মিয়াজান দারোগার একরারনামা গ্রন্থের একটি অধ্যায় নিচে পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—
আমার মুলুক আর খানদান
আমার জন্ম পুব বাংলার ‘ফ’ জেলায়। বাপ ছিল চাষা। থাকতাম সদরের কাছেই। তিন ভাইয়ের মধ্যে আমিই ছোট। দেখতে শুনতে ভালো আর চালাক চতুর বলে আমি ছিলাম আম্মির নয়নের মণি। আম্মি বলত আব্বা একটা আস্ত বেয়াকুব। দেখাদেখি আমরাও তা-ই মনে করতাম। আমাদের এক সুন্দরী বোনও ছিল। যে সময়ের কথা বলছি, তখন তার বয়স হবে বছর চৌদ্দ। দুই বছর আগেই আব্বার চেয়েও বয়সে বড় একজনের সঙ্গে তার নিকা হয়। বোনাই ফকির আমাদের জেলার কালেক্টর সাহেবের আর্দালি পিওন। বেশ তালেবর। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম বোনও আমাদের খুবই হুঁশিয়ার হয়ে উঠেছে। রোজ রোজ ভালো কাপড় পরে আর চাল মেরে বেড়ায়। এর মধ্যে একদিন কালেক্টর সাহেবের বদলির হুকুম এল। দূরে উত্তর-পুবের কোনো একটা জেলায় তিনি চলে গেলেন। আমাদের বুড়ো বোনাইও হুজুরের সঙ্গে চলল, খাস খিদমতগাররা যা হামেশাই করে থাকে। কিন্তু যা হামেশাই ঘটে না তা হলো, দূরের চাকরিতে সঙ্গে করে বিবিকে নিয়ে যাওয়া। আব্বা সাদাসিধে লোক। মেয়ে অত দূরে চলে যাক সে চায়নি। কিন্তু আম্মি চাইল বোন ফকিরের সঙ্গেই যাক। আমার তখন বয়স কম। জোর করে মেয়েকে দূরে পাঠানোর কারণটা বুঝিনি। বছরখানেক বাদে বোনাই একা শ্বশুরঘরে এল। বোন কেন এল না, তার একটা অজুহাত ফকির নিশ্চয়ই দিয়েছিল। আম্মি সেটা শুনে আব্বাকেও যাহোক কিছু বুঝিয়ে দিল। ব্যস, এ নিয়ে ঘরে আর কোনো কথা হলো না। এইবার ফকিরের যাওয়ার সময় হলে সে চাইল আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে। এত দিনে আমিও নাকি বেশ লায়েক হয়ে উঠেছি। একদিন সকালে ডিঙি চেপে তাই ফকিরের সঙ্গে পাড়ি দিলাম। পৌঁছে দেখি বোন আমার আরো তুখোড় হয়েছে। গাঁয়ের সেই বোকা মেয়ে এখন কালেক্টর সাহেবের রক্ষিতা। কিছুদিনের মধ্যে আমিও গেঁয়ো ছোকরা থেকে হুঁশিয়ার চাপরাশি বনে গেলাম। আমার কাজ হলো, কাছারি চলার সময় সাহেবের হুকুম তামিলের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা আর ফাইফরমাশ খাটা। বছর দুয়েক না যেতেই ৪ টাকা মাস মাইনের পুরোদস্তুর আর্দালি হলাম। দুনিয়াটা ধীরে ধীরে রঙিন হয়ে উঠছিল। হবে না-ইবা কেন! আমি কিনা এখন খোদ কালেক্টর সাহেবের ‘শালা’।
আমার বরাত ফিরল
আমার বোন কালেক্টর সাহেবের পেয়ারের বেগম। সেই সুবাদে চাকরিতে চড়চড় করে উঠছিলাম। হুজুরের সঙ্গে বোনের সম্পর্কটা গোপন থাকার কথা। আদতে কিন্তু সবাই জানত আর জেনেও না জানার ভান করত। তবে আমাকে খাতির করে চলত সব ধরনের লোকই। পকেটও ধীরে ধীরে ফুলেফেঁপে উঠছিল। মাইনে ৪ টাকা হলে হবে কী, মাসের শেষে রোজগার গড়পড়তা কুড়ি টাকার কম হতো না। এবার সারা গায়ে ছোপ ছোপ দাগওয়ালা একটা তেজি টাট্টু ঘোড়া