সৌদি আরবের সব শহরের মধ্যে জেদ্দা সবচেয়ে বেশি খ্যাতিমান। এর জনপ্রিয়তাও অন্য শহরগুলোর চেয়ে অনেক অনেক বেশি। এটি বৃহৎ নগর কেন্দ্র আর সৌদি রাজ্যের বাণিজ্যিক রাজধানীও। ‘লোহিত সাগরের বধূ’খ্যাত জেদ্দা এ অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য এবং এর সমৃদ্ধ ইতিহাস ও আধুনিকতার ছোঁয়া এখানে বছরে লাখ লাখ পর্যটককে টেনে আনে।

খেলাধুলার জাগরণে সৌদির বিরাট রূপান্তর ঘটছে। এর পেছনে বড় অবদান  জেদ্দার। চিরাচরিত রক্ষণশীলতার বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসছে সৌদি সমাজ এবং বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সৌদির যোগ ক্রমাগত বাড়ছে, যার সংযোগ সেতু হিসেবে কাজ করছে খেলাধুলা। এখানে আবার এগিয়ে জেদ্দা। এটি মধ্যপ্রাচ্যের ‘হোম অব স্পোর্ট’ হয়ে উঠেছে।

২০১৬ সালে এখান থেকেই যাত্রা করে ‘ভিশন ২০৩০’। এটা সৌদি আরবের দেশব্যাপী রূপান্তরকরণের এক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান। এ প্ল্যানের রূপান্তর ঘটবে শুধুই অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে নয়। সঙ্গে রয়েছে সোস্যাল লাইফস্টাইলে পরিবর্তন আর খেলাধুলায় সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে শারীরিকভাবে নিজেদের আরো বেশি সক্ষম করে তোলা।

সৌদি আরব ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে সবসময়ই খেলাধুলাকে স্বাগত জানানো হয়েছে। এর মধ্যে অগ্রগণ্য শহর জেদ্দা। আধুনিক সব ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজনের কেন্দ্র আর বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে এটি ক্রমেই বিকশিত হয়েছে।

জাতীয়ভাবে সৌদি আরবের ক্রীড়া শিল্পের আকার বড় হচ্ছে। প্রতি বছর এটি ন্যূনতম ৮ শতাংশ করে বাড়ছে। ২০২৪ সাল নাগাদ সৌদির ক্রীড়া শিল্প পৌঁছবে ৩০০ কোটি ডলারে, যা ২০১৮ সালে ছিল ২১০ কোটি ডলার। অর্থাৎ ছয় বছরে এটি ১২০ কোটি ডলার বাড়বে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়ের সেরা সব তারকার সমাবেশ ঘটানো এবং জনপ্রিয় ক্রীড়া ইভেন্টের আয়োজনের মধ্য দিয়ে এটি খেলাধুলার একটি বিশেষ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের মানুষের মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ যেমন বাড়ছে, তেমনি দর্শক উন্মাদনাও তৈরি হচ্ছে। গত ২০ আগস্ট লোহিত সাগরের তীরবর্তী এ শহরে অ্যান্থনি জসুয়া ও ওলেকসান্ডর উসিকের মধ্যকার দুনিয়া কাঁপানো বক্সিং লড়াই অনুষ্ঠিত হয়, যাতে ইউক্রেনিয়ান বক্সার উসিকের জয় হয়েছে। তিনি এখানে ডব্লিউবিএ (সুপার), আইবিএফ, ডব্লিউবিও আর আইবিও হেভিওয়েট শিরোপা ধরে রেখেছেন ব্রিটিশ বক্সারকে হারানোর মধ্য দিয়ে। এ সময় আরো বেশ কয়েকটি ক্যাটাগরির বক্সিং ইভেন্ট জেদ্দায় অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে অন্যতম সোমালি বক্সার রামলা আলী লড়েছেন ডমিনিকার ক্রিস্টাল গার্সিয়া নোভার বিপক্ষে। সুপার-ব্যান্টামওয়েটের এ লড়াইয়ে মাত্র এক মিনিট পাঁচ সেকেন্ডেই প্রতিপক্ষকে নকআউট করেন রামলা আলী।

