মীনাক্ষী সেন, জেলের ভেতর জেল, কারিগর, ২০১৪ সংস্করণ
১.
মেয়েদের কলমে কারাকাহিনী আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামের কাল পর্ব থেকে পাচ্ছি। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হওয়ার সময় এবং নকশাল আন্দোলনের সময় যেসব মেয়ে কারাগারে ছিলেন, তাঁদের কলমেও একঝাঁক লেখা উঠে এসেছে। ছেলেদের লেখা কারাকাহিনীর সঙ্গে তফাতটা একেবারে মৌলিক। উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নির্বাসিতের আত্মকথা’ অসাধারণ সাহিত্যরসসম্পৃক্ত। কিন্তু বীণা বা মীনাক্ষীর সঙ্গে তুলনায় তাঁর স্বরের তফাতটা লক্ষ করা যাক, নরেন গোঁসাই রাজসাক্ষী হওয়ার পর কানাইলাল ও সত্যেন ঠিক করে তাকে খুন করবে। উপেনবাবু প্রথমে এমনভাবে বর্ণনা দিয়েছেন, তা যেন মহাকৌতুকের ব্যাপার। ‘হাসপাতালে থাকিবার সময় সত্যেনের মনে হয় যে, যখন কাশরোগে ভুগিতেছি, তখন ত অল্পদিনের মধ্যে মরিতেই হইবে, বৃথা না মরিয়া নরেনকে মারিয়া মরিলেই ত বেশ হয়। কানাইলাল সে কথা শুনিয়া তাহাকে সাহায্য করিবার জন্য পিস্তল লইয়া হাসপাতালে আসে।’ নরেন গোঁসাই তো পিস্তলের গুলিতে মারা গেল, তখন প্রশ্ন উঠিল পিস্তল এল কোথা থেকে। কয়েদিরা গুজব রটাল রাজবন্দিদের বাড়ি থেকে যেসব ঘিয়ের টিন বা কাঁঠাল আসত, তার মধ্যে ভরে কেউ পিস্তল পাঠিয়েছে।
কানাইলাল বলিল, ‘ক্ষুদিরামের ভূত আসিয়া তাহাকে পিস্তল দিয়া গিয়াছে। প্রেততত্ত্ববিদেদর এক-আধখানা বই পড়িয়াছি, কিন্তু ভূতকে পিস্তল দিয়া যাইতে কোথাও দেখি নাই। ...তবে কর্তৃপক্ষের চক্ষুর অগোচরে জেলের মধ্যে গাঁজা, গুলি, আফিম, সিগারেট সবই যে রাস্তা দিয়ে যাইতে পারে, সে রাস্তা দিয়া পিস্তল যাওয়া ত বিচিত্র নয়!’
আমরা এবার যে নারী কারাকাহিনীকারদের প্রসঙ্গ আনব, তাঁরা কেউ বড়ো মাপের নেতা নন। দল চালনা করার ক্ষমতা বা ইচ্ছা তাঁদের ছিল বলে জানি না। তাঁদের কথনের বিশিষ্টতাটি একটি বিখ্যাত চিঠির সাহায্যে বুঝতে চেষ্টা করতে পারি। কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে কাজ করার জন্য শিলং জেলে ছিলেন সুরমা ঘটক, ১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ পর্যন্ত। তার সাথি ছিলেন অঞ্জলি দাস, —ডাক্তার সুন্দরীমোহন দাসের পৌত্রী। পার্টির নির্দেশে সুরমা ও অঞ্জলি বাড়ি ছেড়ে অনেক দূরে খাসিয়া গ্রামে চলে যান। কিছুদিন পর ধরাও পড়েন।
‘নিয়ে যায় শিলং জেলের ফিমেল ওয়ার্ড-এ; চোর, খুনী, পাগলি ও পতিতা মেয়েদের মধ্যে। অঞ্জলির মা শ্রীযুক্তা সুবর্ণপ্রভা দাস, বোন বাদল, কণি ও সন্ধ্যা দাসকেও ধরে নিয়ে আসে। পরে মাসিমাদের ছেড়ে দেয়। ছিলাম আমি, অঞ্জলি ও কণি।’ ঋত্বিকের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের পর সুরমার জেলের অভিজ্ঞতা লেখা খাতাগুলো পড়ে ভাবী স্ত্রীকে তিনি লিখেছিলেন, ‘তোমার লেখাটা চলবে কেন? অনেকগুলো নতুন জিনিষ আছে ওর মধ্যে। Fuchik থেকে শুরু করে অমল দাশগুপ্ত পর্যন্ত বন্দী-জীবন নিয়ে রচনা করে গেছেন। তুমি নামকরা নেতা নও। বিরাট কিছু achieve করনি। নির্যাতনও এমন নতুন কিছু সহ্য করনি। তোমার caseটাও নাড়া দেবার মতো কিছু নয় তবু তোমার লেখা চলবে। প্রথমত তোমার অভিজ্ঞতার সাধারণতাই হচ্ছে তার আবেদনের প্রাণবস্তু। অত্যন্ত সাধারণের মধ্যে থেকে তুমি অসাধারণকে বারে বারে স্পর্শ করেছ, গভীরে নেমে যেতে পেরেছ। দৈনন্দিনতাকে টুকরো টুকরো করে বিশ্লেষণ করতে পেরেছ। ...বিশেষ করে মেয়েদের বেরিয়ে আসার দিক, তাদের বন্দীজীবনের সমস্যা, তাদের সমাজজীবনের সমস্যা। ...ঐ Tribal মেয়েগুলো ঐ Lunpenised পাগলীগুলো, ঐ বারবনিতার দল... ঐ সব কমরেড, এরা যেন এক একটা ছোট ছোট cameo।’
শুধু সুরমা নন, ঋত্বিকের এই অসামান্য আলোকপাত দিয়ে আমরা অঞ্জলি দাস (লাহিড়ি), জয়া মিত্র, মলয়া ঘোষ, মীনাক্ষী সেন সবার লেখার বৈশিষ্ট্য প্রাথমিকভাবে বুঝতে পারি। মণিকুন্তলা সেনের লেখাও ব্যতিক্রম নয়, যদিও তিনি বড়ো মাপের নেত্রী। কিন্তু নারী বলেই এরা সম্পূর্ণ অন্য এক দৃষ্টিতে জেলকে দেখতে পেরেছেন। তারপর আছে তাঁদের আলাদা আলাদা লেখক চরিত্র। এ প্রবন্ধে মীনাক্ষী সেনের ‘জেলের ভেতর জেল’ গ্রন্থটির বিষয়ে কিছু আলোচনা রইল। ২০১৪ অক্টোবরে অকালপ্রয়াত মীনাক্ষী নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অপরাধে চার বছর কারাবাস করেন। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারের জেনারেল অ্যামনেস্টির সময় মুক্তি পান। তারপর অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি সমাজকর্মী হিসেবে, বিশেষত পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর সুরক্ষার কাজে নিজেকে ঢেলে দেন। পাশাপাশি ছিল জনজাতির সংস্কৃতি নিয়ে নিবিড় অনুসন্ধান। সত্তরের দশকের অভিজ্ঞতা তাঁকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল।
২.
জেলের ভেতরে আরেক জেলকে দেখার অন্তর্দৃষ্টি যে বয়সে মীনাক্ষীর অধিগত, সে নেহাতই তরুণীবেলা। সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘স্পন্দন’ পত্রিকায় টুকরো টুকরো লেখাগুলো প্রকাশ হতো। কী আলোড়ন তুলেছিল ‘পাগলবাড়ি’ পর্ব। প্রায় সম্মোহিত করে তাঁর কথনভঙ্গি, নিরুত্তেজিত শান্ত, মৃদু— কিন্তু পড়তে পড়তে পাঠকের জাগে ছিলা টান টান করা অনুভব। এসব পাগলের বেশির ভাগই ‘ননক্রিমিনাল লুনাটিক’ তাদের জেলে আটকে সমাজের শান্তিরক্ষা করা হয়েছে। ‘হাতে বা পায়ে বেড়ি দিয়ে লোহার গরাদের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয় কিছু অবয়বকে। আর এক ঘরে প্রায় শ দুয়েক উন্মাদের সহবাস। তার ভেতরে আধা সুস্থ বা সম্পূর্ণ উন্মাদের সঙ্গে নাকি রয়েছে অনেক প্রায় সুস্থ বা সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষও। কি শীতে কি গ্রীষ্মে, সম্পূর্ণ উলঙ্গ তরুণী, বৃদ্ধা কিংবা মাঝবয়সি কিছু শরীর। তাঁরা কেউ চেঁচায়, কেউ হাসে, কেউ কাঁদে, কেউ আবার কামড়ে খুবলে নেয় অন্য কোনো সহবন্দিনীর এক খাবলা জীবন্তমাংস। ...এইখানে এইভাবেই নাকি পাগলদের শোধন বা সুস্থ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
