নারী ফুটবলে লাল-সবুজ পতাকায় রূপকথা লিখে চলেছেন ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, মারিয়া মান্দা, আফঈদা খন্দকার ও তাদের সতীর্থরা। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে তাদের যেন ধূমকেতুর মতোই আবির্ভাব। ভারত ও নেপালের আধিপত্য খর্ব করে টানা দুবার সাফ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে বাংলাদেশের মেয়েরা। মেয়েদের বিজয় নিশান এবার উড়ল এশিয়ান পর্যায়েও। বাছাই পর্বের বৈতরণী পেরিয়ে মেয়েরা যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ায়, যেখানে ২০২৬ সালের মার্চে বসছে এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব। বলতে গেলে এক দশক আগেই পথচলা শুরু হওয়া নারী ফুটবল দলটি ঈর্ষণীয় উন্নতি করে এবার খেলবে এএফসি এশিয়ান কাপে।
ইতিহাস গড়ে এশিয়া কাপে খেলতে যাচ্ছেন নারীরা। মেয়েদের ফুটবলে আগে কখনো এ কীর্তি ছিল না। ছেলেদের ফুটবলেও বাংলাদেশ মাত্র একবার খেলেছে এশিয়া কাপে। কুয়েতে অনুষ্ঠিত সে আসরে ১০ দলের একটি ছিল বাংলাদেশ। চার ম্যাচের সবগুলোয় হেরেছিল লাল-সবুজরা। ইরান ও চীনের কাছে বড় ব্যবধানে হারলেও উত্তর কোরিয়া (৩-২) ও সিরিয়ার সঙ্গে দারুণ লড়াই করে হেরেছিলেন কাজী সালাউদ্দিনরা। আশিতে সালাউদ্দিনরা এশিয়া কাপে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ৪৫ বছর পর আবারো দেশের পতাকা এশিয়ার মঞ্চে নিয়ে যাচ্ছেন ঋতুপর্ণারা। বাহরাইন ও মিয়ানমারকে টানা দুই ম্যাচে হারিয়ে ২০২৬ সালের ২১তম এশিয়া কাপ ফুটবলের টিকিট নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। তাদের এ সাফল্যে মাতোয়ারা দেশের ক্রীড়াঙ্গন।
বাংলাদেশে নারী ফুটবলের উত্থানের অন্যতম কারিগর সাবেক কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। তার অধীনে বাংলাদেশ দল বয়সভিত্তিক ফুটবলে সাফ ও অন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশকিছু সাফল্য পাওয়ার পর ২০২২ সালে নেপালকে তাদেরই মাঠে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সিনিয়র পর্যায়ে সাফ মুকুট জয় করে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে সেই কাঠমান্ডুতে সেই নেপালকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো সাফ শ্রেষ্ঠত্ব পায় বাংলাদেশ। এ যাত্রায় কোচ ছিলেন পিটার বাটলার। দলটি অবশ্য তার হাতই হাতে গড়া। দুটি সাফজয়ী ও মিয়ানমারে এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে সাফল্য পাওয়া বাংলাদেশ দলের অধিকাংশ খেলোয়াড় ছোটনের অবদান কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। তারই হাতে গড়া মেয়েরা যখন এশিয়ান পর্যায়ে খেলতে যাচ্ছেন সেই অর্জন ছুঁয়ে যায় এ কোচকে। গতকাল বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এ দলের অনেক দিনের সদস্য হিসেবে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। এটা ধারাবাহিকতার ফসল।’

