লক্ষ্ণৌকে অনেকে
বলেন পুবের
প্যারিস। নবাবি
আমলে এ
শহরে হাজির
হয়েছিল ভারতের
বিভিন্ন অঞ্চলের
নানা পেশার
দক্ষ মানুষ।
তাদের দক্ষ
হাত এ
শহরকে দিয়েছে
জীবনযাত্রার বহু
নতুন উপাদান,
যা আজও
দক্ষিণ এশিয়ার
সংস্কৃতিতে মিশে
আছে।
নবাবি আমলে
লক্ষ্ণৌতে আরো
অনেক কিছুর
মতো জন্ম
হয়েছিল নারীদের
পোশাক ঘারারা।
ভাঁজযুক্ত ঢোলা
পায়জামা, ঊর্ধ্বাঙ্গে
থাকে হাঁটু
অবধি লম্বা
কুর্তি, সঙ্গে
জরি, লেস
লাগানো জমকালো
দোপাট্টা (ওড়না)।
ঐতিহ্য অনুসারে
পায়জামার প্রত্যেক
পা তৈরি
হয় ২৪
মিটার কারুকাজ
করা কাপড়
দিয়ে। হাঁটুর
কাছে এ
পায়জামার অনেক
ভাঁজ। শুরু
থেকেই এ
পোশাকের ব্যবহার
ছিল ধনী
ও অভিজাত
ঘরের নারীদের
মধ্যে। ঘারারাতে
নানা ধরনের
নতুন নকশা
যুক্ত করে
একে বিয়ের
পোশাক হিসেবেও
ব্যবহার করা
হয়।
ঘারারাকে শুধু
পোশাক হিসেবে
বিবেচনা না
করে লক্ষ্ণৌ
নবাবি সংস্কৃতির
নিদর্শন হিসেবে
দেখা হয়।
পোশাকটি এখনো
লক্ষ্ণৌ নারীরা
বিশেষত মুসলিম
নারীরা ব্যবহার
করেন—বিশেষত
বিয়েতে। জমকালো
পোশাকের যে
ধারণা তার
সঙ্গে একেবারে
মানানসই এ
ঘারারা। এতে
জারদোজি নামের
পুরনো আমলের
বিশেষ এমব্রয়ডারি
করা। ঘারারার
ওড়না বা
দোপাট্টাতেও ভারি
কাজ করা,
এতে কিরান
নামের লেস
লাগানো হয়
চাকচিক্য বাড়ানোর
জন্য। কুর্তিতে
কেউ ভারি
কাজ রাখেন
আবার অনেকে
সাদাসিধে চেহারাই
পছন্দ করেন।
ঘারারার একটি
বিশেষ স্টাইল
হলো ‘টুকরি
কা ঘারারা’।
এতে বিভিন্ন
রঙের কাপড়ের
টুকরো ব্যবহার
করা হয়।
এগুলো হাতে
সেলাই করে
যুক্ত করা
হয়। পোশাকে
নবাবি লক্ষ্ণৌ
আমেজ এখনো
টিকে আছে
এ পোশাকে।
ঘারারার বোন বলা যায় শারারাকে। শারারা শব্দের অর্থ আলোর স্ফুলিংগ। পায়জামা হাঁটুর কাছে প্রায় ছাতার মতো ছড়িয়ে থাকে। হাঁটু বা তার একটু নিচে থাকে জোড়া। পায়জামা প্রায় মাটি ছুঁয়ে যায়। উপরে থাকে কুর্তি আর একটা বা দুটো ওড়না। এতে একটি ওড়না থাকে কাঁধে, অন্যটি মাথায়। পুরো পোশাকে জরি, উজ্জ্বল পাথর, পুঁতির কাজ দেখা যায়। ধারণা করা হয় শারারা তৈরি হয়েছিল মোগল ঐতিহ্য অনুসরণে। বলিউডের ছবিতে সত্তর ও আশির দশকে জনপ্রিয় হয়েছিল শারারা। শারারা মূলত বিয়ের পোশাক। ঘারারা ও শারারাকে গুলিয়ে ফেলাটা কঠিন নয়। দুটো পোশাকে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ঘারারার পায়জামা শুরু থেকে শেষ অবধি ঢোলা। অন্যদিকে শারারার পায়জামা হাঁটু পর্যন্ত সরু ও আঁটসাঁট।
