‘ইউরোপীয় সম্প্রসারণবাদের সূচনা ধর্ম বা পুঁজিবাদের হাত ধরে নয়, বরং এটা হয়েছিল গোলমরিচের কারণে’— এ কৌতূহলোদ্দীপক কথাগুলো জানিয়েছেন হেনরি হবহাউজ। আজকের দিনে মসলা সহজলভ্য এবং নিত্যব্যবহার্য হলেও মধ্যযুগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। দুনিয়ায় মসলার মূল কেন্দ্র ছিল ভারত, জাভা, সুমাত্রা। ইউরোপ মধ্যযুগে মসলার জন্য এতটাই পাগল হয়ে উঠেছিল যে বণিকরা দারুণ ঝুঁকি নিয়ে এশীয় অঞ্চলে চলে আসতেন। মধ্যযুগের ইউরোপে অবস্থাপন্নদের খাবারের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছিল, তাদের খাবারে বিভিন্ন মসলার সুবাস থাকতে হতো। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মসলার ঔষধি গুণের ব্যবহার। মসলা থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সুগন্ধি ও প্রসাধনী তৈরি হতো। বিভিন্ন ধর্মীয় আচারে ছিল এর ব্যবহার। সর্বোপরি মসলার ব্যবহার ইউরোপে বিভিন্ন সমাজে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উচ্চ অবস্থানের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল। উচ্চমূল্য ও অজ্ঞাত উেসর কারণে মসলা নিয়ে ইউরোপের বিস্ময় কেবলই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এ চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছিল মসলার উৎপাদনস্থল খুঁজে বের করা এবং এ লাভজনক বাণিজ্যকে দখল করার উদ্যোগ। এ উদ্যোগই আধুনিক যুগের সূচনালগ্নে ইউরোপের পূর্বমুখী সাম্রাজ্য বিস্তারের জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল।

চাহিদা দুনিয়ার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। আমেরিকার মাদকের চাহিদার যোগসূত্র পাওয়া যায় আফগানিস্তানে মিত্র জোটের হামলা ও এখনো চলা পপি চাষের মধ্যে। লাতিন আমেরিকায়ও এ মাদক ব্যবসা এখনো নানা ধরনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। হীরা মূল্যবান কিন্তু এর জন্য সবচেয়ে বড় মূল্য চুকাতে হচ্ছে আফ্রিকার হীরা খনিসমৃদ্ধ দেশগুলোকে। বিশেষভাবে নাম নিতে হয় সিয়েরালিওন, কঙ্গো ও অ্যাঙ্গোলার। মসলার বাণিজ্যই ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে ইউরোপের আত্মপ্রকাশ ঘটায়। কিন্তু ইউরোপ তার ঔপনিবেশিক আধিপত্যের চূড়ায় পৌঁছার আগেই আঠারো শতকে ইউরোপে মসলার চাহিদা কমতে শুরু করে। খাদ্যাভ্যাস বদলে যাওয়ায় ইউরোপীয়রা মসলা ব্যবহার কমিয়ে দেয়। ঔষধি হিসেবে এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মসলার ব্যবহার কমে যায়। এখন মসলার চাষ নানা দেশে ছড়িয়ে গেছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অবিশ্বাস্য উন্নতির পরিপ্রেক্ষিতে মসলার বাণিজ্য আর তেমন গুরুত্ব বহন করে না।

