার্যত পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একটি চিরস্থায়ী মন্দার যুগ শুরু হয়ে যায়। সেখানকার সংগঠিত এবং সুবিধাভোগী জনসাধারণের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়তে থাকে। তাদের জীবনযাত্রার মান দ্রুত নেমে আসে। এসব দেশে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ তুঙ্গে ওঠে। এক কথায় উপনিবেশ ও আধা উপনিবেশগুলোয় সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম ঔপনিবেশিক দেশগুলোর মধ্যেই মুক্তি আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা বৃদ্ধি করে। শুরু হয় বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের সম্পূর্ণ ধ্বংসের যুগ। ইতিহাসে এর আগে কখনই সাম্রাজ্যবাদের এই সর্বাত্মক সংকট দেখা যায়নি। পাশ্চাত্যের উপনিবেশবাদবিরোদী শক্তি সংগঠিত হয়ে অভিনন্দন জানাল নকশালবাড়িকে। বারবার তারা ভারতের বিপ্লবীদের স্মরণ করিয়ে দিল লেনিনের কথা, উপনিবেশগুলোর শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে জনগণের মুক্তি ছাড়া ঔপনিবেশিক দেশের জনগণের (পুঁজির জোয়াল থেকে) মুক্তি সম্ভব নয়।...

এ রকমভাবে ৩০ বছর আগে শুরু করা ভারতীয় বিপ্লব কার্যত বিশ্ববিপ্লবের যুগের সূচনা করে। পাশ্চাত্যের যুবকরা ছুটে আসেন ভারতবর্ষে। তারাও বিশ্ববিপ্লবের এ কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণ করতে চান। সশরীরে উপস্থিত থেকে তারা ভারতীয় বিপ্লবের প্রতি সংহতি জানান।

চীনা গণফৌজের মুখপাত্র রেমনিন রিবাও পত্রিকায় ’৬৫ সালে প্রকাশিত লিন পিয়াওয়ের ‘জনযুদ্ধের তত্ত্ব দীর্ঘজীবী হোক...’ প্রবন্ধটি কার্যত বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের কবর খোঁড়ার কাজে শাবল-কোদালের কাজ করে। সেখানে লিন পিয়াও সুনির্দিষ্টভাবে দেখিয়ে দেন— ‘এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলো হলো বিশ্বের গ্রামাঞ্চল, এই দেশগুলোকে মুক্ত করে বিশ্বের শহর ইওরোপ আমেরিকাকে ঘিরে ফেলতে হবে।...’  মাও সে তুংয়ের (মাও জে দং আধুনিক উচ্চারণ) জনযুদ্ধের ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও’-এর বিশেষ তত্ত্বকে এ রকমভাবে লিন পিয়াও সাধারণ রণনীতিতে পরিণত করেন। সেদিক থেকে বলা যায় নকশালবাড়ির অভ্যুত্থান বিশ্ববিপ্লবের অংশমাত্রই নয়, বিশ্বমানবের মুক্তির মহাকাব্য রচনার একটি অধ্যায়... রক্ত-ঘাম-অশ্রুতে জমাটবাঁধা একটি সংগীত! জনগণের উত্সব, আত্মস্বার্থ, বিসর্জন দিয়ে আত্মত্যাগের উত্সব।