এছাড়া ২০১৯ সালে জর্জ গ্রোভস ও ক্যালাম স্মিথ, একই বছর অ্যান্ডি রুইজ ও অ্যান্থনি জসুয়ার আলোড়ন তোলা লড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছে জেদ্দায়।

এরই মধ্যে বিশ্বনন্দিত বড় বড় ক্রীড়া ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে জেদ্দায়। আরো নতুন নতুন মাইলফলকের অপেক্ষায় সৌদি শহরটি। ইতালিয়ান সুপার কাপ নিশ্চিতভাবেই এখানে বড় এক উদাহরণ। আগামী পাঁচ আসরের তিনটি এখানে অনুষ্ঠিত হবে। ইতালিয়ান ফুটবল লিগের সঙ্গে এ নিয়ে এক চুক্তিও হয়েছে জেদ্দা কর্তৃপক্ষের। ২০১৮ সালে সুপার কাপের ৩১তম আসরটি কিং আব্দুল্লাহ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়।

ফুটবল সবসময়ই সৌদি আরবে জনপ্রিয়। তাই ইউরোপের ফুটবল ম্যাচ এখানে আয়োজন ক্রমেই বাড়ছে। ২০২০ সালে স্প্যানিশ সুপার কাপের তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় জেদ্দার কিং আব্দুল্লাহ স্পোর্টস সিটিতে, যে আসরে রিয়াল মাদ্রিদ চ্যাম্পিয়ন হয়। এ আসর দেখেছে দেড় লাখেরও বেশি দর্শক। ফুটবলের পাশাপাশি এখানে অন্যসব খেলাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সৌদিতে ফর্মুলা ওয়ান আসরও বসছে। ২০২১ সালে সৌদি অ্যারাবিয়ান গ্রাঁ প্রিঁর প্রথম আসর অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর জেদ্দায় সৌদি অ্যারাবিয়ান গ্রাঁ প্রিঁর দ্বিতীয় আসর অনুষ্ঠিত হয়। সৌদি আরব ও ফর্মুলা ওয়ানের মধ্যে ৬৫ কোটি ডলারের ১০ বছর মেয়াদি চুক্তি রয়েছে।

এছাড়া ২০২১ সালে ইন্টারন্যাশনাল হ্যান্ডবল ফেডারেশনের মেনস সুপার গ্লোব, ২০২২ সালে বাস্কেটবলের ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী অক্টোবরে রয়্যাল গ্রিন গলফ অ্যান্ড কান্ট্রি ক্লাবে বসছে তিন দিনব্যাপী গলফ ইনভাইটেশনাল জেদ্দা আসর, যাতে চ্যাম্পিয়ন পাবেন ২ কোটি ডলারের প্রাইজমানি।

এভাবে বড় বড় ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের ক্রীড়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে জেদ্দা ও সৌদি আরবের সম্পর্ক ক্রমেই মজবুত হচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্রীড়া কেন্দ্র হিসেবে এ শহরের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ছে।

জেদ্দার ভবিষ্যৎ আর ক্রীড়া খুবই নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। তাই এখানে বিশ্বমানের ক্রীড়া অবকাঠামো গড়ে উঠছে। এজন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প হাতে নিয়েছে সৌদি সরকার। সব মিলিয়ে যাবতীয় ক্রীড়াযজ্ঞ আর প্রকল্প এটাই প্রমাণ করছে, মধ্যপ্রাচ্যের ‘হোম অব স্পোর্ট’ হিসেবে জেদ্দা এখন আর শুধু কল্পনা নয়, মোটামুটি নিশ্চিত আর প্রতিষ্ঠিত। আরব নিউজ, গার্ডিয়ান।