মধ্যযুগে ইউরোপে মসলার জনপ্রিয়তা কেন অবিশ্বাস্য রকম বেড়ে গিয়েছিল? একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা এ রকম— মাংস সংরক্ষণ ও মাংসের স্বাদ বৃদ্ধিতেই মসলা ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এ দুটো ব্যাখ্যাই ফাঁকিবাজিতে পূর্ণ। মাংস সংরক্ষণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল লবণের। আর ইউরোপে তখনকার ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় মাংস একেবারে দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত না। আর তখন তাজা মাংস পাওয়াটা সহজ ছিল। সর্বোপরি মাংসের দামের তুলনায় মসলার দাম অনেক গুণ বেশি ছিল। তাই মসলা দিয়ে মাংস সংরক্ষণের দাবি যুক্তিতে টেকে না। ১৪৩১-৩২ সালে আর্ল অব অক্সফোর্ডের গৃহস্থালির বিবরণ থেকে জানা যায়, সে সময় এক পাউন্ড মরিচের দামে আস্ত একটা শূকর পাওয়া যেত। উল্লেখ্য, মরিচই তখন সবচেয়ে সস্তা মসলা। ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর অর্থনৈতিক ইতিহাসের শিক্ষক জন মুনরো পঞ্চদশ শতকে ইংল্যান্ডে মসলার দামের একটি হিসাব দেখিয়েছেন। ১৪৩৯ সালে লন্ডনের এক কারিগর দিনে ৮ পেন্স উপার্জন করতে পারতেন। ১ পেনি খরচ করে তিনি এক গ্যালন দুধ, কিছুটা মাখন ও কোয়ার্টার বুশেল কয়লা কিনতে পারতেন। এক পাউন্ড চিনির দাম ছিল ১৬ পেন্স বা দুদিনের কামাই, গোলমরিচের দাম ছিল চিনির চেয়ে একটু বেশি আর আদার একটু কম। এক পাউন্ড লবঙ্গের দাম ছিল ৩৬ পেন্স আর এক পাউন্ড দারচিনির দাম ২৪ পেন্স। তাই মাংস সংরক্ষণের ব্যাখ্যা ধোপে টেকে না। মসলার মূল গুরুত্ব ছিল এর বৈচিত্র্য, সামাজিক ও ধর্মীয় মর্যাদায় এবং দূর দেশ থেকে আসা পণ্য হিসেবে। এখানে মসলার বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ; মসলা কেবল খাবারেই ব্যবহার হতো এমন নয়, বরং ওষুধ হিসেবে, রোগ প্রতিরোধে এর বিপুল ব্যবহার ছিল। এর মধ্যে ইউরোপের অনেক খ্রিস্টান ভূগোলবিদের ধারণা ছিল, স্বর্গ দুনিয়ার পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। ১৩২৫ সালে ইংল্যান্ডে রচিত কারসর মুন্ডি কবিতায় স্বর্গের বর্ণনায় বলা হয়, ‘স্বর্গ হলো আনন্দের বাগান, যেখানে থাকবে মসলার মিষ্টি সুবাস।’

তাই ভারত ও পূর্ব এশিয়া নিয়ে ইউরোপে এক ধরনের বিস্ময়, রোমান্টিকতা ছিল। মসলা আসত এশিয়া থেকে, তাই পুবের রহস্য পশ্চিমাদের কাছে আরো ঘনীভূত হয়েছিল। পুবের দুনিয়া মানেই কত অজানা ভূমি, মসলার উৎস; যে মসলা রোগ নিবারণ করে, জীবনীশক্তি বৃদ্ধি করে! মধ্যযুগের কিংবদন্তি অনুসারে, যিশুর জন্মের পর তাকে দেখতে যে তিনজন সাধু পুুরুষ এসেছিলেন, তারা সঙ্গে দুটি সুগন্ধি মসলা এনেছিলেন। ত্রয়োদশ শতকের একজন ইউরোপীয় লেখক, সন্তদের জীবনীকার টমাস ক্যান্টিমপ্রে একটি কাহিনী বর্ণনা করেছিলেন। ঘটনাটি এমন— একজন কঠোর সংযমী সাধু একবার জায়ফল দিয়ে ভর্তি একটি রুপার কাপ পেয়েছিলেন। উপহার গ্রহণ করা তার নীতিতে ছিল না এবং যথারীতি তিনি রুপার কাপটি ফিরিয়ে দেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি জায়ফলগুলো নিজের কাছে রেখে দেন। এর পেছনে যে কারণটি তিনি উল্লেখ করেছিলেন, সেটা আজো আমাদের চমকে দেয়— জায়ফলগুলো তিনি রাখলেন কারণ ‘এগুলো পূর্বদিকের দুনিয়া থেকে এসেছে।’&dquote;&dquote;

