মায়ামিতে শেষ বাঁশি বাজার পরও যেন বিশ্বাস করা কঠিন—বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সত্যিই বেঁচে গেছে। বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলতে আসা কেপ ভার্দে লিওনেল মেসিদের এমনভাবে কাঁপিয়ে দেবে, তা হয়তো আর্জেন্টিনার দুঃস্বপ্নেও ছিল না। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে রুদ্ধশ্বাস, প্রান্ত থেকে প্রান্তে ছুটে চলা এক অবিশ্বাস্য ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে জিতে শেষ ষোলোয় উঠেছে আলবিসেলেস্তেরা। কিন্তু এই ম্যাচে জয়ী হয়েও আর্জেন্টিনা যতটা স্বস্তি পেয়েছে, কেপ ভার্দে ততটাই সম্মান নিয়ে বিদায় নিয়েছে।
প্রথমার্ধে শুরুটা ছিল ধীর। কেপ ভার্দে নিজেদের রক্ষণবিন্যাসে আর্জেন্টিনাকে আটকে রাখে। তবে ২৯ মিনিটে ম্যাচের প্রথম জাদু দেখান মেসি। লিসান্দ্রো মার্তিনেজ পেছন থেকে নিখুঁত লম্বা পাস পাঠান বক্সে। কেপ ভার্দের রক্ষণরেখা ভেঙে মেসি দৌড়ের মধ্যেই বল নামিয়ে নেন। দ্বিতীয় স্পর্শেরও প্রয়োজন হয়নি। প্রথম স্পর্শেই বল তুলে দেন গোলরক্ষক ভোজিনহার পাশ দিয়ে নিকট কোণে। আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায় ১-০ গোলে।
গোলের পর আর্জেন্টিনা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ৪৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের শট ঠেকান ভোজিনহা। বিরতিতে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনার জন্য অপেক্ষা করছিল ঝড়।
বিরতির পর কেপ ভার্দে সম্পূর্ণ বদলে যায়। ৫৯ মিনিটে সমতায় ফেরে তারা। ডান দিক দিয়ে মোরেইরা বল দেন রায়ান মেন্দেসকে। মেন্দেস দ্রুত কাটব্যাক করেন বক্সে থাকা দেরয় দুয়ার্তের দিকে। কোণ ছিল কঠিন, সামনে ছিলেন লিসান্দ্রো ও এমিলিয়ানো মার্তিনেজ—তবু দুয়ার্তে কাছের পোস্ট দিয়ে বল গলিয়ে দেন দূরের কোণে। স্কোর ১-১।
এরপর মেসির ফ্রি-কিক ভোজিনহা দুর্দান্তভাবে ঠেকান। ৬২ মিনিটে কাছ থেকে মেসির শটও আটকে দেন কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই আবার এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ৯২ মিনিটে মেসির কর্নার কাছের পোস্টে ফ্লিক করেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। লিসান্দ্রো মার্তিনেজ প্রথমে হেডে পৌঁছাতে পারেননি, কিন্তু বল নিয়ন্ত্রণে নিয়েই বাঁ পায়ে প্রচণ্ড শটে জালে পাঠান। বল উঠে যায় টপ কর্নারে। আর্জেন্টিনা ২-১।
কিন্তু কেপ ভার্দে তখনও শেষ হয়নি। ১০৩ মিনিটে আসে ম্যাচের সেরা মুহূর্ত। নিজেদের গোলরক্ষক ভোজিনহা থেকে শুরু হওয়া আক্রমণ ধাপে ধাপে বাম দিকে পৌঁছায়। ইয়ানিক সেমেদোর পাস পান সিডনি কাবরাল। তিনি ভেতরে কাট করেন, ম্যাক অ্যালিস্টারকে পেছনে ফেলেন, তারপর ডান পায়ে বাঁকানো শট নেন। বল সোজা উঠে যায় টপ কর্নারে। এমিলিয়ানো মার্তিনেজের কিছুই করার ছিল না। কেপ ভার্দে ২-২। বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল, কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসেরও সম্ভবত শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত।
ম্যাচ তখন পেনাল্টির দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু ১১১ মিনিটে আবার মেসি। বাঁ দিক থেকে তার কর্নারে গ্ল্যান্সিং হেড করেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। বল ডিনেই বোর্হেসের হাতে লেগে দিক পাল্টে ভোজিনহাকে ফাঁকি দিয়ে দূরের কোণে ঢুকে যায়। গোলটি আত্মঘাতী হিসেবে লেখা হলেও আর্জেন্টিনাকে বাঁচানো সেই আঘাতের উৎস ছিল মেসির কর্নার ও রোমেরোর হেড।
শেষ দিকে কেপ ভার্দে মরিয়া হয়ে ওঠে। ১১৬ মিনিটে সিডনি কাবরালের ফ্রি-কিক টপ কর্নারের দিকে যাচ্ছিল, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ঝাঁপিয়ে ঠেকান। ১১৯ মিনিটে বেঞ্চিমোলের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বল সরিয়ে দেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক। ১২০ মিনিটে লিভরামেন্তো ছয় গজের ভেতর থেকে শট উড়িয়ে দেন, যদিও অফসাইডের পতাকা উঠেছিল। শেষ মুহূর্তে মন্টেইরোর শটও ব্লক হয়।
শেষ পর্যন্ত কেপ ভার্দের রূপকথা থেমে যায় ৩-২ ব্যবধানে। আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায় শেষ ষোলোয়, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ মিশর। কিন্তু এই ম্যাচ আর্জেন্টিনাকে সতর্ক করে দিল—শিরোপা ধরে রাখতে হলে শুধু মেসির জাদু নয়, আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ, আরও বেশি স্থিরতা দরকার। আর কেপ ভার্দে? তারা বিদায় নিয়েছে মাথা উঁচু করে, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনের সামনে দাঁড় করিয়ে।