পাগলা গারদ পরিচিত পরিবারের বাইরে এক কাল্পনিক অলীক মিথ্যা পরিবার তৈরি করে। নিজের পরিবার যেখানে দায় ঝেড়ে ফেলে বাঁচে। সেন্ট্রাল হোম নামেই হোম— তাতে বাড়ির কোনো উষ্ণতা নেই। পাগলা গারদের উদ্ভাবন তথাকথিত সুসভ্য মানুষ এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ রাষ্ট্রের আরামের পক্ষে একটি জরুরি ব্যাপার পরস্পরের কাছে অচেনা একদল উদ্ভ্রান্ত মানুষ— তারা পরস্পরের ভাষার সঙ্গে অপরিচিত। কেউ গালাগালি দিচ্ছে, কেউ ভয় পাচ্ছে। চূড়ান্ত ভয় তো দেখানোও হচ্ছে, কখনো তাদের বাধ্য করা হচ্ছে এমন কাজ করতে, যা তাদের জুগুপ্সা জাগায়। প্রতিবাদের উপায় নেই। মীনাক্ষীর বই পড়তে গিয়ে একটি বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘One flew over the cuckoo’s nest’ মনে পড়ে যায়। হয়তো অনেক সাজানো পরিচ্ছন্ন সেই গারদ— কিন্তু বিচ্ছিন্নতা, শাসন, নিপীড়ন ও ভয় একই রকম। পাগল হিসেবে চিহ্নিত মানুষের তো কোনো নাগরিক অধিকার থাকে না। সে যেন নাবালক কিংবা ক্রীতদাস চিরকালের মতো। আদি পিতৃতন্ত্রের দাপটে চড়থাপ্পড় জুতো চাবুক খাওয়া অবনত শ্রেণী। আর খুবই স্বাভাবিক তাই যে পাগলা গারদকে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ইতিহাস ও বিবর্তনের বাইরে একটি স্বতন্ত্র অবমাননায় দ্বীপ হিসেবে দেখা হয়।
গোইয়ার বিখ্যাত ‘দি ম্যাড হাউস’ চিত্রটির কথাও মনে পড়ে। মীনাক্ষীর কলমেও তুলির জোর আছে, টানটোন সমেত তিনি ফুটিয়ে তোলেন হতভাগ্য মানুষগুলোকে। দু-একটি উদাহরণ দেয়া যাক,
ক) ‘সেই নিস্তব্ধতা টুকরো-টুকরো করে শোনা গেল কয়েকটি তীব্র, তীক্ষ, গলার চিত্কার —‘ধর-মার-ধর-পাগলিকে-মার-’
সেই চিত্কারের উত্স অনুসন্ধান করে দেখা যায়, কয়েকটি মেয়ে তাড়া করেছে একটি কঙ্কালকে। একটি জীবন্ত কঙ্কাল। চামড়ায় ঢাকা হাড়। লম্বা সরু হাত দুখানি আকাশের দিকে তোলা। আঙুলগুলি ছড়ানো। মাথার চুল তিনটে জটার আকারে নেমে এসেছে ঘাড়ে।’
খ) ‘প্রহার সমানে চলছে। অথচ কখন বন্ধ হয়ে গেছে শাহানাজের ক্ষীণ কাতর কণ্ঠে দয়া ভিক্ষা শিখা তার মুখখানা উপড়ে টেনে তোলে। তারপর মুখের ওপর লাগায় কয়েকটা চড়। দেখলাম হাতের চেটো দিয়ে নাক মুছতে মুছতে সেদিকে চেয়ে আছে শাহানাজ! অবাক হয়ে? একটু পরেই গলগল করে রক্ত বের হয়ে এল তার নাক দিয়ে। উপুড় হয়ে চাতালের ওপর পড়ে গেল সে। ...মানতেই হয় শাহানাজ এক পাগল। আর তার পায়ে দূষিত ক্ষত তৈরি হয়েছিল যাদের নিষ্ঠুর অবহেলায়, যারা তাকে মারল, মার খাওয়াল, তারাই সুস্থ এবং স্বাভাবিক মানুষ। এত সুস্থ যে জেলে আটক শত-শত বন্দি-বন্দিনীর তারাই শাসনকর্তা, তত্ত্বাবধায়ক, অভিভাবক।’
গ) ‘পাগলদের ক্ষ্যাপানো তো এক পরিচিত খেলা; ...জেলবাসী এইসব শিশুদের অন্য সময়ে গলা খুলে কথা বলার অধিকারও ছিল না। হাসি বা কান্নার তো নয়ই। কারণে...অকারণে নির্মমভাবে প্রহূত হওয়াটাই ছিল তাদের অভ্যাস। সেই অসহায় শৈশবহীন শৈশবের শিশুরা হঠাত্ করে এক অনধিকার অধিকার পেত। তাদের চেয়েও অসহায়ভাবে বন্ধ এক পাগলিকে ক্ষ্যাপানোর অধিকার। এই অধিকার তারা প্রয়োগ করত নিষ্ঠুর আনন্দে। তাদের সেই খেলা নির্মমতার রূপ নিয়ে আঘাত করত ক্ষীরোদাকে।’