সব মিলিয়ে রহস্য আর উপযোগিতা মসলাকে পশ্চিমা দুনিয়ায় বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিল। তাদের জন্য মসলা কেবল খাদ্য উপাদান নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল। মসলা হয়ে উঠেছিল রহস্যময়, যেমনটা ছিল অলৌকিক ক্ষমতাধারী সন্ত, ভয়ানক কোনো প্রাণী, প্রকৃতির রুদ্র চেহারা ভূমিকম্প কিংবা পৌরাণিক কোনো প্রাকৃতিক উপাদান, পাথরের নদী বা অন্ধকারের রাজ্য।

একাদশ শতকে ক্রুসেডের পরিপ্রেক্ষিতে পণ্যের চলাচল বৃদ্ধি পায়। ফলে ইউরোপে এশিয়ার মসলা (গোলমরিচ, জায়ফল, লবঙ্গ, এলাচ) দুর্মূল্য পণ্য থেকে কিছুটা সহনীয় দামে পাওয়া যেতে শুরু করে। মসলাদার মদ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। চার্লস দ্য গ্রেটের (৭৪২-৮১৪ খ্রিস্টাব্দ) আমলে ইউরোপে বিভিন্ন ধরনের মসলা ও গুল্মের চাষ শুরু হয়। এসব চাষবাস মূলত চার্চের নিয়ন্ত্রণে হতো। ধর্মীয় ভোজ, নানা রকম আচার অনুষ্ঠানে এ সময় মসলার ব্যবহার ছিল। পেত্নি তাড়াতে দরজায় মসলা-গুল্মের বান্ডিল রাখা হতো।

১১৮০ খ্রিস্টাব্দে রাজা দ্বিতীয় হেনরি গোলমরিচের পাইকারি বণিকদের একটি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। এটাকে আধুনিক মুদি দোকানের প্রাথমিক সংস্করণ বলা যায়। এ সংঘ মসলা বাণিজ্যের ব্যবস্থাপনা করত। এরা মসলা পরিষ্কার করে বিক্রির জন্য উপযুক্ত করে তুলত।

এবার মধ্যযুগ ছেড়ে ক্যালেন্ডারে আরো পেছনে যাওয়া যাক। মানুষ কবে প্রথম মসলা ব্যবহার করেছিল আর মসলাটাই-বা কী ছিল? এর উত্তর নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে যতটুকু এখনো গবেষকরা জানতে পেরেছেন, তাতে দেখা যায়, সেই প্রথম মসলাটি গোলমরিচ। আর সেটা ব্যবহার করত প্রাচীন মিসরীয়রা। প্রাচীন মিসরের ফারাও দ্বিতীয় রামেসিসের মরদেহের সঙ্গে গোলমরিচ পাওয়া যায়। ১২২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ১২ জুলাই দ্বিতীয় রামেসিস মারা যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তার নাকের মধ্যে গোলমরিচের বীজ দিয়ে দেয়া হয়েছিল। এরপর প্রাচীনকালের আরো অনেক কবরেই মসলার সমাহার পাওয়া গেছে। ৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে বাইজেনটিয়ান কবি কোরিপ্পাস লিপিবদ্ধ করেছিলেন সম্রাট জাস্টিনিয়ানের মরদেহ কীভাবে সুগন্ধি ভেষজ, মধু দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এর সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছিল শতাধিক মসলা। উদ্দেশ্য মরদেহটি দীর্ঘদিনের জন্য সংরক্ষণ করা। শেক্সপিয়ার তার পেরিক্লিস, প্রিন্স অব টায়ার নাটকে থাইসা সমাহিতকরণ সম্পর্কে লিখেছেন:

Shrouded in cloth of state, balm’d and entreasur’d

With full bags of spices!