জোড়া গোল করে মিয়ানমারকে হারানো ঋতুপর্ণা এখন প্রশংসায় ভাসছেন। এমনকি কোচ বাটলার বলেছেন, এই মেয়েটি সৌদি আরব কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো লিগে খেলার যোগ্যতা রাখেন। ঋতুপর্ণা এখন যেন ভেসে বেড়াচ্ছেন কল্পনার সুখরাজ্যে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ফেসবুক পাতায় শুক্রবার পোস্ট করা ভিডিওতে তিনি অনুভূতি ব্যক্ত করলেন এভাবে, ‘(এশিয়ান কাপের মূল পর্বে ওঠার) অনুভূতি আসলে বলে প্রকাশ করতে পারব না। আমরা যখন জানতে পারি যে আমরা কোয়ালিফাই করেছি, এটা আসলে কল্পনার বাইরে ছিল। আমরা বহু বছর পর এত কষ্ট করে এশিয়ান কাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছি। এটা আমাদের জন্য বড় অর্জন।’
বাংলাদেশের স্বপ্ন এখন আরো বড়—বিশ্বকাপ। সেই স্বপ্ন পূরণ খুব অসম্ভবও নয়। ১২ দলের এশিয়া কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা ৮ দলের সুযোগ থাকবে ২০২৭ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে খেলার। ৬টি দলের সরাসরি আর দুটি দলের প্লে-অফ খেলে। বাংলাদেশ সে সুযোগই কাজে লাগাতে চায়। অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার শুক্রবার বাফুফের পাঠানো ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘সবাই যেভাবে আমাদের সমর্থন করছেন, সেভাবেই করবেন। আমরা যেন আরো এগিয়ে যেতে পারি, সবাই দোয়া করবেন। দলকে বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখতে চাই। যেহেতু আমাদের সামনে সুযোগটা এসেছে, আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব সেটা কাজে লাগাতে।’
বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি রাখতে চায় না বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। সংস্থাটির নারী উইংয়ের চেয়ারপারসন মাহফুজা আক্তার কিরণ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা সামনে যে কয়টি মাস সময় এখন পাব, সেটাকে সেভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করব। কোচ পিটার বাটলারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য থাকবে (এশিয়া কাপে) প্রথম ছয়ে থাকা। বিশ্বকাপে খেলা আমার বড় স্বপ্ন। সেটি করতে আমরা প্রস্তুতির ঘাটতি রাখব না। আমরা অনেক বেশি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলব। বেশকিছু শক্তিশালী দলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলে নিজেদের প্রস্তুত করব আমরা। এমন প্রস্তুতি নেব যাতে এশিয়া কাপে ভালো করে বিশ্বকাপের স্বপ্নপূরণ করতে পারি।’
মেয়েদের অর্জনের পর সংবাদ সম্মেলনে আবেগাপ্লুত মাহফুজা আক্তার কিরণ বলেছেন, ‘এ অর্জনে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই বাংলাদেশ জাতীয় দলকে, আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই কোচিং স্টাফের সব সদস্যকে, ধন্যবাদ জানাই ফুটবল ফেডারেশনের সব নির্বাহী সদস্যকে। যে যেখান থেকে অবদান রেখেছেন সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।’