কিনলাম। ওটার একটা লাল চারজামা (জিন) ছিল আর গলায় বাঁধা ছিল ঘুঙুর। টাট্টুটার পিঠে সওয়ার হয়ে ডাঁটে ঘুরে বেড়াতাম। এক কথায় আমার তখন দারুণ রমরমা। এই সময় জেলায় একটা ডাকাতি হলো। এলাকার বুড়ো বামুন দারোগা পড়ল মহাফ্যাসাদে। সে না পারছিল ডাকাতদের হদিস দিতে, না লুটের মালের কোনো কিনারা করতে। এইবার দেখলাম ফকিরের কেরামতি। সে পথ বাতলে দিল যাতে আমি সুযোগটা কাজে লাগাতে পারি। আদালতের ফন্দিফিকিরে তত দিনে আমিও চোস্ত হয়ে উঠেছি। কিন্তু কোনো থানায় ডাকাতি হলে আমার কী ফায়দা, তা বোঝার মতো বুদ্ধি তখনো আমার হয়নি। বোনাই তখন যেসব ফন্দিফিকিরে আমাকে তালিম দিয়েছিল, আর তার জবাবে আমি যা যা বলেছিলাম, সেগুলো অনেকটা এ রকম:
আমি (মিয়াজান): তুমি কেন আমাকে এর মধ্যে জড়াতে চাইছ, তুমি কি মনে করো আমি লুটের মাল হাসিল করতে পারব কিংবা ডাকাতদের গ্রেফতার করতে পারব?
ফকির: জরুর পারবি। শোন, কার্তিক পোদ্দার, যার ঘরে ডাকাতি হয়েছে, সে ব্যাটা যেমন মালদার তেমনি ভীতু। ওর কাছে হদিস আছে কারা ডাকাতি করেছে, আর মালইবা কোথায় গায়েব করে রেখেছে। কিন্তু ও মুখ খুলবে না। ডাকাতদের মুরুব্বি হলো ব্যানার্জিরা, কার্তিকেরই তালুকদার। মাল আছে তাদেরই ঘরে। কিন্তু সেসব যেতে দে— ওগুলোর কোনোটাই তোর আমার ব্যাপার না। তুই রামচাঁদ গাঙ্গুলীকে চিনিস তো? প্রতাপ সম্পর্কে ওর ভাই। কিন্তু প্রতাপের ওপর রামচাঁদ দারুণ খাপ্পা। তুই যদি কোনোভাবে প্রমাণ করতে পারিস লুটের বখরা প্রতাপও পেয়েছে, তাহলেই তোর নসিব খুলে যাবে।
মিয়াজান: কিন্তু সেটা আমি করব কেমন করে?
ফকির: আরে, এটা হলো দুনিয়ার সবচেয়ে সোজা কাজ। কাল সকালে কালেক্টর সাহেব যখন নাশতার পর আদালতে বেরোবেন, তুই তখন বারান্দায় হুজুরের দিকে পেছন ফিরে বসে থাকবি। শুধু বসে থাকলেই চলবে না, সোনাওয়ালার সঙ্গে গুজগুজ করে ডাকাতি নিয়েই সলা করবি। আর এমনভাবে কথা বলবি, যাতে সেগুলো হুজুরের কানে পৌঁছে। তুই বলবি, ‘তাজ্জব বাত! এত দিন কেটে গেল, ডাকাতির একটা কিনারা হলো না। দারোগাটা বাজে।’ এই রকম আর কি! তারপর বাকি বন্দোবস্ত আমি করব।
মিয়াজান: তারপর কী হবে?
ফকির: আমি কালেক্টরকে খুব ভালো রকম চিনি। বিকালে কামকাজ খতম হলেই আমাকে তলব করে তোর কথাগুলো যাচাই করবে। আমি তখন বলব, ‘আমার বিশ্বাস, তুই পারবি লুটের মাল হাসিল করতে। তিনি যদি মেহেরবানি করে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে একটা সুপারিশ করেন।’ তারপর ম্যাজিস্ট্রেট হয়তো তোকে কিছুদিনের জন্য ওই থানার জিম্মাদারি দিয়ে পাঠাবে। আর সেই সঙ্গে এটাও বলে দেবে যে, ডাকাতদের গ্রেফতার করতে পারলে তোর নোকরি পাকা।
মিয়াজান: ঠিক আছে, বুঝলাম। কিছুদিনের জন্য আমাকে দারোগার জিম্মাদারি দেয়া হলো। কিন্তু লুটের মাল কিংবা ডাকাতদের হদিস আমি কী করে করব! আমার কি পড়ালেখার কোনো তালিম আছে?