ফারাও দ্বিতীয় রামেসিসের নাকে থাকা গোলমরিচের উৎস যে ভারত, সে বিষয়ে গবেষকরা নিশ্চিত। প্রাচীন ভারতের সঙ্গে মিসরের বাণিজ্যযোগ ছিল, যার মাধ্যমে গোলমরিচের ঠিকানা হয়েছিল মিসরীয় সম্রাটের মমিতে। মসলা মানুষের শরীর পচানো ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে, তাই মরদেহ সংরক্ষণে মসলার ভূমিকা রয়েছে। এটা বুঝতে পেরেই প্রাচীন মিসরীয়রা মৃতদের মমি করতে মসলা ব্যবহার করত। রামেসিসের নাকে গোলমরিচ প্রবেশের অনেক আগে থেকেই মিসরে শব মমীকরণে মসলার ব্যবহার দেখা গিয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে মিসরে বেশকিছু মসলার ব্যবহারের সন্ধান পাওয়া যায়। হাওয়ার্ড কার্টার তুতেনখামেনের মমি পরীক্ষা করে দেখার সময় আবিষ্কার করেন যে মরদেহগুলো সংরক্ষণে ধনিয়া ও রেজিন ব্যবহার করা হয়েছিল। হেরোডটাস খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকে মিসরে মমীকরণে তিন ধরনের পদ্ধতি দেখেছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ছিল মসলা ব্যবহার করে তৈরি করা মমি। তবে ব্যবহূত মসলাগুলোর নাম হেরোডটাস উল্লেখ করেননি। হেরোডটাস শুধু একটি মসলার নামই উল্লেখ করেছিলেন তার লেখায়— দারচিনি। ১৫৫৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি মিসরীয় প্যাপিরাসে ধনিয়া, মৌরি, জিরা, রসুনের উল্লেখ পাওয়া যায়। আরো জানা যায়, গিজা পিরামিড যে শ্রমিকরা নির্মাণ করেছিলেন, তারা স্বাস্থ্য রক্ষায় পেঁয়াজ ও রসুন খেতেন। মিসর ছাড়াও আরো অনেক প্রাচীন সভ্যতাতেই মরদেহ সংরক্ষণ বা সমাধিস্থ করার সঙ্গে মসলার ব্যবহারের কথা জানা যায়। পেঁয়াজ, রসুনের ব্যবহার প্রাচীনকালে পারস্যেও ছিল। রাজা সাইরাসের আমলের (খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৯-৫২৯) দলিলে বিপুল পরিমাণ রসুন পাইকারি ক্রয়ের হিসাব পাওয়া যায়।&dquote;&dquote;

প্রাচীনকালে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মরদেহ সুগন্ধীকরণে মসলার ব্যবহার দেখা যায়। বিশেষত এক্ষেত্রে রোমানদের রীতি খুব স্পষ্টভাবেই লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। রোমানরা মসলার স্বাদযুক্ত মদ পান করত। গোসলের জন্য তারা মসলার সুগন্ধযুক্ত তেল ব্যবহার করত। ট্যাসিটাস (৫৬-১২০ খ্রিস্টাব্দ) জানিয়েছেন, মরদেহ সংরক্ষণ বা সুগন্ধীকরণে মসলার ব্যবহার একটি অ-রোমানীয়, ভিনদেশী সংস্কৃতি এবং ধীরে ধীরে রোমান সমাজে এর ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। রোমানদের সমাধিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হতো দারচিনি। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, রোমানদের খাবারে মসলার ব্যবহারের তেমন কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। একটা ব্যাপার নিশ্চিত, এ সমাহিতকরণে মসলার ব্যবহার কেবল ধনীদের কপালে জুটত। গরিবরা এ মসলা ব্যবহার করতে পারত না।

তবে মসলা দিয়ে সমাহিত করা সবচেয়ে বিখ্যাত মরদেহটি কোনো ধনীর নয়, বরং একজন গরিবের। তিনি ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যে বসবাসরত এক গরিব মানুষ। লুক ও জনের সুসমাচারে উল্লেখ আছে, যিশুর মরদেহ লিনেনে মোড়ানো হয়েছিল এবং তার শরীরে ইহুদিদের রীতি অনুসারে মসলা মেখে দেয়া হয়েছিল।&dquote;&dquote;

