আর মাত্র কয়েকটা দিন, এরপরই শুরু হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬। স্বাভাবিকভাবেই সর্বত্র এখন আলোচনার বিষয়বস্তু 'গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ' খ্যাত এ আসর। কিন্তু আপনি যদি ফুটবলের একনিষ্ঠ ভক্ত না হন, তবে এ জোয়ারে শামিল হওয়া কষ্টকর। আড্ডায় নিজেকে ফুটবল বিশেষজ্ঞ হিসেবে জাহির করতে এবং আলোচনা জমিয়ে তুলতে জেনে নিন কিছু সহজ তথ্য—
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর
আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপটি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল মহাযজ্ঞ। প্রথমবারের মতো যৌথভাবে তিনটি দেশ আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকো স্বাগতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। শুধু তা-ই নয়, এবার অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করা হয়েছে। ফলে ম্যাচের সংখ্যাও বাড়ছে রেকর্ড পরিমাণ। এ সিদ্ধান্তের ফলে ‘প্রতিযোগিতার মান কমে যাওয়ার’ আশঙ্কা করছেন সমালোচকরা। তবে কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তানের মতো নবাগত দেশের সমর্থকরা তাদের দলের প্রথম বিশ্বকাপ যাত্রা নিয়ে উচ্ছ্বসিত।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠেয় ফাইনাল ম্যাচে এবারই প্রথম দেখা যাবে আমেরিকান ফুটবলের ‘সুপার বোল’র আদলে এক জমকালো ‘হাফ-টাইম শো’। যেখানে মঞ্চ মাতাতে পারেন ম্যাডোনা, শাকিরা ও বিটিএস’র মতো বিশ্বখ্যাত তারকারা।
দুই কিংবদন্তির বিদায়
ফুটবল বিশ্বের দুই মহানায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (৪১) ও লিওনেল মেসি (যিনি টুর্নামেন্ট চলাকালীন ৩৯ বছরে পা দেবেন) যথাক্রমে পর্তুগাল ও আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নামবেন। বৈশ্বিক মঞ্চে এটিই হতে যাচ্ছে রোনালদোর শেষ উপস্থিতি। অন্যদিকে ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনার অধিনায়ক মেসির জন্যও এটি শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে বলে অনেকে ধারণা করছেন। এ দুই জীবন্ত কিংবদন্তি যদি মাঠে নামেন, তবে পুরুষ ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেয়ার অনন্য রেকর্ড গড়বেন তারা। এছাড়া মেক্সিকোর ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক গুইলারমো ওচোয়াও তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপের স্কোয়াডে ডাক পেয়েছেন, যদিও আগের সব আসরে মাঠে নামার সুযোগ তার হয়নি।
স্বাগতিকদের ওপর জয়ের চাপ
পরিসংখ্যান বলে, ঘরের মাঠের বাড়তি সুবিধা সবসময়ই স্বাগতিক দেশকে এগিয়ে রাখে। ১৯৩০ সালে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বকাপের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রতি চার আসরের একটিতে স্বাগতিক দেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ইতিহাস স্বাগতিকদের পক্ষে কথা বলছে না। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ২০২২ সালে কাতার গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। আর ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে জার্মানির কাছে ১-৭ গোলের লজ্জাজনক হারে স্তব্ধ হয়েছিল ব্রাজিল।
মেক্সিকো এর আগে ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালে স্বাগতিক হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৪ সালে উঠেছিল শেষ ১৬-তে। তবে কানাডার জন্য স্বাগতিক হওয়ার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম।
দেশে দেশে উন্মাদনা
বিশ্বকাপের মরসুমে ব্রাজিলিয়ানদের দৈনন্দিন জীবনের রুটিন বদলে যায়। ইতিহাসের সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দেশে এটি জাতীয় উৎসব। বিশ্বকাপের সময় দেশটির ‘ন্যাশনাল কংগ্রেস’ বা সংসদ তাদের অধিবেশনের সময়সূচি পরিবর্তন করে। ম্যাচের সময় কোনো অধিবেশন চলে না এবং সাধারণ মানুষের খেলা দেখার সুবিধার্থে কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেয়া হয়। রাস্তাঘাট ছেয়ে যায় পতাকায়, সরকারি স্থানগুলো সেজে ওঠে জাতীয় রঙে। এবার রিও ডি জেনিরোতে সবচেয়ে সুন্দর করে সাজানো রাস্তার জন্য বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণাও দিয়েছে নগর কর্তৃপক্ষ।
উন্মাদনা কেবল লাতিনে সীমাবদ্ধ নয়। স্কটল্যান্ডে এবার হাইতির বিরুদ্ধে তাদের প্রথম ম্যাচের পরের দিন অর্থাৎ ১৫ জুন নির্দিষ্ট কিছু সরকারি খাতের কর্মচারীদের ছুটি দিয়ে দিয়েছে।
খেলোয়াড়দের সম্মাননা
বিশ্বকাপ জয়ের মর্যাদার পাশাপাশি ফুটবলারদের জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক বোনাসের ব্যবস্থা রাখে নিজ নিজ দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। এ বোনাস কাঠামো দেশভেদে ভিন্ন হয়। অনেকে বিশ্বকাপ জিতলে খেলোয়াড়দের লাখ লাখ পাউন্ড বোনাস দেয়ার প্রস্তাব দেয়।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী জার্মান দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়কে ৩ লাখ ইউরো (প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড বা ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার) দেয়া হয়েছিল। তবে সব দেশের আর্থিক সক্ষমতা এক নয়। ২০১৪ সালেই ক্যামেরুন, ঘানা ও নাইজেরিয়ার মতো তিনটি আফ্রিকান দেশের খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাদের ফুটবল বোর্ডের বোনাস নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল, কারণ প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ ছিল খুবই কম।
খেলোয়াড়দের জনপ্রিয়তা
বিশ্বকাপে মাঠের লড়াইয়ের আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে এক রূপকথার গল্প। ইনস্টাগ্রামে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং লিওনেল মেসির ফলোয়ার সংখ্যা ৫০ কোটিরও বেশি। এর বিপরীতে, নিউজিল্যান্ডের ডিফেন্ডার টিম পেইন মাত্র ৫ হাজার ফলোয়ার নিয়ে টুর্নামেন্টের 'সবচেয়ে কম পরিচিত' ফুটবলার হিসেবে গণ্য হচ্ছিলেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার ইনফ্লুয়েন্সার ভ্যালেন স্কারসিনি পেইনের সমর্থনে একটি অনলাইন ক্যাম্পেইন করার পররাতারাতি পেইনের ফলোয়ার সংখ্যা এখন ৪০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে!
খেলোয়াড়দের ব্যাগে অদ্ভুত সব ‘হোম কমফোর্টস’
বুট, সানক্রিম বা টুথব্রাশের মতো প্রয়োজনীয় জিনিসের বাইরেও ফুটবলাররা নিজেদের মানসিক প্রশান্তির জন্য অদ্ভুত সব জিনিস সঙ্গে নেন। গত বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড দলের হ্যারি কেন নিয়েছিলেন আরামদায়ক স্লিপার, জুড বেলিংহাম নিয়েছিলেন এক প্যাকেট ‘ইউনো’ কার্ড এবং ডেকলান রাইস নিয়েছিলেন একটি এক্সবক্স গেম কনসোল। রাইস রসিকতা করে বলেছিলেন, ট্রফি বাড়ি নেওয়ার জন্য তিনি একটি বাড়তি ব্যাগও নিয়েছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত সেটি খালি নিয়েই ফিরতে হয়েছিল।














