অথচ ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিসংখ্যানটি অন্য জায়গায়। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আটটি ম্যাচ খেলে একটি গোলও করতে পারেননি রোনালদো। নেই কোনো অ্যাসিস্টও। তাই আগামীকাল ভোর ৫টায় টরন্টোয় ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোতে ওঠার লড়াইয়ে প্রশ্ন একটাই—অবশেষে কি কাটবে রোনালদোর নকআউট অভিশাপ? রোনালদোর গোল মানেই হয়তো শুধু একটি ব্যক্তিগত আক্ষেপের অবসান নয়, পর্তুগালের রাউন্ড অব সিক্সটিনের টিকিটও।
সিআর সেভেনের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে। তখন তিনি ছিলেন গতি আর ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষকে কাঁপিয়ে দেয়া এক তরুণ উইঙ্গার। ইরানের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে করেছিলেন নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল। পর্তুগাল সেবার সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠলেও চারটি নকআউট ম্যাচে গোলের দেখা পাননি তিনি। বরং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েইন রুনির লাল কার্ডের ঘটনায় তার ভূমিকা এবং পরে সতীর্থদের দিকে তাকিয়ে চোখ টেপার দৃশ্যই হয়ে ওঠে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আলোচিত বিতর্কগুলোর একটি।
২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনিই দলের অধিনায়ক ও সবচেয়ে বড় ভরসা। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ৭-০ গোলের জয়ে একটি গোল করা ছাড়া পুরো আসর ছিল হতাশার। শেষ ষোলোয় স্পেনের কাছে ০-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল।
২০১৪ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই ইনজুরি তাড়া করছিল তাকে। বাছাইপর্বে সুইডেনের বিপক্ষে চার গোল করে দলকে বিশ্বকাপে তুললেও ব্রাজিলে গিয়ে নিজের সেরা ছন্দ খুঁজে পাননি। জার্মানির বিপক্ষে ০-৪ গোলের পরাজয়ে ছিলেন প্রায় অদৃশ্য। ঘানার বিপক্ষে গোল করলেও পর্তুগাল গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। ফলে নকআউটে গোলের অপেক্ষাও সেবার আর শুরুই হয়নি।
রাশিয়া বিশ্বকাপে যেন অন্য এক রোনালদোর দেখা মিলেছিল। প্রথম ম্যাচেই স্পেনের বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক। কিন্তু সেই আগুন টেকেনি। শেষ ষোলোয় উরুগুয়ের বিপক্ষে ১-২ গোলে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল। আবারো গোলশূন্য রোনালদো।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ছিল সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অস্থির বিদায়ের পর অনেকেই মনে করেছিলেন বিশ্বকাপেই জবাব দেবেন রোনালদো। কিন্তু ঘানার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে করা গোলই ছিল তার একমাত্র সাফল্য। শেষ ষোলোয় সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে তাকে বেঞ্চে বসিয়ে গনসালো রামোসকে খেলান কোচ ফার্নান্দো সান্তোস। রামোস হ্যাটট্রিক করেন, আর রোনালদোকে কেন্দ্র করে শুরু হয় বিতর্ক। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কাছে হারের পর চোখের জল লুকাতে না পেরে সরাসরি ড্রেসিংরুমে চলে যান তিনি।
অনেকেই ভেবেছিলেন, সেখানেই শেষ। কিন্তু সময়কে অস্বীকার করা যেন রোনালদোর পুরনো অভ্যাস। ২০২৬ বিশ্বকাপে ফিরে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি ইতিহাস গড়েছেন। বিশ্বকাপের ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করা প্রথম ফুটবলার এখন তিনি। তবে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স এবং কলম্বিয়ার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র আবারো প্রশ্ন তুলেছে, বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তিনি কতটা কার্যকর।
এবার সামনে লুকা মডরিচের ক্রোয়েশিয়া। বয়সের ভারে আগের মতো ঝলমলে না হলেও অভিজ্ঞতা, শৃঙ্খলা আর মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে এখনো ভয়ংকর একটি দল তারা। ঠিক একই কথা রোনালদোকেও ঘিরে বলা যায়। ৪১ বছর বয়সে আগের সেই বিস্ফোরক গতি নেই, কিন্তু গোল করার প্রবৃত্তি এখনো অটুট।
রোনালদোর ক্যারিয়ারে রেকর্ডের অভাব নেই। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন, পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেছেন। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব তার জন্য এখনো এক অপূর্ণ গল্প। টরন্টোর রাত তাই শুধু পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়ার লড়াই নয়। বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা ঘোচানোর লড়াইও। আট ম্যাচের অপেক্ষা কি শেষ হবে, নাকি এ আক্ষেপই থেকে যাবে তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অসমাপ্ত গল্প হয়ে? উত্তর মিলবে টরন্টো স্টেডিয়ামে।








