২০২৬ বিশ্বকাপ ৪৮ দলে সম্প্রসারণ, নতুন ক্লাব বিশ্বকাপ, বিপুল বাণিজ্যিক আয়ের মতো বড় বড় সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তার অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনার কারণে সেই শক্ত অবস্থানেই এখন বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। ফুটবল মহলে অনেকেই এটিকে ইনফান্তিনোর সভাপতিত্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখছেন। যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত বিতর্কিত এ পরিকল্পনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ঘটনা নয়; বরং ফিফার অভ্যন্তরে ইনফান্তিনোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন, নেতৃত্বের প্রতি আস্থা এবং আগামী নির্বাচনে তার ভবিষ্যৎ—সবকিছুকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বিতর্কিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক ও পরিচালনাগত কার্যক্রম একটি পৃথক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অধীনে নেয়া হতো। সেই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির সুযোগ তৈরি করা ছিল মূল লক্ষ্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এতে ফিফা নতুন বিনিয়োগ পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে আয় বাড়বে।
ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফাসহ একাধিক মহাদেশীয় কনফেডারেশন শুরু থেকেই এর তীব্র বিরোধিতা করে। তাদের অভিযোগ, ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদকে কার্যত বেসরকারি পুঁজির হাতে তুলে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমনকি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ইউরোপীয় দেশগুলো ফিফার প্রতিযোগিতা বয়কটের কথাও আলোচনায় আসে। প্রবল চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত ইনফান্তিনো নিজেই পরিকল্পনা বাতিলের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন পক্ষের মতামত শুনে স্পষ্ট হয়েছে যে প্রস্তাবটি ফিফার ভেতরে বিভাজন তৈরি করেছে। তাই এটি আর এগিয়ে নেয়া হবে না।’
পরিকল্পনা প্রত্যাহার করেও বিতর্ক থামেনি, বরং ফিফার অভ্যন্তরে এ প্রকল্প ঘিরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো এবং প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) কেভিন লামুর পদত্যাগ করেন। বিদায়ী বক্তব্যে লামুর মন্তব্য করেন, এটি ছিল ‘একজন ব্যক্তির প্রকল্প’, যা মূলত ইনফান্তিনোর একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকেই ইঙ্গিত করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া এসেছে উয়েফার দিক থেকে। সংস্থাটির সহসভাপতি লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার বলেন, ‘গত এক সপ্তাহের ঘটনায় ফিফা সভাপতির প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার ভাষায়, এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, বিশ্ব ফুটবলকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য ইনফান্তিনোই সঠিক নেতা কিনা?’
ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা এখন তাই আরো জোরালো। ২০১৬ সালে সেপ ব্ল্যাটারের দুর্নীতিকাণ্ডের পর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। এরপর টানা দুই মেয়াদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হন। আগামী বছরের মার্চে মরক্কোতে অনুষ্ঠিতব্য ৭৭তম ফিফা কংগ্রেসেও তার সহজ জয় হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংকট সেই হিসাব বদলে দিতে শুরু করেছে।
যদিও অনেক সাবেক কর্মকর্তা মনে করেন, এখনই তার বিদায় নিশ্চিত বলা যাবে না। ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান ডেভিড বার্নস্টেইনের মতে, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন সংকট তৈরি হলে প্রধান নির্বাহীর পদ টিকিয়ে রাখা কঠিন হতো। তবে ফিফায় সভাপতির ভাগ্য নির্ধারণ হয় জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনগুলোর ভোটে। আর সেখানেই এখনো ইনফান্তিনোর শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে।
তবু তার বিকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফের সভাপতি ভিক্টর মন্টাগ্লিয়ানি, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা এবং ফিফার মহাসচিব ম্যাটিয়াস গ্রাফস্ট্রমের নাম আলোচনায় রয়েছে। যদিও পিএসজি সভাপতি ও ইউরোপিয়ান ক্লাব অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান নাসের আল-খেলাইফির নামও শোনা যাচ্ছে।
তবে তার ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন তিনি ফিফা সভাপতির পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী নন।
ফিফা সভাপতির মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ সময় আগামী ১৮ নভেম্বর। এরপর শুরু হবে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী লড়াই। ফলে আগামী কয়েক মাসই নির্ধারণ করবে, ইনফান্তিনো সাম্প্রতিক এ সংকট কাটিয়ে আবারো নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন, নাকি বিশ্ব ফুটবল নতুন নেতৃত্বের দিকে এগোবে।









