সোনালি প্রজন্মের শেষ আলো নিভে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। কেভিন ডি ব্রুইনের ক্লান্ত পা, রোমেলু লুকাকুর বয়স, রুডি গার্সিয়ার দিশেহারা মুখ সবকিছুই যেন ঘোষণা দিচ্ছিল, এ এক যুগের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। দুই গোলে পিছিয়ে থাকা বেলজিয়াম যেন হঠাৎ সেই ‘সারকোফাগাস’ ভেঙে উঠে দাঁড়াল। ম্যাচের ৮৬ মিনিট ধরে রেড ডেভিলদের যেভাবে শাসন করল সেনেগাল, তাতে জয় তাদের প্রাপ্য ছিল। কিন্তু ফুটবলে প্রাপ্য আর প্রাপ্তি সবসময় একসূত্রে গাঁথা থাকে না। ৮৬ মিনিটে রোমেলু লুকাকুর গোল, ৮৯ মিনিটে ইউরি তিলেমানসের হেডে সমতায় ফেরে বেলজিয়াম। অতিরিক্ত সময়ের ১২৪তম মিনিটে তিলেমানসের বিতর্কিত পেনাল্টি গোলে ম্যাচজুড়ে দাপট দেখানো সেনেগালকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে দেয় বেলজিয়াম। আফ্রিকান নেশনস কাপ ফাইনালের পর আরো একবার ন্যায়বিচারহীনতার অভিযোগ নিয়ে মাঠ ছাড়ে সেনেগাল।
শুরুর গল্পটা অবশ্য ছিল সম্পূর্ণ আফ্রিকার অদম্য সিংহদের। ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে হাজারো সেনেগাল সমর্থক সিয়াটলে ঢুকতেই পারেননি। কিন্তু গ্যালারিতে তাদের ঢোলের শব্দ না থাকলেও মাঠে ছিল সেই একই ছন্দ। ইদ্রিসা গানা গেইয়ে, পাপে গেইয়ে, সাদিও মানে, হাবিব দিয়ারারা বল নিয়ে অনায়াসে জায়গা বদল করছিলেন। বিপরীতে বেলজিয়াম নিজেদের অর্ধেই গুটিয়ে ছিল। রুডি গার্সিয়ার রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা নিজের দলকেই বন্দি করে ফেলেছিল। প্রথম সতর্কবার্তা এসেছিল ইসমাইলা সারের শটে, যা পোস্টে লেগে ফিরে আসে। কয়েক মিনিট পর একই সারের আরেকটি প্রচেষ্টাও পোস্টে লাগে। তবে পরেরবার ভাগ্য বেলজিয়ামকে বাঁচাতে পারেনি। ফিরতি বলে হাবিব দিয়ারা সহজেই জাল খুঁজে নিলে এগিয়ে যায় সেনেগাল।
গোল হজমের পরও ঘুম ভাঙেনি বেলজিয়ামের। মাঝমাঠে তিলেমানস ছিলেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। ডি ব্রুইনের শরীরে সময়ের ভার স্পষ্ট। জেরেমি ডোকু আর লিয়ান্দ্রো ট্রসার্ডকে দুই প্রান্তে আটকে রেখে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছিলেন গার্সিয়া। প্রথমার্ধে বেলজিয়ামের দুটি শটই খুব সহজে সামলে নেন গোলরক্ষক দিয়াও। বিরতির পর রোমেলু লুকাকুকে নামিয়ে শেষ চেষ্টা করেছিলেন গার্সিয়া। কিন্তু ৫১ মিনিটে মুসা নিয়াখাতের প্রায় ৭০ মিটারের নিখুঁত লম্বা পাস বুকে নামিয়ে দুই ডিফেন্ডারকে সরিয়ে বজ্রগতির শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ইসমাইলা সার। বিশ্বকাপে এটি ছিল তার চতুর্থ গোল। ২-০ স্কোরলাইন তখন ম্যাচের প্রকৃত চিত্রই তুলে ধরছিল।
রুডি গার্সিয়া ৫৬ মিনিটে একসঙ্গে তুলে নিলেন কেভিন ডি ব্রুইন ও জেরেমি ডোকুকে। বদলি হিসেবে নামলেন নিকো রাসকিন ও ডোডি লুকেবাকিও। মাঠে নামার আগে হয়তো কেউ ভাবেনি এ পরিবর্তনই হবে ম্যাচের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। ৮৬ মিনিটে থমাস মুনিয়ের নিচু ক্রসে সামনে থাকা রোমেলু লুকাকু এক স্পর্শেই বল জালে পাঠান। বদলি সেন্টারব্যাক পাথে সিসের বিপক্ষে শক্তির লড়াইয়ে জিতে নেয়া সেই গোল যেন রেড ডেভিলদের প্রাণ ফেরায়। ৪ মিনিট পর ঘটল আরো অবিশ্বাস্য ঘটনা। ডান দিক থেকে ট্রসার্ডের ভাসানো বলে সবার ওপরে উঠে হেড করেন ইউরি তিলেমানস। উচ্চতায় অনেক খাটো এ মিডফিল্ডার বিশালদেহী গোলরক্ষকের নাগালের বাইরে বল পাঠিয়ে সমতা ফেরান।
অতিরিক্ত সময়ে দুই দলই ক্লান্ত। ম্যাচ ধীরে ধীরে টাইব্রেকারের দিকেই এগোচ্ছিল। ঠিক তখনই আসে সেই মুহূর্ত, যা নিয়ে বিতর্ক চলবে বহুদিন। লামিন কামারা বক্সে তিলেমানসকে ফেলে দেন। প্রথমে খেলা চলতে থাকলেও পরে ভিএআরের ডাকে মনিটরে যান রেফারি সাইদ মার্তিনেজ। দীর্ঘ পর্যালোচনার পর তিনি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। তিলেমানসের ডান পায়ের শট জালে জড়াতেই ইতিহাস লেখা হয়ে যায়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে দেরিতে হওয়া জয়সূচক গোল। একই সঙ্গে সেনেগালের জন্য আরেকটি নকআউট ট্র্যাজেডি।