গ্রিকরা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পুব থেকে গোলমরিচ, দারচিনি আমদানি করত। তাদের রান্নায় রসুনের ব্যবহার ছিল। প্রাচীন গ্রিসের চিকিৎসাশাস্ত্রে মসলা ও গুল্মের যথেষ্ট ব্যবহার ছিল। চিকিৎসক হিপ্পোক্রেটাসের (৪৬০-৩৭৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) লেখায় দারচিনি, ধনিয়া, পুদিনা প্রভৃতির উল্লেখ পাওয়া যায়। উদ্ভিদবিজ্ঞানের জনক থিওফ্রাস্টাস (৩৭২-২৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) তার দুটি গ্রন্থে ৬০০ প্রজাতির মসলা ও গুল্মের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছিলেন।

ভারতে রান্না ও চিকিৎসার জন্য মসলা ব্যবহার হচ্ছে কয়েক হাজার বছর ধরে। ভারতে প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহূত মসলার মধ্যে আছে কালো গোলমরিচ, দারচিনি, হলুদ, এলাচ। হলুদ, এলাচ ব্যাবিলনের বাগানে চাষ হতো খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকে। ‘ফাদার অব সার্জারি’ বলে খ্যাত প্রাচীন ভারতের চিকিৎসক সুশ্রুত শল্য চিকিৎসার পরে মসলা ব্যবহার করতেন অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে। প্রথম শতকে চরক এবং দ্বিতীয় সুশ্রুতার চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয় লেখায় মসলার কথা পাওয়া যায়। দ্বিতীয় সুশ্রুত রোগ সারাতে আদা, গোলমরিচ, দারচিনি, হলুদ, এলাচ ব্যবহার করতেন। আয়ুর্বেদ অনুসারে মুখে লালার পরিমাণ ও হজমশক্তি বাড়াতে পান পাতা দিয়ে লবঙ্গ ও এলাচ পেঁচিয়ে খাওয়ার পর চিবানোর পরামর্শ দেয়া হয়।&dquote;&dquote;

পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে ইউরোপ বিশ্বজয় করতে যে অভিযানে বের হয়েছিল, তার অন্যতম কারণ ছিল মসলা। কলম্বাস, ভাস্কো-ডা-গামা, ম্যাগেলান— ইউরোপের এজ অব ডিসকভারির তিনি অগ্রদূত— এরা সবাই শুরুতে ছিলেন মসলার খোঁজে। এছাড়া নাবিক, বণিক, জলদস্যু ও সেনারাও মসলার খোঁজে ছিলেন। এজন্য রক্তপাতেও তাদের অনাগ্রহ ছিল না।

১৪৯৭ সালে ভাস্কো-ডা-গামাকে ভারত অভিযানের অনুমতি দেন কিং ম্যানুয়েল অব পর্তুগাল, এব অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মসলার সন্ধান। ১৪৯৮ সালের জুলাইয়ে ভাস্কো-ডা-গামা তিনটি পর্তুগিজ জাহাজ নিয়ে ভারতের কালিকট বন্দরে নোঙর করেন। বন্দরে নেমে গামার দূত কয়েকজন তিউনিস বণিককে দেখতে পান। এ মুসলিম বণিকরা দূতকে বলেছিলেন, ‘নরকে যাও! এখানে তোমরা এলে কেন?’ দূতের জবাব ছিল, ‘আমরা এসেছি খ্রিস্টান আর মসলার খোঁজে।’ এ কথোপকথন কিন্তু মোটেই শত্রুতামূলক ছিল না, বরং মুসলিম বণিকরা পর্তুগিজদের স্বাগত জানিয়েছিল এবং কালিকটের বাণিজ্য সম্ভাবনার কথা বলেছিল। ষোড়শ শতকে পর্তুগিজরাই পুরো ইউরোপে সবচেয়ে বেশি গোলমরিচ সরবরাহ করত। ১৫০১ সালে পর্তুগালের লিসবন বন্দর বিপুল পরিমাণ ভারতীয় দারচিনি, আদা, গোলমরিচ, জায়ফল, জয়ত্রী ও লবঙ্গে ভর্তি হয়ে যায়। রাজা ম্যানোয়েল/// ইউরোপজুড়ে বিশেষত জার্মানিতে মসলার বাজার স্থাপন করতে বিভিন্ন দিকে দূত পাঠালেন। বিপুল মুনাফা দেখতে পেয়ে পর্তুগালের রাজা মসলার বাণিজ্যে একচেটিয়া অধিকার স্থাপন করেন। ভারতীয় মসলা পর্তুগিজরা বিভিন্ন ইউরোপীয় সিন্ডিকেটের কাছে উচ্চদামে বিক্রি করত। মধ্যযুগে ইউরোপীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যারোমিটার হিসেবে দেখা হতো গোলমরিচের দামকে।

