২৬ জন যোদ্ধা, একসঙ্গে জাতীয় সংগীত গাইতে গাইতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরা, আর মাঠ ছেড়ে যাওয়ার সময় প্রত্যেকে যেন কিংবদন্তি হয়ে ফিরবে—এ ছিল তার দর্শন। রোমান্টিক, কিছুটা অতিনাটকীয়ও বলা যায়, কিন্তু ফল তো সামনেই। লিওনেল স্কালোনি এ পথের ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়ানো। যদিও টেলিভিশনের পর্দায় তাকে একবার স্পার্টান শিরস্ত্রাণ আর তলোয়াল হাতে দেখা গিয়েছিল, বাস্তবে তার কথাবার্তায় নেই কোনো রণহুংকার, নেই বীরত্বের বাগাড়ম্বর। প্রতিপক্ষকে সম্মান করা, প্রস্তুতি নেয়া, লড়াই করতে জানা আর কষ্ট সহ্য করতে শেখা—এ শব্দগুলোই তার মুখে ঘুরেফিরে আসে। জর্ডানের বিপক্ষে জয়ের পর তিনি বলেছিলেন, প্রতিটি ম্যাচেই পেটের ভেতর কিছু একটা অনুভব করেন, বন্ধুত্বপূর্ণ ম্যাচ হোক বা ফাইনাল কোনো তফাত নেই। সহজ ম্যাচ বলে কিছু হয় না, কারণ তারা নিজেরাই নিজেদের সেই জায়গায় রাখেন। যেদিন এ অনুভূতিটা হারিয়ে যাবে, সেদিনই বিপদ।

কেপ ভার্দের বিপক্ষে এ দর্শনই মেসি-মার্তিনেজ, আলভারেজদের সাফল্যের মন্ত্র হতে পারে। ২০১৮ সালে ভারপ্রাপ্ত কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার সময় খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেছিলেন স্কালোনির হাত ধরে আর্জেন্টিনা নতুন যুগে প্রবেশ করবে। অথচ সেই দলই ২০২১ সালে দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপাখরা কাটিয়ে কোপা আমেরিকা জেতে। এরপর আসে ২০২২ বিশ্বকাপের মহিমা, ২০২৪ কোপা আমেরিকার শিরোপা এবং এখন টানা আরেকটি বিশ্বকাপ অভিযানে অন্যতম ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামা।

শনিবার ভোরে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচটি হবে স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনার শততম ম্যাচ। প্রথম ৯৯ ম্যাচে তার অর্জন ৭২ জয়, ১৮ ড্র ও মাত্র ৯ হার—যা জাতীয় দলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা রেকর্ড। শততম ম্যাচের মাইলফলকেও স্কালোনি ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখতে রাজি নন, বরং তার দৃষ্টি পুরোপুরি দলের ওপর। তিনি জানেন, ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বর্তমান ম্যাচে মনোযোগ ধরে রাখা। কারণ বিশ্বকাপে এক মুহূর্তের অসতর্কতাই পুরো যাত্রাপথ বদলে দিতে পারে।

গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়াকে ৩-০, অস্ট্রিয়াকে ২-০ এবং জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রায় নিখুঁত পারফরম্যান্স দেখিয়েছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু সেই সাফল্যও স্কালোনিকে আত্মতুষ্ট করেনি।

স্কালোনির দর্শনের সঙ্গে অনেকেই মিল খুঁজে পান আর্জেন্টিনার বাস্কেটবলের ‘গোল্ডেন জেনারেশন’-এর। সেই দলের কিংবদন্তি মানু জিনোবিলি একবার বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশে অনেকে মনে করে শুধু সাহস আর হৃদয় দিয়েই সব জেতা যায়। কিন্তু আসলে জিততে হলে আগে ভালো খেলতে হয়, তারপর তার সঙ্গে সাহস যোগ করতে হয়।’ তার এ দর্শনের প্রতিফলন যেন দেখা যায় স্কালোনির দলেও। আবেগ আছে, লড়াই আছে, কিন্তু সবকিছুর আগে আছে সুশৃঙ্খল ফুটবল।

বিশ্বকাপের পরবর্তী ম্যাচগুলো আপাতদৃষ্টিতে আর্জেন্টিনার জন্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক। সেমিফাইনালের আগে তাদের সামনে ফিফা র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ দশের কোনো দল কিংবা বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পর্যায়ের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নেই। কিন্তু স্কালোনির দৃষ্টিতে সেটিই সবচেয়ে বড় ফাঁদ হতে পারে। কারণ শক্তিশালী দলের বিপক্ষে সতর্ক থাকা সহজ, কিন্তু অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মনোযোগ ধরে রাখাই সবচেয়ে কঠিন।

তাই মায়ামিতে কেপ ভার্দের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি কৌশলগত নয়, মানসিক। স্কালোনি চান তার দল যেন প্রতিটি ম্যাচকে ফাইনাল মনে করে খেলতে নামে। কারণ অঘটন কখনো হঠাৎ ঘটে না; আত্মতুষ্টির ছোট্ট একটি ফাঁক দিয়েই তা মাঠে ঢুকে পড়ে। স্কালোনির ভাষায় সেই ফাঁক বন্ধ রাখার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যাওয়া। সেই দর্শনই এখন মেসিদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।