অ্যান্থনি গর্ডনের গোলটি কেবল স্কোরবোর্ডের বদল ছিল না, তা ছিল ইংলিশ কোচ টমাস টুখেলের সুনিপুণ ও যান্ত্রিক ফুটবল প্রকৌশলের প্রারম্ভিক সুর। কিন্তু ঠিক সেই ক্ষণ থেকেই যেন পতনের শুরু। যার নেপথ্যে এক প্রান্তে টুখেলের গাণিতিক ভীরুতা, আর অন্য প্রান্তে ছিল লিওনেল স্কালোনির সাহস ও এক অতিপ্রাকৃতিক জাদুকর লিওনেল মেসির অভিকর্ষ বলয়ের খেল।
ট্যাকটিক্যাল বোর্ডে টমাস টুখেল নামিয়েছিলেন গতি ও শক্তির এক জমাটবদ্ধ রূপরেখা। মর্গান রজার্সকে ডানপ্রান্তে খেলিয়ে এবং বাঁ-প্রান্তে ডিজেড স্পেন্সকে মেসির প্রহরী বানিয়ে তিনি আর্জেন্টিনার ছন্দ ভাঙতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ৫৫ মিনিটে দল এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টুখেল মনে করলেন যথেষ্ট হয়েছে। জয়ের সুবাস পেয়ে আক্রমণভাগকে ছাঁটাই করে রক্ষণভাগে বাড়তি দেয়াল তোলার জন্য এজরিল কনসাকে নামালেন, গর্ডনকে তুলে নিলেন। ম্যাচের বাকি সময় মাঠের দখল ছেড়ে দিয়ে ১২ শতাংশ বল পজিশন নিয়ে তারা নিজেদের বক্সের সামনে এক নিথর দ্বীপ তৈরি করল।
টুখেল যখন ভীরুতার প্রাচীর তুলছিলেন, ঠিক তখনই ডাগআউটে দাঁড়িয়ে লিওনেল স্কালোনি নিজের তূণ থেকে বের করলেন ধারালো তীর। পারদেসের মতো রক্ষণাত্মক ঢাল সরিয়ে তিনি মাঠে নামালেন উইঙ্গার নিকো গঞ্জালেসকে। স্কালোনির এ সিদ্ধান্ত পুরো মাঝমাঠের রসায়ন বদলে দিল। এনজো ফার্নান্দেজ ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার মাঝমাঠের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিলেন। ইংরেজদের দুই মিটার লম্বা ডিফেন্ডারদের বিপরীতে স্কালোনি খেললেন স্পেস অ্যান্ড উইডথের খেলা। নিকো গঞ্জালেসের গতি বাঁ-প্রান্তে ইংরেজদের রক্ষণভাগকে ফালা ফালা করে দিচ্ছিল, যার ফলে স্পেন্স ও ও’রাইলিদের বাধ্য হয়ে নিজেদের পজিশন ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হচ্ছিল।
ঠিক এ শূন্যতার মাঝে ডানা মেললেন লিওনেল মেসি। ইংরেজরা হয়তো ভেবেছিল মেসিকে তারা গতি দিয়ে অবরুদ্ধ করে ফেলবে। কিন্তু ৩৯ বছর বয়সী এ জাদুকর গতিকে নয়, নিয়ন্ত্রণ করছিলেন সময়কে। তিনি যখন মাঠে অলস ভঙ্গিতে হাঁটছিলেন, তখন আসলে পুরো স্টেডিয়াম তার চারপাশে ঘুরছিল। তিনি একাই একটি অভিকর্ষ বলয় তৈরি করেছিলেন, যেখানে প্রতিটি প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার চুম্বকের মতো তার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছিল আর পেছনে তৈরি হচ্ছিল বিশাল শূন্যস্থান।
যখনই ইংল্যান্ড লো-ব্লকে চলে গেল, মেসি মাঠের ডানপ্রান্ত থেকে ভেতরে এসে ইংরেজদের মিডফিল্ড ও ডিফেন্সিভ লাইনের মাঝখানের ডেড-জোনে অবস্থান নিলেন। স্পেন্স বা ও’রাইলি কেউই বুঝতে পারছিলেন না তারা লাইন ছেড়ে মেসিকে প্রেস করতে ওপরে উঠবেন, নাকি নিজেদের জোন ধরে রাখবেন। মেসি এ দ্বিধাদ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে পুরো ম্যাচের টেম্পো নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলেন।

