জসীমউদ্দীন কবিতায়, গানে, ছড়ায় এঁকেছেন বাংলার অনবদ্য রূপ। পল্লীকবির কবিতা পড়ে ছোটবেলায় কল্পনায় ঘুরে বেড়িয়েছি সুবিশাল নকশি কাঁথার মাঠে। গ্রামবাংলার রূপের অত প্রাণবন্ত বর্ণনা ক’জনই বা দিয়েছেন। একটু বড় হয়ে শুনেছি পাবলো পিকাসোর নাম। পিকাসো! কীসব দুর্দান্ত তুলির আঁচড়। যেমন দুর্দান্ত, তেমন কখনো কখনো দুর্বোধ্য। ওনারা শিল্পী। চির নমস্য। এমন অসামান্য যাদের কাজ তারা কীভাবে কবিতার ছন্দে বেঁধেছেন প্রকৃতির রূপ, কীভাবেই বা তুলির আঁচড়ে আঁচড়ে এঁকেছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমোহিত করে রাখার মতো ছবি! দেখতে বড় সাধ হতো।

জসীমউদ্দীন কিংবা পিকাসোর অমর সৃষ্টি গত শতাব্দীর নব্বইয়ে ধরাধামে আবির্ভূত শিশুর কাছে কেবলই ইতিহাস। তবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তারা বুনে দিয়ে গেছেন শিল্পের বীজ। তাই তো আমরা শিল্প খুঁজে পাই যেকোনো সৌন্দর্যে। সেই সৌন্দর্যের কারিগরদের বলি শিল্পী।

তেমনই এক শিল্পীর নাম লুকা মড্রিচ। ফুটবল মাঠে যার নৈপুণ্য পাবলো পিকাসোর ছবির মতো অনবদ্য। এই ক্রোয়েট জাদুকরের ছোঁয়ায় ফুটবল হয়ে উঠেছে নকশি কাঁথার মাঠের মতো শৈল্পিক। মাঠে তিনি নকশি কাঁথার কারিগর।

তিনি লুকা মড্রিচ। লুকিতা, লুকাএমটেন। কবি হয়ত তার কথাই লিখে গেছেন শতবর্ষ আগে -

"মোদের মেসের ইমদাদ হক আগে ছোটে বল লয়ে!

বাপ পায়ে বল ড্রিবলিং করে ডান পায়ে মারে ঠেলা,

ভাঙা কয়খানা হাতে পায়ে তার বজ্র করিছে খেলা।

চালাও চালাও আরও আগে যাও বাতাসের মত ধাও,

মারো জোরে মারো- গোলের ভেতরে বলেরে ছুঁড়িয়া দাও।"

সত্যিই! যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বেড়ে ওঠা মড্রিচ তো পল্লীকবি জসিমউদ্দীনের কবিতার ইমদাদ হকের মতোই! হাত-পা হয়ত ভাঙেনি, কিন্তু প্রাণটা হাতে করে বড় হয়েছেন বহু প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে। তাই তার পায়ে বজ্র খেলা করত। চেলসির রক্ষণভাগকে স্রেফ দর্শক বানিয়ে রদ্রিগোকে ছোড়া ট্রাভেলা পাস কিংবা প্যারিসের সাতজন খেলোয়াড়কে সম্মোহিত করে মড্রিচের বাড়ানো বল থেকে মাদ্রিদ জন্ম দিয়েছে বহু কিংবদন্তির। ২০১৪ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে ৯২.৪৮ মিনিটে সার্জিও রামোসের সেই বিখ্যাত গোলের কথা কার না মনে আছে? ফুটবলের পাঁড়ভক্তরা জানেন, কর্নার থেকে জাদুকরি কিকটা নিয়েছিলেন লুকা।

3ee09167-3d84-4179-a583-0822ad50f70e

স্বর্ণকেশি লুকার জন্ম ১৯৮৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ার উপকূলবর্তী কাউন্টি জাদারের এক হাসপাতালে। তাদের বাড়ি নিকটবর্তী মড্রিচি গ্রামে। বয়স যখন মাত্র ছয়, তখন লুকার দেশে বেজে উঠল যুদ্ধের দামামা। ১৯৯১ থেকে ‘৯৫ পর্যন্ত চলা যুদ্ধে সার্বিয়ান প্যারামিলিটারি বাহিনীর হাতে নিহত হন তার দাদা। যুদ্ধের লেলিহানে বাস্তুহারা পরিবারটি আশ্রয় নেয় জাদার শহরের শরণার্থী হোটেলে। সেই জায়গাটিও খুব একটা নিরাপদ ছিল না। মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা অবিরাম স্নাইপার আর শেলের গোলাবর্ষণে। এমন শ্বাপদসঙ্কুল পরিবেশেই ফুটবলকে ভালোবাসতে শিখলেন ছোট্ট লুকা। কে জানত শৈশবের সেই ভালোবাসায় ভর করে একদিন তিনিই ক্রোয়েশিয়াকে নতুন করে চেনাবেন বিশ্বমঞ্চে!

সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা উঠে আসে মড্রিচের বায়োগ্রাফি মোয়া ইগ্রাতে, ‘আমি সেসব দিনগুলোর কথা খুব একটা কথা বলি না। ছেলেবেলার সময়টা ছিল খুব কঠিন। যুদ্ধ আমাদের থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু সেই কঠিন বাস্তবতাই আজ আমাকে আমি হিসেবে গড়ে তুলেছে।’

‘৯০ দশকের শুরুর দিকেই লুকা নাম লেখান এনকে জাদার ইয়ুথ অ্যাকাডেমিতে। টিঙটিঙে গড়ন কিন্তু অসামান্য কারিকুরি জানা রত্নটিকে চিনতে একদমই ভুল করেননি কোচ টমিস্লাভ বাসিচ। তাই যুদ্ধে সর্বহারা পরিবারের শিশুটিকে বুট আর ট্রেনিং কিট দিয়ে সহায়তা করেন তিনি। ছোট্টবেলার সেই গুণ ছিল মড্রিচের পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে। ছন্দময়, পরিশ্রমনির্ভর, কার্যকর খেলা। মাঠে পরিস্থিতি বুঝে চমৎকার খেলতে পারা মড্রিচকে ব্যক্তিজীবনেও লোকে জানে নিপাট ভদ্রলোক হিসেবে। দম্ভ নেই, অহমিকা নেই। নিভৃতে পালন করে গেছেন অর্পিত দায়িত্ব। দলের প্রয়োজনে খেলেছেন সেন্ট্রাল মিড থেকে অ্যাটাকিং মিড এমনকি ডিফেন্সিভ মিডেও। কারণ তিনি পারতেন মাঝমাঠকে চমৎকার কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করতে। টনি ক্রুস আর ক্যাসেমিরোর সঙ্গে মিলে তো গড়ে ফেললেন পরপর তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের ইতিহাস।

fe610e4b-1770-4bb8-a314-ab46ce3b930e

চড়াই-উৎরাই ছিল তার নিত্যসঙ্গী। স্বদেশি ক্লাব ডায়নামো জাগরেবের হয়ে তার ক্লাব ফুটবলে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু। ছিলেন ২০০৬ থেকে ২০০৮ টানা তিনটি ঘরোয়া শিরোপাজয়ী দলের সদস্য। এরপর তাকে ধারে পাঠানো হয় বসনিয়ার জ্রিঞ্জিস্কি মস্টার ও ইন্টার জাপ্রেসিচে। অল্প কিছুদিন এসব জায়গায় খেলে পাড়ি জমান ইংলিশ ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারে। সেখানেই মড্রিচ হয়ে ওঠেন প্লেমেকার। ২০১০-১১ মৌসুমে স্পার্সের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনাল যাত্রায় রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

২০১২ সালের আগস্টে ৩০ মিলিয়ন ইউরোর চড়াদামে তাকে দলে ভেড়ায় স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ। মাদ্রিদে এসে মড্রিচ দেখলেন মুদ্রার উল্টোপিঠ। কারণ রাজকীয় সাদা জার্সির ভক্তরা অল্পতে তুষ্ট নন! তাদের চাই সেরার সেরা। তাই মাঝমাঠে ঘুরে বেড়ানো মড্রিচের কপালে জুটল সর্বকালের ফ্লপ সাইনিংয়ের তকমা! সোনালি চুলের ক্রোয়েট জাদুকর তখনও তার খেল আরম্ভ করেননি।

কিন্তু হীরে চিনতে ভুল না করা জহুরি হোসে মরিনহো তাই সম্প্রতি বলেন, ‘লুকা মড্রিচ ফুটবলের সৌন্দর্য। সে আমার গর্ব। কারণ আমি যখন তাকে এনেছিলাম কেউ বিশ্বাসই করেনি লুকা ১২, ১৩, ১৪ বছর ধরে মাদ্রিদে খেলবে। কিন্তু আজও সে এখানে। তাই তাকে নিয়ে আমি গর্ব করি।’

কম কী দিয়েছেন মাদ্রিদকে? পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতাতে রেখেছেন বড় ভূমিকা। মাঝমাঠ সেরাদের সেরা না হলে কার সাধ্য এমন সাফল্য ছোঁয়? মাদ্রিদ ক্যারিয়ারে জিতেছেন তিনটি লা লিগা। আরও আছে কোপা দেল রে, সুপার কোপা ডি এস্পানা আর ক্লাব বিশ্বকাপের ট্রফি।

