ইন্ডিগোয় উঠেই যে মন এত দ্রুত ভালো হয়ে যাবে, কে জানত! একটু আগেই আগরতলা বিমানবন্দরের লাউঞ্জে আমার ভরপুর ভ্রমণিয়া আনন্দের ক্ষণটা ফুটো বেলুনের মতো ফুট্টুস হয়ে গিয়েছিল। কেন? কারণটা বোধহয় একটু খুলে বলা দরকার। সেই যে গতকাল দুপুরবেলা ঢাকা থেকে আগরতলা এসে পৌঁছেছি, তার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাড়ির কারোর সঙ্গে এক চিমটি কথা বলতে পারলাম না। আগরতলায় ভারতীয় মোবাইল সিম কেনার সুযোগ নেই। ভারতীয় ন্যাশনাল আইডি কার্ড দেখাতে হয়। সে কারণে মনের ভেতর একটু অস্থিরতা ছিল, বাড়ির সবাই কেমন আছে, কীভাবে আছে— দেশের বাইরে এলে এসব চিন্তা বড় বেশি মাথায় কিলবিলিয়ে ওঠে। এ ইন্টারনেটের যুগে কার পক্ষে সম্ভব এক সেকেন্ডের জন্যও নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা? সিমটা পেলে ফেসবুক না হোক, অন্তত নেটওয়ার্কের মধ্যে থাকা যেত!

হঠাৎ লাউঞ্জের ডিভানে বসা আমাদের দলপ্রধান কবি এ কে শেরাম বলে উঠলেন, বাড়ির সঙ্গে কেউ কথা বলতে চাইলে এখনই বলে নিন। এখান থেকে বাংলাদেশের সিমে কথা বলা যায়। শেরামদার হূদয় সিলেটে যদি আধটুকু পড়ে থাকে, তো বাকি আধটুকু হূদয় ঘুমায় মণিপুর। ৬৬ বছরের জীবনে এ নিয়ে তিনি দশমবারের মতো যাচ্ছেন সেখানে। সব তথ্য জানা। তাড়াতাড়ি ঝটপট সবাই যে যার প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলা শুরু করল মোবাইল ফোন কানে তুলে। সিলেটের কবি পুলিন রায় তো বউ-বাচ্চার সঙ্গে বললই, বন্ধুবান্ধবও কাউকে বাদ রাখল না। ও জীবনে প্রথমবারের মতো ইন্ডিয়া এল। উত্তেজনা আমাদের অন্য সবার থেকে একটু বেশিই। ঢাকার নিভৃতচারী কবি নিতাই সেন শুধু বাড়ির মানুষটির সঙ্গে কথা সারল। শেরামদা ব্যতিক্রম। বাড়ির বাইরে এলে আমি বাড়ির কথা ভুলে যাই। জানিয়ে দিলেন তিনি। আহা! সে রকমই যদি হতে পারতাম! তাহলে আর আমার বাড়ির মানুষটির রেসপন্স না পেয়ে এভাবে কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে হতো না। নিশ্চয়ই আমার তিনি এখন পথে রয়েছেন। আর পথের মধ্যে থাকলেই হলো, কল রিসিভ করার কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। কারণ মোবাইল সেটটা তিনি হ্যান্ডব্যাগে তো রাখেনই, তারও ভেতরে যদি কোনো ব্যাগ বা তস্য ব্যাগ কিংবা প্রাচীন গুহা থাকে, পারলে সেখানেই রেখে দেন। স্বভাবতই মোবাইলের রিংটোনের শব্দ ওনার কর্ণকুহরে সহজে প্রবেশ করে না। আর যদি কোনোমতে শব্দটা কানে পৌঁছেও, মোবাইল সেটটা আনার জন্য ওনাকে রূপকথার সেই রাজকুমারের মতো গভীর পাতালরাজ্যে ডুবে যেতে হয়, তারপর গভীর কোনো তল থেকে বের করে নিয়ে আসতে হয় রাক্ষসের সেই প্রাণভোমরাকে!

আমাদের অবশ্য আরো আধঘণ্টাখানেক সময় বসে থাকতে হয়েছে। না, ওনার কল আসেনি! আমার মেজাজও ক্রমাগত তিরিক্ষি থেকে তিরিক্ষিতর হয়েছে আর নিজের মেজাজকে বোঝাতে চেষ্টা করেছি যে, ওর কী দোষ, মোবাইল সেটটা রক্ষার জন্যই তো এই কাণ্ড! এক-দুবার হারিয়েছে মোবাইল সেট? দুবার যদি ছিনতাই হয়েছে, তো আরেকবার হয়তো মনের বেখেয়ালিতে ফেলে এসেছে সিএনজি স্কুটারে! তাই বাইরে কোথাও গেলেই উনি মোবাইল সেটটা আগে রেখে নেন তস্য থেকে তস্য ব্যাগে, ব্যাগের ভেতরের প্রাচীন গুহায়। যাতে ছিনতাইকারী বা চোর খুঁজে না পায়। কিন্তু আমি দেশের বাইরে আসার পরও যে উনি সেট আগলে রাখার সেই ধনুর্ভঙ্গ পণ নিয়েই থাকবেন, আমার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য একটুও অপেক্ষায় থাকবেন না, সে সত্যটা মেনে নিতেই যা কষ্ট হচ্ছিল আমার। কিন্তু ইন্ডিগোর কোমল সুবাতাস গায়ে লাগতেই মনে হলো, কাছেই সমুদ্র!