এমনি এক ক্ষ্যাপানোর খেলা চলার সময়ে ক্ষীরোদা গরাদের নাগালে একটি বাচ্চার হাত পেয়ে আঙুলে কামড় বসিয়ে দিয়েছিল। গোটা জেলখানায় রব উঠে গেল, ‘ক্ষীরোদা আজ রক্ত খেয়েছে।’ ‘ক্ষীরোদা রক্ত খায়’, ‘ক্ষীরোদা ডাইনি।’ বারবার এইভাবে তথাকথিত ‘রিজন’ আর ‘আনরিজন’, সুস্থ আর পাগলের প্যারাডক্সময় অবস্থানকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন মীনাক্ষী। একটু অপ্রাসঙ্গিক শোনাবে হয়তো, সাদাত হাসান মান্টোর ‘টোবাটেক সিং’ গল্পের তুলনাটা মনে এসেই যায়। লাহোর পাগলা গারদের শিখ মনোরোগী সেই বিষেণ সিং— নিয়মমাফিক, ধর্মের ভিত্তিতে লোকবিনিময়ের চুক্তি মেনে পাগল বিনিময় হচ্ছে। বিষেণ তো ফিরতে চায় নিজের গ্রাম টোবাটেক সিং-এ। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী নোম্যানসল্যান্ডে দাঁড়িয়ে সে ঘোষণা করে, এটিই তার গ্রাম এবং ওখানেই তার মৃত্যু হয়। অবিস্মরণীয় তার প্রলাপ— ‘উপর দে গুড়গুড় দে আনেক্সে দি বে ধেয়ানা মুগ দি ডাল অফ টোবা টেক সিং অফ দি গবর্নমেন্ট অফ...।’ কে উন্মাদ আর কে নয় গুলিয়ে যায়। মীনাক্ষী আমাদের সুফিয়া মাস্তানের কাহিনী শুনিয়েছেন। পাগলবাড়িতে চক্রান্ত করে যেসব সুস্থ মানুষকে ঢোকানো হয় শাস্তি দেয়ার জন্য, সুফিয়া তাদের একজন। সীমান্তে বেআইনিভাবে পার হওয়ার অপরাধে বন্দি হয়েছিল সুফিয়া। রোজার সময় সামান্য কিছু বাড়তি ডায়েট জোটে বন্দিদের, সেটাও চুরি করে মেট্রনের দলবল। সাহসভরে অভিযোগ জানিয়েছিল সুফিয়া। তাকে শাস্তি হিসেবে চিরকালের জন্য পাগল বানিয়ে গারদে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। সেই চূড়ান্ত অমানবিক ভয়াবহ পরিবেশেও সে মানসিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে বাকি জীবন। বিচারশালা এবং রাষ্ট্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একলা ব্যক্তির এই প্রতিবাদ আমাদের কাঁপিয়ে দেয়।
আর সুস্থ কারা? ‘মা’ শব্দ যুক্ত করে জেলে যাদের ডাকার নিয়ম, কর্তৃপক্ষের রোবট, শিখা, সরযূ, পুঁটি। শিখার কথা জয়া মিত্রও ‘হন্যমানে’ লিখেছিলেন, ‘শিখা হচ্ছে প্রেসিডেন্সি জেলের অবস্থা ব্যবস্থার এক নিখুঁত প্রতীক। গোটা বারো চিটিং কেসের আন্ডারট্রায়াল আসামী। আপাদমস্তক নাগরিক পাপের এক সম্পূর্ণ চেহারা যেন।’ আর মীনাক্ষী? তাঁর কণ্ঠ যেন অসহ্য ক্রোধে থমথম করে, শিখার হাতে নিরস্ত্র অসহায় মানুষকে প্রহূত হতে দেখার যে ক্রোধ, অমন অত্যাচারের প্রতিকার করতে না পারার যে দুঃসহ যন্ত্রণা, তারও কোনো বর্ণনা হয় না। ...