ক্রোয়েট জাতীয় দলের হয়ে মড্রিচ প্রথম মাঠে নামেন ২০০৬-এ। এ পর্যন্ত খেলেছেন ১৭০টিরও বেশি ম্যাচ। পাদপ্রদীপের আড়ালে থেকে ২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া যে রানার্স আপ হয়েছিল তার পেছনে মূল কৃতিত্বটা কিন্তু তারই। স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় তথা গোল্ডেন বল। পরেরবার অর্থাৎ ২০২২ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া হয় তৃতীয়।

রোনালদো-মেসির যুগে আলোচনায় আসতে পেরেছেন খুব অল্প কয়েকজন ফুটবলার। তাদেরই একজন লুকা মড্রিচ। তারই প্রমাণ ২০১৮ ব্যালন ডি’ অর ও ফিফা বেস্ট ম্যানস প্লেয়ার অ্যাওয়ার্ড।

মড্রিচ সেই বুড়ো মেশিন, চালু হলে যার দম সহজে ফুরোয় না। তাই তো ক্যারিয়ারে খেলেছেন ৮০০টিরও বেশি ম্যাচ। বয়সটা ৩৯, কিন্তু এই তো সেদিনও খেলেছেন ছেলের বয়সী রদ্রিগো, ভিনিসিয়াসদের সঙ্গে। ক্লাব সতীর্থ রদ্রিগো তো তাকে ‘পাপা’ বলেই ডাকেন! বয়স বেড়ে গেলেও টগবগে তরুণদের মতোই খেলতে পারতেন পুরো ম্যাচজুড়ে। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ সাজিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে কিংবা দলের বিপদে নিজেদের ডিবক্সের আশেপাশে, কোথায় ছিল না তার বিচরণ!

60fef124-ba74-4a4d-8884-d38d791f3f13

ডায়নামো জাগরেবে ১১২ ম্যাচে ৩১, জ্রিঞ্জিস্কি মস্টারের হয়ে ২২ ম্যাচে ৮, ইন্টার জাপ্রেসিকে ১৮ ম্যাচে ৪, টটেনহ্যামে ১২৭ ম্যাচে ১৭ আর রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সুদীর্ঘ ১৩ বছরে ৪৮৮ ম্যাচে করেছেন ৩৭ গোল। অর্থাৎ ক্লাব ক্যারিয়ারে মোট ৭৬৭ ম্যাচে ৯৭ গোল করেছেন লুকা। জাতীয় দলে এ পর্যন্ত ১৮৬ ম্যাচ খেলে করেছেন ২৭ গোল। গোলের পরিসংখ্যানে মড্রিচদের মাপা যায় না। মড্রিচের করা গোলগুলোর বেশিরভাগেই গোলকিপাররা কেবল মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখেছেন ইন্দ্রঘূর্ণিতে ঘুরতে থাকা বলের জালে জড়ানোর দৃশ্য।

অবশেষে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে শেষ ম্যাচটা খেলে ফেলেছেন লুকা। আবারও মনে পড়ে পল্লীকবির কথা-

“উইড়া যায়রে হংস পক্ষি পইড়া রয়রে ছায়া ;

দেশের মানুষ দেশে যাইব- কে করিবে মায়া।”

মড্রিচ ফের ক্রোয়েট কোনো ক্লাবে খেলবেন কি-না কে জানে? হয়ত খুব শিগগিরই তুলে রাখবেন বুটজোড়া। জাদুকররা যত বুড়ো হন, তত বাড়ে তাদের কারিশমা। মড্রিচের বেলায়ও তাই। ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল ৩৮ বছর ২৩৪ দিন বয়সে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে মাঠে নামার রেকর্ডটি নিজের করে নেন তিনি। ওই বছরেরই জুলাইয়ে ৩৮ বছর ২৮৯ দিন বয়সে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে গোল করে সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলস্কোরার বনে যান স্বর্ণকেশী ক্রোয়েট। তিনি শিল্পী নাকি জাদুকর, নাকি শৈল্পিক জাদুকর…সে প্রশ্ন তোলা থাক।

মড্রিচকে বিদায় জানিয়ে মাদ্রিদের দেওয়া ফেসবুক পোস্টকে উদ্ধৃত করেই শেষ করি, “এই পথচলা শেষ বলে ব্যথিত নই, আমি বরং আনন্দিত কারণ এই যাত্রা একদিন শুরু হয়েছিল।” সত্যিই মড্রিচকে আর মাদ্রিদের ১০ নম্বর জার্সিতে দেখা যাবে না। কিন্তু তার উপহার দেওয়া একেকটি কবিতার স্মৃতি রোমন্থন করে কাটিয়ে দেওয়া যাবে অজস্র মুহূর্ত। আজ থেকে মাদ্রিদের ১০ নম্বর জার্সির ওজন বেড়ে গেল বহুগুণ!