আমি তাদের বিমানবালা বলতে কোনোভাবেই রাজি নই। শব্দটার মধ্যে কেমন যেন একটা অসম্মানের ছাঁচ আছে। আমার বরং ওদের আকাশবালিকা বলতেই ভালো লাগে। সেই সুন্দরী সুহাসিনী আকাশবালিকাদের একজন আমাকে দেখেই এমন এক স্মিত হাসি হেসে বিমানে স্বাগত জানাল যে, আমার মনে হলো, এ হাসি শুধু আমারই জন্য, শুধু আমারই জন্য স্পেশাল। সিটে স্থান নেয়ার পর দেখলাম আরো বেশ কয়েকজন। বিমানজুড়ে ওরা পাঁচ-ছয়জন হবে, পাখা ঝাপটে ওড়াউড়ি করতে লাগল। আমি নিবিষ্টমনে ওদের পাখার রঙিন মখমল দেখতে লাগলাম। এছাড়া আর উপায়ই বা কী। হিসাব অনুযায়ী আমার জানালার পাশে বসার কথা ছিল। ওটাই আমার সিট নম্বর। কিন্তু আমাদের দলনেতা এ কে শেরাম আমার চেয়েও বড় কবি। তিনি আকাশের চূড়ায় উঠে মেঘের ঠিকানা পেলে ছাড়বেন কেন? প্রথমেই ঢুকে পড়লেন ওখানে। মাঝখানে কবি নিতাই সেন, তারপর সাইডে আমি। অসুবিধা নেই। জানালার পাশে বসে না হয় মেঘের সান্নিধ্য না-ই পেলাম, এখানে বসার ফলে তো একটু না একটু হলেও আকাশবালিকার ছোঁয়া মিলবে!

সন্দেহ নেই, আকাশবালিকারা সবাই সুন্দরী। উঁচু লম্বা অটুট স্বাস্থ্য। কিন্তু পোশাকে যেন কোথায় গলদ আছে। না রঙে নয়, গাঢ় নীল রঙটা ওদের প্লেনের রঙের সঙ্গে মিলেমিশে আকাশের সীমানাকেও ছুঁয়ে গেছে, কিন্তু সাইজটাই যেন কেমন বেঢপ, নিতম্বের দিকটায় বিদঘুটে রকমের টাইট। মোটেও মানানসই নয়। হাঁটু পর্যন্ত স্কার্ট। তারপর পায়ে অতি পাতলা কাপড়ের কালো পায়জামা। ওটা না থাকলেই বোধ করি সুন্দর লাগত, এখনই বরং অশ্লীল লাগছে।

যথারীতি সিট বেল্ট বাঁধলাম। বিমান গর্জন করে উঠল। ধীরে ধীরে চলতেও শুরু করল। আমার একটু নার্ভাস লাগছিল। সেটা তাড়ানোর জন্য চঞ্চলমতি টাইপের আকাশবালিকার চোখজোড়াকে বেছে নিলাম। যে আমাকে চমৎকার একটা হাসি উপহার দিয়েছিল। মরলে তো ও-ও মরবে আমার সঙ্গে! এত টেনশনের কী আছে। বিমান যখন একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠে সোজা চলতে লাগল, তখনই হঠাৎ আমার ভিরমি খাওয়ার জো। প্লেনে উঠে কী কী করতে হবে, বিপদে পড়লে কীভাবে বাঁচার চেষ্টা করতে হয়— এসব যখন মাইক্রোফোনে ভেসে আসছে, তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সেই চঞ্চলমতি আকাশবালিকা চোখে-মুখে ভ্রুভঙ্গি করে বাঁচনোর সেসব উপাদান হাতে-কলমে দেখাতে দেখাতে নিজেও নেচে চলেছে। হ্যাঁ হ্যাঁ, নাচছেই তো। আমি চোখ কচলে নিশ্চিত হই। মাথাটা বড় বেশি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একবার সামনে ফিরে তো আবার পেছনে ঘুরে সে বেশ হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে নাচছে। যখন সামনের দিকে ফিরছে, তখনই দূরের আরেক প্রান্তের আকাশবালিকার সঙ্গে তার চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছে আর দুজনই থেকে থেকে দুষ্টুমির ভঙ্গিতে হেসে উঠছে।