সাম্রাজ্যবাদের এই চরম দুঃসময়ে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি মোতাবেক তাকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং গোপন-সামরিক মদদ দিতে এগিয়ে এল রাশিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো। পুরনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে মিলিতভাবে এই নয়া সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী (মুখে সমাজতন্ত্র, কাজে সাম্রাজ্যবাদ) শক্তি জনগণকে মোকাবেলা করতে নেমে পড়ে। দেশে দেশে রাশিয়াপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিগুলোও জনগণকে বিভ্রান্ত করার এবং নিরস্ত্র করার কাজে লেগে যায়। পার্টিগুলোর মধ্যে বিপ্লবীদের চিহ্নিতকরণ শুরু হয়ে যায়। গোপন হত্যা ও যড়যন্ত্র দিয়ে ওরা অগ্রসর হয়। এর মূল্য দিতে গিয়ে রাশিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে একই অক্ষে প্রবেশ করে। সংকটে পড়া কিন্তু অর্থবলে, অস্ত্রবলে বলীয়ান একটা শক্তির ভাড়াটে হয়ে খাটতে গিয়ে এ দেশগুলোকেই পরবর্তীকালে সাম্রাজ্যবাদ গিলে নেয়। ... ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ প্রযুক্তিগত কিছু বিকাশ ঘটিয়ে বেনিয়া অর্থনীতিতে নিজেকে নামিয়ে এনে সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করে। আজকের সাম্রাজ্যবাদী-অর্থনীতিকে তাই বলা যায়— বেনিয়াবৃত্তি। বেনিয়া সাম্রাজ্যবাদ। পুঁজিবাদ যেমন শোষণ করে, মুনাফা করে, মুনাফার জন্য অনবরত বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাকে সম্পদ (পণ্যের আকারে) সৃষ্টি করতে হয়। বেনিয়াবৃত্তিতে এই নতুন সৃষ্টির সুযোগ প্রায় শূন্য। প্রচলিত পণ্যের বা মানসিক সম্পদের রকমফের করে বাজারে ছাড়ার মধ্যেই তার অস্তিত্ব (পেটেন্ট আইন, গ্যাট চুক্তি লক্ষণীয়)। সেই দিক থেকেও বলতে গেলে আমরা দেখতে পাব, পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ তার চিরায়ত রূপটাকে ধ্বংস করেই অধঃপতিত হয়ে বেনিয়াবৃত্তি সম্বল করে কোনো রকমে ধুঁকছে। শোষক আর শাসকের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, আজকের সভ্যতা হলো বৈশ্য সভ্যতা। আজকের সংস্কৃতি ক্লাসিক-পুঁজিবাদী সংস্কৃতি নয়। এত প্রযুক্তিগত বিকাশ সত্ত্বেও দেশে দেশে যে ধর্মীয় পুনরুভ্যুত্থানবাদ, তার রহস্যটাও এখানে। যে ধর্মের যুক্তি ও দর্শনের বিকল্প হিসেবে সমান্তরালভাবে পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে যুক্তিবাদকে আশ্রয় করে পুঁজিবাদ বিকাশ লাভ করেছিল। অর্থনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে বেনিয়া অর্থনীতিকে জালিয়াতির অর্থনীতি (স্মিথ) বলে বর্জন করেই এগিয়ে গিয়েছিল, ষাটের দশকের ধাক্কায় তারা সেই বর্জিত পথ ও দর্শনের কোলেই ঢলে পড়ে। এটা যদি সার্বিক ধ্বংসের সূচনা না হয় তো কোনটা হবে ওদের মৃত্যুযন্ত্রণা! মৃত্যুযন্ত্রণাকাতর মানুষের মতো আজকের সাম্রাজ্যবাদ একটু দম নেয়ার জন্য ছটফট করছে। ৩০ বছর আগের ঘা সামলাতেই ওরা ছটফট করছে। এই ছটফটানিকে দেখে ওদের এই স্বনীতি বিসর্জন দিয়ে হাত-পা ছোড়াকে শক্তি বলে চিহ্নিত করাটা নিজেদেরই দুর্বলতার প্রকাশ। ৩০ বছর আগের ঘা সামলাতেই ওরা ছটফট করছে।

ভারতের বুকে ওদের একচেটিয়া একদলীয় এক প্রভুর শাসন ভেঙে গেছে। কার্যত ভারতবর্ষে আজ কোনো কেন্দ্রীয় শাসক দল নেই। যা আছে, সেটা হলো কতগুলো গোষ্ঠী। যারা নিজেদের সামাল দিতেই ব্যস্ত।...

আজকের এই অবস্থার উত্স সেই ৩০ বছর আগে। যার প্রস্তুতি ঘটেছিল ধীরে ধীরে। তত্ত্বে, তথ্যে সজ্জিত হয়েই নকশালবাড়ি অঞ্চলের কৃষকরা ঘটনাটা ঘটিয়েছিলেন। ‘ঘটনা যখন ঘটে যায়, তখন সেটা আমরা জানতে পারি কিন্তু এর পেছনে যে কত পরিশ্রম, কত ত্যাগ, সেটা তখনই জানা যায় না’ (চারু মজুমদার)।

সুতরাং ইতিহাসের উপাদান হিসেবে যদি আমরা প্রস্তুতি পর্বের দলিলগুলোই তুলে ধরি, সেগুলো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। এগুলো এরই মধ্যে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ‘আটটি দলিল’ বলে চিহ্নিত করেছেন। চারু মজুমদারের লেখা এ দলিলগুলো সংগ্রামের প্রস্তুতি পর্বের পর পর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশও বটে।

 

লেখকের নকশালবাড়ি : তিরিশ বছর আগে এবং পরে গ্রন্থ থেকে সংকলিত