তার সব কুপ্রবৃত্তিকে বাধাহীন বেপরোয়া বেগে উত্সাহিত ও প্রকাশিত হতে দিল তো এই জেলখানাই। অর্থাত্ বীণা যা মৃদুভাবে বলেছিলেন, মীনাক্ষী তার বনেদ দরে নাড়া দিলেন। ভাবতে অবাক লাগে অনশনের সময় হাঙ্গামার অভিযোগে মণিকুন্তলা সেনকেও বন্দি করে রাখা হয়েছিল প্রেসিডেন্সি জেলের পাগলদের সেলে। এ স্বাধীন ভারতেই। জেল ভিজিটর অবনী ব্যানার্জি তাঁর অবস্থা দেখে অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। মীনাক্ষী প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, এ কেমন সংশোধনাগার? সংশোধনের বদলে আরো পঙ্কিলতায় ঠেলে দেয়া যে ব্যবস্থার উদ্দেশ্য। যেন অপরাধী তৈরির পাঠশালা। এ কেমন পাগলবাড়ি, যেখানে সুস্থ মানুষকে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য গারদে ঠেলে পাগল করে দেয়া হয়। মানসিক ভারসাম্যহীনকে বিনা চিকিত্সায়, বিনা শুশ্রূষায় ঠেলে দেয়া হয় চিরকালীন অন্ধকারে? মীনাক্ষীর দাদা অনিরুদ্ধ সেন লিখেছেন,
‘‘এই বইটি যে আলোড়ন তোলে, তার প্রভাবে জেলের ল্যুনাটিক ওয়ার্ডে কাউকে আটকে রাখার বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয় এবং বিচারকের নির্দেশে অজস্র বন্দী মুক্তি পান। বিচারক তাঁর রায়ে বারবার ‘জেলের ভেতর জেল’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। একজন অ্যাক্টিভিস্ট-এর পক্ষে হয়তো শুধু এটাই একটা লাইফ টাইম অ্যাচিভেমন্ট হতে পারতো।’’
কিন্তু কিছু বন্দি মুক্তি পেলেই কি সমাধান হলো? মীরাক্ষী তো দেখিয়েছেন জেলের বাইরেও একটা অদৃশ্য জেলখানা বর্তমান। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর গল্পে যাদের কথা পড়েছি, স্টেশনে, বাসস্টপে, রেলগাড়িতে যাদের দেখছি— সেই সব বিকৃতদেহ মানুষদের কীভাবে তৈরি করা হয়, ছোটবেলা থেকে হাঁড়িতে বসিয়ে রেখে সেই বীভত্স ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সমাজে নামিদামি অপরাধজগতের অধিপতিরা। তাদের নাম কক্ষনো জানা যায় না। বিচারের নামে প্রহসন বিষয়ে অনেক আগেই ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র কমলাকান্তের মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন যে, সেটা একটা কসাইখানা। বড়ো পশুরা পালায়। ছোটরা ধরা পড়ে। মীনাক্ষী দেখেছেন একটি কাঁঠালচুরির অপরাধে তিন বছর জেল খাটতে। পুতুল নামে একটি মেয়ে পাদ্রিবাবার কাছে চাকরি করত, বাসন মাজত, ঘর পরিষ্কার করত। পাদ্রিবাবা মাইনে দেয়নি তাই দুটি কাপড়, ঘড়ি, আর শ’দুয়েক টাকা চুরি করেছিল পুতুল। দু’বছর ধরে চুরির দায়ে জেলে আছে সে। গরিব মানুষ যখন একবার আইন আদালতের চক্করে পড়ে, সর্বস্বান্ত হওয়া তখন তার একমাত্র ভবিতব্য। পরিবারের যে শান্তিময় চেহারার বিজ্ঞাপন সর্বত্র— মীনাক্ষী দেখেছেন স্নেহমমতার আপাত আচ্ছাদনের তলায় তার কুিসততম স্বার্থপরতা। মা মেয়েকে বিক্রি করছে পয়সার জন্য নারীমাংসের হাটে। তাঁর মনে হয়েছে ‘এই কি রক্তের সম্পর্কের মূল্য? এই কি বহু প্রবাদে কথায় কাহিনিতে রণিত অপত্যস্নেহ।’ মীনাক্ষীর লেখা পড়তে গিয়ে আমারও মনে পড়ে যায়, মালদহে দেখেছি একটি তরমুজ চুরি করার জন্য ক্ষুধার্ত বালিকাকে পিটিয়ে খুন করেছে ফলের গুদামের মালিক। আবার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে টাকার বিনিময়ে মুখ বন্ধ করে ফেলেছে বালিকার হতদরিদ্র বাবা। খুনির কোনো শাস্তি হয়নি।