এটা আমার দ্বিতীয় উড়ান। এর আগে আমি কেবল একবারই বিমান ভ্রমণ করেছিলাম। থাই এয়ারওয়েজে। ঢাকা টু ব্যাংকক, ব্যাংকক টু ঢাকা। বিমানে ওঠামাত্রই এক চমৎকার চেহারার থাই আকাশবালিকা আমার উদ্দেশে স্মিত স্বাগত হাসি জানিয়ে আমার হাতে একটা ছোট্ট টিউলিপ ফুল তুলে দিয়েছিল। সেই অ্যারোপ্লেনটা ছিল এই অ্যারোপ্লেনটার চেয়েও আকারে তিন গুণ। ডানে-বামে বসার চেয়ারের পাশাপাশি মাঝখানেও ছিল বসার সিট। আমাদের সিট মাঝখানের রোতে পড়ায় খুব হতাশ ছিলাম। আমার খুবই শখ ছিল জানালার পাশে বসার। কিন্তু থাই আকাশবালিকাদের মনোরম তত্পরতায় সেদিন বেশিক্ষণ মনে ক্ষোভ নিয়ে গুরুগম্ভীর চালে থাকতে হয়নি। ওরা এটা-ওটা দিয়ে ওদের সুন্দর লালিত্যময় সেবা উপহার দিয়েছে। এমনকি যখন ওরা বিয়ার, হুইস্কি, ভদকা, শ্যাম্পেনের ট্রে নিয়েও সার্ভ করতে গেল, ওদের সাকির মতো লাগেনি, মনে হয়েছে এ কোমল সৌন্দর্যের আড়ালে কোথাও ব্যক্তিত্বের স্ফুলিঙ্গ লুকিয়ে রয়েছে, হাত বাড়াতে গেলে হাত ঝলসে যেতে পারে!

আগরতলার সঙ্গে মণিপুরের সম্পর্ক যতই মধুর, গভীর আর নিবিষ্ট, যোগাযোগ ব্যবস্থা ততই কঠিন আর দুর্গম! তা সত্ত্বেও যে কীভাবে কীভাবে আগরতলার রাজা-মহারাজারা সবাই মণিপুরি কন্যাদের বিয়ে করত, সেটা একটা ঘটনাই বটে। আকাশের অবস্থা ভালো থাকায় আমরা নির্বিঘ্নেই, ভালোয় ভালোয় ইম্ফল এয়ারপোর্টে পৌঁছলাম। সময় লাগল পৌনে ১ ঘণ্টা।

ইন্ডিগো থেকে বেরোতেই দূরে চোখে পড়ল পাহাড়। রানওয়ে ছাড়িয়েও অনেক দূর থেকে দূরে শুধু প্রান্তর আর খোলা ভূমি, তার পরই পাহাড়ের নীল সারি। রাজধানী ইম্ফলের পুরোটাই নাকি উপত্যকা-ভূমি আর চারদিকে খাড়া পর্বতশ্রেণী। মণিপুর পুরো পার্বত্য রাজ্য নয়। তবে পার্বত্যাঞ্চলীয়। মোট ভূখণ্ডের পরিমাণ ২২ হাজার ৩২৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে ৯২ শতাংশই পার্বত্য ভূমি, মাত্র ৮ শতাংশ উপত্যকা। চারদিকের এ বিশাল বিশাল পর্বতশ্রেণীর মাঝখানে ১ হাজার ৮৩৪ বর্গকিলোমিটারের এ নয়নাভিরাম ইম্ফল, যা মণিপুরের রাজধানী হিসেবে সুখ্যাত।

রানওয়ে থেকে একটি সুদৃশ্য কার আমাদের বিমানবন্দরের লাউঞ্জের দিকে এগিয়ে দেয়। আমরা ইমিগ্রেশনের মুখোমুখি দাঁড়াই। মণিপুরি সম্প্রদায়ের লোকজন মণিপুরি ভাষা ছাড়া কথা বলতে চায় না। আমাদের সুবিধা হলো, আমাদের সঙ্গে কবি এ কে শেরামদা রয়েছেন। যিনি শুধু চেহারাসুরতেই একজন খাঁটি মণিপুরি নন, মণিপুরি ভাষার একজন প্রধান কবিও। তার বদৌলতে আমাদের আর মুখই খুলতে হলো না। ইমিগ্রেশনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দেখি, এখানে আসার আগে মণিপুর সম্পর্কে যা যা শুনে এসেছিলাম, তার অনেক নমুনা। অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র হাতে সেনারা অতি সতর্ক দৃষ্টিতে লাউঞ্জের ভেতর টহল দিয়ে চলেছে। বেশ বাঘা সাইজের কুকুর নিয়েও দিচ্ছে প্রহরা। পুরো মণিপুরই নাকি রাজনৈতিকভাবে অশান্ত ও ঝঞ্ঝামুখর থাকে। বিভিন্ন জাতি আর গোষ্ঠীর একত্র অবস্থানের কারণে নাকি দাবিদাওয়ারও শেষ নেই। একদিকে নাগারা যদি চাইছে স্বাধীন রাজ্য, তো আরেকদিকে অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠী জানাচ্ছে অন্য কোনো দাবি। এসব নিয়ে সবসময়ই লেগে থাকে হানাহানি, মারামারি। আর একটা কিছু ঘটলেই কোনো না কোনো পক্ষ থেকে দেয়া হয় আন্দোলনের ডাক। দিনের পর দিন বন্ধ থাকে। সন্ত্রাস অধ্যুষিত মণিপুরে নাকি সন্ধ্যার পর কেউ ঘর থেকে বেরই হয় না।