কিরণ বলেন, ‘তবে এখানেই শেষ নয়। লক্ষ্যটা সুদূরে। আপনারা জানেন, আমাদের এই জার্নি অনেক দিনের। মূলত এই জার্নিটার শুরু ২০০৮ থেকে। আপনারা আজ যে মহিলা ফুটবল দলটার সাফল্য দেখছেন তার সূচনা সেই ২০০৮ সালে যখন কাজী সালাউদ্দিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন। মেয়েদের ফুটবলটা তখন কোনোমতে চলছিল। ২০১২ সালটা ছিল টার্নিং পয়েন্ট। আমি একটা এনজিওর মাধ্যমে কিছু ফান্ড তুলে সারা দেশব্যাপী ট্যালেন্ট হান্ট করি এবং ঢাকার বাইরে সারা দেশের তিনটা ভেন্যুতে আমরা ক্যাম্প করি। সেখান থেকে আমরা ২১০ জনকে বাছাই করে তাদের নিয়ে রাজশাহীতে একটা টুর্নামেন্ট করি। সেখান থেকে ৪৬ জনকে বাছাই করে আমরা আমাদের ক্যাম্পে নিয়ে আসি। আজ যে ঋতুপর্ণা, মারিয়া, মনিকা, কৃষ্ণা, শামসুন্নাহারকে দেখতে পাচ্ছেন তারা সেই ট্যালেন্ট হান্টেরই প্রডাক্ট।’
মেয়েদের ফুটবলের সূচনাপর্ব নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। আমরা অনেক হার্ডল পার করেছি। তখনকার প্রেসিডেন্ট কাজী সালাউদ্দিনের সঙ্গে আমরা আলোচনা করলাম, মেয়েদের নিয়ে যদি অনেকদূর যেতে চাই তাহলে বছরব্যাপী ট্রেনিং করতে হবে। আমাদের বিদেশী ও দেশী কোচের সমন্বয়ে ভালো একটা কোচিং স্টাফ তৈরি করতে হবে। সেজন্যই কাজী সালাউদ্দিন তখন টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে পল স্মলিকে নিয়ে এসেছিলেন। স্মলি মেয়েদের টিমের সঙ্গেও কাজ করতেন। তখন আমাদের মেয়েদের দলের কোচ ছিলেন গোলাম রব্বানী ছোটন। তারও অনেক অবদান আছে। তিনি এ টিমের সঙ্গে অনেকদিন কাজ করেছেন। মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করেছেন। তার অবদানের জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তার অবদান আছে আজকের এ অবস্থানে আসার জন্য।’
এ নিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘আসলে আমরা যখন শুরু করি তখন আমাদের না ছিল কোনো টাকাপয়সা, না ছিল কোনো স্পন্সর। মেয়েদের ফুটবলের নাম শুনলে তখন সবাই দূরে সরে যেত। কারণ তখন মেয়েদের ফুটবল ওই পর্যায়ে ছিল না। ক্যাম্প শুরুর সময়ও আমাদের কোনো টাকা নেই। আমি প্রেসিডেন্ট সালাউদ্দিনকে জিজ্ঞেস করি, আমাদের তো কোনো টাকা নেই, কীভাবে হবে? তিনি বলেছিলেন, কিরণ তুমি শুরু করো। একটা কিছু হবে। আসলে তখন একটা কিছু হয়নি, হয়েছিল ২০১৮ সালে। শুরু থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই ক্যাম্পের যাবতীয় খরচ বহন করেছি আমি ও কাজী সালাউদ্দিন। আপনারা জানেন একটা ক্যাম্প চালাতে কী পরিমাণ খরচ হয়। মেয়েদের খাওয়া, ট্রেনিং। এখন তো মেয়েদের বাস আছে, তখন সেটাও ছিল না। তারা কমলাপুরে যাক কিংবা বঙ্গবন্ধুতে যাক, খরচ তো ছিলই। মেয়েদের পড়াশোনাও অব্যাহত রেখেছিলাম আমরা। চার-পাঁচটি টিউটর মিলিয়ে অনেক ব্যয়বহুল ছিল।’
স্মৃতিকাতর হয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক সংগ্রাম করেছি। আপনারা জানেন, মাঝে আমিও বড় অসুখে ভুগেছি। কেমো দিয়েই আমি জাপানে ছুটে গিয়েছিলাম মেয়েদের জন্য ফান্ড নিয়ে আসতে। সেখান থেকেই মেয়েদের টিমটা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজকের অবস্থানে।’
২০২৩ সালে অর্থাভাবে এই মিয়ানমারে প্যারিস অলিম্পিকের বাছাইপর্বে মেয়েদের খেলতে পাঠায়নি বাফুফে। তা নিয়ে অনেক বিতর্ক, অনেক সমালোচনা হয়েছে। এবার সেই মিয়ানমার থেকে যখন এশিয়া কাপের টিকিট পাওয়ার সুখবর এল তখন নিশ্চিতভাবেই অনুতাপ করেছেন বাফুফের কর্মকর্তারা। পেছনের ব্যর্থতা নিয়ে না ভেবে তারা বরং এশিয়া কাপে ওঠার সাফল্যই উদযাপন করতে চান।