মধ্যযুগে ইসলাম ও খ্রিস্ট ধর্মের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং নিদারুণ শত্রুতা থাকলেও নানা ক্ষেত্রে এ দুই ধর্মের মানুষ পরস্পরের মধ্যে বিভিন্ন আদান-প্রদানে লিপ্ত ছিল। বিশেষত মুসলিমদের হাত ধরে আরব ও এশিয়ার বহু বিলাস পণ্য ইউরোপে জায়গা করে নেয়। আব্বাসীয় শাসনামলে মসলার বাণিজ্য সমৃদ্ধিতে আরবরা ভূমিকা রেখেছিল। উল্লেখ্য, সিন্দবাদ ছিলেন এ আব্বাসীয় আমলেরই একজন নাবিক। আব্বাসীয় আমলে আরব বণিকরা যাত্রা করতেন মূলত বসরা থেকে, আর ফিরে এসে মসলা বিক্রি করতেন বাগদাদ বন্দরে।

ইউরোপে মসলা যেত মূলত ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কিছু বন্দর থেকে, যার মধ্যে ছিল আলেকজান্দ্রিয়া, বৈরুত, আক্রা (বর্তমান ইসরায়েল) ও সাইপ্রাস। বণিকরা ভারত ও পূর্ব এশিয়া থেকে এ বন্দরগুলোয় মসলা আনতেন, যেগুলোর চূড়ান্ত গন্তব্য ছিল ইউরোপ। এ সময় পর্যন্ত ইউরোপীয়রা তাদের মসলার চাহিদা মেটানোর জন্য মুসলিম বণিকদের ওপরই নির্ভর করত। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা এ বাণিজ্য সরাসরি নিজেদের হাতে নিয়ে আসার উদ্যোগ গ্রহণ করে। মসলার ব্যবহার ছিল মূলত এশিয়ায়। ভারত, চীন ও পূর্বাঞ্চলীয় মুসলিম দেশগুলোই বেশি মসলা ব্যবহার করত। ইউরোপ এদের পাশাপাশি মসলা ভোগের নতুন অঞ্চল হিসেবে বিকশিত হচ্ছিল। সব মিলিয়ে মসলার বাণিজ্য তখন বিরাট এক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের হাতছানি। এ মসলা বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র ছিল ভারত এবং সঙ্গে যুক্ত ছিল চীন, ইন্দোনেশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য। অর্থনৈতিক ইতিহাসের গবেষক জ্যানেট আবু-লুঘোদের কথায়, তখন ভারত ছিল সবখানে যাওয়ার রাস্তা। ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের করোমানডেল উপকূলে ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলে জন্মানো জায়ফল, জয়ত্রী ও লবঙ্গ আমদানি হতো। জাভানিজ ও মালয়ী বণিকরা এ মসলা ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রথমে আনতেন মালয়েশিয়ার বন্দরে, সেখান থেকে ভারতীয় জাহাজে করে এ মসলা করোমানডেল বন্দরে হাজির হতো। করোমানডেল বন্দর থেকে ভারতীয় ও ইন্দোনেশিয়ার মসলা যেত আবার চীনে। আর এর বদলে ভারতে আসত সিল্ক ও পোর্সেলিন।&dquote;&dquote;

