ভুটানের নারী ফুটবল লিগে পারো এফসিতে খেলেছেন বাংলাদেশের শীর্ষ তারকা সাবিনা খাতুন, ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, মাতসুশিমা সুমাইয়া ছাড়াও ডিফেন্ডার শিউলি আজিম ও নিলুফা আক্তার নীলা। যদিও তারকাখচিত এ দলটি শিরোপা জিততে পারেনি। লিগে না হেরেও তারা রানার্সআপ হয়েছে। এ মৌসুমে পারো এফসি আর রয়্যাল থিম্পু কলেজ উইমেনস ফুটবল টিম (আরটিসি ডব্লিউএফটি) উভয়ই অপরাজিত থাকার গৌরব অর্জন করে। তখন দুই দলকে আলাদা করা হয় গোল ব্যবধানে, যাতে এগিয়ে থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে শামসুন্নাহার জুনিয়র, তহুরা খাতুন, স্বপ্না রানীর রয়্যাল থিম্পু।

মৌসুমের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হয় আরটিসি ও ট্রান্সপোর্ট ইউনাইটেড। শিরোপা জিততে হলে ট্রান্সপোর্ট ইউনাইটেডকে হারাতে হবে—এমন সমীকরণের সামনে পড়ে তহুরাদের আরটিসি। ম্যাচে তারা ঠিকই ৩-০ গোলে ট্রান্সপোর্টকে হারিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলেন। ওই ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন তহুরা খাতুন। ১৫ জয় আর তিন ড্র মিলে ৪৮ পয়েন্ট পায় আরটিসি। পারো এফসিরও সমান ৪৮ পয়েন্ট। দুই দলকে তখন আলাদা করা হয় গোল ব্যবধানে। তাদের ১৭২ গোলের বিপরীতে পারো করেছে ১১৩ গোল। বিশাল গোল ব্যবধানই আরটিসিকে শিরোপা এনে দেয়।

১০ দলের এ লিগে অনেক একপেশে ম্যাচ হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো দল ২০ গোলেরও বেশি ব্যবধানে জিতেছে! যেমন গত ১৫ মে স্যামৎসে ডব্লিউটিসিকে ২৮-০ গোলে হারায় পারো, যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জয়। ওই ম্যাচে গোল উৎসব করেন ঋতুপর্ণা, সাবিনা, মনিকা ও সুমাইয়া। স্যামৎসের আর্টিফিশিয়াল টার্ফে ওই ম্যাচে পারোর ২৮ গোলের মধ্যে ২৫টিই করেন বাংলাদেশের চার খেলোয়াড়। সাবিনা নয় গোল, মনিকা চাকমা সাত গোল, সুমাইয়া পাঁচ গোল ও ঋতুপর্ণা চার গোল করেন। চলতি মৌসুমে মোট সাতবার ম্যাচসেরা খেলোয়াড় হয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। তিন ম্যাচে সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন বাংলাদেশের ফরওয়ার্ড মাতসুশিমা সুমাইয়া। দুই ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন আরেক ফরওয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমা।

26

২০১৬ সালে ভুটানে নারী ফুটবল লিগের যাত্রা। থিম্পু উইমেনস লিগ নামে যাত্রা করা লিগটি ২০২১ সালে নাম পায় ভুটান উইমেনস লিগ। প্রথম মৌসুমে সানশাইন ও পরের মৌসুমে পারো এফসি শিরোপা জয় করে। এরপর টানা তিন মৌসুমে শিরোপা জিতে নিল রয়্যাল থিম্পু কলেজে।

এবারই প্রথম বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিকাংশ শীর্ষ খেলোয়াড় ভুটান লিগের বিভিন্ন দলে ডাক পান। এর মধ্যে পারো এফসিতেই খেলেন সাবিনা, ঋতুপর্ণার মতো শীর্ষ তারকা। যদিও শেষ হাসি হাসলেন তহুরা, স্বপ্না রানী, শামসুন্নাহার জুনিয়রদের রয়্যাল থিম্পু কলেজ দল। এবার লিগে চতুর্থ স্থান পেয়েছে থিম্পু সিটি এফসি। এ দলে খেলেছেন বাংলাদেশের কৃতী মিডফিল্ডার মারিয়া মান্দা। এছাড়া চ্যাম্পিয়ন রয়্যাল থিম্পু কলেজের হয়ে মাঝে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ম্যাচ খেলে এসেছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার।

লিগের শেষ দিকে ভুটান খেলতে যান বাংলাদেশ জাতীয় দলের ডিফেন্ডার নীলা। তিনি যোগ দেন ঋতুপর্ণাদের পারো এফসিতে। যদিও চ্যাম্পিয়নের শিরোপা জেতা হলো না, তিনি পেলেন রানার্সআপ ট্রফির স্বাদ। প্রথমবার বিদেশে লিগ খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হ্যাঁ আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো কাটল। রানার্সআপ হলেও আমরা তাদের সমান পয়েন্ট পেয়েছি। পারো এফসি এ ফলাফলে খুশিই। ক্লাবটি অনেক ভালো সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে আমাদের। অন্যান্য ক্লাব থেকে বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি আমরা।’

