লেক অন্টারিও থেকে ভেসে আসা শীতল বাতাস যখন বিকালের সেই তাপ প্রবাহকে কিছুটা প্রশমিত করল, ঠিক তখনই ফুটবলের দুই প্রবাদপ্রতিম প্রতিভার সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপের মুখোমুখি লড়াইয়ে ঝরতে শুরু করল বারুদ। বিরতির পর ইভান পেরিসিচের গোলে যখন এগিয়ে গেল মডরিচের দল, তখন পর্তুগালের স্বপ্নে জমতে শুরু করেছিল বিদায়ের অন্ধকার। পর্তুগাল স্তব্ধ, কিন্তু তখনো দিগন্তে ছিল অন্ধকারের আগের শেষ আলো। সেই আলোই রোনালদো। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এতদিন যে গোলটি তার কাছে অধরাই ছিল, ফুটবল জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে ঠিক সেটিই পেলেন তিনি। ৬৮তম মিনিটে পেনাল্টি স্পট থেকে চরম স্নায়ুচাপেও অবিচল থেকে জাদুকরী লক্ষ্যভেদ করলেন ৪১ বছর বয়সী এ মহাতারকা। চিরচেনা ‘সিউউউ’ ধ্বনিতে কেঁপে উঠল পুরো স্টেডিয়াম।

নাটকের তখন কেবল শুরু। সমতার স্বস্তি যখন ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, ঠিক ৯৪তম মিনিটে গনসালো রামোসের জাদুকরী হেডে জয় নিশ্চিত করে ফেলে পর্তুগাল। পর্তুগিজদের সেই বুনো উদযাপন এতই দীর্ঘ ছিল যে রেফারিকে সময় আরো বাড়াতে হয়। আর সেই বাড়তি সময়েই লুকিয়ে ছিল আসল ক্লাইম্যাক্স। ১০৩তম মিনিটে ক্রোয়েশিয়ার জসকো ভার্দিওল বল জালে জড়ালে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধতা নেমে আসে। বেঞ্চে বসা রোনালদোর মুখ ঢেকে যায় চরম হতাশায়। কিন্তু ভিএআরের নিপুণ কাটাছেঁড়ায় অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পর্তুগিজ শিবির। হাসি, কান্না আর বুকচেরা দীর্ঘশ্বাসের অদ্ভুত এক দোলাচলের ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করে রোনালদোর পর্তুগাল। সেখানে তাদের অপেক্ষায় আরেক ইউরোপীয় পরাশক্তি স্পেন।

ম্যাচের শুরুর দিকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল পর্তুগালের হাতে। বলের দখল, আক্রমণের গতি, উইং দিয়ে ওঠানামা সবকিছুতেই এগিয়ে ছিল তারা। রাফায়েল লেয়াও বাম প্রান্তে একের পর এক দৌড়ে ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণকে অস্থির করে তুলছিলেন। অষ্টম মিনিটেই তার কাটব্যাক থেকে ব্রুনো ফার্নান্দেসের পরপর দুটি শট ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক দোমিনিক লিভাকোভিচ। এরপর পেদ্রো নেতোর একের পর এক বিপজ্জনক ক্রসেও গোলের দেখা মেলেনি। কখনো রোনালদো, কখনো ব্রুনো কেউই শেষ ছোঁয়াটা দিতে পারেননি।

আক্রমণের ঢেউ সামলেও ক্রোয়েশিয়া ছিল অটল। মাঝমাঠে লুকা মডরিচ, মাতেও কোভাচিচ ও পেতার সুচিচের নিয়ন্ত্রিত ফুটবল ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে দলটিকে। বিরতির পর যেন পাল্টে যায় ম্যাচের চিত্রনাট্য। ৫৩তম মিনিটে যসিপ স্তানিশিচের দারুণ ক্রসে পেছনের পোস্টে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে জোরালো শটে জালে পাঠান ইভান পেরিসিচ। মুহূর্তেই এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। গোলের পর আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠে দালিচের দল। ইগর মাতানোভিচের একটি গোল অফসাইডে বাতিল হয়, সুচিচের জোরালো শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন দিয়োগো কস্তা। অন্যদিকে পর্তুগালের হয়ে লেয়াওর ২৫ গজ দূরের দুর্দান্ত শট আঘাত হানে ক্রসবারে, রোনালদোর একটি গোলও অফসাইডের কারণে বাতিল হয়।

ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় ৬৮তম মিনিটে। কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে রেনাতো ভেইগাকে জড়িয়ে ধরেন নিকোলা ভ্লাশিচ। প্রথমে খেলা চললেও ভিএআরের পর নরওয়ের রেফারি এসপেন এসকাস মনিটরে গিয়ে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন। তখনই সামনে আসেন রোনালদো। ৪১ বছর বয়সী এ ফরওয়ার্ড শান্তভাবে লিভাকোভিচকে ভুল পথে পাঠিয়ে বল জালে জড়িয়ে সমতায় ফেরান পর্তুগালকে। এটি ছিল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে রোনালদোর ক্যারিয়ারের প্রথম গোল। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বকাপের নকআউটে গোল করা সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলারের রেকর্ডও গড়েন।

সমতায় ফেরার পরও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি পায়নি পর্তুগাল। বরং ক্রোয়েশিয়াই বারবার আক্রমণে উঠে আসে। কোভাচিচের দুটি দূরপাল্লার শট, মাতানোভিচের কাছের পোস্টে নেয়া প্রচেষ্টা প্রতিহত করেন কস্তা। সুচিচের আরেকটি গোলও অফসাইডে বাতিল হয়। পরিস্থিতি বুঝে ৮১ মিনিটে রোনালদোকে তুলে নেন মার্তিনেজ। সিদ্ধান্তটি তখন অনেককেই অবাক করলেও শেষ পর্যন্ত সেটিই কাজে দেয়। মাঝমাঠে বাড়তি নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় পর্তুগাল।

যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে বাম দিক থেকে রাফায়েল লেয়াওর নিখুঁত ক্রসে উঁচুতে উঠে হেডে গোল করেন বদলি ফরওয়ার্ড গনসালো রামোস। গোলের পর উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে পর্তুগিজ সমর্থকরা। রামোসের গোলের পর পর্তুগালের উদযাপন এত দীর্ঘ ছিল যে রেফারি অতিরিক্ত সময়ের সঙ্গে আরো ৩ মিনিট যোগ করেন। আর এই শেষ মুহূর্তেই ঘটে ম্যাচের সবচেয়ে বড় নাটক।

১০৩তম মিনিটে কর্নার থেকে সৃষ্ট জটলায় বল জালে জড়ান যশকো ভার্দিওল। ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলাররা উল্লাসে মেতে ওঠেন, বেঞ্চ ও মাঠে ঢুকে পড়ে। কিন্তু ভিএআরের দীর্ঘ পর্যালোচনায় দেখা যায়, বলটি ভার্দিওলের কাছে পৌঁছার আগে অফসাইডে থাকা ইগর মাতানোভিচের গায়ে লেগেছিল। ফলে গোল বাতিল। মুহূর্তেই উৎসব বদলে যায় স্তব্ধতায়। প্রতিবাদে গ্যালারি থেকে বোতল ছুড়ে মারেন ক্ষুব্ধ ক্রোয়েশিয়ান সমর্থকরা, কিন্তু সিদ্ধান্ত বদলায়নি।

এ ম্যাচ বিশ্বকাপের ইতিহাসেও জায়গা করে নিয়েছে। প্রথমবারের মতো এক ম্যাচে চারটি গোল বাতিল হলো ভিএআরের সিদ্ধান্তে। হারের মধ্য দিয়েই বিশ্বকাপ অধ্যায়ের ইতি টানেন ৪০ বছর বয়সী লুকা মডরিচ। ২০১৮ সালের রানার্সআপ ও ২০২২ সালের তৃতীয় হওয়া ক্রোয়েশিয়াকে আরেকবার টেনে নেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন তিনি, কিন্তু ভাগ্য পাশে দাঁড়ায়নি। শেষ বাঁশির পর রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক দুই সতীর্থ মডরিচ ও রোনালদোর আলিঙ্গনের দৃশ্য হয়ে থাকে রাতটির সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত।

পর্তুগাল এ জয় উৎসর্গ করেছে প্রয়াত ফরওয়ার্ড দিয়োগো জোতাকে। ম্যাচটি ছিল তার সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রথম বার্ষিকীর আগের দিন। জাতীয় সংগীতের পর স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় ভেসে ওঠে জোতার ছবি, ২১তম মিনিটে দাঁড়িয়ে তাকে শ্রদ্ধা জানান সমর্থকরা। ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত রোনালদো জোটার ২১ নম্বর জার্সি গায়ে তুলে নেন।