ভারতের পশ্চিম উপকূলে ছিল আরো দুটি বন্দর— মালাবার ও গুজরাট। প্রাচীনকালে রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য যোগাযোগ ছিল। মালাবারে উৎপাদিত গোলমরিচ গুজরাট বন্দর থেকে রোমে রফতানি হতো। মধ্যযুগে গুজরাট থেকে পারস্য ও ইরাকে মসলা রফতানি হতো। গুজরাট থেকে যাওয়া মসলাই বাগদাদ থেকে যেত ইউরোপে। পুব ও পশ্চিমের এ মসলা উৎপাদন ও ভোগের সম্পর্কে সংযোগ সেতু ছিলেন আরব বণিকরা। ১৫০০ সালে পর্তুগিজ ক্যাপ্টেন আলভারেজ কাব্রাল কালিকট বন্দরে মুসলমানদের দুটি জাহাজ জব্দ করেন। তখন কালিকট বন্দরে ১৫ হাজার মুসলিম বণিক অবস্থান করছিলেন। আরব বণিকদের ভারতীয় মসলা আমদানির উল্লেখ ইবনে খুরদাধাবেহ (৮৫০), আল-ঘাফিকি (১১৫০), ইশাক বিন ইমরানা (৯০৭) ও আল কালকাশান্দির (১৪০০) লেখায় পাওয়া যায়। এখানে সময়কালগুলো খেয়াল করলে দেখা যাবে সপ্তম শতক থেকে চতুর্দশ শতক ভারতের সঙ্গে মসলা বাণিজ্যে আরব মুসলিমদেরই আধিপত্য ছিল; যা পরবর্তীকালে ইউরোপীয়দের হাতে চলে যায়।

মার্কো পোলো ও জন ম্যান্ডেভিলের ভ্রমণবৃত্তান্ত অনুসারে তৈরি দুটি ফরাসি মার্বেল চিত্র থেকে ভারতের মসলা বাণিজ্যকে ইউরোপীয়রা কীভাবে দেখত, সে বিষয়ে একটা ধারণা পাওয়া যায়। দুটি চিত্রই কেরালার কোল্লাম বন্দরের। মার্কো পোলোর বিবরণের জন্য তৈরি চিত্রে দেখা যায়, একজন কালো মানুষ এক মুসলিম ব্যবসায়ীর কাছে গোলমরিচ নিয়ে এসেছে এবং সেই বণিক তা শুঁকে, স্বাদ পরীক্ষা করে দেখছেন। আর ম্যান্ডেভিলের বিবরণীর চিত্রে পাওয়া যায়, কোল্লামে গোলমরিচ ক্ষেত থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং তারপর এক ইউরোপীয় শাসকের কাছে সেগুলো নিয়ে আসছেন এক মুসলিম বণিক। ভাস্কো-ডা-গামার আগে যে দু-একজন ইউরোপীয়র ভারতের মাটিতে পা রাখার বিবরণী পাওয়া যায়, তারা কেউই মসলা বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। গামার ভারতে পৌঁছার আগ পর্যন্ত স্থানীয় উৎপাদকরা স্পষ্টভাবে জানতেন না তাদের গোলমরিচ শেষমেশ কাদের রান্নাঘরে ঢুকছে। আবার যে ইউরোপীয়রা এ মসলা ব্যবহার করত, তাদেরও কোনো ধারণা ছিল না ভারতীয় চাষীদের অবস্থা সম্পর্কে, তারা মনে করত এ মসলা আসত পুবের কোনো জাদুর ভূমি থেকে, যেখানে দানবদের বাস কিংবা কল্পনার রঙে রাঙানো ইন্ডিয়া থেকে। ইউরোপীয়রা পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্তও ধারণা করত যে মসলার একমাত্র উৎস হচ্ছে ভারত। কিন্তু ততদিনে আরব বণিকরা হদিস করে ফেলেছিলেন যে ভারত ছাড়াও জাভা, সুমাত্রা ও শ্রীলংকায় মসলা পাওয়া যায়। মার্কো পোলোর বিবরণে জাভা দ্বীপে মসলা উৎপাদনের প্রাচুর্যের কথা জানা যায়। তার কাছে মনে হয়েছিল, এটাই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় দ্বীপ এবং এর পরিধি তিন হাজার মাইলের বেশি। মার্কো পোলো জানিয়েছেন, সে সময় জাভায় বিপুল পরিমাণ গোলমরিচ, জায়ফল, দারচিনি, লবঙ্গ প্রভৃতি উৎপাদন হতো। এসব কিনতে দুনিয়ার অনেক দেশের জাহাজ ও বণিকরা জাভায় ভিড় করতেন।

