বিশ্বকাপ শুরু হলেই ফুটবলপ্রেমীদের চোখ চলে যায় মাঠের দিকে। কিন্তু মাঠের খেলার পাশাপাশি আরেকটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতাও চলে, কে সবচেয়ে বড় তারকা? কার জন্য স্টেডিয়ামে ভিড় জমে, কার নাম সবচেয়ে বেশি খোঁজা হয় ইন্টারনেটে, কার জার্সি সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়, আর কোন ফুটবলারের উপস্থিতি বিশ্বকাপকে নতুন মাত্রা দেয়?

গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই প্রশ্নের উত্তর ছিল দুটি নাম—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি। ২০০৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত পাঁচটি বিশ্বকাপজুড়ে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিলেন তারা। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রাক্কালে সেই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। ফুটবলবিশ্বের নতুন মুখ হয়ে উঠেছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, রোনালদো ও মেসির যুগ কি শেষ হয়ে এসেছে? নাকি এখনও বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তারাই?

টিকিট বিক্রির হিসাব বলছে, জনপ্রিয়তার লড়াইয়ে এখনও মেসির অবস্থান অটুট। আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোর টিকিট সবার আগে বিক্রি হয়ে গেছে। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক বিক্রি শুরু হওয়ার আগেই আর্জেন্টিনার ম্যাচের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। অনেকেই মনে করছেন, এটি হতে যাচ্ছে ৩৮ বছর বয়সী মেসির শেষ বিশ্বকাপ। ফলে তাকে শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে দেখার আগ্রহে দর্শকদের উন্মাদনা তুঙ্গে।

অন্যদিকে রোনালদোর পর্তুগাল ও এমবাপ্পের ফ্রান্সের ম্যাচগুলোর টিকিটও দ্রুত শেষ হয়ে গেছে। তবে পুনরায় বিক্রির বাজারে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে পর্তুগাল-কলম্বিয়া ম্যাচের টিকিট। কিছু ক্ষেত্রে এর দাম ১২ হাজার ডলার পর্যন্ত উঠেছে। তা সত্ত্বেও সামগ্রিক চাহিদার বিচারে মেসির আর্জেন্টিনা এখনও সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

তবে মাঠের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে চিত্রটি ভিন্ন। ২৭ বছর বয়সী এমবাপ্পে ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজের নাম উজ্জ্বলভাবে লিখে ফেলেছেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন তিনি। ২০২২ সালে গোল্ডেন বুট জিতেছেন। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ১৪ ম্যাচে তার গোল ১২টি, প্রতি ম্যাচে গড়ে ০.৮৬ গোল। তুলনায় মেসির ২৬ ম্যাচে ১৩ গোল এবং রোনালদোর ২২ ম্যাচে ৮ গোল।

বিশ্বকাপে গোল করার দক্ষতার বিচারে এমবাপ্পে বর্তমানে দুই কিংবদন্তিকেও ছাড়িয়ে গেছেন। মেসির গোল সংখ্যা ছাড়াতে তার প্রয়োজন মাত্র একটি গোল। অথচ তিনি খেলেছেন অনেক কম ম্যাচ। ফলে মাঠের পারফরম্যান্স বিবেচনায় ২০২৬ বিশ্বকাপে সবচেয়ে ভয়ংকর তারকা হিসেবে এমবাপ্পের নামই সামনে চলে আসে।

তবে বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াই নয়; এটি জনপ্রিয়তারও বিশ্বমঞ্চ। আর সেই জায়গায় এখনও রাজত্ব করছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। গুগলের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি খোঁজা ক্রীড়াবিদ তিনি। ২০২৬ সালের তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা যাচ্ছে, প্রতি মাসে গড়ে এক কোটির বেশি বার তার নাম সার্চ করা হচ্ছে। যা অন্য যেকোনো ফুটবলারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

মেসি ও এমবাপ্পে পরিসংখ্যানগতভাবে কাছাকাছি অবস্থানে থাকলেও রোনালদোর ডিজিটাল উপস্থিতি এখনও অতুলনীয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার আধিপত্য স্পষ্ট। ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারী সংখ্যা ৬৬ কোটি ৪০ লাখের বেশি। মেসির অনুসারী ৫০ কোটির বেশি হলেও এমবাপ্পে এখনো ১৩ কোটির ঘরে। ২০২৪ সালে রোনালদো প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সব সামাজিক মাধ্যম মিলিয়ে ১০০ কোটির বেশি অনুসারীর মাইলফলক স্পর্শ করেন।

অর্থনৈতিক শক্তির ক্ষেত্রেও রোনালদো এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ২০২৫ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়ের ক্রীড়াবিদ ছিলেন তিনি। ফোর্বসের হিসাবে তার বার্ষিক আয় ২৮ কোটি ডলার। সৌদি আরবের ক্লাব আল-নাসরের সঙ্গে চুক্তি ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন থেকে এই বিপুল আয় আসে। মেসির আয় প্রায় ১২ কোটি ডলার এবং এমবাপ্পের আয় প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

তবে বাণিজ্যিক সম্ভাবনার বিচারে অনেক বিশেষজ্ঞ এখন এমবাপ্পেকে এগিয়ে রাখছেন। কারণ তিনি এখনো ইউরোপের সবচেয়ে বড় ক্লাবগুলোর একটি রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলছেন। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রতিযোগিতামূলক লিগগুলোর একটিতে নিয়মিত গোল করছেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি। এর আগের মৌসুমেও ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন।

রোনালদো এখন সৌদি আরবে এবং মেসি যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে খেলছেন। ফলে বিশ্ব ফুটবলের মূল কেন্দ্রবিন্দু থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করছেন তারা। অন্যদিকে এমবাপ্পে প্রতিনিয়ত ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করছেন। স্পন্সর, সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে তাই তার মূল্য দ্রুত বাড়ছে।

তাহলে ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কে?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে কোন মানদণ্ডে বিচার করা হচ্ছে তার ওপর। যদি দর্শকদের আবেগ, স্টেডিয়ামের আকর্ষণ এবং বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করা হয়, তাহলে এখনও লিওনেল মেসি সবচেয়ে বড় নাম। যদি ডিজিটাল প্রভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বৈশ্বিক পরিচিতির কথা বলা হয়, তাহলে রোনালদোর ধারে-কাছেও কেউ নেই। আর যদি বর্তমান ফর্ম, মাঠের পারফরম্যান্স ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে এমবাপ্পেই ফুটবলের নতুন মুখ।