ইমিগ্রেশনের পালা শেষ করে লাউঞ্জের বাইরে বেরিয়ে আসতেই অবাক চোখে লক্ষ করলাম, বেশ কয়েকজন মুসল্লি ঘোরাফেরা করছেন। কেউ কেউ বসে আছেন, কেউ দাঁড়িয়ে। মুসল্লি মানে একেবারে বাংলাদেশের ট্রিপিক্যাল মৌলভিদের মতোই অনেকটা। মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি— বেশির ভাগেরই শুধু থুতনিতে, আর পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। আমার ধারণা ছিল, মণিপুরটা বুঝি পুরোপুরি মণিপুরি সম্প্রদায়ের মানুষজনের। এখানে এসে একসঙ্গে এত মুসলমান দেখব ভাবিনি। তবু এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র কৌতূহল প্রকাশ করি না। কেননা সফরকারী আমাদের চারজনের মধ্যে কেবল আমিই মুসলমান। এ বিষয়ে কথা বললে হয়তো আদিখ্যেতা মনে করতে পারে।&dquote;&dquote;

বিমানবন্দরের প্যাসেজের বাইরে আসতেই একটা হাসিমুখ অপরিচয়ের সব বাতারাবরণ ঝেঁটিয়ে বিদায় করে আমাকে গাঢ় আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিজের পরিচয় জানালেন, শরত্চন্দ থিয়াম। ইনিই তাহলে ইন্দো-বাংলা পোয়েটস মিটের উদ্যোক্তা? যাদের নিমন্ত্রণে আমরা চারজন বাংলাদেশ থেকে এই ইম্ফলে এলাম। তার নাম আগেই শুনেছিলাম। মণিপুরি ভাষার খ্যাতনামা কবি। ২০০৬ সালে ‘নুংশিবী গ্রীস’ গ্রন্থের জন্য সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। শরত্চন্দ থিয়ামের সঙ্গে রয়েছেন চটপটে আরো দুজন কবি, অ্যালেক্স বাবু আর থাঙ্গা টংব্রাম অমরজিৎ। অ্যালেক্স বাবু বেশ ফ্যাশনেবল। লম্বা পাতলা। হংকংয়ের যুবক যেন। শার্টের ওপর লালচে রঙের গেঞ্জির সঙ্গে লাল জুতার ম্যাচিংটা দারুণ হয়েছে। এসেই ব্যস্ত হয়ে উঠল আমাদের ফটো তোলায়। অমরজিৎ ঠিক ওর উল্টো। মোটা গাট্টাগোট্টা। মঙ্গোলীয় টাইপ চেহারা। প্যান্ট-শার্ট ইন করা। জানা গেল, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও কবি।

ওরা তিনজনই ফুল দিয়ে আমাদের খুব যত্নের সঙ্গে বরণ করে নিল। তারপর একটা জিপের আগে-পিছে আমাদের বসিয়ে দেয়া হলো। আমি বসলাম কবি এ কে শেরাম ও কবি নিতাই সেনের মাঝখানে। আমাদের সামনে ড্রাইভারের পাশে কবি শরত্চন্দ থিয়াম। জিপটা বিমানবন্দরের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরের রাস্তার মুখে আসতেই আবারো চোখে পড়ল আরো সব মুসল্লির দল। মাথায় টুপি, গায়ে পাঞ্জাবি। দল বেঁধে জিপে উঠছে। কৌতূহল আর কিছুতেই দমাতে না পেরে আমি এ কে শেরামকে জিজ্ঞেসই করে বসলাম, ওরা কি মুসলমান?

আমার প্রশ্ন শুনে এ কে শেরাম সামনে বসা কবি শরত্চন্দ থিয়ামের সঙ্গে মণিপুরি ভাষায় কিছু বলাবলি করলেন। একটু পরই এ কে শেরাম আমাকে জানালেন, ‘হ্যাঁ। মণিপুরে প্রচুর মুসলমান আছে। ওরা এসেছিল হজযাত্রীদের সি-অফ করতে। আজ নাকি ৪০০ হজযাত্রী ইম্ফল থেকে হজে গিয়েছে।’

এটা আমার কাছে অভাবনীয় মনে হলো। আমি ভেবেছিলাম, মণিপুরে বুঝি মুসলমানদের অস্তিত্ব নেই। এখানে মণিপুরিরাই বেশি বাস করে। যারা বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত। আর হয়তো থাকতে পারে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ। তারপর কিছু খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ। আমার মন যেন বুঝতে পারলেন এ কে শেরাম। তিনি নিজের মনেই বলতে লাগলেন, রাজধানী ইম্ফলে বাস করে মূল মণিপুরি জনগোষ্ঠী মৈতৈ। আর পার্বত্যাঞ্চলে বাস করে কমপক্ষে ২৯টি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, যাদের মণিপুরিরা সমষ্টিগতভাবে বলে চিংমি অর্থাৎ পাহাড়ের মানুষ। তারপর তার ভাষ্য থেকেই জানা গেল, মণিপুরিদের মধ্যে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী আছে, যারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তারা সাধারণভাবে ‘মৈতৈ পাঙন’ বা মণিপুরি মুসলিম নামে পরিচিত। মূল মণিপুরিদের সঙ্গে তাদের ধর্মের ভিন্নতাই শুধু নয়, নৃতাত্ত্বিক উেসর বিচারেও কিছুটা ভিন্নতা আছে। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নৃতাত্ত্বিক উৎস থেকে জাত অমণিপুরি পিতা ও মণিপুরি মাতার মিলিত বংশধররাই এ মৈতৈ পাঙন বা মণিপুরি মুসলিম জনগোষ্ঠী।

