১৯৯৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় ফ্রান্সের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্যারাগুয়ে। লাল কার্ডের কারণে জিনেদিন জিদান ছিলেন নিষিদ্ধ, ফরাসি আক্রমণ বারবার আটকে যাচ্ছিল হোসে লুইস চিলাভার্টের দেয়ালে। ম্যাচ গড়িয়েছিল অতিরিক্ত সময়ে। শেষ পর্যন্ত ১১৪ মিনিটে লরাঁ ব্লাঁর ‘গোল্ডেন গোল’ শুধু প্যারাগুয়েকেই বিদায় করেনি, খুলে দিয়েছিল ফ্রান্সের প্রথম বিশ্বজয়ের পথও। সেই শ্বাসরুদ্ধকর রাতের আটাশ বছর পর আবার শেষ ষোলোয় মুখোমুখি ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ে। আজ দিবাগত রাত ৩টায় শেষ আটে ওঠার লড়াইয়ে এবারো ফ্রান্স ফেভারিট, প্যারাগুয়ে আন্ডারডগ। কিন্তু এবারের প্যারাগুয়ে জার্মানিকে বিদায় করে আসা এক লড়াকু দলের গল্প। আজ থেকেই শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াই। দিনের প্রথম ম্যাচে রাত ১১টায় মুখোমুখি হবে কানাডা ও মরক্কো।
তবে দিনের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় লড়াইটি অপেক্ষা করছে ফিলাডেলফিয়ায়, যেখানে ফ্রান্সের দুর্বার আক্রমণভাগের সামনে দাঁড়াবে জার্মানিকে বিদায় করে আত্মবিশ্বাসে উজ্জ্বল প্যারাগুয়ে। দিদিয়ের দেশমের দলটি চলতি বিশ্বকাপে আক্রমণের ঝড় তুলেছে। গ্রুপ পর্বে সেনেগালকে ৩-১, ইরাককে ৩-০, নরওয়েকে ৪-১ গোলে হারানোর পর শেষ বত্রিশে সুইডেনকে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে তারা। চার ম্যাচে ১৩ গোল, হজম মাত্র ২টি। কিলিয়ান এমবাপ্পে একাই করেছেন ছয় গোল। ওসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিস, ব্র্যাডলি বারকোলা—সবাই মিলে ফরাসি আক্রমণভাগকে বানিয়েছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভয়ংকর বাহিনী। বেঞ্চে রায়ান শেরকি, ডিজায়ার দুয়ে, জঁ-ফিলিপ মাতেতার মতো বিকল্প থাকায় দেশমের হাতে আছে এমন অস্ত্রাগার, যা অধিকাংশ দলের কাছে ঈর্ষার বিষয়।
যে পরিসংখ্যান সব সময় ভাগ্য নির্ধারণ করে না, তা প্যারাগুয়ের চেয়ে ভালো কে জানে। শেষ বত্রিশে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানির সঙ্গে ১-১ ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে ইতিহাস গড়েছে গুস্তাভো আলফারোর দল। জুলিও এনসিসোর গোলে এগিয়ে যাওয়া, কাই হাভার্টজের সমতায় ফেরানো, এরপর অরল্যান্ডো গিলের বীরত্ব—সব মিলিয়ে সেই ম্যাচ প্যারাগুয়ের জন্য হয়ে উঠেছে নতুন জাতীয় মহাকাব্য। অথচ তাদের টুর্নামেন্টের শুরুটা ছিল ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ গোলে হেরে যাত্রা শুরু করেছিল প্যারাগুয়ে। সেখান থেকে তারা ঘুরে দাঁড়ায় তুরস্কের বিপক্ষে ১-০ জয়, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র এবং জার্মানির বিপক্ষে অবিশ্বাস্য লড়াই দিয়ে। শেষ তিন ম্যাচে মাত্র এক গোল হজম করেছে তারা। এ রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলাই ফ্রান্সের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে। প্যারাগুয়ের কোচ আলফারো তার দলকে ‘যোদ্ধা’ হিসেবেই দেখেন। জার্মানিকে হারানোর পর তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ছেলেরা মাঠে হৃদয় রেখে আসে। প্রতিপক্ষরা ইউরোপের সেরা একাডেমিতে গড়া। আমরা এসেছি লাল মাটি থেকে। সেই মাটিতেই খালি পায়ে খেলতে খেলতে স্বপ্ন দেখা শেখা।’
ফ্রান্সও তা জানে। দেশম সতর্ক করেছেন, প্যারাগুয়ে কাকতালীয়ভাবে এ পর্যায়ে আসেনি। তার ভাষায়, ‘আমি প্যারাগুয়েকে দেখেছি। তারা যা করেছে, তা দুর্ঘটনা নয়। তারা দক্ষিণ আমেরিকার আদর্শ দল, শক্তিশালী, খুব দৃঢ়, আবার ভালো খেলোয়াড়ও আছে।’ দেশম ১৯৯৮ সালের সেই ম্যাচেরও সাক্ষী। তখন তিনি ছিলেন অধিনায়ক, এবার কোচের ভূমিকায়।