ইংল্যান্ডের লো-ব্লক যত নিচে নামছিল, মেসির প্রভাব তত বাড়ছিল। একসময় মনে হচ্ছিল, মাঠের প্রতিটি নীল-সাদা পাস তার পায়ের ছোঁয়া নিয়েই শেষ হতে হবে। ডান হাফ-স্পেস থেকে কখনো ম্যাক অ্যালিস্টারকে, কখনো নিকো গঞ্জালেসকে, কখনো এনজো ফার্নান্দেজকে এমনভাবে বল ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন যে ইংল্যান্ডের পাঁচ ডিফেন্ডারের দেয়াল বারবার এক পাশ থেকে আরেক পাশে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছিল। সমতার গোলটিও জন্ম নেয় ঠিক এমনই এক আক্রমণে। মেসির সূক্ষ্ম পাসে আর্জেন্টিনা আক্রমণের গতি বদলে দেয়, ইংল্যান্ডের রক্ষণ এক মুহূর্তের জন্য ভারসাম্য হারায়, আর সেই তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গায় কোনো চাপ ছাড়াই এগিয়ে এসে এনজো ফার্নান্দেজ জোরালো শটে পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন। গোলটি এনজোর হলেও তার স্থপতি ছিলেন মেসি; কারণ আক্রমণের ছন্দ, দিক ও সময়—তিনটিই নির্ধারণ করেছিলেন তিনি।
ম্যাচের ৯১ মিনিটে সেই জয়সূচক গোলের আগের মুহূর্তটি ছিল মেসির পজিশনাল জিনিয়াসের সেরা উদাহরণ। স্পেন্স যখন এক মুহূর্তের জন্য বল ক্লিয়ার করলেন, মেসি কিন্তু বক্সের ভেতর তাড়াহুড়ো করে ঢোকেননি। তিনি ঠিক সেকেন্ড বলটি রিসিভ করার জন্য হাফ-স্পেসে দাঁড়িয়ে রইলেন। যখন স্পেন্স এবং ও’রাইলি দুজনেই মেসির দিকে ধাবিত হলেন, তখন ইংরেজদের ব্যাক-লাইনের ডানপ্রান্ত পুরোপুরি অরক্ষিত হয়ে পড়েছিল। মেসি তার জাদুকরী বাঁ-পায়ের বদলে ডান পা দিয়ে যে ক্রসটি বাড়ালেন, তার গতি ও ট্র্যাজেক্টরি এতটাই নিখুঁত ছিল যে তা জন স্টোন্স ও পিকফোর্ডের মধ্যবর্তী অবস্থানে গিয়ে পড়ল। স্কালোনির আরেক লেট সাবস্টিটিউট লাউতারো মার্টিনেজ ঠিক সেই স্পেসটি রিড করে ডাইভ দিয়ে হেড করলেন।
টুখেল ভেবেছিলেন ম্যানপাওয়ার দিয়ে বক্স ভরিয়ে রাখলেই গোল আটকানো যায়। কিন্তু স্কালোনির ট্যাকটিক্যাল উইডথ এবং মেসির হাফ-স্পেস ডমিনেশনের সামনে টুখেলের সেই পাঁচ ডিফেন্ডারের প্রাচীর তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। শেষের দিকে টুখেল লম্বা ডিফেন্ডার ড্যান বার্নকে স্ট্রাইকার বানিয়ে বক্সে লং-বল সাপ্লাই দেয়ার যে মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন, তা ওতামেন্দি ও ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর কাছে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
এ ম্যাচে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। ইউরোপীয় শারীরিক শ্রেষ্ঠত্বের যে ধারণা বারবার তুলে ধরা হয়, স্কালোনির দল সেটিকে কেবল প্রতিহতই করেনি, ভেঙে চুরমার করেছে। ওতামেন্দি আকাশের প্রতিটি বল পরিষ্কার করেছেন। রোমেরো সামনে উঠে ডুয়াল জিতেছেন। বদলি নেমে ডি পলও দুর্দান্ত করেছেন। এনজো মাঝমাঠ নিজের দখলে নিয়েছেন। ম্যাক অ্যালিস্টার দুইবার পোস্টে আঘাত করেছেন। আর মেসি? তিনি প্রমাণ করেছেন, ফুটবলে সবচেয়ে শক্তিশালী পেশি মানুষের মস্তিষ্ক।
আলফ র্যামসি ১৯৬৬ সালে বলেছিলেন, আর্জেন্টিনারা পশুর মতো খেলে। ইতিহাস সেই বাক্যকে অপমান হিসেবে মনে রেখেছিল। কিন্তু আজ সেটি অন্য অর্থ পায়। তারা সত্যিই পশুর মতো। আহত হলেও লড়ে, রক্তাক্ত হলেও থামে না, কোণঠাসা হলে আরো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। আর এ কারণেই স্কালোনির আর্জেন্টিনা আলাদা। এখানে নায়ক একজন নন। কখনো এনজো, কখনো লাউতারো, কখনো ম্যাক অ্যালিস্টার। কিন্তু তাদের সবার কেন্দ্রে আছেন লিওনেল মেসি, যিনি নিজের আলোয় অন্যদেরও উজ্জ্বল করে তোলেন।