এরপর এ কে শেরামদা আরো যে চমৎকার কাহিনীটা শোনালেন সেটা হলো, সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে মণিপুরের মহারাজ খাগেম্বার সঙ্গে তার অনুজ শানোংবার দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠলে শানোংবা সদলবলে কাছাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং কাছাড়রাজের সহায়তায় মণিপুর আক্রমণ করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। পরে কাছাড়রাজের পরামর্শে পার্শ্ববর্তী তরফ রাজ্যের মুসলিম শাসকের সহায়তা কামনা করেন এবং কাছাড় ও তরফের যৌথ সৈন্যবল নিয়ে পুনরায় মণিপুর আক্রমণ করে। কিন্তু আবারো পরাজিত হয়। পরে মণিপুরি রাজা বন্দি হওয়া মুসলিম সৈন্যদের এক সমঝোতার মাধ্যমে মুক্তি দিয়ে মণিপুরে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করার ব্যবস্থা করেন এবং তাদের সঙ্গে বিয়ে দেন মণিপুরি রমণীদের। তাদের বংশধররাই আজকের মৈতৈ পাঙন বা মণিপুরি মুসলিম জনগোষ্ঠী। তারা একদিকে পিতার ধর্ম ইসলামকে সমুন্নত রেখেছে, অন্যদিকে মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে জন্মদাত্রী জননী ও দেশমাতৃকার ভাষা মণিপুরিকে। মণিপুর ও মণিপুরি জাতি এবং ইসলাম ধর্মের প্রভাবে তারা ধারণ করে আছে এক মিশ্র সংস্কৃতির ধারা। ধর্মের বা সংস্কৃতির কারণে মণিপুরের এ মৈতৈ পাঙন বা মণিপুরি মুসলিমদের উপস্থিতি কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না।

মণিপুরে এখন বৈষ্ণব ধর্মই প্রধান ধর্মবিশ্বাস হলেও এখানে ইসলাম ধর্মাবলম্বী যেমন আছে, তেমনি আছে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী, মণিপুরের প্রাচীন ধর্মমত আপোকপার অনুসারীসহ বিভিন্ন ধর্মমত ও পথের অনুসারী। এতে কোনো সমস্যা হয় না। সবক্ষেত্রেই এক ধরনের সহিষ্ণুতাবোধ কাজ করে এখানে। মণিপুরি মুসলিমরা তো মণিপুরের সামগ্রিক সমাজ-পরিমণ্ডলের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যে দলই ক্ষমতাসীন হোক, রাষ্ট্রক্ষমতায় তাদের অংশীদারিত্বও উল্লেখ করার মতো। একবার তো মণিপুরি মুসলিম সম্প্রদায়ের একজন মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছিলেন। আর ভাষাগত ঐক্যসূত্রের কারণে তাদের সঙ্গে মূল মণিপুরিদের সম্প্রীতির বন্ধন খুবই দৃঢ়।

শেরামদার কথা শুনতে শুনতে কখন যে আমরা এয়ারপোর্ট থেকে ওয়াহেংবাম লেইকি রোডের হোটেল ভেইগোয় পৌঁছে গেলাম, টেরই পেলাম না। প্রাইভেট কার থেকে নামতেই শেরামদা রাস্তার উল্টো পাশের দিকে তাকিয়ে জানালেন, ওপাশে একটা নদী আছে। আমি সোৎসাহে তাকিয়ে কোথাও নদী দেখতে পেলাম না। কয়েকটা দোকান, একতলা বিল্ডিং, দেয়াল।&dquote;&dquote;

কলকাতা, দিল্লি বা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানেও হোটেলের রিসেপশনে আমাদের সবার পাসপোর্ট জমা দিতে হলো। এন্ট্রি করে রাখবেন। একা হলে দেখছি বেশ মুশকিলেই পড়তে হতো। এরা তো কেউ মণিপুরি ভাষা ছাড়া কথাই বলে না।

সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে আমরা দোতলায় গিয়ে থামি। লম্বা বিশাল প্যাসেজের দুই পাশজুড়ে রুম। শেরামদা আমাকে আর পুলিন রায়কে ডান পাশের দিকের রুমটি দিয়ে নিতাই সেন আর নিজের জন্য পথের পাশের বাম দিকের রুমটি নিয়ে নিলেন। হোটেলটির মান মোটামুটি ভালোই। রুমে ঢুকে মন ভালো হয়ে যায়। কমলা রঙের ঝকঝকে দেয়াল। রুমে টিভি, এসি, ফ্যান ছাড়াও একটা চেয়ার আর কাপড় রাখার ছোট্ট আলমারি রয়েছে।

পুলিন রায় ওর সুবিধামতো দরজার পাশের বেডটি দখলে নিয়েই ফেসবুক নিয়ে বসল। নিচে হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের সবাইকে নিয়ে ছবি তুলেছে। নগদ নগদ ফেসবুকে স্ট্যাটাস ছাড়বে। আমার যদি এখানকার সিম থাকত, আমিও কি তাই করতাম? বোধ হয় না। আমি আসলে সেই ঢাকা থেকেই আগরতলায় এসে সিম না নেয়া কিংবা ফেসবুকে ব্যস্ত না থাকার পক্ষেই ছিলাম। কয়েকটা দিন ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চাই। তবে বাড়ির জন্য যে মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়, তাও তো সত্যি!