প্যারাগুয়ের সবচেয়ে বড় প্রাচীর গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। বিশ্বকাপের আগে যার প্রথম একাদশে থাকা নিশ্চিত ছিল না, সেই ২৬ বছর বয়সী গোলরক্ষক এখন নতুন নায়ক। জার্মানির বিপক্ষে ছয়টি সেভ এবং টাইব্রেকারে দুটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে তিনি যেন চিলাভার্টের স্মৃতিকে ফিরিয়ে এনেছেন। চিলাভার্ট ছিলেন প্যারাগুয়ের কিংবদন্তি। গোলরক্ষক হয়েও ফ্রিকিক ও পেনাল্টি নিতে পারতেন, ছিলেন ব্যক্তিত্বে অদম্য। গিল হয়তো সেই অর্থে চিলাভার্ট নন, কিন্তু এ বিশ্বকাপে তার গ্লাভস প্যারাগুয়ের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আক্রমণে প্যারাগুয়ের সবচেয়ে বড় ভরসা জুলিও এনসিসো। ফরাসি লিগের পরিচিত মুখ এনসিসো বিশ্বকাপে এক গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করেছেন। জার্মানির বিপক্ষে তার হেডেই এগিয়ে গিয়েছিল প্যারাগুয়ে। বল পায়ে ড্রিবল, ছোট জায়গায় ঘুরে দাঁড়ানো, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া—সব মিলিয়ে তিনি ফ্রান্সের রক্ষণভাগের জন্য বড় হুমকি হতে পারেন। এনসিসো নিজেও জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমি যে কারো বিপক্ষে খেলতে প্রস্তুত। ফ্রান্স খুব ভালো দল, তাদের খেলোয়াড়রা উচ্চমানের। কিন্তু আমাদেরও শক্তি আছে। নিজেদের ধরনে আমরা তাদের আঘাত করতে চাই।’
দিনের প্রথম শেষ ষোলোর লড়াইয়ে অবশ্য নজর থাকবে আরেকটি জমজমাট দ্বৈরথেও। আজ রাত ১১টায় হিউস্টনে মুখোমুখি হবে সহআয়োজক কানাডা ও আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল মরক্কো। দুই দলের সাম্প্রতিক উত্থান, শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল ও দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণের কারণে ম্যাচটিকে শেষ ষোলোর সবচেয়ে সমানে সমান লড়াইগুলোর একটি মনে করা হচ্ছে।
কানাডা নকআউটে এসেছে আত্মবিশ্বাস নিয়ে। গ্রুপ পর্বে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পর শেষ বত্রিশে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছে তারা। জেসি মার্শের দলটি পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে নিজেদের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে উচ্চ গতির প্রেসিং, শারীরিক সক্ষমতা এবং দ্রুত ট্রানজিশন। আলফোনসো ডেভিসের গতি, জোনাথন ডেভিডের গোল করার দক্ষতা এবং ইসমাইল কোনোনের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ কানাডাকে প্রতিপক্ষের জন্য কঠিন পরীক্ষায় পরিণত করেছে। নিজেদের সমর্থকদের উপস্থিতিও তাদের বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগাবে।
অন্যদিকে মরক্কোও এসেছে দারুণ ছন্দে। গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের সঙ্গে ড্র করে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দেয়া দলটি শেষ বত্রিশে নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে হারিয়ে জায়গা করে নিয়েছে শেষ ষোলোয়। ওয়ালিদ রেগরাগুইয়ের দল আগের বিশ্বকাপের মতো এবারো সংগঠিত রক্ষণ, মাঝমাঠের শৃঙ্খলা এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণের ওপর ভরসা করছে। আশরাফ হাকিমির ডান প্রান্তের দৌড়, সোফিয়ান আমরাবাতের বল পুনরুদ্ধার এবং ইউসেফ এন-নেসিরির ফিনিশিং মরক্কোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
দুই দলের খেলার ধরনে মিলও রয়েছে। উভয়েই প্রতিপক্ষকে বেশি জায়গা না দিয়ে সুযোগ বুঝে দ্রুত আক্রমণে উঠতে পছন্দ করে। ফলে ম্যাচে বলের দখলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ছোট ছোট মুহূর্ত, ব্যক্তিগত নৈপুণ্য এবং সেট-পিস। মাঝমাঠে যে দল আধিপত্য বিস্তার করবে, তারাই ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে থাকবে।
এ ম্যাচের বিজয়ী কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ের মধ্যকার ম্যাচের জয়ী দলের। অর্থাৎ শেষ আটে ওঠার পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবেও দুই দলই গভীর আগ্রহ নিয়ে নজর রাখবে দিনের দ্বিতীয় ম্যাচটির দিকে।