জেলের বাইরেও জেল-মীনাক্ষী দেখেছেন সেই জেলের পরোয়ানা নিয়ে জামিন বা মুক্তি পাওয়ার পর কিশোরী বা সদ্যোযুবতী মেয়েদের জন্য জেলের গেটে দাঁড়িয়ে থাকে বেশ্যাবাড়ির দালালরা— তাদেরই লোকজন ছড়ানো ভেতরে ওয়ার্ডার থেকে মেট পর্যন্ত। পালানোর পথ বন্ধ। কঙ্কনদীঘির হারিয়ে যাওয়া মেয়ে হাসিনাকে যেমন টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল নিষিদ্ধ পাড়ার দালালরা। হাসিনার গল্প লেখার সময় মীনাক্ষী রূপকথার ভঙ্গি গদ্যে নিয়ে আসেন, ভাষার সেই মায়া আর বিষয়ের ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতার দ্বন্দ্ব হাসিনাকে আমাদের মনে অক্ষয় করে রাখে। স্বামী আবার বিয়ে করেছে, বালিকা হাসিনা বয়স্ক স্বামীর হাতে প্রচণ্ড মার খেয়ে পালানোর পর। তবে হাসিনার ফিরে আসার পর তাড়িয়ে দেয়নি।
‘গোয়ালঘরে থাকতে দিয়েছিল। গালাগাল শুনতে সতীন দিয়েছিল। কাজ করার জন্য গোয়ালঘর পরিষ্কার, ধান ঝাড়া, সেদ্ধ করা রেখেছিল। খেতে আধপেটা নুনভাত দিয়েছিল। আর পেটে দিয়েছিল সন্তান। তারপর পাঁচ মাসের গর্ভবতী হাসিনা তার শারীরিক চাহিদা মেটাতে অক্ষম হলে লাথি মেরে বাচ্চাটিকে মেরেও ফেলেছিল।’
পরিবারতন্ত্র, পিতৃতন্ত্রের নির্দয় দাঁত-নখ কীভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেয় সেসব মেয়ের জীবন, তার চলচ্ছবি ‘জেলের ভেতর জেল’। মীনাক্ষী ভাষা, শব্দ ব্যবহার নিয়ে খুব চিন্তা করেননি— অন্তত তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে যা পড়েছি, তাতে মনে হয়। কিন্তু যে আপাত নির্লিপ্ত অথচ গহনে তীব্র, কথনভঙ্গি তাঁর আয়ত্ত তা সাহিত্যিকদের জাত চিনিয়ে দেয়। তাঁর ছোটগল্পগুলোয়ও সেই শক্তির পরিচয় আছে। ‘মাগো’ বা ‘স্নেহলতা’ গল্প এ মুহূর্তে মনে পড়ছে। তাঁর জেলকথায় সরাসরি রাজনীতি প্রসঙ্গ কম, কিন্তু গভীর অর্থে তা অবশ্যই রাজনৈতিক। মীনাক্ষী সহযোদ্ধা কৃষ্ণাকে বলেছিলেন, ‘মানুষের সঙ্গে মিশতে, তাদের ভালবাসতে শিখেছি সাতের দশকের রাজনীতি থেকে।’ জেলের ভেতর জেল বন্দিনীদের আর শিশুদের শরীর আর মনের ওপর আধিপত্যের রাজনীতিকে নগ্ন করে দেখায়। ক্ষমতাকে যারা দাপিয়ে বেড়ায় ক্ষমতায়— সর্বস্ব দিয়ে, আদর্শ আর সহমর্মিতা দিয়ে মীনাক্ষী তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। এই প্রচেষ্টায় খাদ নেই, কোনো আপসরফা নেই। এটিই তাঁর রাজনৈতিক প্রস্থানভূমি।
রামকুমার মুখোপাধ্যায়কে লেখা চিঠিতে মীনাক্ষী জানিয়েছেন, কেন তিনি ত্রিপুরা মহিলা কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ ছাড়লেন। ১০ বছরের লক্ষ্মীকে মালকিন এবং তার প্রেমিক মাথায় কাঠ দিয়ে মেরে খুন করে পুড়িয়ে দিয়েছিল। সাত বছর কেস চলেছে, রায় হয় না। মালকিন টাকা দিয়ে বন্ধ করতে চেয়েছিল লক্ষ্মীর মার মুখ। মাতাল স্বামী তাকে মেরেছে প্রচণ্ড, তবু মা অটল। তার পাশে ছিলেন মীনাক্ষী। আর তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে সমাজের ক্ষমতাশালী লোকেরা।