আধঘণ্টা পর শেরামদার রুম থেকে ডাক এল। ওখানে খাবার এসেছে। আমরা সবাই একসঙ্গে খাব। শেরামদার রুমে ঢুকেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বিশাল জানালা দিয়ে রাস্তার ওপাশটা তো দেখা যাচ্ছেই, একতলা দোকান, বিল্ডিং ছাপিয়ে নদীটাও চোখে পড়ছে। শহরের ভেতর দিয়ে একটা নদী বইছে, সত্যিই ব্যাপারটা অন্য রকম। তবে দুই পাড় খুব চওড়া নয়। তাতে কী। নদী তো নদীই। পাহাড়ি ঝরনার জল নিয়ে কোন অতল সায়র পর্যন্ত ভেসে গিয়েছে কে জানে! শেরামদা দেখছি প্রকৃত অর্থেই একজন কবি। উড়োজাহাজে তিনি জানালা ছাড়েননি, হোটেলে ছাড়লেন না নদী।

সত্যি মনে মনে আফসোস হতে লাগল, রুমে বসে সর্বক্ষণ একটা নদীর চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকাটা একজন সুন্দরী মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার চেয়ে কম রমণীয় নয়। শেরামদা জানালেন, নদীটির নাম নাম্বল।

খাবার দেখে স্বস্তিই পেলাম। ইন্ডিগো থেকে নামার পরই শুনছিলাম, ইম্ফলে যেমন মণিপুরি ভাষা ছাড়া কেউ কথা বলে না, মণিপুরি খাবার ছাড়া অন্য খাবারও রোচে না তেমন। কিন্তু এ তো দেখছি আমাদের চিরাচরিত বাঙালি খাবার— সেই ভাত, ভাজি, রুই মাছ আর ডাল। খাওয়ার পর ভেবেছিলাম, পেট ভাসিয়ে বেশ তৃপ্তি করে একটা ঘুম দেব। তা আর হলো না। সদা হাস্যমুখ শরত্চন্দ থিয়াম এসেই তাড়া দিয়ে উঠলেন, চলেন চলেন কাংলায় যাব। আর দেড় ঘণ্টা পর বন্ধ হয়ে যাবে। সবাই ঝটপট তৈরি হয়ে ছুটলাম কাংলার উদ্দেশে।

গেটের সামনে দাঁড়াতেই একটা পৌরাণিক মেজাজ পাওয়া গেল। সুউচ্চ কাংলা গেটটি মণিপুরি সংস্কৃতির আবহে নির্মিত। অ্যালেক্স বাবু দৌড়ে আমাদের সবার জন্য টিকিট কেটে নিয়ে আসে। গেট দিয়ে ঢুকতেই টের পাই বিশেষ যত্নেই নির্মিত হয়েছে কাংলা। প্রাচীন এ ফোর্টটি যতটুকু না ঐতিহাসিক, তার চেয়ে বেশি মনে হলো নৈসর্গিক। নৈসর্গিক বলে যে গাছপালার আধিক্য তা বলা যাবে না, রাস্তার দুই পাশজুড়ে খোলা মাঠ পড়ো জমিই বেশি চোখে পড়ল, যা চোখে একটা মুক্তির স্বাদ এনে দেয়। ভেতরের ৫-৬ মিনিটের মতো পথ হেঁটে যেখান থেকে বিশেষ ট্রাভেল কারের টিকিট কাটতে হয়, সেখানে গিয়ে হতাশ হতে হলো। আর পৌনে ১ ঘণ্টা পরই বন্ধ হয়ে যাবে কাংলা, তাই ওরা আর আজকে টিকিট ছাড়ছে না। প্রাচীন নিদর্শনগুলো দেখতে চাইলে আমাদের হেঁটে হেঁটেই দেখতে হবে। সেটা যে কোনোভাবেই সম্ভব নয়, এ কে শেরাম ও শরত্চন্দ থিয়াম দুজনই হতাশার সঙ্গে বারবার বলতে লাগলেন। ওদিকে যে হেঁটে যতটুকু দেখার দেখব, তারও বুঝি জো নেই। শুরু হয়ে গেল টিপ টিপ বৃষ্টি। আমরা সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই পিচ ঢালা পথে সোজা সামনের দিকে এগিয়ে যাই। পথ যেখানে শেষ হয়েছে এবং ডানে-বামে দুদিকে চলে গেছে দুটি পথ, সেখানেই কাংলা শাহ নামের স্ট্যাচু। দুই পাশে দুটি সিংহ সদৃশ সাদা মূর্তি, ঠিক সিংহও মনে হবে না, সিংহ আর ড্রাগন মিলিয়ে ভিন্ন টাইপের অদেখা কোনো জন্তুর আদল। পেছনে প্রাচীন দেয়াল। ওটা দেখতে দেখতেই বৃষ্টির ফোঁটা বড় হয়ে উঠতে লাগল। আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে আবারো পেছনের একটা প্রাচীন নিদর্শনের স্থাপনার বারান্দায় দাঁড়াই। বিশাল লম্বা দুটো প্রাচীন বাইচের নৌকা পাশাপাশি রাখা। আর চারপাশটা পুরো কাচ দিয়ে ঢাকা। জানা গেল, এটা বহুপ্রাচীন রাজসম্পদের নমুনা। আমরা বাইরের বারান্দা থেকে ওটা দেখি আর বৃষ্টি কখন থামবে, তার জন্য অপেক্ষা করি। দূরের মাঠ ছাড়িয়ে একটা বিশাল মন্দির চোখে পড়ছে। কাংলা গেট, কাংলা শাহ মূর্তির সঙ্গে এ মন্দিরেরও মিল রয়েছে একটি জায়গায়। সবই মণিপুরি মিথকে অঙ্গীভূত করেছে ডিজাইনে। এ কে শেরাম, শরত্চন্দ থিয়াম, অ্যালেক্স বাবু, উত্তম— সবাই কাংলা আমাদের দেখাতে না পেরে আফসোস করতে লাগল।

