ঐতিহাসিক এক অঘটনের প্রায় ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারো মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফ্রান্স ও সেনেগাল। ২০০২ সালে সিউলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছিল বিশ্বকাপে অভিষিক্ত সেনেগাল। তবে এবার দৃশ্যপট ভিন্ন। ফ্রান্স শুধু বর্তমান বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তিই নয়, তাদের আক্রমণের নেতৃত্বে আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো মহাতারকা। যদিও তার ক্লাব মৌসুম শেষ হয়েছে শূন্য হাতে। ইউরোপের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলার হয়েও জিততে পারেননি কোনো শিরোপা। তবে ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখলেই যেন বদলে যান কিলিয়ান এমবাপ্পে।
বাংলাদেশ সময় আজ দিবাগত রাত ১টায় সিয়াটলের লুমেন ফিল্ডে সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে ফ্রান্স। ম্যাচের আগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এমবাপ্পে। ১৪টি বিশ্বকাপ ম্যাচে ১২ গোল করা এ ফরোয়ার্ড আর ৪ গোল করলে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড স্পর্শ করবেন।
সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং প্রস্তুতির দিক থেকে ফ্রান্স বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে। টুর্নামেন্টের ঠিক আগে প্রস্তুতিমূলক ম্যাচে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানের দাপুটে জয় পেয়েছে তারা। সেই ম্যাচে ফরাসিদের হয়ে আলো ছড়িয়েছেন তরুণ উইঙ্গার মাইকেল অলিসে। অনবদ্য হ্যাটট্রিক করে তিনি প্রমাণ করেছেন, বিশ্বকাপের মঞ্চে জ্বলে উঠতে পুরোপুরি প্রস্তুত। ফরাসি শিবিরের জন্য আরেকটি স্বস্তির খবর হলো দলের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার উইলিয়াম সালিবার ফিটনেস। পিঠে সামান্য চোট থাকা সত্ত্বেও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি শুরু থেকেই খেলেছেন এবং নিজের স্বাভাবিক খেলাটাই উপহার দিয়েছেন। সেনেগালের বিপক্ষেও মূল একাদশে তার থাকাটা প্রায় নিশ্চিত।

চলতি মাসের শুরুতে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে জয় পায় ফ্রান্স। ছবি: রয়টার্স
দেশমের ৪-২-৩-১ রণকৌশলে গোলপোস্ট সামলানোর দায়িত্বে থাকবেন নির্ভরতার প্রতীক মাইক মাইগনান। রক্ষণভাগে সালিবার সঙ্গী হিসেবে থাকবেন ডায়োত উপামেকানো, আর দুই প্রান্তে থিও হার্নান্দেজ ও জুলস কুন্দে ফরাসি রক্ষণকে এক নিশ্ছিদ্র দুর্গে পরিণত করবেন। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে আদ্রিয়েন রাবিও ও অঁরেলিয়েন চুয়ামেনির মতো অভিজ্ঞ মিডফিল্ডাররা প্রস্তুত, যারা শুধু রক্ষণকেই সহায়তা করবেন না; বরং দলের আক্রমণভাগের জন্য গোলের সুযোগ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। ফ্রান্সের আক্রমণভাগ এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম সেরা। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা মাইকেল অলিসে, ওসমানে ডেম্বেলে ও দেশারি দৌয়ের মতো খেলোয়াড়রা সেনেগালের রক্ষণে যেকোনো মুহূর্তে ভীতি ছড়াতে সক্ষম।
তবে সব আলো যার ওপর নিবদ্ধ তিনি কিলিয়ান এমবাপ্পে। এ মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা এ স্ট্রাইকারের সামনে রয়েছে অনন্য এক ইতিহাস গড়ার হাতছানি। গত দুটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনি এরই মধ্যে ১২টি গোল করে সর্বকালের সেরা গোলদাতার তালিকায় যৌথভাবে ষষ্ঠ স্থানে অবস্থান করছেন। জার্মানির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসার গড়া চারটি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ড থেকে তিনি মাত্র ৪ গোল দূরে রয়েছেন। এবারের আসরে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এমবাপ্পে চাইবেন যত দ্রুত সম্ভব এ মাইলফলক স্পর্শ করতে। সেনেগালের রক্ষণভাগের জন্য এমবাপ্পেকে আটকে রাখাটাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সেনেগালও ছেড়ে কথা বলার পাত্র নয়। কোচ পাপে থিয়াওয়ের অধীনে দলটি এখন একটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ৪-৩-৩ ফর্মেশনে সাজানো এ দলে যেমন একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড় রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন অভিজ্ঞ তারকারা। সেনেগালের রক্ষণভাগ সামলানোর দায়িত্বে থাকবেন কালিদু কুলিবালির মতো ডিফেন্ডার। তার সঙ্গে মুসা নিয়াখাতে, ইসমাইল জ্যাকবস ও অ্যান্টোনি মেন্ডির উপস্থিতি সেনেগালের রক্ষণভাগকে যথেষ্ট শক্তিমত্তা প্রদান করেছে। গোলপোস্টের নিচে এদুয়ার্দ মঁদির মতো অভিজ্ঞ গোলরক্ষক থাকায় সেনেগাল রক্ষণাত্মক দিক থেকে বেশ আত্মবিশ্বাসী।
মাঝমাঠে সেনেগালের মূল অস্ত্র পেপ মাতার সার, লামিন কামারা ও পেপ গে। ফরাসি মিডফিল্ডারদের টেক্কা দিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখার গুরুদায়িত্ব থাকবে এ ত্রয়ীর ওপর। তবে সেনেগালের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো তাদের আক্রমণভাগ। দলের প্রাণভোমরা সাদিও মানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং মাঠের যেকোনো পরিস্থিতি বদলে দেয়ার ক্ষমতা সেনেগালের জন্য বিশাল এক সম্পদ। তার সঙ্গে নিকোলাস জ্যাকসনের ক্ষিপ্রতা ও ইসমাইলা সারের উইং দিয়ে আক্রমণের দক্ষতা ফরাসি ডিফেন্ডারদের জন্য বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
ফ্রান্স যেখানে বল পজেশন ধরে রেখে এবং ছোট ছোট পাসের মাধ্যমে আক্রমণ শানাতে চাইবে, সেনেগাল সেখানে নির্ভর করবে তাদের শক্তিশালী রক্ষণ এবং দ্রুতগতির কাউন্টার-অ্যাটাকের ওপর। বিশেষ করে জ্যাকসন ও মানের গতিকে কাজে লাগিয়ে ফ্রান্সের হাই-লাইন ডিফেন্সের দুর্বলতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবেন সেনেগাল কোচ।














