সেবার মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এ মঞ্চেই বুলগেরিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে শেষবার জয়ের উৎসব করেছিল ‘এল ত্রি’। এরপর কেটে গেছে প্রায় চার দশক। প্রজন্ম বদলেছে, বদলেছে বিশ্বকাপের মানচিত্র; কিন্তু মেক্সিকোর জন্য নকআউটের দরজা বারবার বন্ধই থেকেছে। গতকাল সেই আজতেকাতেই, একই ২-০ ব্যবধানে একুয়েডরকে হারিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অভিশাপ ভাঙল স্বাগতিকরা। বজ্রপাতের কারণে ১ ঘণ্টা দেরিতে শুরু হওয়া রাতটিও শেষ পর্যন্ত রূপ নিল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিতে। হুলিয়ান কিনিওনেস ও রাউল হিমেনেসের গোলে একুয়েডরকে বিদায় করে শেষ ষোলোতে পা রাখল মেক্সিকো।

ম্যাচ শুরুর নির্ধারিত সময়ের আগেই আজতেকার আকাশে দেখা দেয় বজ্রপাত। নিরাপত্তার কারণে প্রায় ১ ঘণ্টা পিছিয়ে দেয়া হয় ম্যাচ। কিন্তু সেই বিরতি গ্যালারির আবেগকে একটুও স্তিমিত করতে পারেনি। হাজারো মেক্সিকান সমর্থকের কণ্ঠে স্টেডিয়াম তখনো প্রকম্পিত। খেলা শুরু হতেই সেই আবেগ যেন মাঠেও ছড়িয়ে পড়ে।

শুরুর বাঁশি থেকেই একুয়েডরকে চেপে ধরে হাভিয়ের আগিরের দল। বলের দখল, আক্রমণের গতি ও উচ্চ প্রেসিং সবকিছুতেই এগিয়ে ছিল স্বাগতিকরা। একুয়েডরের রক্ষণ প্রথম থেকেই চাপে পড়ে যায়। সেই চাপেরই প্রতিফলন আসে প্রথমার্ধে।

মাত্র ৯ মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয় মেক্সিকো। প্রথম গোলটি আসে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা হুলিয়ান কিনিওনেসের পা থেকে। বক্সের বাইরে থেকে নেয়া জোরালো শটে একুয়েডরের গোলরক্ষককে কোনো সুযোগই দেননি তিনি। এবারের বিশ্বকাপে এটি তার তৃতীয় গোল।

এরপর ব্যবধান দ্বিগুণ করেন অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার রাউল হিমেনেস। নিখুঁত ফিনিশিংয়ে গোল করে জাতীয় দলের হয়ে নিজের গোলসংখ্যা বাড়িয়ে নেন ৪৭-এ। এর মাধ্যমে জারেদ বোরগেত্তিকে ছাড়িয়ে মেক্সিকোর ইতিহাসে এককভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি। সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হাভিয়ের ‘চিচারিতো’ হার্নান্দেজকে স্পর্শ করতে এখন তার প্রয়োজন আর পাঁচটি গোল।

দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে একাধিক পরিবর্তন এনে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে একুয়েডর। কিছু সময় বলের দখল বাড়ালেও মেক্সিকোর সুসংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে পারেনি তারা। পুরো ম্যাচে আগিরের দল ছিল শৃঙ্খলাবদ্ধ। মাঝমাঠে প্রতিপক্ষকে জায়গা না দিয়ে দ্রুত বল পুনরুদ্ধার করেছে, আবার প্রয়োজন হলে নিচে নেমে রক্ষণও সামলেছে। ফলে একুয়েডর বড় কোনো সুযোগই তৈরি করতে পারেনি।

যোগ করা সময়ে একুয়েডরের হতাশা আরো বাড়ে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা বলার সময় মুখ ঢেকে রাখায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেন ডিফেন্ডার পিয়েরো ইনকাপিয়ে। ১০ জনের দলে পরিণত হয়ে শেষ বাঁশির অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না দক্ষিণ আমেরিকার দলটির।

ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত মেক্সিকান কোচ আগিরে বলেন, ‘প্রায় ৪০ বছর পর আজতেকাকে আবার এমন দেখলাম। আমরা অনেক বড় জয় পেয়েছি, কিন্তু এ জয়ের মতো নয়। কারণ আমরা ঘরের মাঠে, আমাদের সমর্থকদের সামনে জিতেছি। তারা আজ নিজেদের হৃদয় উজাড় করে দিয়েছে।’ খেলোয়াড়ি জীবনেও একাধিকবার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার স্বপ্নভঙ্গের সাক্ষী ছিলেন আগিরে নিজেই। তাই এ জয় তার কাছেও অন্য রকম। ‘আমি সেই খেলোয়াড়দের একজন, যারা কখনো পঞ্চম ম্যাচ খেলতে পারেনি। গ্রুপ পর্ব পেরিয়েও একটি ভুলে সব শেষ হয়ে যেত। আজ সমর্থকদের সঙ্গে আমাদের যে সংযোগ তৈরি হয়েছিল, সেটাই আমাদের বাড়তি শক্তি দিয়েছে’—বলেন তিনি।

ইতিহাসও নতুন করে লিখেছে মেক্সিকো। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনো কনমেবল দলের বিপক্ষে জয় পাওয়া প্রথম কনকাকাফ প্রতিনিধি এখন তারা। এর আগে দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর বিপক্ষে নকআউটে পাঁচটি ম্যাচ খেলেও জয়ের দেখা পায়নি উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কোনো দল। ঘরের মাঠে মেক্সিকোর আধিপত্যও অব্যাহত থাকল। আজতেকায় প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে ৮৯ ম্যাচে মাত্র দুটি হার তাদের। জিতেছে ৭০টি। আর মেক্সিকো সিটিতে বিশ্বকাপের ১০টি ম্যাচ খেলেও এখনো অপরাজিত এল ত্রি।

এবারের বিশ্বকাপে তাদের শুরুটাও ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। প্রথম চার ম্যাচে কোনো গোল না খেয়ে জয় পাওয়া বিশ্বকাপ ইতিহাসের মাত্র চতুর্থ দল এখন মেক্সিকো।

এ যাত্রায় সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম হুলিয়ান কিনিওনেস। কলম্বিয়ায় জন্ম হলেও ক্লাব ফুটবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মেক্সিকোয়। অ্যাটলাস ও ক্লাব আমেরিকার হয়ে সাফল্যের পর নাগরিকত্ব নিয়ে বেছে নেন মেক্সিকোর জার্সি। বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা, চেক প্রজাতন্ত্রের পর এবার একুয়েডরের বিপক্ষেও গোল করে দলের অন্যতম ভরসায় পরিণত হয়েছেন তিনি।

ম্যাচ শেষে কিনিওনেস বলেন, ‘আমাদের এখনো অনেক পথ বাকি। মানুষকে আরো আনন্দ দিতে হলে আরো কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলের সাফল্যই আমার কাছে বড়। এ জার্সি গায়ে খেলতে পারাটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।’

চার দশকের অভিশাপ ভাঙার আনন্দে এখন উচ্ছ্বসিত পুরো মেক্সিকো। কিন্তু একটি জয়েই তাদের তৃষ্ণা মিটে যাওয়ার কথা নয়। যে স্বপ্নের নতুন অধ্যায় আজতেকায় শুরু হয়েছে, সেটি বিশ্বকাপের মঞ্চে কত দূর গড়ায়, এখন সেটিই দেখার।