২৩৭ একর আয়তনের এ বিশাল ফোর্টে নাকি মণিপুরের প্রাচীন রাজন্যদের অনেক গৌরবময় স্মৃতি ও নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মণিপুরবাসীর ঐতিহ্য, গর্ব ও ইতিহাস। মণিপুরিরা খুব গর্বের সঙ্গে বলে, ভারতবর্ষের ইতিহাস ৭৫০ বছরের পরাধীনতার ইতিহাস হলেও মণিপুর দীর্ঘদিন ছিল স্বাধীন ভূখণ্ড। ১৮৯১ সালে ইংরেজদের কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর মণিপুরের স্বাধীনতা প্রথমবারের মতো বাধাপ্রাপ্ত হয়। মণিপুর রাজবংশের গৌরব বীর টিকেন্দ্রজিৎকে তখন ফাঁসি দেয়া হয়। তার আগ পর্যন্ত মণিপুরবাসী সহস্রাধিক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বাধীনই ছিল। মণিপুরের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রামাণ্য দলিল চেইখারোল কুম্বাবা অনুযায়ী খ্রিস্ট জন্মের অনেক আগে থেকেই মণিপুরের অস্তিত্ব ছিল। এরপর ৩৩ খ্রিস্টাব্দে পাখাম্বাদের রাজত্বকাল থেকে মণিপুরের রাজনৈতিক ইতিহাসের শুরু এবং এর পীঠস্থান এই কাংলা ফোর্ট। ধর্মীয় প্রাণকেন্দ্র হিসেবেও কাংলার গুরুত্ব অপরিসীম। আজকের কাংলা ফোর্টটি গড়ে উঠতে শুরু করে সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধে। বার্মিজ আক্রমণে এর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরবর্তীকালে তা পুনর্নির্মিত হয়েছে। ২০০৪ সালে আসাম রাইফেলসের কাছ থেকে কাংলা ফোর্টের দায়িত্ব দেয়া হয় কাংলা ফোর্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির হাতে।

টিপ টিপ বৃষ্টি মাথায় নিয়েই আমরা কাংলা ফোর্ট থেকে বেরিয়ে এলাম। কাংলা ফোর্টের চৌমাথা থেকে বাম দিক অর্থাৎ ব্রিজের দিকে একটু এগোতেই বামের ফুটপাতে পড়ল শহীদ মিনার। ১৮৯১ সালে ইংরেজ আর মণিপুরিদের যুদ্ধে যেসব সেনানী নিহত হয়েছে, তাদের স্মৃতির উদ্দেশেই নির্মিত হয়েছে এ সৌধ। তার পাশেই পলো গ্রাউন্ড। মণিপুরিরা মনে করে, পলো খেলাটির জন্ম এখানেই। ব্রিটিশরা খেলাটিকে এখান থেকে নিয়েই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়। একই রাস্তা ধরে এগোতে এগোতেই আমরা মণিপুরের বিখ্যাত ইমা মার্কেটটি পেয়ে যাই। যেটা পুরোপুরিই পরিচালিত হয় নারীদের দ্বারা।

বিশাল উঁচু ভবনের ভেতর খোলা মার্কেট। তার মধ্যে একেকটা সারি। এভাবে বেশ কয়েকটি সারির মধ্যে সামান্য কিছু জায়গা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন রকমের পসরা সাজিয়েছে মণিপুরের নারীরা। এখানে প্রতিটি দোকানই নারীদের। একটিও পুরুষের দোকান নেই। এমন কোনো পণ্য নেই, যা পাওয়া যায় না। কাপড় থেকে শুরু করে চুন-পান। শুধু যে জওয়ান বয়সী নারীরা দোকান সাজিয়ে বসে আছে তা নয়। বেশ কয়েকজন নারীকে দেখলাম, যাদের বয়স হয়তো আশিও ছাড়িয়েছে। এখনো কী কর্মস্পৃহা নিয়ে বসে আছে দোকানে অনমনীয় ভঙ্গিতে! আমরা একটা খোলা খাবারের দোকানে গিয়ে বসি। গরম গরম শাকবড়া ভাজা হচ্ছে। এটা অনেকটা আমাদের পিঁয়াজু আর বেগুনি টাইপের। এটার জুড়ি হলো চা। খানিকক্ষণ ওটা খাই। বেশ সুস্বাদু। তারপর চায়ে চুমুক দিই। বেশ লাগে। এখানে খেতে খেতেই আমাদের আড্ডা জমে ওঠে।