ফকির: তুই তো দস্তখত করতে পারিস। দারোগার পক্ষে ওটাই অনেক। বাকি কাজ রামচাঁদ গাঙ্গুলী সামলে দেবে। এখানকার চাকরি ছেড়ে যাওয়ার আগে তোর ২০০ টাকা মিলবে। আরো ৩০০ পাবি যদি প্রতাপকে ফাঁসাতে পারিস। তারপর তুই দারোগার চাকরিতে পাকা হয়ে যাবি আর দুই বছরের মধ্যে একেবারে মালামাল।
মিয়াজান: আসল কথাটা হলো, প্রতাপকে কীভাবে ডাকাতির মামলায় জড়াব আর মালইবা মিলবে কোথায়?
ফকির: তবে শোন— থানায় দাখিল হয়েই তুই একদঙ্গল বরকন্দাজ, চৌকিদার আর গোয়েন্দা নিয়ে কার্তিক পোদ্দারের বাড়ির দিকে রওনা হবি। এতে তোর জরুর ১০০ টাকা আমদানি হবে। মালদার লোকদের বাড়িতে ডাকাতির পর দারোগা সওয়াল-জবাব করতে গেলে এটা তার হকের নজরানা। তুই অবশ্যই নজরানা নিবি, তবে নিজের হাতে নয়; বক্সির হাত দিয়ে। বেয়াদবি যাতে না হয়, সেজন্য আধঘণ্টা অপেক্ষা করবি, গড়গড়া টানবি, তারপর কার্তিককে পিছমোড়া করে বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে আসবি। ওকে থানার চৌহদ্দির বাইরে কোনো একটা ঘরে কয়েদ করে রাখতে হবে। সেই ঘরের চালের বাতার মধ্যে দড়ি ঝুলিয়ে কার্তিকের পিছমোড়া দুটো হাত আচ্ছা করে বাঁধবি। এরপর দড়ি ধরে টান মারলেই ব্যাটার গোটা শরীরের ওজন গিয়ে পড়বে ওর মোচড়ানো দুই কাঁধে। দড়িতে আরো টান দিলে শরীরটা ধীরে ধীরে উপরে উঠবে। তারপর একটা সময় হাতদুটো কাঁধের জোড় থেকে খুলে বেরিয়ে আসবে। এত জবরদস্তির পর কেবল একজনকেই দেখেছি মুখ না খুলতে। কার্তিককে সামান্য একটু টানের বেশি আর কিছু দেয়ার দরকার পড়বে বলে মালুম হয় না। ওর শরীরটা ভারী, হাতগুলো পলকা, জোড় ছোট ছোট। তার ওপর জাতে তামুলি। এইসব লোকেরা বেশি ঝামেলায় যায় না। তুই জরুর এবার আমার খেলটা আন্দাজ করতে পারছিস?
মিয়াজান: বুঝতে তো পারছি! আর এটাও বুঝছি যে কার্তিক এখন আমাদের কব্জায়। বাকি কাজ আন্দাজ করতে কোনো মুশকিল নেই।
ফকির: শাবাশ! তুই যে আমিরনের ব্যাটা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তোর আব্বাটা তো আহাম্মক, কিন্তু তুই পেয়েছিস মায়ের ধারা। কার্তিককে একবার বাগে আনতে পারলেই হলো। তখন দেখবি ও কবুল করেছে যে, দুজন ডাকাতকে চিনতে পেরেছে— ভোলা সর্দার আর তিলক— বাবু প্রতাপ গাঙ্গুলীর খাস শাগরেদ। প্রতাপ যেহেতু দাঙ্গাবাজ আর চরিত্রও ভালো নয়, তাই ও বলবে যে, ওর সন্দেহ লুটের মাল প্রতাপের ঘরেই পাওয়া যাবে। ব্যস, কেল্লা ফতে। একটা পরোয়ানা নিয়ে তুই প্রতাপের বাড়িতে তল্লাশি চালাবি। বেরিয়ে আসবে লুটের মাল।
মিয়াজান: কিন্তু কার্তিক মালগুলো শনাক্ত করবে তো?
ফকির: আলবত করবে। তা না হলে দড়ি, বাঁশ আর এত জোগাড়যন্ত্রের কী দরকার ছিল!
অনুবাদ: অরিন্দম দাশগুপ্ত