পারো এফসি চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও দলটির খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফদের আনন্দের কোনো কমতি ছিল না। তারা নেচেগেয়ে এ সাফল্য উদযাপন করেন। দলটির হয়ে সবচেয়ে বেশি গোল করা সাবিনা খাতুন দলের একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘এই জার্সি পরতে পেরে ও আমাদের পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি গর্বিত। সবকিছুর পেছনেই কোনো না কোনো কারণ থাকে। সবকিছুর জন্য আমি কৃতজ্ঞ।’

পারো এফসি এক ফেসবুক পোস্টে কৃতী ফরওয়ার্ড সাবিনাকে নিয়ে লিখেছে, ‘সাতটি ম্যাচসেরার পুরস্কার পাওয়া সাবিনা পারো এফসিকে সামনে এগিয়ে নিতে ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ এক অস্ত্র। তার দক্ষতা, নিবেদন আর নেতৃত্বগুণ ছিল চোখে পড়ার মতো। তাকে আমাদের দলে পেয়ে আমরা গর্বিত। সাবিনা ও পারো এফসি সামনে আরো অনেক কিছু উপহার দেবে বলে বিশ্বাস করি আমরা।’

এদিকে থাইল্যান্ডে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলে দেশে ফিরে সপ্তাহ খানেক ছুটি কাটিয়েছেন আফঈদারা। এরপর নিবিড় অনুশীলনের জন্য চট্টগ্রামে ঘাঁটি গেড়েছেন তারা। ঋতুপর্ণারা এ সময় ভুটানে গিয়ে শেষ ম্যাচটি খেলে আবার দেশে ফিরেছেন। তারা শিগগিরই যোগ দেবেন ক্যাম্পে, যেখানে সিনিয়র, অ-২০ সব মিলিয়ে কোচ পিটার বাটলারের অধীনে ট্রেনিং করছেন অন্তত ৪১ ফুটবলার। যদিও কিছু নাম এখনো ব্রাত্য। তারা বাটলারের ক্যাম্পে ডাক পাননি।

ভুটানের দল ট্রান্সপোর্ট ইউনাইটেড লিগ শেষ হওয়ার আগেই বিদেশী ফুটবলারদের ছেড়ে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের গোলরক্ষক রুপনা চাকমা, ফরওয়ার্ড কৃষ্ণা রাণী সরকার ও ডিফেন্ডার মাসুরা পারভীন দেশে ফিরে আসেন ঋতুপর্ণাদের আগেই। ফেডারেশন সব ফুটবলারের চুক্তি ডিসেম্বর পর্যন্ত নবায়ন করেছে। কৃষ্ণা, মাসুরা চুক্তিবদ্ধ ফুটবলার হয়েও বাটলারের চট্টগ্রাম ক্যাম্পে যাননি।

সাফজয়ী দলের ডিফেন্ডার মাসুরা পারভীন বলেন, ‘আমাদের ক্লাব আগেই বিদেশী ফুটবলারদের ছেড়ে দিয়েছে। এখন বাড়িতে রয়েছি। আমাদের চুক্তি রয়েছে, কিন্তু ফেডারেশন ক্যাম্পে যোগ দেয়ার বিষয়ে কিছু বলেনি।’

সাফজয়ী দলের অন্যতম সদস্য কৃষ্ণা রাণী সরকার টাঙ্গাইলে নিজের বাড়িতে রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ফেডারেশন যদি ডাকে, অবশ্যই ক্যাম্পে যোগ দেব। আমি দেশে এসেছি ফেডারেশন জানে, কিন্তু ক্যাম্পে যোগ দেয়ার বিষয়ে কিছু বলেনি।’

২০২৪ সালের শেষ দিকে নেপালে সাফ চলাকালে সিনিয়র ফুটবলার ও কোচ পিটার বাটলারের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। একযোগে ১৯ ফুটবলার কোচকে বয়কটের ঘোষণা দেন। তারা নানা অভিযোগ তোলেন কোচের বিরুদ্ধে। যদিও কোচ নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন, ফেডারেশনও কোচের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। পরে কয়েক দফা আলোচনায় সংকট দূরীভূত হয়। বাটলারের অধীনে অনুশীলন করতে ও খেলতে সম্মত হন শীর্ষ ফুটবলাররা। ব্রিটিশ কোচ পরে মনিকা, রুপনা, ঋতুপর্ণা, মারিয়াসহ আরো কয়েকজনকে ডাকলেও সাবিনা, কৃষ্ণা, সানজিদা, মাসুরা, সুমাইয়াকে আর ডাকেননি। ফেডারেশন ডাকলে পরীক্ষা দিতে কার্পণ্য নেই কৃষ্ণার। তিনি বলেন, ‘ভুটানে লিগ শুরুর আগে আমি বাটলারের অধীনে চারদিন অনুশীলন করেছি। যদি ডাকে তাহলে অনুশীলনে নিজের সেরাটা দেখানোর জন্য প্রস্তুত।’