এ আসরে মাঠের খেলার অংশ ছাড়াও জন্ম হয় আরো অনেক ঘটনার। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি, পর্তুগাল সুপারস্টার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোসহ বিভিন্ন দলের খেলোয়াড়, রেফারি, এমনকি পুলিশ কর্মকর্তারা প্রাণনাশের হুমকিস্বরূপ ই-মেইল আর হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পেয়েছেন। হুমকির পর মেসি ও আর্জেন্টিনা দলের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ও অংশ নেয়া দেশগুলোর পুলিশ বাহিনীকে নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতা কেন্দ্র (আইপিসিসি) বিশ্বকাপজুড়ে প্রতিদিন নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সেই গোপন নথির একটি অংশ প্রকাশ করেছে স্পেনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম প্রেনসা ইবেরিকার অনুসন্ধানী অপরাধবিষয়ক চ্যানেল ইনফরমেসিওন.ইস।
প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বকাপের সময় সবচেয়ে বেশি হুমকি পেয়েছেন ২০২২ আসরের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার দলনায়ক মেসি। গত ২৭ জুন ডালাসে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা-জর্ডান। ওই ম্যাচের আগে টেক্সাসের ডালাস বিমানবন্দরে পুলিশকে ফোন করে এক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি ও তার দুই সঙ্গী ‘হাতে বানানো বোমা ও এআর-১৫ সেমিঅটোমেটিক রাইফেল’ নিয়ে স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছেন। ওই দুই ব্যক্তি পুলিশ ও দুই দলের খেলোয়াড়দের ওপর হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। কথিত ওই সন্ত্রাসীর মূল লক্ষ্য ছিলেন মেসি। যদিও এসব হুমকির পরও জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারাতে পেরেছিল আর্জেন্টিনা।
শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয় মিসর। ওই ম্যাচের আগেও বোমাতঙ্ক ছড়ায়। ম্যাচের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক ব্যবহারকারী লেখেন, ‘আমি আটলান্টা স্টেডিয়ামে ঢুকতে যাচ্ছি। নিজের শরীরে চারটা বোমা বেঁধে উড়িয়ে দেব মেসিকে।’ ম্যাচটি চলার সময় পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ফোন করে বলা হয়, স্টেডিয়ামের তিনটি ডাস্টবিনে ‘তিনটি বোমা’ রাখা আছে। বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই নেয়া হয়েছিল। ফলে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কুকুর নিয়ে পুরো স্টেডিয়ামে ব্যাপক তল্লাশি চালাতে হয়। যদিও খেলা পণ্ড হওয়ার মতো কিছু শেষ পর্যন্ত ঘটেনি।
৪১ বছর বয়সী রোনালদোকেও টার্গেট করা হয়। গত ১৪ জুন ফিফার এক কর্মী পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি রোনালদোর থাকার ব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর খোঁজখবর নিচ্ছেন। ১৬ জুন হিউস্টনে পর্তুগাল দল যে হোটেলে উঠেছিল, সেখান থেকে ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে গ্রেফতার করে পুলিশ। কানাডার টরন্টোয় রোনালদোর কাছে যেতে এক অনুরাগী তার সঙ্গে লিফটে ঢোকার চেষ্টা করেন। নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে সঙ্গে সঙ্গে আটকে দেন। মায়ামিতেও রোনালদোকে ঘিরে ধরার চেষ্টা হয়।
প্যারাগুয়ে-ফ্রান্স ম্যাচজুড়েই ছিল সংঘর্ষের ঘটনা। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের সঙ্গে মাঠে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। রিয়াল তারকার একমাত্র গোলে ম্যাচে প্যারাগুয়েকে হারায় ফ্রান্স। পরে প্যারাগুয়ের এক সিনেটর এমবাপ্পের গায়ের বর্ণ নিয়ে কথা বলে বিতর্কের জন্ম দেন। ৫ ও ৬ জুলাই প্যারাগুয়েতে এমবাপ্পের প্রতিকৃতিও পোড়ানো হয়।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নরওয়ের স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সরলথ সহজ গোলের সুযোগ নষ্ট করেন। পরে অতিরিক্ত সময়ের খেলা শেষে ২-১ গোলের জয় তুলে নেয় ইংল্যান্ড। ওই ম্যাচের পর সরলথ ও তার স্ত্রীকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। পেনাল্টি মিস করায় হুমকির মুখে কলম্বিয়ার ফুটবলার জামিনটন ক্যাম্পাজ বিশ্বকাপ শেষে সতীর্থদের সঙ্গে দেশে ফিরতে পারেননি। আবার স্পেন ও ফ্রান্সের ম্যাচে লামিনে ইয়ামালকে ফাউল করে পেনাল্টি হজম করায় ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়ে পেয়েছেন হামলার হুমকি। ওই ম্যাচে ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে যায় স্পেন, যারা পরে চ্যাম্পিয়ন হয়।
এশিয়ার দল দক্ষিণ কোরিয়া এবার তিন ম্যাচের দুটিতে হেরে গিয়ে প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নেয়। এটা মানতে পারেননি সমর্থকরা। ক্ষুব্ধ হয়ে কোচ হং মাইওং-বো ও পুরো দলকে একযোগে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। এ ঘটনার পর দক্ষিণ কোরিয়া দলকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হয়েছিল কড়া পুলিশ প্রহরায়।
আর্জেন্টিনা ও মিসর ম্যাচে মিসরের গোল বাতিলের বাঁশি বাজানো ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ার ম্যাচের পর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে প্রায় ‘ছয় হাজার হুমকিমূলক বার্তা’ পাঠানো হয়, যার বেশির ভাগই ছিল মিসরের নাগরিকদের কাছ থেকে। ওই ম্যাচে ভিএআর দায়িত্বে থাকা ফরাসি রেফারি উইলি দেলাজোদও পান হত্যার হুমকি।