আমি অনমনীয় দৃঢ় মণিপুরি নারীদের বিস্মিত চোখে দেখতে থাকি। মণিপুরি নারীরাই মূলত মণিপুরের শক্তি ও সম্পদ। শুধু যে দোকানের পসরা মেলে দিয়ে রোজগার করে তা নয়। ক্ষেতে জমিনের ফসলও ফলায় পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। এমনকি এ দেশের মেরুদণ্ড বলতেও নারীদের সংগ্রামকেই বোঝায়। মেরি কম, শর্মিলা, সরিতার দেশ ইম্ফলের নারীরা যুগ যুগ ধরেই নানা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। চা খেতে খেতেই এ কে শেরাম শোনালেন সেই গৌরবের কাহিনী। ব্রিটিশ আমলে মুণিপুরি নারীরা প্রথমবারের মতো সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯০৪ সালে ব্রিটিশ সরকার মণিপুরে ফ্রি ট্রেড পলিসি চালু করে। এর আওতায় মণিপুর থেকে প্রচুর পরিমাণ চাল বাইরে রফতানি হয়। চাল রফতানি বেশি পরিমাণে হতে থাকায় মণিপুরে চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। এর প্রতিবাদে মণিপুরের নারীরা প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। ব্রিটিশরা কঠিন হাতে নারীদের আন্দোলন দমায়। কিন্তু উলটো ভেতরে ভেতরে মণিপুরবাসীর ক্ষোভ আরো বেড়ে যায়। ব্রিটিশ সরকারের নিপীড়নের বিরুদ্ধে নারীরা আরো কঠিন ও জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলে। ফলে ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী তাদের যাবতীয় অন্যায় আদেশ তুলে নিতে বাধ্য হয়। ১৯৩৯ সালেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় মণিপুরি চালসহ অন্যান্য পণ্য বাইরে পাঠানোর কারণে এখানে দেখা দেয় খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষাবস্থা। এবারো মণিপুরি নারীদের তীব্র আন্দোলনে মণিপুর থেকে তাত্ক্ষণিকভাবে চাল রফতানি বন্ধ হয়। ইতিহাসে এ আন্দোলনকে বলা হয় নুপী লান। অতি সাম্প্রতিককালেও মণিপুরি নারীরা স্বামীর অত্যাচার ও আসাম রাইফেলসসহ বিভিন্ন শক্তির দ্বারা শারীরিকভাবে নিগৃহীত হওয়ার প্রতিবাদে অনশন, নগ্ন হয়ে প্রতিবাদের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন তোলেন। নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে মণিপুরি নারীরা মৈরি পাইবি নামে একটি শক্তিশালী সংগঠনও গড়ে তুলেছেন। মহিলা মার্কেটটি দেখে আরো ভালো লাগল, মণিপুরি নারীরা যে সেজেগুজে রয়েছেন, তা সবই তাদের নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অলঙ্কারে। মুখের ভাষার মতো সবকিছুতেই রয়েছে নিজস্বতার ছাপ।

ইমা মার্কেট থেকে হাঁটতে হাঁটতেই আমরা পাওনাবাজার সড়কে অবস্থিত মণিপুরি সাহিত্য পরিষদের অফিসে যাই। ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি মণিপুরের প্রাচীন সাহিত্যের নিদর্শন সযত্নে বহন করে চলেইে। চারপাশের আলমারি, টেবিলজুড়ে মণিপুরি ভাষা। মণিপুরি ভাষা ভিন্ন হলেও এর লিপি বাংলা। মণিপুরি সাহিত্য পরিষদের সভাপতি থোইদিংজম তোম্বী, সাধারণ সম্পাদক কুঞ্জবিহারী, সদস্য ধবল সিংহ ও অফিস সংরক্ষক ইবোহল শর্মা আমাদের খাইয়ে-দাইয়ে ভালোই আপ্যায়ন করলেন।

বেশ প্রাণময় আড্ডা সেরে আমরা যখন বিপরীত দিকের দরোজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি, তখন সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয়ে উঠেছে। অবাক হয়ে দেখলাম, সামনেই সেই নাম্বল নদী আর দূরে রাস্তার ওপাশে আমাদের হোটেলটিও দেখা যাচ্ছে। ছোট্ট সেতুটা পেরোতে পেরোতে ইচ্ছে হয়, বেশ খানিকক্ষণ একা একা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু সেটা তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ কে শেরাম ইন্ডিগোয় বারবার বলে দিয়েছেন, কেউ একা মুভ করবেন না আর সন্ধ্যার পর বাইরে থাকবেন না। তার নিষেধ অমান্য করি কীভাবে? কিন্তু হোটেলে ঢোকার আগে সন্ধ্যার অন্ধকারে রাস্তায় কোনো রকমের কোনো ভ্রুকুটি সামান্যও চোখে পড়ল না। বেশ লোকজন হাঁটছে পথে, গাড়িও চলছে দিনের মতো নির্বিঘ্নে।