‘অসহ্য অসম্ভব পরিস্থিতির সৃষ্টি করে আমাকে কমিশন ছাড়তে বাধ্য করা হয় এক রকম। এখন লক্ষ্মীর খুনিরা খুশি, সব নির্যাতনকারীরা, সরকার, পুলিশ সবাই খুশি— চুপ, পুতুল মহিলা কমিশন চলছে।’
জেলে মীনাক্ষী চার বছর ধরে শুধু অকথ্য অন্যায় দেখেননি, প্রতিবাদ করেছেন, শাস্তি পেয়েছেন। তবু নির্যাতিতদের পাশ থেকে সরেননি। জেলের ভেতর জেলের অসংখ্য চরিত্র— ভাঙাচোরা মুখের মিছিল এক অত্যাশ্চর্য আখ্যান তৈরি করেছে। পাগলবাড়ি, হাজতি নম্বর, মেয়াদি নম্বর— এ তো উপন্যাসের পর্ববিভাগ নয়, বল্লালী বালাই, আম আঁটির ভেঁপু, অক্রুর সংবাদের মতো। আচ্ছা, উপন্যাস কি কাল্পনিক কাহিনী হতে হবে? আজ তো উপন্যাসের সংজ্ঞা বদলাচ্ছে, তার মধ্যে ঢুকে পড়েছে সরাসরি বাস্তব। টানা আখ্যান না বলে আশকথা পাশকথার গলিপথ চলছে এদিক ওদিক। আবার বাস্তব ডুব দিচ্ছে কুহকে। এই পরিবর্তিত উপন্যাসের পাঠকের মেজাজ নিয়ে লক্ষ করি মীনাক্ষীর বইটির গড়ন, অধ্যায়ের নাম।
* ‘এক টুকরো রোদ্দুরের তৃষ্ণায়’ আসগরি বেগমের শেষ জীবন
* and its a mad, mad, mad world
শুধু একটা কুশল প্রশ্নের অপরাধে
* মাঝে মধ্যে আমারও খুব বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে— তার কী করা?
* রক্তচোষা
* জন্মেছিস ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে মা
* মানুষের দেহ-বিক্রি, অনিচ্ছায় সেই নীল নীলিমা ও একজন ওয়ার্ডার
* নিশ্চয়ই জেনো সে এক কিশোরীর প্রতিবাদ শোভা
* পাগল, কারা-পাগল, কারা পাগল? কেউ থাকে, কেউ থাকে না
* যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা বিদেশিনি নীলনয়নার জেল আগমন
প্রতিটি পরিচ্ছেদ স্বয়ংসম্পূর্ণ আবার একটি সূত্র বরাবর চলে গেছে তাদের মধ্য দিয়ে। নিখুঁত বুনোট, ভাবতে অবাক লাগে অগোছালো অন্যমনস্ক, কৃষ্ণাদের দেয়া ডাকনামে ‘নেলিখেপি’ মীনাক্ষী এমন একটা অভাবিত কাঠামো কীভাবে তৈরি করলেন, যার মধ্যে ঢুকে পড়েছে পরিস্থিতির চাপে আর্ত এক মানববিশ্ব— তাঁর ‘দেশে দেশে দেশহারা’র পশ্চিম পাকিস্তানি বা বর্মিদের আজ দুই হাজার ষোলোয় কত যে প্রাসঙ্গিক মনে হয়। কী অসহায় লাখ লাখ উদ্বাস্তু মানুষ ভুগোলকজুড়ে— ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, তুলনায় নিরাপদ দেশ তরীগুলো যে বড়োই ছোট, তাই সমুদ্রতটে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে সিরীয় শিশুর ছোট্ট মরদেহ।
‘জেলের ভেতর জেল’ শুধু কারাকাহিনী নয়, স্মৃতিকথা নয়, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, পারিবারিক ও সামাজিক অন্যায়ের দলিলীকরণ নয়, উপন্যাসও নয়, কিন্তু এসব মিলিয়ে ছাপিয়ে এক মহত্ সাহিত্য— জীবনের মতো মহত্। কথাশিল্প এখানে জীবন শিল্প। কোনো অনুপুঙ্খ বাদ পড়ে না অথচ তথ্য পুঞ্জীভূতও হয় না। নীরন্ধ্র অন্ধকারে মীনাক্ষী আলোর ফুলকিগুলোকে পরম মমতায় দেখান। পাগলবাড়ির জন্য বিশেষ ডায়েট রুটি, ডিম, দুধ, চিনি, চা কীভাবে চুরি হয়ে যায় মেট্রন আর সাঙ্গোপাঙ্গোদের পেট ভরানোর পর বিক্রি হয় দোকানে, হোটেলে। সেই বিবেক-খাওয়া অন্ধকারে মীনাক্ষী অন্যায়ের প্রতিবাদে সরব ন্যায়নিষ্ঠ ওয়েলফেয়ার অফিসারদিদির লাঞ্ছনা দেখেছেন। ‘সকাল দশটা নাগাদ ওয়ার্ডে ঢুকছেন দিদি, শিখা পুঁটিরা তৈরি। ওয়েলফেয়ার অফিসারকে ঘিরে নাচতে নাচতে অশ্লীল অশ্রাব্য কথাও অঙ্গভঙ্গিসহ চলেছে। অপমানের মধ্য দিয়ে মাথা উঁচু করে অবিচলিত পায়ে হেঁটে চলে যান সেই দীর্ঘদেহী মহিলা তাঁর গন্তব্যস্থলের দিকে।’