মেয়েদের ফারসি
পায়জামার উদ্ভব
অওধে, সপ্তদশ
শতাব্দীর শেষ
ভাগে। এটাকে
বলা যায়
দুই পায়ের
স্কার্ট। এ
পায়জামার দৈর্ঘ্যে
অনেক লম্বা।
হাঁটলে মেঝে
ঝাড়ু দেয়া
হয়ে যায়
এমন। একে
ফারসি ঘারারাও
বলা হয়।
কারণ ঘারারার
পায়জামার সঙ্গে
এর বেশ
সাদৃশ্য। এ
নামটি এসেছে
ফরাস শব্দ
থেকে, যার
অর্থ মেঝে।
কারণ এর
দৈর্ঘ্য ও
মেঝে ঝাড়ু
দেয়ার মতো
বিষয়টি। এ
পায়জামা সাধারণ
হাঁটার সময়ে
বা হাতে
টেনে ধরে
রাখতে হয়।
পায়জামায় স্বর্ণের
জরি থেকে
শুরু করে
নানা ধরনের
নকশা যুক্ত
করা হয়।
সেকালে অভিজাত
নারীদের আভিজাত্য
প্রকাশের একটি
উপাদান ছিল
এ পায়জামা।
এখনো নানা
সংস্কারের মধ্য
দিয়ে টিকে
আছে ফারসি
পায়জামার চল।
নবাবি আমলের
মাঝামাঝি এসে
লক্ষ্ণৌতে উদ্ভব
হয় মেয়েদের
পাঁয়চা পায়জামার।
নবাব গাজীউদ্দিন
হায়দার বা
তার পুত্র
নাসিরউদ্দিন হায়দারের
সময়ে আবির্ভাব
ঘটেছিল এ
পায়জামার। এটি
খুব ঢিলেঢালা
কিংবা আঁটসাঁট
কোনোটাই নয়।
এটা ছিল
একটু রক্ষণশীল
নারীদের পায়জামা।
আর যারা
ছিলেন ফ্যাশনেবল,
তারা পরতেন
কলিদার পায়জামা।
পায়জামাটি নবাব
নাসিরউদ্দিন হায়দারের
(শাসনকাল ১৮২৭-৩৭)
খুব পছন্দ
হয়েছিল, তিনি
তার বেগমদের
কলিদার পায়জামা
পরাতে শুরু
করেন। রাজপরিবারে
যুক্ত হওয়ায়
সাধারণ মানুষের
মধ্যেও বেড়ে
যায় এর
জনপ্রিয়তা।
লক্ষ্ণৌ পোশাকের
জাঁকজমকে বিরাট
ভূমিকা আছে
এমব্রয়ডারির। এখানকার
নিজস্ব বিখ্যাত
রীতিটি হচ্ছে
‘চিকন’।
এটি তৈরি
করার প্রক্রিয়াকে
বলা হয়
চিকনকারি। হাতের
সেলাইয়ের মাধ্যমেই
করা হয়
চিকনকারি। এটি
এখনো লক্ষ্ণৌ
জমজমাট শিল্প,
একে বলা
হয় ‘লক্ষ্ণৌই
চিকন’।
সাদা কাপড়ে
সাদ সেলাইয়ের
মাধ্যমে নকশা
করার রীতি
ছিল পারস্যে।
বলা হয়
সেখান থেকেই
মোগলদের হাত
ধরে এ
রীতি ভারতে
আসে এবং
লক্ষ্ণৌ একসময়
তাকে নিজের
মতো করে
ব্যবহার করতে
শুরু করে।
মুসলিম অভিজাতদের
মধ্যে ঢাকার