ষোড়শ শতকের শেষলগ্নে ইংরেজ এবং ওলন্দাজরা প্রথমবারের মতো এশিয়ার জলসীমায় প্রবেশ করে। উভয়েরই লক্ষ্য, আরাধ্য ছিল মসলা। মসলা সরাসরি এশিয়া থেকে আমাস্টারডামের হেরেনগ্রখট নাকি লন্ডনের পেপার লেনে যাবে, এ নিয়ে ব্রিটিশ ও ডাচদের মধ্যে যুদ্ধ হয়। আবার এ দুই শক্তি ক্যাথলিক শক্তি, এশীয় প্রতিদ্বন্দ্বী, চোরাকারবারি সবার সঙ্গে আটলান্টিক ও এশিয়ার জলে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এমন নিষ্ঠুরতা এশিয়ার জল এর আগে কখনো দেখেনি। 

সপ্তদশ শতকে মসলা বাণিজ্যে ওলন্দাজরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এ শক্তি অর্জিত হয়েছিল যখন নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন রাজ্য একত্রিত হয়ে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন করে। মূলত ভারতের সঙ্গে মসলার বাণিজ্য করার জন্যই এ কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৬০২ থেকে ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দ সময়কালে এ ডাচ ও পর্তুগিজদের মধ্য যুদ্ধ হয়েছিল। মূলত মসলা ও অন্যান্য বাণিজ্যের দখলই ছিল এ যুদ্ধের কারণ। যুদ্ধের পর ডাচরা তাদের মসলা বাণিজ্যের কেন্দ্র স্থাপন করে ইন্দোনেশিয়ার বাতাভিয়া বা আজকের জাকার্তায়। ডাচ সাম্রাজ্যে মসলা চুরির শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড।

মসলা কেন ইউরোপে মূল্যবান হয়ে উঠেছিল, তার নানা কারণ আমরা পুরো লেখায় দেখেছি। খাবারের স্বাদ বৃদ্ধি, ঔষধি গুণ, সামাজিক মর্যাদার প্রতীক প্রভৃতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মসলা। এরপর ছিল এক রকম অধ্যাত্মবাদী ধারণা— মসলা আসে পুবের কোনো রহস্যঘেরা স্বর্গ থেকে। এসব মিলিয়ে মসলার যে চাহিদা ইউরোপে ছিল, তা মেটানোর জন্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যই যথেষ্ট ছিল। তার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারত বা পুবের কোনো রহস্যঘেরা অজানা ভূখণ্ডের উদ্দেশে সাগর পাড়ি দেয়ার দরকার ছিল না। জীবনের ঝুঁকি নেয়ার কারণ ছিল বোধহয় এ লাভজনক ব্যবসা থেকে পুরো লাভটা নিজেদের পকেটে পোরা।

সূত্র:

স্পাইস: দ্য হিস্টরি অব আ টেম্পটেশন, জ্যাক টার্নার

আউট অব দি ইস্ট: স্পাইস অ্যান্ড দ্য মেডিয়েভাল ইমাজিনেশন, পল ফ্রিডম্যান

দ্য টেস্ট অব কনকোয়েস্ট, মাইকেল ক্রনড্লে