অন্ধকারে জোনাকি তো এঁরাই। যাঁরা অন্তরের শক্তিতে আলো জ্বালাতে পারেন। একদিকে স্পর্ধিত পিতৃতন্ত্রের বিকট ব্যাদান নিয়ে আসে বিদ্যার পিতৃদেবের মতো বাবারা। পরিবারের তথাকথিত সম্মান বজায় রাখতে, নিজের অহং তৃপ্ত করতে লম্পট জামাই বা ছেলেকে যারা আশ্রয় দেয়, হোমে পাঠায় অসহায় কন্যাদের। আছে পরিবারের জন্য উপার্জন করতে গিয়ে ধর্ষিত মিতার হূদয়হীন মা, ‘মেয়ে তার নষ্ট হয়ে গেছে। তাকে বাড়ি নিলে তিনি পতিত হবেন, তার চোদ্দোগুষ্টি পতিত হবে— তার বাকি মেয়েদের বিয়ে হবে না।’ তাই মিতাকে তিনি ঘরে নেবেন না। ধর্ষকরা এ ব্যবস্থায় মুক্ত থাকে, ধর্ষিতরা থাকে জেলে। অন্যদিকে আছে হামিদা, হাওয়া, শোভা, মুন্নি— যাদের মেরুদণ্ড বাঁকা করা যায় না। আছেন ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী বালিকা জাহানারার কৃষক বাবা-মা, যারা মেয়ের সঙ্গে বাচ্চাটিকে ও সাদরে কোলে তুলে নিতে এসেছিলেন। আছে রুগ্ণ কিন্তু দীপ্ত শিবানীদি, যে তার সন্তানের পিতা, প্রবঞ্চক প্রেমিক সম্পর্কে জজসাহেবকে বলেছিল, ‘রক্ত পরীক্ষায় প্রমাণ হলেও এ ছেলের বাপ আর ও হতে পারবে না। বাপ হওয়ার তো যুগ্যি হতে লাগে, হুজুর ও তো তার অযুগ্যি। এই বাচ্চা এখন শুধু আমার।’ আছে অজস্র শিশুমুখ— যারা মীনাক্ষীদের কারাজীবন আলো করে ফুলের মতো ফুটেছিল, সেই সব পুন্নি, ছায়া, সবুরজান, আনোয়ারা, শংকরী, খুকু। এদের মধ্যে একজনকে দিয়ে আলোচনা শেষ করছি। দণ্ডকারণ্যের মানা ক্যাম্প থেকে হারিয়ে গিয়ে কলকাতার জেলে পৌঁছেছিল শংকর। ছোট্ট একটি ছেলে, যে শুধু ভাবে ‘আইচ্ছা আমি যে নাই, ওরা যে ডোল বন্ধ কইর্যা দিবে?... আমি যে ইস্কুলে যাই তার লিগা দেয়, যারা ইস্কুলে যায় না, তাগো ডোল দিব না— তয় মা-বাবা-বইনে খাইবো কী?... ক্ষুধা পাইলে বইনটা বড়ো কান্দে।’ ভাবতে ভাবতে কেমন উদ্ভ্রান্ত হয়ে যায় বাচ্চা ছেলেটা। দুশ্চিন্তায় সেই শিশু ঘুমোয় না, শুধু ভাবে কীভাবে আছে তার পরিবার। শংকরকে দেখে মীনাক্ষী অলৌকিক এক সোপানক্রমের খোঁজ পেয়ে যান— অন্ধকার থেকে যা সোজা উঠে গেছে আলোর দিকে।
‘মাঝে মাঝে এমন দিনও তো আসে, যখন মনে হয় পৃথিবী ভরে গেছে ঘৃণায় আর হিংস্রতায়। ...যে পৃথিবীর তাপে যেন শুকিয়ে ওঠে মন। এই পৃথিবীতে যে সবচেয়ে প্রিয় আমার, তাকেও আর ভালোবাসি বলে মনে হয় না।
অনুভূতিশূন্য সেই মনে সমস্ত আড়াল ঠেলে এসে দাঁড়ায় শংকর। নিজেকেই তখন আমি বলি— ‘দেখ, দেখে শেখ কী করে ভালোবাসতে হয়।’
মীনাক্ষী সেনের কারাকাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে আমরাও নিজেদের এ কথাই বলি, ‘দেখ্ দেখে শেখ কী করে ভালোবাসতে হয়।’