মলমলের আকর্ষণ
ছিল। নবাবি
আমলের শেষ
দিকে চাপকান
ও আংগরাখা
মিলিয়ে তৈরি
হয়েছিল আচকান।
এ পোশাকটি
পুরো ভারতেই
পুরুষদের মধ্যে
জনপ্রিয় হয়ে
ওঠে। আচকান
হায়দরাবাদে গিয়ে
কিছু পরিবর্তনের
মধ্য দিয়ে
হয়ে ওঠে
শেরওয়ানী। আচকানের
এ নবরূপ
আবার লক্ষ্ণৌ
মানুষদেরও পছন্দ
হয়েছিল, তাই
তারাও আগ্রহভরে
শেরওয়ানী পরা
শুরু করে।
মাথার টুপি,
পাগড়ি বহুকাল
ধরেই ভারতবর্ষের
পুরুষের পোশাকের
অবিচ্ছেদ্য অংশ
ছিল। নাসিরউদ্দিন
হায়দার চালু
করেছিলেন ‘পাঁচপানওয়ালী
টুপি’।
এ টুপি
তিনি ছাড়া
আর কেউ
পরার সাহস
করেননি। কিন্তু
নবাবের এ
টুপি মানুষের
খুব পছন্দ
ছিল। তাই
তিনি মারা
যাওয়ার পর
মানুষ ব্যাপকভাবে
এ টুপি
পরা শুরু
করে।
একবার দিল্লি
থেকে এক
শাহজাদা লক্ষ্ণৌ
এলেন। তার
মাথায় ছিল
দুলপড়ী টুপি।
এ টুপিও
মানুষের বেশ
মনে ধরে।
এর জনপ্রিয়তা
এমন হয়েছিল
যে মাথায়
এ টুপি
থাকলে মানুষ
বলত, ‘দুলপড়ী
টুপিওয়ালে শাহজাদে’।
শেষ নবাব
ওয়াজিদ আলী
শাহ নিজের
ডিজাইনে তৈরি
করেছিলেন ‘আলম
পসন্দ’ টুপি,
নামটি তারই
দেয়া। সাধারণ
মানুষ বলল
ঝুলা। তবে
টুপির কিছুটা
অদ্ভুত ডিজাইনের
কারণে মানুষের
কাছে এটি
জনপ্রিয় হয়নি।
লক্ষ্ণৌ নবাবি
আমলে জুতারও
নানা নতুন
ডিজাইন তৈরি
হয়। এ
শহরে সলীমশাহী
নামে মোগল
রীতির ছুঁচলো
ডগাওয়ালা জুতার
খুব কদর
ছিল। শহরের
কেতাদুরস্ত পুরুষরা
এ জুতা
ব্যবহার করতেন।
জুতার ডগার
ডিজাইনে সামান্য
পরিবর্তন এনে
লক্ষ্ণৌ অধিবাসীরা
আবার হাজির
করল আরেক
জুতা। একসময়
জুতায় জরি-চুমকির
কাজও যুক্ত
হতে লাগল।
আবদুল হালীম
শরর (১৮৬০-১৯২৬)
যখন তার
বিখ্যাত গুযিশতা
লক্ষ্ণৌ লিখছেন,
তখন সেখানে
নারীদের মধ্যে
শাড়ির বেশ
প্রচলন হয়েছিল।
কিন্তু এতে
স্থানীয় সংস্কৃতির
প্রতি অনুরাগের
হেতু শরর
খুশি হতে
পারেননি। তার
মতে, এতে
লক্ষ্ণৌ নারীদের
নিজস্ব পোশাকের
ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত
হচ্ছে—‘...তাই
বলে নিজেদের
চালচলন, বেশভূষা
একেবারে ছেড়ে
দিতে হবে,
এটা আমি
কোনোমতেই মেনে
নিতে পারি
না।...শাড়িতে
যে কী
এমন বিশেষ
সৌন্দর্য আছে,
তা আমি
কিছুতেই বুঝতে
পারি না।’
অমিত রহমান: লেখক





